এলিয়েন মাছ
চিত্র-বিচিত্র ইফতেখার মাহমুদ মার্চ ২০২৫
গভীর সমুদ্রে গবেষণা পরিচালনার জন্য বিভিন্ন যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। এসব যন্ত্র সাধারণত সাগরের তলদেশে অনুসন্ধান চালায়। যার মাধ্যমে পাওয়া যায় নতুন ও বিরল সব প্রাণীর খোঁজ। এমন গবেষণা যানের মাধ্যমে হঠাৎ দেখা গেল কিছুটা ভিন্ন আকৃতির একটি অনুসন্ধানকারী যানের মতো একটি প্রাণী। এটি কোনো যন্ত্র নয় বরং মাছ। গবেষকরা জানিয়েছেন, এটি গভীর সমুদ্রের একটি মাছ। মাছটির নাম ব্যারেলি।
এটি দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্রের মনটেরির ক্যালিফোর্নিয়া উপসাগরে। সমুদ্রের দু’হাজার ফুট গভীরে এই অদ্ভুত মাছের দেখা পেয়েছে এক দল গবেষক। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় বিজ্ঞানী র্যাচেল কার্সনের নেতৃত্বে অভিযান চালানোর সময় এর দেখা পান।
এমন স্বচ্ছ মাথার প্রাণীর বিচরণ আছে আটলান্টিক, প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরে। পানির দুই হাজার থেকে দুই হাজার ৬০০ ফুট গভীরে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সমুদ্র গবেষণা সংস্থা মনেটারি বে অ্যাকুয়ারিয়াম রিসার্চ ইনস্টিটিউট পানির জগৎ নিয়ে কাজ করে। এ কাজে তারা ভেনটেনা নামের দূর থেকে পরিচালনা করা যায়- এমন একটি যন্ত্র ব্যবহার করে। এতে বসানো আছে উচ্চ রেজুলেশনের ক্যামেরা, যার ফ্রেমে সম্প্রতি বন্দি হয়েছে অদ্ভুত এই প্রাণী।
রিমোট অপারেটিং যান ভেনটানা ও ডক রিকেটসের ধারণকৃত ২৭ হাজার ৬০০ ঘণ্টারও বেশি সময়ের ভিডিওতে মাত্র ৯ বার মাছটিকে ক্যামেরায় ধারণ করা সম্ভব হয়েছে।
এই মাছ স্পুক ফিশ নামেও পরিচিত। বিজ্ঞানীরা এ ধরনের স্বচ্ছ মাথার প্রাণীকে ম্যাক্রোপিনা মাইক্রোস্টমাও বলে থাকেন। বিরল এই প্রাণী লম্বায় ছয় ইঞ্চি।
এলিয়েনের মতো এই মাছটির শরীরের বেশির ভাগ অংশ কালো বা অস্পষ্ট হলেও মাথার ওপরের অংশটি স্বচ্ছ। অন্য যে-কোনো সামুদ্রিক প্রাণী থেকে ভিন্ন মাছটির স্বচ্ছ মাথার ভেতরে রয়েছে উজ্জ্বল সবুজ রঙের একজোড়া চোখ।
স্বচ্ছ মাথার প্রাণী প্রথম দেখা যায় ১৯৩৯ সালে। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের জীববিজ্ঞানী উইলবার্ট ম্যাকলেওড চ্যাপম্যান এ ধরনের প্রাণী নিয়ে প্রথম আলোচনা করেন।
ব্যারেলি মাছটি সমুদ্রের অনেক গভীরে থাকে যেখানে খাদ্য সংকট রয়েছে। তবে, ব্যারেলি মাছের চোখের অবস্থান এমন জায়গায় যে, জলরাশি ভেদ করে এরা খুঁটিয়ে খাবারের সন্ধান করতে পারে।
২০১৯ সাল পর্যন্ত ধারণা ছিল, মাছটির চোখজোড়া এক জায়গায় স্থির এবং মাথার ওপরে সরাসরি যা ছিল তা শুধুমাত্র একটি ‘টানেল-ভিশন’। তবে একই বছর আরেকটি নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, মাছটির চোখ মাথার ওপরের স্বচ্ছ ঢালের মধ্যে ঘুরতে পারে, খাদ্য খুঁজতে পারে এবং সে কী খাচ্ছে তা দেখতেও পারে।
খাবারের সন্ধানে এই মাছ ৩৬০ ডিগ্রি চোখ ঘোরাতে পারে। এই চোখ ঘোরানো নিয়েই প্রথমে শুরু হয়েছিল গবেষণা।
জীববিজ্ঞানীদের মতে, মাছটি এমন এক কঠিন পরিবেশে বাস করে, যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছাতে পারে না। তারই ফলস্বরূপ এক শক্তিশালী দৃষ্টিশক্তির অনুভূতি তৈরি হয় মাছটির মধ্যে। গভীর সমুদ্রের প্রাণীদের চোখের মতো ব্যারেলি মাছেরও রয়েছে টিউবুলার বা নলাকৃতি চোখ। এ ধরনের চোখ সাধারণত বহু-স্তর রেটিনা বিশিষ্ট হয়ে থাকে। পাশাপাশি থাকে একটি বড়ো লেন্স, যা তাদের এক দিক থেকে অধিক পরিমাণে আলো শনাক্ত করতে সাহায্য করে।
গবেষকরা মনে করছেন মাছটি সূর্যের আলো উপেক্ষা করতে এটি একটি হালকা ফিল্টার তৈরি করে এবং প্রিয় খাবার ছোট মাছ ও জেলিফিশের বায়োলুমিনিসেন্সকে চিহ্নিত করে।
সমুদ্র জীববিজ্ঞানীরা আরও জানান, এটি পানিতে গতিহীনভাবে থাকার জন্য বড়ো ও চ্যাপ্টা পাখনা ব্যবহার করে। অর্থাৎ চারপাশের প্রাণীদের এরা স্পষ্টভাবে দেখতে পারে না। এমনকি এরা নিজেদের ওপরে লুকিয়ে থাকা শিকারিদেরও দেখতে পারে না। তবে ছোট মাছ বা প্ল্যাঙ্কটন শিকারের জন্য ওপরের দিকে তাকাতে পারে।
খাদ্যের সন্ধান পেলে ব্যারেলি মাছ অন্ধকার থেকে আক্রমণ করে এবং শিকারকে দ্রুত গ্রাস করে। এ সময় সামনের দিকে তাকানোর জন্য মাছটি চোখ ঘোরায় ও নিজের অবস্থান সম্পর্কে বুঝতে পারে।
আরও পড়ুন...