কোয়ান্টাম কম্পিউটিং : নতুন সম্ভাবনার দ্বার
আইটি কর্নার নাদিম নওশাদ এপ্রিল ২০২৫
কম্পিউটার আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই আধিপত্য বিস্তার করছে। আজকে আমরা এমন এক কম্পিউটারের কথা জানবো যেটা বর্তমানে প্রচলিত কম্পিউটার থেকে অনেক দ্রুত কাজ করতে পারে। আর এ কম্পিউটারের নাম কোয়ান্টাম কম্পিউটার। কোয়ান্টাম কম্পিউটার কতটা দ্রুত কাজ করে তার একটা নমুনা চলো জেনে নিই।
২০১৫ সালে গুগোল ও নাসা যৌথভাবে তাদের রিপোর্টে বলে, তাদের তৈরি কোয়ান্টাম কম্পিউটার কয়েক সেকেন্ডেই এমন একটি সমস্যার সমাধান করেছে যা সাধারণ কম্পিউটারের করতে ১০০ মিলিয়ন বছরের বেশি সময় লাগবে। ভাবতে পারো, কোয়ান্টাম কম্পিউটার তাহলে কতটা দ্রুত কাজ করে!
কোয়ান্টাম কম্পিউটার কী?
কোয়ান্টাম কম্পিউটিং কম্পিউটার সায়েন্স, পদার্থবিজ্ঞান এবং গণিতের সমন্বয়ে তৈরি একটি বহুমুখী ক্ষেত্র। এটি এমন এক অত্যাধুনিক কম্পিউটিং পদ্ধতি যেখানে কোয়ান্টাম মেকানিক্সকে কাজে লাগিয়ে ডাটা প্রোসেসিং করা হয়। কোয়ান্টাম কম্পিউটিং-এর মধ্যে কোয়ান্টাম হার্ডওয়্যার, অ্যাপ্লিকেশন তৈরি এবং কোয়ান্টাম অ্যালগোরিদমসহ বিভিন্ন শাখা রয়েছে। মেশিন লার্নিং, ক্রিপ্টোগ্রাফির মতো ক্ষেত্রগুলোতে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং প্রচলিত কম্পিউটারের তুলনায় অনেক দ্রুত সমাধান দিতে সক্ষম।
কোয়ান্টাম কম্পিউটার কীভাবে কাজ করে
কোয়ান্টাম কম্পিউটার কীভাবে এত দ্রুত কার্য সম্পাদন করে, তা বুঝতে হলে আমাদের প্রথমেই জানতে হবে প্রচলিত কম্পিউটার কীভাবে কাজ করে। সাধারণ কম্পিউটারের একটি প্রোসেসর থাকে, যেখান থেকেই সমস্ত কাজের নির্দেশনা প্রদান করা হয়। এটাকে কম্পিউটারের ব্রেইনও বলা যেতে পারে। প্রচলিত কম্পিউটারের প্রসেসরে বিট দিয়ে তৈরি একটি সারি থাকে। বিটগুলো কেবল ০ বা ১ হতে পারে। তাই এই বিটগুলোকে বাইনারি বিটও বলা হয়ে থাকে। প্রচলিত কম্পিউটার যেখানে ডাটা প্রোসেসিং করার জন্য বাইনারি বিট ব্যবহার করে, সেখানে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এ সম্পূর্ণ নতুন পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়, যাকে কোয়ান্টাম বিট বা সংক্ষেপে কিউবিট বলে। কিউবিট ব্যবহার করে প্যারালাল কম্পিউটিং করা সম্ভব; অর্থাৎ একই সাথে ০ এবং ১ উভয় বিটে কাজ করা সম্ভব।
কোয়ান্টাম কম্পিউটার কীভাবে কিউবিটের কার্যপদ্ধতি ব্যবহার করে, তা আরও ভালোভাবে বুঝতে চলো একটা উদাহরণ দেখা যাক। মনে করো, তুমি একটা গোলকধাঁধার মাঝে দাঁড়িয়ে আছো। তোমাকে এই গোলকধাঁধাটার সমাধান করতে হবে। প্রচলিত কম্পিউটার সমস্যাটি সমাধানের জন্য সম্ভাব্য সমস্ত রাস্তা খুঁজে বের করবে। এক্ষেত্রে, প্রতিবার নতুন পথ খুঁজে বের করতে ও বন্ধ রাস্তাগুলোর তথ্য মনে রাখতে প্রচলিত কম্পিউটার বিট ব্যবহার করবে। অন্যদিকে, কোয়ান্টাম কম্পিউটার গোলকধাঁধাটিকে পাখির চোখ দিয়ে দেখবে। ফলে একসাথে অনেকগুলো পথ খুঁজে বের করে, সঠিক পথটি অনেক দ্রুত ও নির্ভুলভাবে নির্বাচন করতে পারে।
এখন একটু ভাবো, প্রতিটা পথ ঘুরে ঘুরে সঠিক পথ বের করবার থেকে পাখির চোখে দেখে গোলকধাঁধাটিকে সমাধান করতে কত কম সময় লাগবে!
কোয়ান্টাম কম্পিউটিং-এর মূলনীতি
কোয়ান্টাম কম্পিউটার সম্পর্কে জানার জন্য এর মূলনীতিগুলো সম্পর্কে জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোয়ান্টাম কম্পিউটার কোয়ান্টাম নীতি মেনে চলে। এ সম্পর্কে বুঝতে হলে আমাদের কিছু নীতি সম্পর্কে জানা প্রয়োজন।
সুপারপজিশন (Superposition) : সুপারপজিশন পদার্থের তরঙ্গের মতো। একটি কিউবিট নিজে খুব বেশি কার্যকর না হলেও কোনো তথ্যকে এটি সুপারপজিশনে ফেলতে পারে। সুপারপজিশনে কিউবিটগুলো জটিল ও বহুমাত্রিক গঠন তৈরি করতে পারে। সুপারপজিশনে অনেকগুলো কোয়ান্টাম অবস্থা সম্মিলিত হয়ে নতুন কোয়ান্টাম অবস্থা তৈরি করতে পারে। আবার কোনো কোয়ান্টাম অবস্থা ভেঙে অনেকগুলো স্বতন্ত্র অবস্থার তৈরি করতে পারে। এভাবেই সুপারপজিশন অবস্থায় লক্ষ লক্ষ প্রোসেস কয়েক সেকেন্ডেই করে ফেলা সম্ভব।
এনট্যাঙ্গেলমেন্ট (Entanglement) : এনট্যাঙ্গেলমেন্ট হলো কিউবিটগুলোর একে অপরের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করার ক্ষমতা। কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গেলমেন্ট ঘটে যখন একটি কিউবিট কোনো বিটের সাথে এমনভাবে যুক্ত থাকে যে একটি বিটের তথ্য পেলেই অপর বিট সম্পর্কে জানা যায়। ফলে কোয়ান্টাম প্রোসেসর একটি বিটের ওপর নির্ভর করেই কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কোনো বিট ওপরের দিকে ঘুরলে অন্য বিটটি অবশ্যই নিচের দিকেই ঘুরবে। যখন কোয়ান্টাম সিস্টেমকে হিসাব করা হয়, তখন সুপারপজিশনটি ভেঙে একটি বাইনারি অবস্থায় রূপান্তরিত হয়।
ডিকোহেরেন্স (Decoherence) : ডিকোহেরেন্স হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে কোনো সিস্টেম কোয়ান্টাম অবস্থা থেকে নন কোয়ান্টাম অবস্থায় ভেঙে পড়ে। কখনো কখনো এটি ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয় ডিকোহেরেন্স পরিমাপ করতে। আবার কখনো কখনো পরিবেশের বিভিন্ন কারণে এমনটি হতে পারে। কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরিতে অনেক বড়ো একটি চ্যালেঞ্জ হলো কিউবিটগুলোকে বাহ্যিক পরিবেশ থেকে রক্ষা করতে পারে এমন একটি কাঠামো নির্মাণ করা।
বিভিন্ন জটিল সমস্যা সমাধানের জন্য কোয়ান্টাম অ্যালগোরিদম ব্যবহার করে বহুমাত্রিক কম্পিউটার স্পেস তৈরির গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। মেশিন লার্নিং, আণবিক সিমুলেশনের মতো জটিল সমস্যাগুলোর সমাধানে কোয়ান্টাম কম্পিউটিংকে অনেক বেশি কার্যকর হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কোয়ান্টাম কম্পিউটার কম্পিউটিং জগৎকে নতুন সম্ভাবনার দ্বারের সামনে এনে দিয়েছে। বিভিন্ন আর্থিক, গবেষণা, সরকারি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো কোয়ান্টাম কম্পিউটার নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করছে।
আরও পড়ুন...