চঞ্চল কৈশোরের স্বপ্ন
জুলাই-নিবন্ধ নাসীমুল বারী আগস্ট ২০২৫
পড়ন্ত দুপুর। শনিবার হলেও আজ স্কুল খোলা ছিল। দুপুরে ক্লাস ছুটির পর স্কুলগেটের বাইরে আসে সৌরভ, রাফিদরা অনেকেই। সেখানে কলেজ শাখার বড়ো ভাইয়াদের একটা জটলা। গেট দিয়ে ওরা বের হতেই ওদেরকে ডাকে এক বড়ো ভাইয়া। সৌরভ ও রাফিদ যায়। উত্তেজনায় সে বলে, এই শোনো, কাল থেকে বাংলা ব্লকেড শুরু হচ্ছে! এ আন্দোলন পালটে দেবে ইতিহাস!
‘ইতিহাস পালটাবে’, ‘বাংলা ব্লকেড’ আচমকা এমন শব্দ ও কথাগুলো শুনেই কেমন যেন একটা কাঁপুনি ধরে যায় সৌরভের মনে। এটা কি নতুন কোনো খেলা? নাকি রোবট বা গেমের নাম? রাফিদও তাকিয়ে থাকে বড়ো ভাইয়াটার দিকে! না, বড়ো ভাইয়ার চোখ-মুখ দেখে সৌরভ বুঝতে পারে, এটা অনেক সিরিয়াস কিছু একটা।
রাফিদ কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করে, ভাইয়া, এটা আবার কী?
কিছুটা উত্তেজিত বড়ো ভাইয়ারা আরও কিছু শিক্ষার্থীর সাথে আলাপ করছিল। রাফিদের কথায় একজন বলে, এটা বৈষম্যের বিরুদ্ধে তরুণদের প্রতিবাদ। যারা পরিশ্রম করে, মেধা দিয়ে এগিয়ে যেতে চায়, তাদের জন্য একটা ন্যায়ের লড়াই। শুধু ঢাকাতেই না, দেশের সব জায়গায় অবরোধ হবে, এটাই বাংলা ব্লকেড! এতদিন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ছিল। এবার আমরা তোমাদেরকেও চাই যুক্ত করতে। এটা তোমাদের ভবিষ্যতের জন্যও প্রয়োজন।
তোমরা সবাই শাহবাগে থাকবে কাল বিকেলে। মনে থাকবে তো?
বাসায় ফিরতে ফিরতে ওরা কয়েকবার আওড়ায় ‘বাংলা ব্লকেড’। এসব কী বলছে? কেন শাহবাগে যেতে বলছে? ওরা তো ছোট, তারপরও কেন বলছে যেতে? ওদের ভবিষ্যতে প্রয়োজন। কী এটা! অনেক প্রশ্ন মনে? অনেক জিজ্ঞাসা মনে? অনেক বিস্ময়ও! কিন্তু আবার এটা নতুন কিছু-এমন একটা ভাবনায় ওদের মনে শিহরনও জাগে। নতুন আর দারুণ কিছু লাগছে। দুজনের মাঝেই কৌতূহল, আগ্রহ ও শিহরন।
হাঁটতে হাঁটতে মাঠের কাছে আসতেই দেখা হয় তানভীর ও জামানের সাথে। বাসার কাছেই মাঠ। সবাই একই ক্লাসে নাইনে পড়ে। তবে চারজন তিন স্কুলে। স্কুল ছুটির পর বাসায় ফিরতে এভাবে সাধারণত দেখা হয় না। কখনো কখনো হয়, আজও দেখা হয়ে গেল। কৌতূহল ও শিহরনের উত্তেজনায় সৌরভ এগিয়ে তানভীরকে বলে, কাল থেকে নাকি শাহবাগে বাংলা ব্লকেড। শুনেছিস কিছু তোরা? শুনেছিস?
সৌরভকে সমর্থন দিয়ে রাফিদও বলে, শুনেছিস কিছু তোরা?
-বা-ং-লা ব্ল-কে-ড...! তানভীর, জামান দুজনেই বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করে, কী এটা রে! তোরা জানলি কোত্থেকে?
-স্কুল থেকে। সৌরভ বলে।
জামান বলে ওঠে, এই ফেসবুকে যেমন কাউকে ব্লক করা হয় তেমন কিছু কি?
সৌরভ আর রাফিদ নিজেরা দুজনে ফিসফিসিয়ে বলে, আমরাও তো জানি না কিছু। শুধু বলেছে ‘বৈষম্যের বিরুদ্ধে তরুণদের প্রতিবাদ।’ আর তো তেমন কিছু জানি না। তাই একটু গম্ভীর হয়ে সৌরভ ওদেরকে বলে, যা এখন বাসায় যা। ফ্রেশ হ। বিকালে মাঠে আসবি না, তখন বলব। সব বলব।
এখনই না জানানোটা জামানের ভালো লাগেনি। তাই আবারও বলে, ফেসবুকের ব্লক নিয়ে কিছু বলবি তাইতো! তাই এখন বলতেছিস না আমাদেরকে। কেউ কি তোদের ব্লক মেরেছে?
কোনো কথা না বলে একটু হেসে বাসার দিকে রওনা দেয় সৌরভ, রাফিদ; সাথে সাথে ওরাও।
বিকালে মাঠে আসে ওরা। ক্রিকেট খেলবে। কিন্তু তানভীর আর জামানের চোখে কৌতূহলী এক স্পন্দন ধরা পড়ে। -বা-ং-লা ব্ল-কে-ড...! কী বিষয় ওটা!
তানভীর এর সাথে জামান, লাবিব, সৈকত ওরা সৌরভকে ঘিরে ধরে জানতে চায়, বাংলা ব্লকেড কী রে?
সৌরভ একটা ভাব নিয়ে বলে, এখন বাদ দে, খেলা শুরু কর। কাল শাহবাগে যাবি, তখন দেখবি জানবি সবাই, কী এটা!
-দেখ বেশি হেঁয়ালি করবি না। তানভীর বলে সৌরভকে।
-হেঁয়ালির কিছু নেই। কালই সব জানতে পারবি শাহবাগে গেলে। আসলে আমিও এখন ভালো করে কিছু জানি না। চল আমরা সবাই তাহলে একসাথেই শাহবাগে যাই। যাবি? ওখানে গিয়েই জানব।
পরদিন বিকালে শাহবাগে আসে সৌরভ রাফি তানভীর জামান ও লাবিব। শুধু লাবিবই ওদের চেয়ে এক ক্লাস নিচে এইটে পড়ে। ওদের সবার মনে কৌতূহল। বাংলা ব্লকেড নিয়ে ওদের বিস্ময় শিহরনের কমতি নেই। এখানে এসে দেখে, হাজারো ছাত্র-ছাত্রী প্ল্যাকার্ড হাতে মধ্য রাস্তায় বসে স্লোগান দিচ্ছে-
“দফা এক দাবি এক, কোটা নট কাম ব্যাক!”
“তারুণ্যের হাতিয়ার, গর্জে উঠুক আরেকবার!”
“জাস্টিস, জাস্টিস, উই ওয়ান্ট জাস্টিস।”
“আমার সোনার বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই।”
রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে রাফিদ, তানভীর, জামান সৌরভকে বলে, দ্যাখ, দ্যাখ স্লোগানগুলো! ‘কোটা নট কাম ব্যাক।’
আমরাও চাই না কোটা। ওরা সবাই বলে। পরক্ষণেই জামান বলে, তাইতো কদিন আগে আমার মাকে বাবা বলছেন, কোটাটা না ওঠালে তোমার ছেলে-মেয়েদের ভবিষ্যৎ ভালো না।
রাফিদ বলে, আচ্ছা আমাদের ছোটোদের এখানে কেন আসতে বলেছে? দেখে তো মনে হচ্ছে যারা চাকরি করবে, তাদের জন্য।
সৌরভ বলে, যাহ্! কিছুই জানিস না। আমারাও শিক্ষার্থী। আমরাই তো বড়ো হবো একদিন। শিক্ষার্থীদের প্রতি বৈষম্য মানে আমাদের প্রতিও। অন্যায়টা তো সবার ওপরেই পড়ে। বৈষম্যের কষ্ট ছুঁয়ে যায় সবাইকে, তাই না? তাই আমরা এখানে এসেছি।
রাফিদ, তানভীর, লাবিব, জামান সবাই মাথা নেড়ে সায় দেয়। সৌরভ আবার বলে, এই যে, আমাদের জানার আগ্রহ থেকেই তো শুরু হলো। আজ দেখলাম, কাল হয়তো... অংশও নেব আমরা! প্রয়োজন কিন্তু আমাদের আগামীর জন্য।
শেষ বিকেলের আকাশে তখন লালচে আলো। সৌরভ ভাবে আজকের দিনটা শুধু একটা ব্লকেড দেখা নয়, নতুন কিছু জানা ও শোনার।
দুই.
সন্ধ্যা হয়ে আসছে। বাংলা ব্লকেড শেষ হয়ে গেছে। স্লোগান থেমেছে, প্ল্যাকার্ড গুটিয়ে নিয়েছে সবাই। শিক্ষার্থীরা রাস্তা ছেড়ে দিয়েছে। সৌরভরা এখনো জাতীয় জাদুঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ওদের মনে এখনো গুঞ্জরন! এখনো কৌতূহল! সৌরভের ভেতরে এখনো কিছু একটা ধ্বনিত হচ্ছে।
হঠাৎ ওদের সামনে আসে স্কুল গেটের সে-ই বড়ো ভাইয়ারা। একজন সৌরভকে চিনতে পেরে বলে, এই যে! বাহ, আমার স্কুলের ছোটো ভাই তো! আমাদের মান রেখেছ এখানে এসে।
সৌরভ দেখে তাকে। লম্বা চওড়া গড়ন, চোখে চশমা। পাশে আরেকজন গাম্ভীর্য আর হাসির দারুণ মিশেল তার মুখে। তার কথা শুনেই আজ এখানে আসা। সৌরভ প্রথমজনকে কৌতূহলে বলে, ভাইয়া, আপনার নামটা কী?
একটু মিটি মিটি হেসে বলে, আমি মুহিত। আর এই যে যিনি তোমাদেরকে আসতে বলেছিলেন, উনি সালমান ভাই।
ওরা সবাইকে সালাম দেয় একসাথে। সালমান স্নেহভরে কাছে টানেন। ওদের কাঁধে হাত রেখে বলেন, ভয় পেয়েছ? নাকি ভালো লেগেছে?
ওরা চুপ। কোনো কথা বলে না। হয়তো এখনো বোঝার চেষ্টা করছে সবকিছু। হাসিমুখে আবার সালমান বলেন, তোমরা কী বুঝেছ, কেন এসেছ? জানো কি আমরা কেন রাস্তায় নামি?
এবারও ওরা চুপচাপ।
সালমানই আবার বলে, আমার মেধার অধিকারকে আমার প্রয়োজনে কাজে লাগাতে চাই। ন্যায্যভাবে, যোগ্যভাবে দেশের জন্যও, নিজের জন্যও। তোমরা তোমাদের মেধাকে সঠিক ব্যবহার করতে চাও। তাই না?
সবাই একসাথে বলে ওঠে, হাঁ।
-বেশ তো তাহলেই তোমাদেরকে বুঝতে হবে এখনকার ব্যাপারগুলো। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ব্যাপারটা। এই যে আমরা বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলি, এই যে আন্দোলন; এসব কেবল একটা চাকরি পাওয়ার জন্য না। এটা একটা ন্যায়ের দাবি। যাতে সব মানুষ সমানভাবে সুযোগ পায়। মেধা থাকা সত্ত্বেও যাতে আমরা তোমরা আটকে গিয়ে হারিয়ে না যাই কোটার ছাঁকনিতে।
সৌরভ সাহস করে বলে, ভাইয়া তাহলে বিষয়টা পরিষ্কার করে আমাদেরকে জানান। আমরা জানতেও চাই, বুঝতেও চাই।
সালমান একটু হাসেন। মনে মনে ভাবেন, এরা শুধুই দেখতে ছোটো। কিন্তু ভেতরে ভেতরটা হয়তো জেগে উঠছে। তাই আদর করে বলেন, চলো, বসি। গল্প করি একটু। চটপটি খাবে? তোমাদের জানার ইচ্ছাটাই তো সবচেয়ে বড়ো আশার জায়গা।
ওরা সবাই চারুকলার দিকে একটু এগিয়ে যায়। ওখানে ফুটপাতের একটা অংশে বসে। সামনের চটপটিওয়ালা থেকে চটপটি নেয়। সালমান মুহিতসহ ওরা পাঁচজন। বসে সালমান সবার নাম পরিচয় শোনে। তারপর বলে, আজ হলো বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বাংলা ব্লকেড কর্মসূচি। শুধু ঢাকাতেই নয়, দেশের প্রায় সকল শহরেও হয়েছে।
সৌরভ আবারও প্রশ্ন করে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনটা কী? পুরোপুরি জানাবেন আমাদের?
-তোমরা ছোট; তবু তোমাদের জানা দরকার। স্পষ্ট করেই জানা দরকার। তোমাদের জানার আগ্রহটা অনেক ভালো। আমাকে বেশ আশান্বিত করেছে। শোনো মন দিয়ে। পড়ালেখা শেষ করে আমাদের দেশে প্রায় সকলেই সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের চাকরি করতে চায়। এর মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো বিসিএস ক্যাডার। প্রতিযোগিতামূলক নানা পরীক্ষা দিয়ে তবে চাকরির যোগ্যতা অর্জন করতে হয়। এই মেধার প্রতিযোগিতায় তুমি যোগ্যতা অর্জন করার পরও নিশ্চিত হতে পারবে না তোমার চাকরি হবে; কোটার আওতায় তোমার সুযোগ কমে যাচ্ছে।
মনে করো, একটা চাকরির পরীক্ষায় তুমি পাস করেছ। তোমার মতো আরও অনেকেই পাস করেছে। চাকরি আছে মোট ১০০টি। এখন ভাবো, তোমাদের মধ্যে থেকে মাত্র ৪৪ জনকে নেওয়া হলো। আর যারা পরীক্ষায় তোমাদের চেয়ে তুলনামূলক কম নম্বর পেয়েছে, এমন ৫৬ জনকে চাকরি দিয়ে দেওয়া হলো। এর কারণ তারা কোটার আওতায় পড়ে।
রাফিদ, জামান আর সৌরভ একসাথে বিস্মিত হয়ে বলে উঠল, তা কী করে হয়! আমি ভালো করে পাস করলাম, আর আমার চেয়ে কম নম্বর পাওয়া কেউ চাকরি পাবে?
সালমান হেসে বলল, এই তো, তোমরা নিজেই বুঝে ফেলেছ আসল কথা!
কৌতূহল আর জিজ্ঞাসা নিয়ে রাফিদ ও জামান বলে, কম নম্বর পেয়েও কেন চাকরি পাবে ওরা?
সালমান বোঝাতে লাগল, দেখো, এটা কোটার নিয়ম। কিছু নির্দিষ্ট শ্রেণির জন্য চাকরি বরাদ্দ রাখা হয়। কেউ হয়তো তার বাবা-দাদা-নানার সূত্রে, কেউ হয়তো কোনো জাতিগত পরিচয়ের কারণে এই কোটার মধ্যে পড়ে। তাই তারা কম নম্বর পেলেও চাকরি পায়। অথচ তুমিই মেধাবী, তুমিই পরিশ্রম করেছ; তবু বাদ পড়ে গেছ।
এই যে বৈষম্য, এতে মেধা উপেক্ষিত হয়, অবহেলিত হয়। এটাই আমরা দূর করতে চাই। আজ হয়তো আমরা বা আমাদের কথা বলছি, আন্দোলনে নেমেছি, কিন্তু ভবিষ্যতে এ সমস্যার মুখোমুখি তোমরাও হবে।
তানভীর এবার একটু দ্বিধাভরে জিজ্ঞেস করল, কেন এমনটা করা হয়? কেন এ কোটাব্যবস্থা?
-এটা রাষ্ট্রের নীতি। এটা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত। অনেক আগেই কিছু শ্রেণির জন্য কোটা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন দরকার যোগ্যতার ভিত্তিতে সবাইকে সমান সুযোগ দেওয়া।
সৌরভ জানতে চায়, আপনারা কী করছেন?
হেসে হেসেই সালমান ওদেরকে বলে, আমরা কোটাব্যবস্থা দূর করতে চাই। তুমি আমি আর ওই কোটাধারী প্রার্থীরা একই দেশের নাগরিক, একই সমাজের মানুষ। কিন্তু কোটা বিভাজন তৈরি আমাদের জাতিগত একতাকে ভেঙে দিচ্ছে। একটা বৈষম্য তৈরি করছে। তাই আমরা মেধা আর পরিশ্রমের যথাযথ মর্যাদা ও সম্মান উদ্ধারে নেমেছি। সবার জন্য সুযোগ সমান হয়; সে ব্যবস্থা করার জন্য নেমেছি। এটাই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন।
হঠাৎ তানভীর চিৎকার দিয়ে বলে, আমি ওদের বিরুদ্ধে লড়াই করব। আমার বাবাকে আমি হারিয়েছি। এখন ওদের জন্য আমার লেখাপড়ার মেধাকেও হারাব? এটা হতে পারে না।
তানভীরকে থামিয়ে সালমান আবার বলে, এখন থেকে তোমরা এখানে আসবে, রাজু ভাস্কর্যে আসবে, সাইন্স ল্যাবরেটরিতে আসবে, চানখারপুলে আসবে। যেখানে যখন ঘোষণা আসবে, সেখানেই যাবে। টিভিতে ঘোষণা পাবে। ফেসবুকে ঘোষণা পাবে। তোমরা তোমাদের বন্ধুদের নিয়েও এমন দল করবে, যাতে দলবেঁধে যেতে পারো। মনে থাকবে তো?
সালমানের এ ছোট্ট গল্প-আলাপ শেষে ওরা ওঠে। বাসার পথে রওনা দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে আজিমপুরে ওদের বাসা। বাসায় ফিরতে ফিরতে তানভীর বলে, আমি প্রতিবছরই এখানে আসি একবার।
-কেন?
রাফিদ জানতে চায়। হঠাৎ চুপসে যায় তানভীর। মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে আসে। কণ্ঠটা কেমন যেন ভিজে ভিজে ওঠে। ভেজাকণ্ঠে বলে, বাবার খোঁজে।
-মানে?
তানভীর চোখের দৃষ্টি নামিয়ে নিচু গলায় বলে, সানজিদা তুলি আপু প্রতিবছর একদিন আমাদের নিয়ে এখানে আসেন। অবস্থান করেন। ‘মায়ের ডাক’ নামে উনার একটা সংগঠন আছে। ওটার মাধ্যমে আমাদের হারিয়ে যাওয়া বাবাকে খুঁজে দেওয়ার জন্য দাবি জানায়।
চারপাশে হঠাৎ নেমে আসে স্তব্ধতা। কারো মুখে কোনো শব্দ নেই। শুধু পায়ের আওয়াজ। কিছুক্ষণ পর তানভীর বুকের ভেতর জমে থাকা কথাগুলো বের করে ভরা গলায় বলে, আমার বাবারে সেই যে নিয়ে গেল, আর তো এলো না! দশ বছর হয়ে গেছে। আমি তখন কত ছোট্ট। আমি কেঁদে কেঁদে বলছিলাম, বাবা, আমি তোমার সাথে যাব। মা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখেছিলেন।
চোখ দুটো মোছে তানভীর। চোখ মুছতে মুছতেই বলে, আজকাল মা আমারে তুলি আপার ওইসব মিছিলে যেতে দিতে চায় না। ভয় পায় আবার যদি আমাকে কেউ নিয়ে যায়। আমি লুকিয়ে লুকিয়ে যেতাম। মিছিলের ভিড়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম, যদি বাবারে কোনো মিছিলে দেখতে পাই...
গলা বসে আসে তানভীরের। আর কথা বলতে পারে না। আবারও চোখ মুছে। চোখ মুছে সৌরভ, রাফিদ, লাবিব, জামানও। তানভীরের কাঁধে হাত রাখে সৌরভ। দৃঢ়কণ্ঠে বলে, আমরাও খালুর গুমের বিচার চাই। এটাও আমাদের অধিকার।
(চলবে)
আরও পড়ুন...