তিন দুরন্ত মিশন জঙ্গলবাড়ি

রহস্যভেদ রবিউল ইসলাম ডিসেম্বর ২০২৪

(গত সংখ্যার পর)

পাঁচ.

সাব্বির ও রাকিব এখনো মাঠে বসে আছে। সেই কখন শাইক বনের মধ্যে ঢুকেছে। এখনো ফেরার নাম নেই। ওদের দুশ্চিন্তা হচ্ছে। তখন রাকিব বললো, ‘আচ্ছা, শাইক কোনো বিপদে পড়লো না তো?’

‘আমাদের উচিত হয়নি ওকে এভাবে একা যেতে দেওয়া।’ বললো সাব্বির।

‘আমার ভয় হচ্ছে, সত্যি যদি কোনো বিপদে পড়ে?’

‘দেখ এত ভেঙে পড়িস না। নিশ্চয়ই আল্লাহ ওকে সাহায্য করবেন। ও যদি বিপদে পড়ে আমরা বুঝতে পারবো। আমরা ওকে সাহায্য করতে এগিয়ে যাবো। আমরা ওকে খুঁজে পাবো ইনশাআল্লাহ।’

দুই বন্ধু বসা থেকে উঠে সোজা মাঠের দিকে যায়। ওরা মাঠের পাশে বটগাছের নিচে চেয়ারম্যানের ছেলেকে দেখে থেমে যায়। একটি দোকানের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে। চেয়ারম্যানের ছেলে মাঠ পার হয়ে বনের মধ্যে ঢোকে। তাকে অনুসরণ করতে থাকে সাব্বির ও রাকিব। ওরাও বনের মধ্যে ঢুকে পড়ে। চেয়ারম্যানের ছেলে বল্টু সামনের দিকে হাঁটছে। ওর হাতে আছে টর্চলাইট। কিন্তু রাকিবদের সঙ্গে কিছু নেই। একটু পরে বল্টু থমকে দাঁড়ায়। তারপর পেছনে লাইট মারে কয়েকবার। তার আগেই গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে সাব্বিররা। ওদের দেখতে পেল না বল্টু।

বল্টু আবার সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করে। কিন্তু এবার আর টর্চ জ্বালাচ্ছে না। রাকিব ও সাব্বির বুঝে উঠতে পারছে না কী করবে। এমনিতেই ওরা শাইককে খুঁজে পাচ্ছে না।

সাব্বির বললো, ‘আমাদের সামনের দিকে যেতে হবে। এখানে থেমে যাওয়া ঠিক হবে না।’ রাকিব হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো।

ওরা আবার সামনের দিকে হাঁটতে থাকে। এই বনে হাঁটাও বেশ কঠিন। অনেক ঘন জঙ্গল। চারদিকে গাছ আর গাছ। হাঁটতে গেলেই লতার সঙ্গে জড়িয়ে যেতে হচ্ছে। বাইরে থেকে দেখে কখনো বোঝা যায় না ভেতরে এত গভীর বন।

রাকিব ও সাব্বির হাঁটছে তো হাঁটছে। ‘এভাবে আর কত হাঁটব? পা তো ব্যথা হয়ে গেল।’ বললো রাকিব। 

‘আমার তো একই অবস্থা।’ সাব্বিরের উত্তর।

রাকিব আবার বললো, ‘এখানে একটু জিরিয়ে নিই।’

এরপর সেখানে বসলো ওরা। দুই বন্ধু দুই দিকে মাথা দিয়ে পিঠ এক করে বসে আছে। কেউ কোনো কথা বলছে না। বড্ড ক্লান্ত ওরা। শুধু নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। কারো পায়ের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। মাঝে মাঝে একটি টর্চের আলোও জ্বলছে। আলোটা ওদের দিকে আসছে। পায়ের আওয়াজও খুব কাছে চলে এসেছে। ওরা দু’জন একটি ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে পড়লো। চার জোড়া পা ওদের পাশ কাটিয়ে চলে গেল। পাগুলো সোজা যাচ্ছে। তারা কিসব আলাপ করতে করতেই যাচ্ছে।

রাকিব ও সাব্বির বুঝতে পারলো, এই বনের মধ্যে অনেক রহস্য লুকিয়ে আছে। হয়তো খুনের সঙ্গে এই বনের সম্পর্ক আছে। ইকবাল ও আতিক ভাইয়ের নিখোঁজ হওয়ার পেছনে এই বনের সম্পর্ক আছে। আর বল্টুও বনে ঢুকেছে। তার মানে চেয়ারম্যান এর সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। ওরা দু’জন এসব ভাবছে।

রাকিব বললো, ‘আমাদের উচিত হবে, এই দু’জনকে ফলো করা।’ সাব্বির না করলো না।

ওরা আবার উঠে দাঁড়ালো। তারপর খুব সাবধানে ওই দু’জনকে অনুসরণ করতে থাকে। রাকিব ও সাব্বির হাঁটছে তো হাঁটছে। ওরা একটু দাঁড়ালো। মনে হলো ওদের পেছনে কোনো ছায়ামূর্তি। ওরা পেছনে ঘুরলো, হ্যাঁ সেখানে দু’জন দাঁড়িয়ে আছে। তারা টর্চ জ্বালালো। সেই আলোতে লোক দুটোকে দেখা যাচ্ছে। অপরিচিত লোক। আগে কখনো দেখেনি ওরা। মাথায় লম্বা লম্বা চুল। লম্বা গোঁফ দু’জনের। একজনের হাতে টর্চ লাইট, আরেকজনের হাতে পিস্তল। ওরা আবার ঘুরে দাঁড়ালো। কিন্তু কী বিপদ! এপাশে দাঁড়িয়ে আছে বল্টু। ওর হাতে হকিস্টিক। মনে হলো যে-কোনো মুহূর্তে রাকিব ও সাব্বিরকে মাথায় এক ঘা বসিয়ে দেবে। মনে মনে আল্লাহকে ডাকতে থাকে রাকিব ও সাব্বির। তারপর দিলো এক দৌড়। কিন্তু...


ছয়.

শাইকের কয়েক হাত সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেই ভয়ংকর প্রাণী। চোখ দিয়ে আগুন ঝরছে। প্রাণীটি শাইকের দিকে এগিয়ে আসছে। ও কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না কীভাবে এখান থেকে উদ্ধার হবে। প্রাণীটি আরও এগিয়ে আসতেই শাইক উঠে দাঁড়ালো। পেছন দিকে দিলো দৌড়। প্রাণীটিও দৌড়ে আসছিল। কিন্তু কোনো এক গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে উলটে পড়ে গেল। সেই সুযোগে শাইক আরও দৌড়াতে থাকে। প্রাণপণে দৌড়াতে থাকে। বেশ কিছুদূর এসে ও থামলো। 

এই জায়গাটা বেশ শান্ত মনে হচ্ছে। চারিদিকে জোনাক পোকা জ্বলছে। ঝিঁঝিঁপোকার ডাক শোনা যাচ্ছে।

আকাশে চাঁদ উঠেছে। বনের গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো এসে পড়ছে। সেই আলোতে এখন অনেক কিছু দেখা যাচ্ছে। শাইক আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলো। চাঁদের আলোয় শাইকের ভয় কমে গেছে। একটি পাখি ফুড়–ত করে উড়ে গেল। এখানে কত্ত রকম গাছ, নানারকম লতা। শাইক যা দেখছে তাতেই মুগ্ধ হচ্ছে। আল্লাহর সৃষ্টি যে এত সুন্দর হয় তা হয়তো এই বনে না এলে বুঝতেই পারতো না শাইক।

হঠাৎ একটি শিয়াল ডেকে ওঠে হুক্কা হুয়া। তাতে শাইক লাফিয়ে উঠলো। কিন্তু ভয় পেল না। ওর হঠাৎ মনে পড়লো, স্কুলের মাঠে সাব্বির ও রাকিব বসে আছে। ওর ফেরা উচিত। কিন্তু কীভাবে ফিরবে? ওতো কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছে না। যে পথ দিয়ে বনে ঢুকেছিল সেই পথ হারিয়ে ফেলেছে! তবু নিজেকে সান্ত¡না দিলো, আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্য করেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ ওকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করবেন।

বিসমিল্লাহ বলে শাইক আবার সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করে। খুব ক্ষুধা লেগেছে। কিছু খেতে পারলে অনেক ভালো হতো। কিন্তু এই বনের মধ্যে চাইলেই তো আর খাবার পাওয়া যাবে না। তাই ও আবার হাঁটতে শুরু করে। কিছুদূর গিয়েই ওর সামনে একটি পেয়ারা গাছ পড়লো। অনেক পেয়ারা ধরে আছে তাতে। চাঁদের আলোয় পেয়ারাগুলো চকচক করছে। কয়েকটা পেয়ারা পাড়ল শাইক। প্যান্টের পকেটে রাখলো কিছু। আর কয়েকটা হাতে রাখলো খাওয়ার জন্য। মুখে দিতেই ও অবাক হলো। খুবই সুস্বাদু! পেয়ারা এত সুস্বাদু হয় ওর জানাই ছিল না। গপাগপ কয়েকটা খেয়ে নিলো।

জীববিজ্ঞানে শাইক বাস্তুসংস্থান পড়েছিল। কীভাবে প্রাকৃতিকভাবে খাবারের চাহিদা পূরণ হচ্ছে। ও বুঝতে পারছে বনের মধ্যেও আল্লাহ বাস্তুসংস্থান করে রেখেছেন। নিশ্চয়ই কোনো না কোনো বন্যপ্রাণী এই পেয়ারা খেয়ে বেঁচে থাকে।

পেয়ারা খেয়ে শরীরে যেন শক্তি ফিরে পেল শাইক। ও আবার হাঁটতে শুরু করে। কিন্তু এভাবে আর কত হাঁটবে? গন্তব্যহীন হাঁটার কোনো মানে হয় না। তখনই কোনোকিছুর সঙ্গে শাইকের পা আটকে যায়। ও নিচু হলো। যা দেখলো তাতে অবাক! সেখানে একটি মানুষের জামা পড়ে আছে। এই বনে জামা কীভাবে এলো? নিশ্চয়ই কেউ এখানে বিপদে পড়েছে। সাবধান হয়ে যায় শাইক। ও ওখান থেকে আরেকটু দূরে গিয়ে দাঁড়ায়। বোঝার চেষ্টা করছে কোনোকিছু চোখে পড়ে কি না।

না আশপাশে কেউ নেই। শাইক কয়েকবার ঘুরে দেখলো চারদিক। কাউকেই চোখে পড়লো না। ও একটি গাছের সঙ্গে হেলান দিলো। সাব্বির, রাকিবের কথা খুব মনে পড়ছে। নিশ্চয়ই ওকে না পেয়ে খুব দুশ্চিন্তা করছে। কেন যে একা একা এই বনের মধ্যে ঢুকতে গেল। এখন মনে হচ্ছে অনেক বড়ো একটা বোকামি হয়ে গেছে।

ঠিক তখন শাইকের পায়ের ওপর দিয়ে কি যেন হেঁটে গেল। ও নিচের দিকে তাকিয়ে আঁতকে ওঠে। বিশাল এক সাপ ফণা তুলে আছে। যে-কোনো সময় শাইকের পায়ে ছোবল মারবে। ও কী করবে এখন? ও চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। কোনো রকম নড়াচড়া করছে না। সাপটা ওর দিকে এগিয়ে আসছে। মাত্র এক হাত দূরে ফণা তুলে গো গো আওয়াজ করছে। হয়তো এখনই ছোবল মারবে!


সাত.

সাব্বির ও রাকিব দৌড়াচ্ছে। ওদের পিছু পিছু দৌড়াচ্ছে চেয়ারম্যানের ছেলে বল্টু। এই বুঝি ধরা খেয়ে গেল। সাব্বির দৌড়াতে দৌড়াতে অনেক দূর এসেছে। হঠাৎ মনে হলো রাকিব নেই? দু’জন তো একসঙ্গেই দৌড়াচ্ছিল, তাহলে রাকিব গেল কোথায়? ও তো ভুলেই গেছে রাকিবের কথা। তাহলে রাকিবকে ধরে ফেলেছে বল্টু? নিশ্চয়ই বল্টুরা ওকে অনেক মারবে। আবার পেছন দিকে হাঁটতে শুরু করে সাব্বির। যেভাবে হোক রাকিবকে খুঁজে বের করতে হবে।

সাব্বির হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর চলে এসেছে। অথচ রাকিবের কোনো খোঁজ নেই। বল্টু বা তার সঙ্গে থাকা অন্য দু’জনেরও কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। সাব্বির যেখানে আছে সেখানে অনেক ঘন জঙ্গল। চাঁদের আলোও যেন ঠিক মতো পৌঁছাতে পারছে না। চারপাশে ছোটো-বড়ো অসংখ্য গাছ। সেসব গাছের সঙ্গে এমনভাবে লতা জড়িয়ে আছে, সহজে হাঁটাও দুষ্কর। যত সময় যাচ্ছে এই বনকে ততই রহস্যময় মনে হচ্ছে সাব্বিরের। ও জীবনেও ভাবেনি কখনো এমন একটি বনের মধ্যে ওকে রাত কাটাতে হবে। যে সাব্বির একা বাড়ির উঠানে যেতে ভয় পেতো, সে আজ একটি গভীর বনের মধ্যে হারিয়ে গেছে। এমনভাবে হারিয়েছে কোনো কূলকিনারা করতে পারছে না।

অনেক দৌড়ানো হলো, অনেক হাঁটা হলো- এবার একটু বিশ্রাম নেওয়া দরকার। এখানে কোথাও বসতে হবে। ও একটি গাছে হেলান দিলো। সঙ্গে সঙ্গে ব্যথায় চিৎকার করে উঠলো। মনে হলো পিঠে যেন কেউ সুচ ফুটিয়ে দিয়েছে। ভালো করে হাত বুলিয়ে দেখলো গাছটাতে। গাছের গায়ে কাঁটায় ভরা। ব্যথায় কাতরাচ্ছে সাব্বির। এই বনে কাতরিয়ে কোনো লাভ নেই। কী আর করা সাব্বির গাছটার পাশ থেকে সরে গেল। তারপর সেখানে বসে পড়লো। মনে হলো কোনো গাছের গুঁড়ির ওপরে বসেছে।

সেখানে বসে রাকিবের মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠলো। সে ওর পেছন পেছন দৌড়ে আসছিল। হঠাৎ কীভাবে নিখোঁজ হয়ে গেল! এই বনের মধ্যে ওকে খুঁজে পাওয়া যে সহজ হবে না, সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে সাব্বির।

এখন রাত ক’টা বাজে তাও বোঝার উপায় নেই। সঙ্গে না আছে কোনো ঘড়ি, না আছে কোনো মোবাইল। বাড়িতে থাকলে এতক্ষণ একটা ঘুম হয়ে যেত। আজ মায়ের ইলিশ মাছ রান্না করার কথা। ইলিশ মাছের কথা ভাবতেই, সাব্বিরের পেটটা চোঁ চোঁ করে উঠলো। এখন বুঝতে পারছে ওর ক্ষুধা লেগেছে। কিছু পেটে না গেলে আর মাথায় কাজ করবে না। কী করা যায়, কী করা যায়?

এত বড়ো বন যেহেতু, নিশ্চয়ই খাবারের জন্য কিছু না কিছু পাওয়া যাবে। আল্লাহ নিশ্চয়ই এই বনে খাবারের মতো কিছু রেখেছেন। অন্তত ফল তো পাওয়া যাবে। তখনই ঘটলো এক ভয়ংকর ঘটনা। সাব্বির যেখানে বসে ছিল সেটা নড়ে উঠলো। কী অদ্ভুত, গাছের গুঁড়ি কেন নড়ছে? বুঝতে পারছে না সাব্বির! আরও জোরে নড়ে উঠলো সেটা। তারপর সেটা চলতে শুরু করে। অবাক ব্যাপার গাছের গুঁড়ি চলতে পারে। সাব্বির উঠে দাঁড়ালো। তারপর যা দেখলো, ও রীতিমতো অবাক! বিশাল বড়ো কচ্ছপ। সাব্বির এত সময় কচ্ছপের ওপর বসে ছিল? কী ভয়ংকর ব্যাপার। আর কচ্ছপ এত বড়ো হয়! মাথাটা ঘুরতে শুরু করে সাব্বিরের। এই বনের মধ্যে চাঁদ ছাড়া আর কিছু দেখা যাচ্ছিল না। অথচ সাব্বির এখন চারদিকে তারা দেখছে। ওর মাথাটা ঘুরছে। আস্তে আস্তে পুরো বনটা ওর মাথার ওপর ঘুরতে শুরু করে। নিজেকে আর সামলে রাখতে পারে না সাব্বির। ধপাস করে সেখানেই পড়ে গেল।

একসময় চোখ খুললো সাব্বির। ও বনের মধ্যে পড়ে আছে। মাথাটা ঝিমঝিম করছে, মাথায় আঘাত পেয়েছে। কত সময় এভাবে পড়ে ছিল নিজেও বুঝতে পারছে না, উঠে বসলো। তারপর সেখানে তাকালো, না কচ্ছটা নেই। তাহলে কচ্ছপটা চলে গেছে। জীবনে এত বড়ো কচ্ছপ যেন আর সামনে না পড়ে মনে মনে সেই দোয়া করছে সাব্বির। নিজে যে সুস্থ আছে সেজন্য আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলো।

দুই বন্ধুর জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করলো সে। দোয়া শেষ করে সাব্বির সামনের দিকে হাঁটতে থাকে। ও বেশ কিছু দূর হাঁটার পর দেখলো একটি পুকুর। আনন্দে পুকুরের দিকে এগিয়ে যায় সাব্বির। তারপর সেখান থেকে দুই হাত ভরে পানি পান করে। পুকুরের পাশে বসলো সাব্বির। চাঁদের আলো পুকুরে পড়ায় পুরো পুকুরটা চিক চিক করছে। পুকুরের পানিতে চাঁদটাকে রূপোর থালার মতো মনে হচ্ছে। ও একটু পানিতে নামতে চাইলো। প্রথম এক পা নামিয়ে দিলো, তারপর আরেক পা।

সাব্বির এখন পুকুরে দাঁড়িয়ে আছে। তখনই ওর পায়ে কোনো কিছুর স্পর্শ লাগে। বেশ বড়ো কিছু মনে হলো। ও সেদিকে তাকালো। প্রথমে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না। তারপর আবার তাকালো। আঁতকে ওঠে সাব্বির, ওর পাশেই একটি কুমির! কী ভয়ংকর ব্যাপার! কী হবে এবার?


আট.

চেয়ারম্যানের ছেলে বল্টু প্রথমে রাকিবের কলার ধরে ফেলে। তারপর স্টিক দিয়ে রাকিবের পায়ে জোরে আঘাত করে। তাতে মা-গো বলে চিৎকার করে ওঠে রাকিব। কিন্তু রাকিব দমে যাওয়ার পাত্র নয়। ও গায়ের বল প্রয়োগ করে। প্রথম রাকিবের ঘাড় বরাবর একটি ঘুষি মারে। তাতে তাল সামলাতে পারে না বল্টু। একটু পিছিয়ে যায়। তবে সেখান থেকে এসে আবার রাকিবের দিকে ছুটে আসে। স্টিক দিয়ে রাকিবকে আঘাত করতে যায়। সঙ্গে সঙ্গে রাকিব বসে পড়ে। এতে স্টিক গিয়ে আঘাত করে একটি গাছে। তাতে স্টিক বল্টুর হাত থেকে ছিটকে পড়ে। সেই সুযোগে রাকিব বল্টুর পিঠে একটি ঘুষি মারে। উলটে পড়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা খায় বল্টু। পরিস্থিতি ভালো না দেখে দৌড়ে পালিয়ে যায় বল্টু। আর বলে, ‘আমি দেখে নেবো তোরা এই বন থেকে কীভাবে পালাস। আমি তোদের সব কটাকে জঙ্গলবাড়িতে নিয়ে যাবো। তারপর মজা দেখাবো। এই বনে যারা আসে তারা পালাতে পারে না।’

রাকিবের এবার সাব্বিরের কথা মনে পড়ে। একসঙ্গেই তো দৌড়াচ্ছিল। কিন্তু ও কোথায় হারালো। ওকে ওই গুন্ডাগুলো ধরে নিয়ে গেল না তো! এক অজানা আশঙ্কা কাজ করছে রাকিবের মধ্যে। আর শাইক বা কোথায়? এত বড়ো বন, কীভাবে ওদের খুঁজে বের করবো, ভাবছে রাকিব। 

তবে এই বনের আসল রহস্য হচ্ছে জঙ্গলবাড়ি। নিশ্চয়ই সেখানে ভয়ানক কিছু হয়। চেয়ারম্যানের নামে নানারকম অপরাধের কথা শোনা যায়। মাদকের ব্যবসা, মানবপাচার, শিশুপাচার- এমন কোনো অপরাধ নেই যে, এই চেয়ারম্যানের নামে শোনা যায় না। কয়েকদিন আগে পত্রিকায় খবর বেরিয়েছিল এই বন থেকে নাকি গাছ কেটে কাঠ পাচার করা হচ্ছে। বন ধ্বংস করা হচ্ছে। তাহলে এ সবের কেন্দ্রবিন্দু হলো জঙ্গলবাড়ি। একবার যদি জঙ্গলবাড়ির খোঁজ পাওয়া যায়, তাহলে সব রহস্যের সমাধান হবে।

রাকিব জোরে জোরে চিৎকার করে- সাব্বির...সাব্বির...সাব্বির! কিন্তু কোনো উত্তর আসে না। এই বনের মধ্যে রাকিবের ডাক যেন প্রতিধ্বনি হয়ে ওর কাছেই ফিরে আসছে। ও বুঝতে পারছে এভাবে কাজ হবে না। হঠাৎ বুঝতে পারে, পায়ে বেশ লেগেছে। ব্যথায় টনটন করছে। ডান হাত দিয়ে পা চেপে ধরে সেখানে বসে পড়ে রাকিব। বেশ শক্ত করে চেপে রাখে। তারপর প্যান্টের বেল্ট খোলে। বেল্ট দিয়ে সেখানে শক্ত করে বেঁধে দিলো। এবার একটু আরাম পাচ্ছে। কিন্তু এভাবে এখানে বসে থাকলে কোনো সমাধান হবে না।

তবুও চোখটা বন্ধ হয়ে আসে ওর। সঙ্গে সঙ্গে মায়ের কোমল মুখটা ভেসে ওঠে। মনে পড়ে মায়ের কথা, ‘বিপদে ভেঙে পড়তে হয় না। বিপদ দিয়ে আল্লাহ মানুষের পরীক্ষা নেন। সেই পরীক্ষায় পাস করতে আল্লাহ নিজেই সাহায্য করেন।’

চোখ খুললো রাকিব। এখন কত রাত হয়েছে কে জানে। হয়তো মধ্যরাত হবে। সেই এশার নামাজ পড়ে ওরা বনের মধ্যে ঢুকেছে। তারপর তো একটার পর একটা বিপদ লেগেই আছে। কত রাত হলো সেটা তো বোঝার কোনো উপায় নেই। এভাবে বসে থাকা ঠিক হবে না। তাতে বিপদ বাড়বে।

উঠে দাঁড়ালো রাকিব। তারপর বিসমিল্লাহ বলে সামনের দিকে হাঁটতে থাকে। ও হাঁটছে আপন মনে। কোনোদিকে না তাকিয়ে দুচোখ ওকে যেদিকে নিয়ে যাচ্ছে ও সেদিকে হাঁটতে থাকে। হাঁটছে আর ভাবছে সাব্বির ও শাইকের কথা। ওরা কোথায় কে জানে? কী অবস্থায় আছে তাও ধারণা করা মুশকিল।

রাকিব ছাড়াও কারো হাঁটার শব্দ শোনা যাচ্ছে। ও দাঁড়িয়ে গেল। হ্যাঁ স্পষ্ট কারো হাঁটার শব্দ ওর কানে আসছে। কিন্তু কোন দিক থেকে আসছে সেটা বোঝা যাচ্ছে না। রাকিব কান খাড়া করে বোঝার চেষ্টা করে শব্দটা কোনদিক থেকে আসছে। শব্দটা আসছে ওর বাম দিক থেকে। ও আস্তে আস্তে সেদিকে যেতে থাকে। খুব সাবধানে পা ফেলছে, যেন কেউ বুঝতেই না পারে। রাকিব একদম কাছে চলে এসেছে। তিনজন মানুষ হেঁটে যাচ্ছে। একজন মাঝখানে। তার দুই পাশ দিয়ে দু’জন পিস্তল ধরে রেখেছে। তার মানে এই লোকটাকে ওরা বন্দি করে নিয়ে যাচ্ছে। রাকিব নিঃশব্দে ওদের অনুসরণ করতে থাকে। ওরা বুঝতেও পারছে না রাকিব যে ওদের পেছনে আছে। এই লোক দুটো চেয়ারম্যানের লোক হবে। আর মাঝখানের লোকটাকে চাঁদাবাজি বা অন্য কোনো কারণে ধরে নিয়ে এসেছে। ওদের আবছা আবছা কথায় অন্তত তাই মনে হচ্ছে।

হঠাৎ একটি শুকনো পাতায় পা পড়ে রাকিবের। তাতে মচমচ করে শব্দ হয়। বিপদ বাধে সেই শব্দে। সেই শব্দ গিয়ে পৌঁছে ওই লোক দু’টির কানে। সঙ্গে সঙ্গে তারা পেছনে ফিরে তাকায়। এত সময় তারা চাঁদের আলোতে হাঁটছিল। এবার টর্চ জ্বালিয়ে খুঁজতে থাকে। কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না, কারণ আগেই রাকিব ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে গেছে। তখন ওদের একজন বললো, ‘বাদ দে তো, হয়তো কোনো ব্যাঙ লাফিয়েছে।’

তারা আবার হাঁটতে শুরু করে। রাকিব আরও সাবধানে তাদের অনুসরণ করতে থাকে। বেশ কিছুক্ষণ হাঁটার পর তারা থামলো। সামনে একটি নদী, খুব বেশি বড়ো না। ওই লোকটিকে নিয়ে একটি নৌকায় উঠলো। বেশ বড়ো নৌকা। সেখানে একজন মাঝিও রেডি ছিল। কিন্তু সমস্যা হলো একটাই নৌকা। তাই রাকিব আর তাদের অনুসরণ করতে পারল না। রাকিব এসে নদীর পাড়ে দাঁড়ালো। একটি গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে রাকিব। চাঁদের আলোয় চিকচিক করছে নদীর পানি। যখন ঢেউ উঠছে তখনই যেন চাঁদটা নদীর পানিতে দুলছে।

ছোটো নদী। সঙ্গে সাব্বির ও শাইক থাকলে সাঁতরে পার হওয়া যেত। রাকিব খুব ভালো করে নদীর ওপারে তাকায়। হ্যাঁ ওপারে একটি বাড়ি আছে। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে নদীর ওপারে জঙ্গলের মধ্যে একটি বাড়ি। তাহলে কি ওটাই জঙ্গলবাড়ি? মাঝিটাও আবার নৌকা নিয়ে এপারে আসছে। তার মানে এখানে একটি নৌকা, আর একজনই মাঝি। কেউ এলে তাকে ওপারে দিয়ে আবার এপারে আসে। এখানে নিয়মিত কারো কারো যাতায়াত আছে।

রাকিব যখন এসব ভাবছিল, তখন ওর মাথায় কিছুর স্পর্শ অনুভব করে। ও সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে দাঁড়ায়। ওর মাথায় পিস্তল ধরে রেখেছে একজন। পুরো মুখটা দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু বোঝা যাচ্ছে বেশ শক্তিশালী কেউ হবে।

লোকটা বললো, ‘তুই তো বিরাট বিচ্ছু! এখানে চলে এসেছিস। কেউ এই বনের মধ্যে ঢুকতে সাহস পায় না। আর তুই এই জঙ্গলবাড়ি পর্যন্ত চলে এসেছিস? কেউ তো জানেই না এখানে একটি বাড়ি আছে।’

রাকিব বললো, ‘আপনারা যেগুলো করছেন, সেগুলো অন্যায়। মানুষের ক্ষতি করছেন।’

লোকটি এবার বললো, ‘এ তো দেখি দারুণ দারুণ নীতি কথা বলে। তোর এসব নীতি কথা শোনার সময় যে আমাদের হাতে নেই।’

তারপর আরেকজন এসে রাকিবের দুই হাত পেছন দিকে বেঁধে ফেললো। এবার রাকিবকে নৌকার দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। রাকিব বুঝতে পারছে, আর কোনো উপায় নেই। ও গুন্ডাদের হাতে ধরা পড়ে গেছে। আপাতত ওই জঙ্গলবাড়িতেই ওকে বন্দি থাকতে হবে।

মাঝি বললো, ‘এইটা আবার কে?’

তখন এক গুন্ডা বললো, ‘ওর জঙ্গলবাড়ি দেখার অনেক শখ হয়েছিল। এখন ঘুরিয়ে আনি। বেচারা বাবার নামটাই না ভুলে যায়।’

রাকিবকে যখন নৌকায় তোলা হলো ও একটু চালাকি করলো। রাকিব জুতা জোড়া নদীর ঘাটে খুলে রেখে দিলো। কেউ অবশ্য বুঝতে পারেনি। তারপর নৌকা এপারে এলো। রাকিবকে নৌকা থেকে নামিয়ে জঙ্গলবাড়িতে নেওয়া হলো।

রাকিব তো অবাক। এই বনের মধ্যে বিশাল বাড়ি! ওকে হাত বাঁধা অবস্থায় মেঝেতে ফেলে রাখা হলো। সেখানে আরও কয়েকজনকে এভাবে বেঁধে রাখা হয়েছে। রাকিব অবাক হয়ে দেখলো, ওদের স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র ইকবাল ও আতিক ভাইকেও এখানে আটকে রাখা হয়েছে। তাদের নাক-মুখ ফুলে আছে। মনে হয় অনেক মারধর করেছে। 

একটু পরেই সেখানে এলো বল্টু। তারপর বললো, ‘কী রে তোকে বলেছিলাম না, এই বন থেকে বের হতে পারবি না। আর তোকে জঙ্গলবাড়িতে আটকে গুম করে দেবো।’

‘বল্টু তুই এখানে কী করছিস? আর আতিক ভাইদের আটকে রেখেছিস কেন? আমরা তো ওনাদের খুঁজতে এই বনে ঢুকেছিলাম।’

‘খুঁজেই তো পেয়েছিস।’ বলেই হা-হা-হা করে হেসে উঠলো। বল্টু তারপর বললো, ‘ওদের আটকে রেখেছি, কারণ ওদের পাখনা গজিয়েছিল। সেই পাখনা উপড়ে দেবো।’ আবার অট্টহাসি। হাসি থামিয়ে বললো, ‘আর জানতে চাস, আমি এখানে কেন? আরে এটা তো আমাদের। আমার আব্বুর। মানে মানুষ টাকার বিনিময়ে যাকে ভোট দিয়ে চেয়ারম্যান বানিয়েছে।’

‘কিন্তু বল্টু, এটা অন্যায়। আল্লাহ কিন্তু সব দেখছেন। তিনি নিশ্চয়ই এত অন্যায় সহ্য করবেন না।’

রাকিবের কথা হেসেই উড়িয়ে দিলো বল্টু। তারপর সেখানে হাজির হলো বল্টুর বাবা আজগর চেয়ারম্যান। রাকিব আরও অবাক হলো।

চেয়ারম্যান তখন বললো, ‘আমাকে দেখে অবাক হস না। তুইতো বিচ্ছু, তোর আর দুই বন্ধু কই? তারাও যদি এই বনে ঢোকে ওদের সঙ্গেও একই ঘটনা ঘটবে। আমি রাতের বেলা এখানে থাকি। আর দিনের বেলা এলাকায় গিয়ে মানুষের বন্ধু সাজি।’

এ কথা বলেই অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো চেয়ারম্যান।

(চলবে)

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ