দখিনের আলো

উপন্যাস জাফর তালুকদার মার্চ ২০২৫

মন্টু মামা বললেন, ‘চল তোর নানির কবরটা দেখে আসবি।’

‘কবর কোথায় মামা?’ জিতুর চোখে কৌতূহল।

‘এইতো দশ গম্বুজ মসজিদের কাছে।’

জিতু অস্ট্রেলিয়া থাকে। মোট এই নিয়ে তিনবার দেশে এসেছে। বেশির ভাগ সময় তারা ঢাকা থেকে ঘুরে যায়। বাগেরহাটে আসা হয় না। জিতুর বয়স তেরো। ওর জন্ম মেলবোর্নে। প্রকৌশলী বাবা ওখানে স্থায়ী হয়েছেন আশির দশকে। তাদের লন-ঘেরা চমৎকার ডুপ্লেক্স বাড়ি। বাগান। কাছেই থার্ড রোতে হ্যারল্ড গ্রামার স্কুল। পড়াশোনায় খুব নাম করেছে জিতু। ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাটা রপ্ত করেছে ভালোই। আদার্স কারিকুলামেও পারফরম্যান্স সার্টিফিকেট পেয়েছে কয়েকবার। ভ্রমণ আর বই পড়াটা এক রকম নেশায় দাঁড়িয়ে গেছে। স্কুলের আউট বই তো আছেই। কমিউনিটি লাইব্রেরি থেকে বই নিয়ে আসে প্রতি সপ্তায়।

শুধু পড়া নয়। নিজেও টুকটাক লিখছে। বছরের গোড়ায় স্কুলের গল্প লেখা প্রতিযোগিতায় একটা পুরস্কার জিতে রীতিমতো বাহবা জুটেছে কপালে।

জিতুরা এবার দেশে এসেছে লম্বা ছুটিতে। বাবা কদিন থেকেই চলে গেছেন। মায়ের ইচ্ছা ছেলেদের সামার ভ্যাকেশনের পুরোটা দেশে কাটাবেন। চার বছরের তিতুর স্কুলের বয়স হয়নি। তবুও ভাইয়ের দেখাদেখি তার বায়নার অন্ত নেই। জিতুটাও কম পাজি না। ছোটকে খেপিয়ে সে ভালো মুখ করে বসে থাকে ভেজা বেড়াল হয়ে। 

নানা রকম ফন্দি-ফিকির ঘুরে বেড়ায় তার মাথায়। এখানে এসেও খুনসুটি চলছে। এই গলায় গলায় ভাব তো এই যুদ্ধ। বাগেরহাটে ঘোরাঘুরি নিয়েও রীতিমতো তুলকালাম চলছে। মেহজাবিন অনেক বুদ্ধি করে জিতুটাকে গছিয়ে দিয়েছেন মন্টুর হাতে, ‘যা তো ভাই, তুই একটু দস্যিটাকে সামাল দে। খান জাহান আলীর দরগাহ আর ষাটগম্বুজের চারদিকটা ঘুরিয়ে দেখিয়ে নিয়ে আয়।’

হিস্টরিক্যাল ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে ভারি কৌতূহল জিতুর। ওখানের আদেলাইদি সিটি, ওয়াইল্ড লাইফ পার্ক, কেপ রেঞ্জ, কুইন্স ল্যান্ডের গ্রেট স্যান্ডি, কারনরভন- আরা কত কী পার্ক চষে বেড়িয়েছে ইতোমধ্যে। এখানেই শেষ নয়। বাবা-ছেলের রীতিমতো গবেষণা চলে সামারটা ইউরোপ আমেরিকার কোন অঞ্চলে কাটাবে? এশিয়া নিয়ে তেমন একটা মাথাব্যথা নেই তাদের। তবে এবার বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, কম্বোডিয়া আর ভিয়েতনাম। জিতুর ধারণা, এশিয়াকে জানতে হলে জাপানকে জানা দরকার সবার আগে। হিরোশিমা আর ফুজিতো বলাই বাহুল্য। ভ্রমণের তালিকায় দেশটি আপাতত তোলা রয়েছে আসছে গরমের জন্য।

বাংলাদেশে তেমন একটা না কাটালেও বইটই পড়ে এখানের আগাপাশতলা খুঁটে জেনে নিয়েছে জিতু।

মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে তার অপার কৌতূহল। বাপির কাছ থেকে যা একটু তথ্য মেলে গালগল্পের ছলে। বাবা নিজেও একজন মুক্তিযোদ্ধা। ছেলেকে যতটা পেরেছেন এই যুদ্ধদিনের রোমহর্ষক কাহিনি তুলে ধরেছেন গল্পের জাদুতে। জিতু সবকিছু পড়ে যাচাই করতে চায় বলেই মুক্তিযুদ্ধের ওপর শিশুতোষ কিছু ইংরেজি বই চেয়েছিলেন ঢাকার দু-একজন বন্ধুর কাছে। সবাই নেই বলে এড়িয়ে গেছেন। দায়িত্বপূর্ণ অফিসে মেইল করেও কোনো সাড়া মেলেনি। অদ্ভুত! 

দশ গম্বুজ মসজিদের পশ্চিম পাশে এক ফালি কবরস্থান। ওখানেই শুয়ে আছেন নানি। মামার দেখাদেখি জিতু দু’হাত তুলে দাঁড়িয়ে থাকল কিছুক্ষণ। নানির সঙ্গে খুব জমানো স্মৃতি তার নেই। কেন নেই কে জানে! তারা ঢাকায় এলেই নানি বাগেরহাট থেকে আসতেন লটবহরের বোঝা বয়ে। পানটান নিয়ে মশগুল থাকতেন খুব। বাটা পানের সঙ্গে থাকতো অনেক রকম মসলাপাতির মিশেল। ঘণ্টায় ঘণ্টায় এই পাতা চিবানো দেখে চোখ ছানাবড়া হয়ে যেত জিতুর। তার যে মতো স্বভাব। এই নিয়ে আড় ধরে বসে থাকতো নানির পেছনে। পানপাতা খেলে কী হয়! সুপারি, চুন, খয়ের, জর্দা, এলাচ, স্যাকারিন এতসব মিশিয়ে বেটেছেঁচে খেতে হবে কেন? এটা যদি খেতে এতই মজা হবে তবে মাম্মি খায় না কেন? নানিকে বলে একবার জিভের ডগায় একটু পানবাটা নিয়ে ফেলে দিয়েছিল থু মেরে। ওহ গড, এটা একটা খাবার হলো নাকি!

ছেলের বাঁদরামি দেখে মা চোখ শাসিয়ে বলেছিলেন, ‘তোমাকে অত পাকামি করতে হবে না। নানির খেতে ইচ্ছে হয়েছে খাবে, তাই বলে তোমাকেও খেতে হবে নাকি! সব ব্যাপারে নাক গলানো ঠিক না। মনে থাকে যেন।’

পান ছাড়া নানিকে নিয়ে তেমন একটা স্মৃতি নেই। কতটুকু সময়ই বা তারা থেকেছে একসঙ্গে! ঘোরাঘুরি করতেই সময় ফুরিয়ে যায়। হাঁফিয়ে উঠতে হয় নেমন্তন্নের অত্যাচারে। না করার উপায় নেই। মাম্মি হাসিমুখে সময় বের করেন সবার জন্য। তবে সর্বত্রই একই কাহিনি। হাত চুবিয়ে খাওয়া আর গল্পের তুফান। 

সব জায়গাতেই জিতুর বয়সি কিছু বন্ধু জুটে যায়। ওরা বইটই নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করে না। যত গল্প ইউটিউব আর ফেসবুক নিয়ে। তবে রতন আর মিলুটা একটু অন্য রকম। ওরা বইমেলা থেকে বই কেনে প্রতিবার। এবারও কিনেছে কিছু। এই নিয়ে জমে উঠল। মজারু বই-আড্ডা।

গেল মাসে রতনরা ঘুরে এসেছে লন্ডন থেকে। বেথনাল গ্রিনে বোনের বাসা। ভারি আনন্দে কেটেছে একটা মাস। বলতে গেলে পুরো লন্ডনটা চষে ফেলেছে। ন্যাশনাল মিউজিয়াম, মাদাম তুঁসো, লন্ডন আই, ন্যাশনাল গ্যালারি, বিগ বেন, টাওয়ার অব লন্ডন, টাওয়ার ব্রিজ, বাকিংহাম প্যালেস, ওয়েস্টমিনিস্টার প্যালেস, কেনসিংটন প্যালেস, হাইড পার্ক- দেখাদেখির এই ম্যারাথন গল্প যেন ফুরাতেই চায় না।

ওসব অবশ্য আগেই দেখে নিয়েছে জিতুরা। কিছুই নতুনত্ব নেই। শুনতে হয় তাই শোনা। বরং তাদের ভ্রমণ ছিল আরো মজার। কিসলু ভাইয়া, মিনু আন্টি, ফারুক আংকেল, দিনা আপু- দারুণ মাতামাতিতে উড়ে গেছিল পনেরোটা দিন।

তার অবশ্য সহজে মন ভরে না। যা দেখে মনে হয় এ আর এমন কী! পারি, রোম, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, নিউ ইয়র্ক, তুরস্ক, কাতার, বাহরাইন, দুবাই, শ্রীলঙ্কা- কত দেশ দেখা হলো এক ফোঁটা বয়সে! তবে একটা চুম্বকের জাদু কোথায় যেন লুকিয়ে আছে লন্ডনের গোপন শিরায়। বাপির কাছে ইংরেজদের কায়কারবার নিয়ে এত গল্প শুনে মনে হয়েছে এই দেশ আর মানুষ বড়ো বেশি চেনা। ক্লাইভের মূর্তিটা অনেক সময় নিয়ে দেখেছিল খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। বাপি বলেছিলেন, ‘কী চিনতে পেরেছ ওনাকে?’

জিতু বিরক্তির সঙ্গে মাথা নেড়েছিল। জবাব দেয়নি। খুব ইচ্ছে ছিল ঢাকায় এসেই যে করে হোক লালবাগ দুর্গ আর আহসান মঞ্জিলটা দেখে নেবে। জাদুঘরও দেখা যেতে পারে। তবে বাগেরহাট এসে লাভ হয়েছে একটা। খানজাহান আলীর দরগাহ, দিঘি, ষাটগম্বুজ দেখার সুযোগ ঘটেছে। সুন্দরবনের জন্য তৈরি হচ্ছে আলাদা প্রোগ্রাম। 

রিমেলের ঝড়ে অনেক জীবজন্তু মারা গেছে। আপাতত সেখানে যাওয়া বারণ। দেখা যাক কী হয়! মামা আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, ‘হয়ে যাবে। চিন্তা করিস না।’

মামার কথায় জাদু আছে। এমন করে ইতিহাসের কথা বলেন মনে হয় যেন এইতো সেদিন সবকিছু ঘটে গেছে চোখের সামনে। নানির কবর জিয়ারত করে মামা চলে এলেন দশ গম্বুজ মসজিদের খোলা চত্বরের দিকটায়। মসজিদের পাশেই হাজী আরিফ নামে একজন কামেল দরবেশের কবর। কবরের ওপর শামিয়ানা টাঙানো। কোণের কাছে শোভা পাচ্ছে রঙিন মালার ঝালর। আগরবাতির পবিত্র ঘ্রাণে মন ভরে উঠল। জিতু কৌতূহলী চোখে বলল, ‘হাজী আরিফ কে মামা?’

মামা দু’মুহূর্ত কী যেন ভাবলেন। তারপর উদাস গলায় বললেন, ‘উনি একজন বড়ো কামেল দরবেশ। কিন্তু ওনাকে কেউ তেমন একটা চেনে না।’

‘কেন চেনে না?’

‘কথায় আছে না গেঁয়ো যোগী ভিখ পায় না!’

‘কেন পায় না মামা!’

‘এ মানুষটা ছিলেন রহস্যময়। কোথায় বাড়িঘর কেউ জানত না। একটা লম্বা লাঠির আগায় দা বেঁধে দিনভর ঘুরে বেড়াতেন বাগেরহাটের রাস্তায় রাস্তায়। যেখানে যেতেন হুমড়ি খেয়ে পড়ত লোকজন। দুঃখ-কষ্টের কথা শোনাতেন। উনি থেমে থেমে গলা উঁচিয়ে হাঁক দিতেন- ইয়া আলী জুলফিকার। এই আজব মানুষটার কোনো ঠাঁই ছিল না মাথা গোঁজার। বলা চলে যেখানে রাত, সেখানে কাত। খাওয়াদাওয়ারও ঠিকঠিকানা ছিল না। যখন যেমন জুটত তাই খেয়ে নিত।’

জিতু চোখ কপালে তুলে বললো, ‘বাহ দারুণ ইন্টারেস্টিং!’

‘সেটাই তো বলছি। দেশ ভাগের আগে মতি কাকুর বাবা কাজ করতেন পুলিশে। বাগেরহাটে থানার কাছে কোয়ার্টারে থাকতেন ফ্যামিলি নিয়ে। ওখানে গিয়ে প্রায়ই ঝিম ধরে বসে থাকতেন মানুষটা। কাকি যত্নআত্তি করে ভালোমন্দ খেতে দিতেন। না দিলেও রা করতেন না। নিজেই আপন মনে কখন চলে যেতেন টের পেতো না কেউ। মানুষটা সারাদিন কাড়াপাড়া, সুন্দরঘোনা, খানজাহান আলীর দরগাহ, ষাটগম্বুজ, রণবিজয়পুরের আশপাশ গ্রামের বনজঙ্গলে কী যেন খুঁজে বেড়াতেন। কী খুঁজতেন কেউ জানে না! এভাবে দিনমান খোঁজাখুঁজি করে হঠাৎ একদিন ঝোপঝাড়ের ভেতর খুঁজে পেলেন নয়গম্বুজ মসজিদ। ওনার কাজের গতি বেড়ে চলল। ব্রিটিশদের অযত্ন-অবহেলায় এরকম অনেক মসজিদ হারিয়ে গেছে। নতুন উৎসাহে এগিয়ে চলে খোঁজাখুঁজির মাত্রা। এভাবে দিনমান হাতড়ে হাতড়ে হঠাৎ জায়জঙ্গলের মধ্যে ভেসে ওঠে একটা উঁচু মাটির ঢিবি। লোকলস্কর নিয়ে ঢিবি খুঁড়ে বেরিয়ে এলো চমৎকার একটা আস্ত মসজিদ। এটাই সেই হাজী আরিফের বিখ্যাত দশগম্বুজ মসজিদ। 

এই ঘটনায় দারুণ হৈ চৈ পড়ে গেছিল বাগেরহাটে। ইংরেজদের হঠকারিতায় এরকম কত মসজিদ-ইমারত-দিঘি ইতিহাসের পাতা থেকে হারিয়ে গেছে কেউ জানে না! রহস্যময় পুরুষ হাজী আরিফের জীবন-রহস্য আজও কেউ সঠিকভাবে খুঁজে পায়নি। কৌতূহল আর মনোযোগের অভাবে এই মহান পুরুষের নাম হারিয়ে গেছে বাগেরহাটের ইতিহাস থেকে। শুধু অজানা কিছু গালগল্প চাউর হয়ে আছে তাকে নিয়ে। তাঁর মৃত্যু ঘটনাও ছিল রীতিমতো চমকে দেবার মতো। বাগেরহাটের পিসি কলেজ মাঠে সেই সময় একটা বড়ো জনসভা হয়েছিল। মাঠ ভর্তি লোকের সামনে গম্ভীরমুখে হাজী আরিফ বক্তৃতা দিতে দাঁড়ালেন। ইয়া আলী জুলফিকার- মাত্র একটি শব্দ বলেই সহসা মঞ্চে ঢলে পড়লেন বিখ্যাত কামেল বুজুর্গ হাজী আরিফ। জীবন ও মৃত্যুর পুরোটাই রহস্য চাদরে ঢেকে নিজের খুঁজে পাওয়া প্রিয় মসজিদের আঙিনায় পরম শান্তিতে শুয়ে আছেন ইতিহাসের বড়ো এক আলোকিত মানুষ।’

দশগম্বুজ পেরিয়ে কিছুটা পশ্চিমে এগিয়ে গেলেই ষাটগম্বুজ মসজিদ। মামার ইচ্ছে, কাছাকাছি যখন এসেছেন, একটু ঢু মেরে গেলে কেমন হয়? জিতু কেমন একটা ঘোরে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল। মামা মৃদু হেসে বললেন, ‘যাবি নাকি ষাটগম্বুজ মসজিদ দেখতে?’

‘কতদূর যেতে হবে!’

‘এই তো দেখা যায় এখান থেকে।’

‘চলো যাই।’

‘তোর খিদেটিদে লেগেছে নাকি! খাবি কিছু?’

‘কী খাবো। কী আছে এখানে?’

‘নেই, আবার আছে। তুই কী খাবি বল?’

‘পিজা-নাগেট হলে চলবে।’

‘এটা তোর মেলবোর্ন পেয়েছিস নাকি! মোড়ে মোড়ে ক্যাফে-রেস্তোরাঁয় পিজার বন্যা বয়ে যাবে!’

জিতুর চোখে লজ্জার ছায়া পড়ল। সে গাল ফুলিয়ে বললো, ‘স্যরি মামা, পিজা লাগবে না।’

‘ইস, অমনি মান হলো ভাগ্নের! সবুর কর, আমি ঘরে বানানো ফাস্টক্লাস পিজা তোকে খাওয়াব। এখন দোকান থেকে চিপস আর ড্রিংকস নিয়ে নিই কেমন।’

গেটের ভেতরে ঢুকে অবাক হয়ে গেল জিতু। বিশাল মসজিদ কম্পাউন্ড। মাম্মির কাছে শুনেছে ষাটগম্বুজের মতো বড়ো ঐতিহাসিক মসজিদ দেশে আর নেই। সামনে বিশাল মাঠ। কেয়ারি করা বাগান। জাদুঘর। ঘোড়া দিঘি। চোখ জুড়িয়ে যায়। মসজিদের ভেতর ঢুকে রীতিমতো অবাক হওয়ার পালা। এ যেন এক অন্য জগৎ। সামনের বড়ো খিলানের দু’পাশজুড়ে রয়েছে আরো পাঁচটা খিলান। পুব-পশ্চিমে সাতটা করে এগারোটা সারিতে সাতাত্তরটি ছবির মতো গম্বুজ। গম্বুজগুলো বেশির ভাগই গোলাকৃতি। কয়েকটি মাত্র চৌকোনা। ভেতরে ছটা করে দশ সারিতে দাঁড়িয়ে আছে দশটা স্তম্ভ। চারপাশের দেওয়ালে মোটা পাথরের আস্তরণ। এগুলো যেনতেন পাথর নয়। রীতিমতো সাগর-নদী উজিয়ে অন্য দেশ থেকে আনা। কত গল্প চালু আছে এ নিয়ে। অনেকেই বলেন, খান জাহান আলী কুদরতি কেরামতিতে এই পাথর নদীতে ভাসিয়ে নিয়ে এসেছেন দূর পাহাড় থেকে। আসলে কী তাই! সেসময় জাহাজে মালামাল আনা-নেওয়ার জন্য একটা বন্দর গড়ে উঠেছিল ষাটগম্বুজের কাছে ভৈরব নদীর ঘাটে। সেই জৌনপুর থেকে মূল্যবান পাথর পাল তোলা নৌকায় আনা হয়েছিল মসজিদের কাজে। এই বন্দরের নাম হারিয়ে গেছে ইতিহাসের পাতা থেকে। এই যে দেওয়ালজুড়ে লতাপাতার এত যে সূক্ষ্ম নকশা- এর কারিগরও ছিল একেকজন দক্ষ মিস্ত্রি। কারুশিল্পীতো বটেই। এরা এসেছিলেন জৌনপুরী জৌলুস আর আভিজাত্যের মিশেল নিয়ে। তখনকার ধরনধারণ অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে এখন।

শোনা যায়, ষাটগম্বুজেই ছিল খানজাহান আলীর কাজকর্মের আসল দরবার। নামাজ আদায়ের পাশাপাশি দাপ্তরিক শলাপরামর্শ, ধর্মীয় লেখাপড়া, লোকজনের আনাগোনা, বৈঠক- সবমিলিয়ে মুখর থাকত ষাটগম্বুজ মসজিদের আঙিনা। সীমানা দেওয়াল, বাগান, রঙিন পাথর আর কারুকাজের ঝিলিক হারিয়ে গেছে কালের গর্ভে। দুটো মিনার আগে ব্যবহার হতো সৈন্যদের ওয়াচ-টাওয়ার হিসেবে। সে-ব্যবস্থা উঠে গেছে বহু আগে। ইংরেজ আমলে অযত্ন আর অবহেলায় অনেকটা পরিত্যক্ত হয়ে যায় এই দেশসেরা মসজিদটি। 

১৯০৪ সালে পুরাতাত্ত্বিক বিভাগ হারানো ঐতিহ্য রক্ষায় এগিয়ে এলে পুরোটাই নিয়ে আসা হয় সংস্কারের আওতায়। দেশভাগের পর পুনরায় এর কার্যক্রমে গতি পেলে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে ষাটগম্বুজের সুনাম। ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেওয়ার পর নতুন করে ঢল নেমেছে পর্যটকের। নতুন চালু হওয়া জাদুঘরটিও বর্তমানে দর্শকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। 

জিতু কৌতূহলী গলায় বললো, ‘সেই কবেকার কথা, এখনও সবকিছু কত সুন্দর তাই না মামা?’

‘ঠিক বলেছিস। তবে যাচ্ছেতাই আনাড়ি ঘষামাজায় আগের রূপটা ফিকে হয়ে গেছে। রংটাও কেমন যেন কটকটা। চোখে লাগে। চল, পেছনের দিঘির কাছে যাই। এটা হলো বিখ্যাত ঘোড়াদিঘি।’

ঘাটে পা ছড়িয়ে জিতু একটু আনমনা হয়ে তাকিয়ে রইল পুকুরের দিকে, ‘মামা।’

‘বল।’

‘পুকুরের নাম ঘোড়াদিঘি কেন!’

‘সে আর এক কাহিনি। আসলে এসবই হলো খানজাহান আলীর কীর্তি। তবে এই মানুষটাকে নিয়ে গল্পের শেষ নেই। নানা গল্প চালু আছে ওনাকে নিয়ে। তবে একটা ধারণার ব্যাপারে মোটামুটি অনেকেই একমত।’

মামা ইতিহাসের মাস্টারের মতো সেই গল্পটা এবার তুলে ধরেন কৌতূহলী ছাত্রের সামনে।

গৌড়ের সুলতান নাসির উদ্দিন শাহ খলিফাতাবাদের প্রধান উজিরের দায়িত্ব দিয়ে এখানে পাঠান খানজাহানকে। তখন এই এলাকাটি ছিল নানা রকম অরাজকতায় ঠাসা। কলহ-বিবাদ, হানাহানি, বিদ্রোহ, মগ আর পর্তুগিজ জলদস্যুদের খুনখারাবি, সামাজিক নিপীড়ন, দারিদ্র্য, বিশৃঙ্খলা, চাঁদাবাজি, জুলুম, লুটপাট, অভাব-অনটন, জনরোষ- সব মিলিয়ে এলাকাটা পরিণত হয়েছিল নরককুণ্ডে।

খানজাহান আলী সৈন্য বাহিনীর বড়ো একটা দল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন কয়েক ভাগে। নানা প্রান্ত ঘুরে অবশেষে ভৈরব নদীর কাছে এই সুন্দরঘোনা গ্রামে এসে ঠাঁই গাড়েন বিশাল লটবহর নিয়ে। এখানেই নদীর কিনার ঘেঁষে গড়ে তোলা হয় খানজাহানের বসতভিটা। যার আরেক নাম ছিল হাবেলি কসবা। কাছে পিঠে বানানো হয় সৈন্যদের ব্যারাক। যে কারণে পুরো এলাকাটি পরিচিতি পেয়েছিল বেরাকপুর নামে। নোনা দেশে মিঠা পানির সমস্যা তো ছিলই। এজন্য কাটা হয় দিঘি, পুকুর। বানানো হয় মসজিদ। রাস্তা। মাদ্রাসা-মক্তব তো ছিলই। ঘোড়াদিঘি সে সময়কার তৈরি প্রথম দিঘি। এর নামকরণ নিয়ে অনেক কল্পকাহিনি চাউর হয়ে আছে লোক মুখে-মুখে। কারো মতে, পীর খান জাহান আলী আধ্যাত্মিক শক্তি বলে জিন-পরীদের দিয়ে রাতারাতি কাটিয়ে নেন এই দিঘি। কারো মতে, সৈন্যরা ঘোড়া নিয়ে এখানে মার্চ করত বলে নামকরণ হয়ে যায় ঘোড়ার নামে। কারো বিশ্বাস, একটা ঘোড়া এক দৌড়ে যতটা যেতে পারত ততটাই ছিল এই দিঘির দৈর্ঘ্য। তবে যে যা বলুক না কেন, খানজাহানের লোকজন যে এটা খুঁড়েছে এটাই আসল সত্য। শুরুতে দিঘিতে যে আদি ঘাট, কুমির আর বাগানঘেরা ছিল তা হারিয়ে গেছে বহু আগে। এখন যে ঘাটে বসে আছো এটা পরে তৈরি। দিঘির গভীরতা কমে গেলেও পানি কিন্তু মিষ্টি। শহরে পানি সাপ্লাই যাচ্ছে এই দিঘি থেকে। দেখবি নাকি একটু টেস্ট করে। চল, খাঞ্জেলি দিঘি থেকে ঘুরে আসি।’

‘সে আবার কোথায়?’

‘এই তো কাছেই। কেন, নাম শুনিসনি?’

‘তা শুনেছি এক-আধটু। মাম্মি বলেছে।’

‘তা বলতেই হবে। তোর মা ছিল হিস্টোরির স্টুডেন্ট। ইট-পাথরের গন্ধ শুঁকে দাবড়ে বেড়াতেন চারদিক। আমরা ছোটরাও কম ছিলাম না। একটা অছিলায় ঘুরে বেড়াতাম দলবল নিয়ে। সে একটা সময় ছিল বটে।’

সামান্যই পথ। একটা অটো নিয়ে চলে এলো দরগার মাজারে। ঢোকার মুখে একটু ঢাল বেয়ে খাড়া উঠতে হয়। চৈত্র মাসের পূর্ণিমায় বিরাট মেলা বসে দিঘির পাড়ে। লোকে বলে দরগার মেলা। মেলায় রাজ্যের ঢল নামে মানুষের। দোকানপাট, নাগরদোলা, বায়স্কোপ, পুতুল খেলা, বাঁদর নাচ, খেলনা, মাটির হাঁড়িকুড়ি, রংবেরঙের পুতুল, আসবাব, খাবার দোকান, মিষ্টি, জিলাপি, গজা, বাতাসা, ভাজাভুজি, গানবাজনা, হৈচৈ- ফুর্তির বান ডেকে যায় চারদিকে।

মামা বড়ো গেটের কাছে এসে একটু আনমনা হলেন। ‘মেলা দেখতে এসে দারুণ একটা কাণ্ড হয়েছিল সেই স্কুল লাইফে।’

জিতুর চোখে কৌতূহল, ‘কী কাণ্ড মামা?’

‘কয়েকজন বন্ধু মিলে এসেছিলাম মেলা দেখতে। ঠিক এখানটায় আসার সময় মনে হলো কে যেন গোড়ালির কাছে প্যান্ট ধরে টানছে। পেছন ফিরে দেখি একটা কালো কুকুর কামড়ে ধরে আছে গোড়ালির দিকটা। রীতিমতো রক্তারক্তি কাণ্ড!’

‘মাই গড, তারপর কী হলো!’ জিতুর চোখ কপালে উঠে গেল। 

‘তারপর আর কী! রীতিমতো হৈচৈ পড়ে গেল। আশপাশ থেকে ছুটে এলো লোকজন। বন্ধুরা পাঁজাকোলা করে ছুটে চলল হাসপাতালে।’

‘আর কুকুর?’

‘ও কামড় দিয়েই হারিয়ে গেল চোখের নিমিষে।’

‘হাউ ফানি, ভাবা যায়! এত মানুষ রেখে কামড়ে দিল কিনা তোমাকে!’

‘এটাই নিয়তি।’

‘তুমি ফেইথে বিশ্বাস করো!’

‘কেন করব না! সবকিছু কী আগাম বলে আসে?’

‘এটা ঠিক। তারপর কী হলো তোমার পায়ের?’

‘সে আরেক কাণ্ড! বলে দুঃখ শেষ করা যাবে না।’

‘তবুও শুনি।’

‘বন্ধুরা ধরাধরি করে নিয়ে এলো সদর হাসপাতালে। কিন্তু সেখানে কোনো ভ্যাকসিন নেই। এটা পেতে হলে যেতে হবে খুলনা মিউনিসিপালিটিতে। তো সেই পর্যন্ত ছুটে অনেক কষ্টে জোগাড় হলো এ আর ভি ইনজেকশন। উনিশ দিন ধরে নাভির চারপাশ ঘুরিয়ে দেওয়া হলো এই বোমাটে ইনজেকশন। বোঝো ঠ্যালা!’

দরগার ভেতরে ঢুকে অবাক হয়ে গেল জিতু। এত বড়ো দিঘি! চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। ‘দেখেছ মামা কী বিশাল! এটা কী দিঘি না লেক?’

‘হ্যাঁ, তা যা বলেছিস। এটা ঘোড়া দিঘির চেয়েও বড়ো। ১৪৫০ সালে এই দিঘি করেন খানজাহান আলী। এর আয়তন দুশো বিঘা জমির সমান। চারদিকের আকার একই মাপের। কমপক্ষে ১১০০ বর্গহাত তো বটেই। চওড়া উঁচু পাড়। আগে ঘাট ছিল চারটি। তা হারিয়ে গেছে বহু আগে। এখন নতুন দুটো ঘাট তৈরি হয়েছে উত্তর পাশে। ছোট ঘাটটি মেয়েদের। ঘাটের পাড়েই মাজার। খানজাহানের দরগাহ।’

‘মামা, এই দিঘিতে নাকি কুমির আছে!’

‘আছে মানে! এই দিঘির বড়ো আকর্ষণই হলো কুমির। এই নিয়ে বহু গালগল্প ছড়িয়ে আছে। কারো মতে খানজাহান তাঁর দুটো ঘোড়াকে কুমির বানিয়ে দিঘিতে রেখেছেন। অনেকের ধারণা, খান জাহান দুটো দুষ্ট জিনকে কুমির করে বন্দি রেখেছেন দিঘিতে। যার বংশধরদের দু-একটা টিকে আছে এখনও। কিন্তু এর কোনোটারই তেমন ভিত্তি নেই। যেটা সত্য বলে ধরে নেওয়া যায় তা হলো, সুন্দরবন অঞ্চলে এমনিতেই কুমিরের আনাগোনা ছিল খুব। খানজাহান হয়তো শখ করে দিঘিতে দু-একটা কুমির পুষেছেন যাতে কেউ পানি নষ্ট করতে না পারে। কালাপাহাড় আর ধলাপাহাড় সেই গোত্রের নেক্সট জেনারেশন। ওরা খুবই নিরীহ। কারো কোনো ক্ষতি করে না। দূর-দূরান্ত থেকে ভক্তরা মানত করে হাঁস, মুরগি, ছাগল নিয়ে আসে ওদের খাওয়ার জন্য। খাদেম বিশেষ কায়দায় ডাকলে ওরা পানির ওপর ভেসে উঠে খাবার মুখে তুলে নেয়।’

জিতু মুচকি হেসে বললো, ‘ওদের তো বেশ শান্ত মনে হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার ময়েল নদীর কুমির আর হাঙর কিন্তু দারুণ হিংস্র। ওদের হাতে প্রায়ই মারা পড়ে বহু লোক।’

‘সর্বনাশ, গিয়েছিস নাকি ময়েলে মাছ ধরতে?’

‘বাপি তো প্রায়ই যায় ভেটকি মাছ ধরতে। একবার কী করে যেন বোট থেকে পড়ে গেছিলেন পানিতে। ভাগ্যের জোরে বেঁচে গেছেন।’

‘কালাপাহাড় আর ধলাপাহাড় নিয়ে সে-অভিযোগ নেই। কিন্তু ওদের খানাখাদ্য নিয়ে যে-অবিচার করা হয় এটা খুবই কষ্টকর। বেশিরভাগ খাবারই নানা কৌশলে হাতড়ে নিয়ে যায় দরগার ফকিরের দল। নিরীহ লোকজনকে ফুসলে সর্বস্ব কেড়ে নেবার অভিযোগও আছে তাদের বিরুদ্ধে।’

ঘাটে তেমন একটা ভিড় জমেনি তখনও। কিছু মানুষ বসে আছেন হাত-পা ছড়িয়ে। অনেকেই শরীরের পাপতাপ ঝরাতে নাইতে নেমেছেন পবিত্র পানিতে। শিশুদের আনন্দ একটু বেশি হলেও আতংকে সেটিয়ে আছে কুমিরের ভয়ে।

রোদ চড়েছে সামান্য। ঝকঝকে আকাশ। বাতাসে মৃদু হিম। কেমন একটা টাটকা জলজ গন্ধ চুরিয়ে উঠেছে। কয়েকটা মাছরাঙা আর পানকৌড়ি অলস বসে আছে শ্যাওলার ঢিবিতে। দুটো হাঁসপাখি মাথার ওপর চক্কর দিয়ে উড়ে গেল হাসতে হাসতে। জিতু ঘাটে আসনপিঁড়ি হয়ে বসে থাকল উদাস হয়ে। হঠাৎ দার্শনিক গলায় বললো, ‘দিঘির ওপারটা দেখেছ। কত উঁচু আর গাছপালায় ভরা।’

‘যাবি নাকি ওখানে?’

‘কিছু আছে নাকি দেখার!’

‘আছে বৈকি।’

‘কী আছে বলতো?’

‘দিঘির পশ্চিম পাড়ে গাছগাছালির মধ্যে খানজাহান আমলের একটা মসজিদ আছে। এটার নাম একগম্বুজ মসজিদ। দেখতে ছোট। কিন্তু খুব পুরোনো। একগম্বুজ নাম হলেও এর রয়েছে চারটি পাথরের স্তম্ভ। চার দেওয়ালে শোভা পাচ্ছে আরো নয়টি সুন্দর গম্বুজ। সবগুলোই নতুনের মতো। মসজিদটি দেখতে এখনও ভারি সুন্দর।’

একধরনের বিস্ময়ের ঘোর জড়িয়ে আছে জিতুর চোখেমুখে। একটু কৌতূহলী গলায় বললো, ‘এছাড়াও তো খানজাহান অনেক মসজিদ, মাজার, দিঘি, মাদ্রাসা, রাস্তাঘাট বানিয়েছেন।’

‘তাতো বটেই। জিন্দাপীরের মাজার, মোহাম্মদ তাহেরের মাজার, বিবি বেগিনীর মসজিদ, চুনখোলা মসজিদ, সিংরা মসজিদ, পচা দিঘির মতো বহু কাজবাজের সঙ্গে জড়িয়ে আছে খানজাহানের নাম। আসলে উনি যে মানুষের বন্ধু ছিলেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই।’

‘খানজাহানের পরিচয় আসলে কী? উনি কী খলিফাতাবাদের শাসক ছিলেন? নাকি ধর্ম প্রচারক পীর দরবেশ?’

‘সেটাই হয়েছে মুশকিল! নানা রকম রংবেরং গল্প-কাহিনি দিয়ে সাজানো ওনার জীবন। এর ভেতর আসল মানুষটাকে খুঁজে পাওয়া যায় না!’

‘কেন যায় না?’

‘কী করে যাবে! উনি কোন দেশের মানুষ, কোন রাজদরবারের উজির-নাজির, নাকি ¯্রফে পীরদরবেশ, ধর্মপ্রচারক, নাকি রাজ্য শাসক, কী তাঁর মতলব, কেউ সঠিক করে কিছু বলতে পারে না, পুরোটাই অনুমান নির্ভর।’

‘মাত্র চার-পাঁচশ বছর আগের ঘটনা! এ নিয়ে এত জল্পনা-কল্পনা কেন? এত বড়ো একজন মানুষ। এত বড়ো বড়ো কাজ করলেন। অথচ দেশের মানুষ ওনাকে ভালো করে চেনেন বলে মনে হয় না! বন্ধুদের কাছে গল্প করতে গিয়ে অবাক হয়েছি। অনেকেই চেনে না তাকে! তুমি তো বাগেরহাটের মানুষ। দরগার কাছে রনবিজয়পুর তোমার বাড়ি। সত্যি বলো তো মামা, উনি আসলে কে ছিলেন?’

‘অতোশত বলতে পারব না বাপু। যতটুকু শুনছি, উনি ছিলেন একজন তুর্কি। গিয়াস উদ্দিন আজম শাহের প্রধান সেনাপতি ছিলেন। পরে নানা ঘাট ঘুরে ঠাঁই হয় গৌড়ের রাজ দরবারে। নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহের সময় প্রধান উজির করা হয় খানজাহানকে।’

এই পুরো অঞ্চলটাই ছিল বাদাবন। হিংস্র জীবজন্তুতে ভরপুর। বন কেটে তৈরি হয় বসত। না ছিল রাস্তাঘাট। না হাটবাজার। না শিক্ষা। না বিশুদ্ধ পানি। ধর্মীয় কুসংস্কার, অনাচার-অবিচার, হাঙ্গামা, খুন-খারাবি ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। দুর্ভিক্ষ, মহামারি, মগের দস্যুতা- সবমিলিয়ে নরকে পরিণত হয়েছিল গোটা দখিন জনপদ। যার ফলে গৌড়ীয় শাসন অনেকটাই অকার্যকর হয়ে যায়।

খানজাহান ৬০ হাজার সৈন্য আর ৩৭০ জন আউলিয়া নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন। নানা পথ ঘুরে, পথে পথে যুদ্ধ করে, সবাইকে আহ্বান করেছিলেন ইসলামের ছায়াতলে আসতে। তিন দলে ভাগ হয়ে তারা যাত্রা শুরু করেছিলেন অজানার সন্ধানে। যেতে যেতে খানজাহানের দলটি একসময় এসে আশ্রয় নেন বারোবাজার গ্রামে। ধর্মপ্রচারের পাশাপাশি তিনি এখানে তৈরি করেন একগম্বুজ মসজিদ। ইমারত। রাস্তা। দিঘি। পুকুর। ১২ জন সহচর নিয়ে এখানে আসেন বলেই এর নাম হয় বারো বাজার। এরপর তিনি একে একে আশ্রয় নেন মুড়লী আর পয়োগ্রাম কসবায়। এরপর সেনের বাজার হয়ে ভৈরব নদীর কাছে সুন্দরঘোনা গ্রামে ঠাঁই নিয়েছিলেন পাকাপাকিভাবে। জঙ্গল সাফ করে দখিনের এই জনপদকে বানিয়েছিলেন তাঁর স্থায়ী ঠিকানা। খলিফার শাসন কায়েম হওয়ায় তখন এই অঞ্চলের পরিচিতি ঘটে খলিফাতাবাদ হিসেবে। তখনও হয়ত নামকরণ হয়নি বাগেরহাটের। খানজাহান এই নতুন অঞ্চলে বসত গাড়েন বলেই এর নামকরণ করেন হাবেলি কসবা।

নতুন রূপে ঢেলে সাজানো হয় হাবেলি কসবাকে। শহরের আশপাশের গ্রামে গড়ে ওঠে অসংখ্য ইমারত, মসজিদ, মাজার, তোরণ, বন্দর, বাড়িঘর, মাদ্রাসা, পুকুর, দিঘি, রাস্তাঘাট। ষাটগম্বুজ মসজিদের কাছে খানজাহান যে বসতবাড়ি বানিয়েছিলেন কিছু ভাঙা দেওয়াল ছাড়া এর কোনো অস্তিত্ব আজ আর নেই। আগের ভৈরবও মজেহেজে গেছে। তবে রাস্তাঘাটের কিছু স্মৃতি বহাল আছে এখনও। নোনা জল-হাওয়ার কারণে খানজাহান ইমারতের ইট পাথরের কাজে ব্যবহার করেছিলেন আধুনিক পদ্ধতি। যাকে বলা যায় তোঘলকি রীতি। জৌনপুর থেকে মূল্যবান পাথরের সঙ্গে এনেছিলেন দক্ষ মিস্তিরি আর বাহারি মালামাল। শত শত বছর পরও যে কারণে অটুট রয়েছে তার তৈরি মসজিদ-মাজারের পুরোনো কাঠামো। রাস্তাগুলো তৈরি হয়েছিল একই রকম মজবুত কাঠামোয়। যা এখনও টিকে আছে বহু জায়গায়। কেবল ধর্ম প্রচারক হিসেবে নয়, খানজাহান ছিলেন জনদরদি একজন দক্ষ শাসক। খলিফাতাবাদের অধীনে তিনি শক্ত হাতে শাসন করেছিলেন গোটা দক্ষিণ বঙ্গ। বাগেরহাট ছিল শাসনের কেন্দ্রবিন্দু। নতুন করে ঢেলে সাজানো হয়েছিল শহরটি। সৈন্য-সামন্ত, উজির-নাজির, পেয়াদা-গোমস্তা আর হরেক রকম দূরদূরান্তের মানুষের আনাগোনায় মুখর ছিল বাগেরহাট। সব রকম অরাজকতা বন্ধ করে তিনি শান্তি এনেছিলেন প্রজাদের। বন্ধ করেছিলেন জলদস্যুদের অত্যাচার, খুন-খারাবি, অপহরণ, রাহাজানি, কলহ-বিবাদসহ সব রকম বিদ্রোহ। সেই অর্থে খানজাহানকে একজন দক্ষ শাসক বললেই কেবল ভুল হবে, ধর্মীয় আচার ও মূল্যবোধের চমৎকার প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর জীবনে। ক্ষমতার চাবিকাঠি হাতে থাকার পরও খানজাহানের জীবনযাপন ছিল অতি সাধারণ একজন মুসাফিরের মতো। তাঁর বেশবাস ছিল অতি সাধারণ। এত ক্ষমতাধর মানুষ হয়েও তাঁর বসতভিটাকে অন্য ইমারতের মতো শক্ত-পোক্ত করেননি। যে কারণে তাঁর বানানো শেষ আশ্রয় এখনও অটুট থাকলেও, বাস্তবের বসতভিটা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে বহু আগে। 

‘চল, আমরা বরং সামনের খানজাহানের মাজারটা ঘুরে দেখে আসি।’

‘তাই চলো, সবাই দেখি ওদিকেই যাচ্ছে।’

‘তা যাবে না কেন, এই দেখার ইচ্ছে নিয়েই তো সবাই আসে।’

‘এখানে বুঝি ওনার কবর তাই না মামা?’

‘হ্যাঁ, সেই কথাই বলছি। এই দরগা শরিফ নিয়েও কল্পকথার শেষ নেই। কত পুরোনো ঘটনা বুঝতেই পারছ। কেউতো আর দেখেনি কিছু। সবই মুখে মুখে।’

‘তা শুনি তোমার গল্প।’

‘একসময় মৃত্যু চিন্তায় খুব কাতর হয়ে পড়েছিলেন খানজাহান। কোথায় কবর হবে এটা জানার জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য চান। আসমানি সিদ্ধান্ত পাওয়া গেলে, দিঘি খুঁড়ে পাশেই আগাম তৈরি করেন মাজার শরিফ। এটা বানানোর নয় বছর পর ১৪৫৯ সালের ২৩শে অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন উলুঘ খানের আজম পীর খানজাহান আলী। তাঁর মৃত্যুদিন স্মরণে প্রতি বছর তাঁর ভক্ত অনুসারীরা মহা ধুমধামে ওরসের আয়োজন করেন।

‘আচ্ছা মামা, বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদকে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দিয়েছে ভালো কথা। কিন্তু এখন কী হবে?’

‘কী হবে মানে?’

‘এরকম একটা বিশাল পর্যটন স্পট নিয়ে দেশ-বিদেশে কোনো পাবলিসিটি নেই কেন? অস্ট্রেলিয়া হলে এরকম একটা সাইট নিয়ে চুটিয়ে ব্যবসা জমত পর্যটনের।’

‘এখানের পাবলিকের এসব দেখার চোখ নেই।’

‘তুমি বললেই হলো! তোমরা ট্যুরিস্ট বললেই মনে করো বড়ো হোটেল-মোটেল না হলে তাদের চলবে না। কিন্তু সাদা চামড়ার ট্যুরিস্ট হলেই যে তাদের পকেটে কাঁড়িকাঁড়ি ডলার থাকবে এটা সম্পূর্ণ ভুল। আজকাল ট্যুরিস্টরা হোটেলের বদলে কোনো ফ্যামিলির পেয়িং গেস্ট হয়ে থাকতে চায়। এতে দুই তরফের লাভ।’

‘তোর ছোট মাথা হলেও কথাটা কিন্তু মন্দ বলিসনি। দেশ-বিদেশে ঘুরে বেশ চোখ খুলে গেছে।’

‘এই যে ষাটগম্বুজ লাগোয়া তোমাদের বিশাল বাংলো বাড়ি এটাই তো অনায়াসে কাজে লাগাতে পারো। তুমি তো কিছুই করছ না। অনলাইনে ষাটগম্বুজ ভিজিটের প্যাকেজ অফার করে একটা ব্যবসা দাঁড় করতে পারো। একটু বুদ্ধি খাটিয়ে করলে দেশের মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়বে।’

‘তুই দেশে থাকলে কাজ হতো। তোকে ম্যানেজার বানিয়ে ব্যবসাটা শুরু করতাম।’

মাজারের গেটের ভেতর যাওয়ার জন্য ছোটখাটো একটা ঢল নেমেছে। জিতুও মামার হাত ধরে মিশে গেল ভিড়ের সঙ্গে। ঢোকার মুখে সামান্য ভিড়। ওখানে আগরবাতি, গোলাপ জল, মোমবাতি, কালো ফিতা আর মাদুলি নিয়ে কিছু লোক রীতিমতো বাজার বসিয়ে দিয়েছে। নানা কথার জাদুতে এগুলো লোকজনকে গছানোর চেষ্টা চলছে। পুণ্যের সঙ্গে এর কোনো যোগ নেই। তবুও বন্ধ হচ্ছে না বাণিজ্য। ভেতরে ঢুকে অবাক হয়ে গেল জিতু। একগম্বুজের ওপর দাঁড়ানো এটা হলো খানজাহান আলীর মাজার। এর স্থাপত্য রীতি, নকশা, ইট-পাথর, পোড়া মাটি অনেকটাই দেখতে ষাটগম্বুজের মতো। চারদিকে কাঠের রেলিংঘেরা উঁচু বেদিতে গিলাফ মোড়া কবর। কবরের ওপর টাঙানো শামিয়ানা। রঙিন ঝালর। সবমিলিয়ে আশ্চর্য এক পবিত্র স্নিগ্ধতায় মন ভরে ওঠে।

জিতু কেমন এক ঘোরের মধ্যে হারিয়ে গেল। মামা হাত ধরে কাছে টেনে বললেন, ‘চল, মাজারের গায়ে শিলালিপির লেখাটা পড়ে দেখি। আরবি-ফারসি জানিস নাকি! নো প্রবলেম। আমার মুখস্থ আছে। শুনবি আয়।’

মামা চোখ বন্ধ করে গদগদ গলায় আবৃত্তি করলেন :

“ইয়ারো মুরিদ-দোস্তাম

আল মাওতু হাক্কুন, আল মাওতু হাক্কুন 

খারাস্ত আন্দর বোস্তাম

আল মাওতু হাক্কুন, আল মাওতু হাক্কুন। 

মরগাস্তে খামছিয়ে মোহকামি পিয়ে 

জুমলায়ে জানান জু একিন,

নায় হামচু দিগার দুশমনান

আল মাওতু হাক্কুন আল মাওতু হাক্কুন।”

কথাটা মৃত্যুকে নিয়ে। মৃত্যুই চিরন্তন... 

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ