রোনালদো হতে চেয়েছিল ছেলেটি
খেলার চমক আবু আবদুল্লাহ এপ্রিল ২০২৫
স্বপ্ন ছিল একদিন বিশে^র নামকরা ফুটবলার হওয়ার। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে আদর্শ মেনে বেড়ে উঠছিল কিশোর ফুটবলারটি। স্কুলের সময়টুকু ছাড়া দিনের বাকিটা সময় ফুটবল নিয়েই মেতে থাকতো সে। তার ধ্যান-জ্ঞান, স্বপ্ন সব কিছুই ছিল ফুটবলকে ঘিরে। খেলোয়াড় হিসেবেও ছিল দারুণ সম্ভাবনাময়। ক্লাবের ম্যানেজার নাসের মেরিজ জানিয়েছেন, ছেলেটির ডান পায়ে খেলার ক্ষমতা ছিল বেশি। হেড করার ক্ষেত্রেও সে ছিল দারুণ প্রতিভা। সে দলে যোগ দেওয়ার পর ক্লাবের চেহারাটাই বদলে গিয়েছিল। তার স্বপ্ন ছিল রোনালদোর মতো আন্তর্জাতিক ফুটবলার হওয়ার।
কিন্তু ছেলেটির জন্ম এমন একটি জায়গায় যেখানে বিখ্যাত হওয়া তো দূরের কথা, বেঁচে থাকাটাই ভাগ্যের। দখলদার শক্তির নৃশংসতা থেকে বাঁচতে সেখানে প্রতিদিন সংগ্রাম করতে হয়। যখন তখন যে কারো বুকে লাগতে পারে দখলদারদের বুলেট। এবং শেষ পর্যন্ত সেই নির্মম পরিণতিই কেড়ে নিয়েছে তার ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন।
যার কথা বলছি, তার নাম নাজি আল-বাবা। ফিলিস্তিনের ইসরাইল অধিকৃত ভূখণ্ড পশ্চিম তীরের হালহুল শহরের বাসিন্দা ছিল সে। দারুণ সম্ভাবনাময় এক ফুটবলারের নাম ছিল নাজি আল-বাবা। ছোটোবেলা থেকেই ফুটবলকে ভালোবেসে বেড়ে উঠেছিল এই ফিলিস্তিনি কিশোর। কিন্তু চারটি ইসরাইলি বুলেট গত বছর নভেম্বরে নিভিয়ে দিয়েছে এই কিশোর ফুটবলারের স্বপ্ন।
ইসরাইলি সেনাদের হাতে ফিলিস্তিনিদের প্রাণ হারানো নতুন কোনো ঘটনা নয়। যুদ্ধের ঘটনা ছাড়াও প্রতিদিনই দখলদার বাহিনী যখন খুশি গুলি চালায় ফিলিস্তিনিদের ওপর। তেমনই এক ঘটনায় সেদিন খেলার মাঠে কিশোর ফুটবলারদের ওপর গুলি চালায় ইহুদিবাদী সেনারা। মাঠেই জার্সি-বুট পরা অবস্থায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে নাজি। যে ফুটবল ছিল তার স্বপ্ন, সেই ফুটবল খেলার মাঝেই তার জীবন কেড়ে নেয় দখলদার সেনারা।
১৪ বছর বয়সি নাজি আল-বাবা হালহুল স্পোর্টস ক্লাবে নিয়মিত ফুটবল প্রশিক্ষণ নিতো। অল্প বয়সেই সে সম্ভাবনাময় ফুটবলার হিসেবে নাম করেছিল। নাজির বন্ধু ও টিমমেট রেদা হেনিয়েহ প্রিয় বন্ধুর স্মৃতিচারণ করে বলেন, ওর সাথে ফ্রি কিক নেওয়া নিয়ে প্রায়ই আমার মিষ্টি ঝগড়া হতো। ও ছিল দলের সবচেয়ে লম্বা খেলোয়াড় এবং সবচেয়ে হাসিখুশি মানুষ। রেদা আরো বলেন, আমি শেষ পর্যন্ত নাজিকেই ফ্রি কিক নেওয়ার সুযোগ দিতাম, কারণ আমি জানি ও আমার চেয়ে ভালো ফ্রি কিক নিতে পারবে। প্রতিবার ও গোল করার পর দৌড়ে আমার কাছে আসতো এবং আমরা এক সাথে আনন্দ করতাম।
নাজিকে যেদিন হত্যা করা হয় সেদিন সে স্কুল থেকে ফিরেই খেলতে চলে যায়। নিদাল আবদুল মতিন আল-বাবার ছয় সন্তানের মধ্যে পঞ্চম ছিল নাজি। দুপুরের পর তার এক চাচাতো ভাই এসে বাড়িতে খবর দেয় যে, নাজির ক্লাব মাঠে ঢুকে গুলি চালিয়েছে ইসরাইলি সেনারা। খবর শুনে নাজির বাবা ও এক চাচা দৌড়ে মাঠের দিকে চলে যান। গিয়ে দেখেন সেনারা দাঁড়িয়ে আছে অস্ত্র হাতে। কাউকে মাঠে ঢুকতে দিচ্ছে না। সন্তানের কাছে যেতে চাইলে তাদের লাঠি পেটা করে সেনারা। নাজির বাবার হাত ভেঙে যায় পিটুনিতে। এরপর তাকে হাতকড়া পরিয়ে মাটিতে ফেলে রাখে কয়েকজন সেনা।
নাজির বাবা বলেন, সেনারা এরপর অ্যাম্বুলেন্স ডেকে নিহত ফুটবলারের লাশ পাঠায় হাসপাতালে। আমি দূর থেকে মনে মনে দোয়া করতে থাকি লাশটা যেন আমার সন্তানের না হয়; কিন্তু ওর বুট জোড়া দেখে আমি চিনতে পারি। মাত্র কয়েকদিন আগে ওকে ওই বুট কিনে দিয়েছিলাম।
গুলি লাগার পর আধাঘণ্টা ঘাসের ওপর পড়ে ছিল নাজির দেহ। কাউকে তার কাছে যেতে দেয়নি দখলদার সেনারা। দ্রুত চিকিৎসা করাতে পারলে হয়তো বেঁচে যেত ছেলেটি; কিন্তু সেটি করতে দেয়নি ইসরাইলি বাহিনী।
ইসরাইলি হামলায় ফিলিস্তিনি খেলোয়াড়দের মৃত্যু নতুন কিছু নয়। এটি নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফিলিস্তিনের সাধারণ মানুষের মৃত্যুতে যেমন বিশ^ বিবেক চুপ করে থাকে তেমনি ফিলিস্তিনি খেলোয়াড়দের ওপর ইসরাইলি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলোতেও চুপ করে থাকে বিশ^ ক্রীড়াঙ্গন।
নাজি আল-বাবা উদাহরণ মাত্র। তার মতো বহু ফিলিস্তিনি খেলোয়াড়, ক্রীড়া সংগঠক অকালে প্রাণ দিয়েছেন দখলদার রাষ্ট্র ইসরাইলি বাহিনীর হাতে। ২০২৩ সালের ৭ নভেম্বর থেকে গাজা উপত্যকায় যে যুদ্ধ হয়েছে তাতেও শতাধিক খেলোয়াড় প্রাণ হারিয়েছেন।
আরও পড়ুন...