শিশুশ্রম স্বপ্ন হারানোর গল্প
বিশেষ রচনা হারুন ইবনে শাহাদাত মে ২০২৬
প্রিয় বন্ধুরা, তোমরা যখন স্কুল ড্রেস পরে সুন্দর পরিপাটি হয়ে স্কুলে যাও, খুব আনন্দ পাও। স্কুল তোমাদের কারো কারো মন খারাপের কারণ হতেই পারে। কিন্তু তারপরও নিশ্চয় তোমাদের দু-চোখে একটা স্বপ্ন আঁকা থাকে। এই স্বপ্নের টানেই সকালের মিষ্টি ঘুম শেষ হওয়ার আগেই বিছানা ছেড়ে ওঠো। মায়ের বানানো নাশতা টেবিলে রেখেই ছুটে যাও স্কুলে। যেতে যেতে অবশ্যই তোমাদের চোখ পড়ে ঠিক তোমারই বয়সের কিংবা তার চেয়েও ছোট শিশু-কিশোররা ছুটছে কোনো মোটর গাড়ির গ্যারেজ, হোটেল, দোকান নয়তো কোনো কারখানায়। কারণ ওরা তোমাদের মতো ছাত্র নয়, শিশু-শ্রমিক। তোমাদের মতো উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন ওরা হারিয়ে ফেলেছে।
আঠারো বছরের আগে শ্রম বিক্রি করা আইনসংগত নয়। কারখানার মালিকদের জন্য আঠারো বছরের নিচের কাউকে শ্রমিক হিসেবে কাজে নিয়োগ করা বেআইনি। কিন্তু কথায় আছে, ‘প্রয়োজন আইন মানে না’-ক্ষুধার যন্ত্রণার কাছে ওরা পরাজিত। আর মালিকরা কম পয়সায়, বেশি লাভের আশায়, অথবা অসহায় কোনো পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর কথা বলে ওদের কাজে নিয়োগ করে। আসলে মূল সমস্যা হলো-অমানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। ইনসাফভিত্তিক আদর্শ কল্যাণরাষ্ট্রের অনুপস্থিতি। কারণ রাষ্ট্রের দায়িত্ব অসহায় পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো। দরিদ্র, এতিম, অসহায় শিশু-কিশোরদের বিনামূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থার সাথে সাথে অসহায় পরিবারে কেউ কর্মক্ষম থাকলে তার কাজের ব্যবস্থা করা। ইনসাফভিত্তিক আদর্শ কল্যাণ রাষ্ট্র শিশু-কিশোরের পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করে জীবনযাপনের অনিশ্চয়তা দূর করত। কোনো পরিবারে কর্মক্ষম কোনো সদস্য না থাকলে সেই পরিবারের দায়িত্ব নিত রাষ্ট্র। দরিদ্র অসহায় শিশু-কিশোরদের কর্মমুখী শিক্ষা দিয়ে কৈশোরকাল শেষে কাজের ব্যবস্থা করত ইনসাফভিত্তিক কল্যাণরাষ্ট্রের সরকার।
কী তোমাদের ভাবনায় ফেলে দিলাম? তোমরা হয়তো ভাবছ, সেই কল্যাণ রাষ্ট্র কেন নেই, কবে হবে, কে করবে? সব প্রশ্নের উত্তর অবশ্যই তোমরা পাবে। তারজন্য সবার আগে তোমাদের দায়িত্ব নিজেদের যোগ্য করে গড়ে তোলা-বেশি বেশি লেখাপড়া করা। স্কুলের পাঠ্য বইয়ের সাথে সাথে মানবিক গুণ অর্জনের জন্য পড়তে হবে নিজ নিজ ধর্ম গ্রন্থ-পবিত্র কুরআন-হাদিস, সাহিত্য ও মহৎ ব্যক্তিদের জীবনী।
নিশ্চয় তোমাদের জানতে ইচ্ছে করছে, কতজন শিশু-কিশোর শিশুশ্রমে নিয়োজিত? তাহলে বলছি শোনো, ২০২৫ সালে পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুসারে, আমাদের দেশে ৩৫ লাখ ৪০ হাজার শিশু শ্রমিক, ১০ লাখ ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। এদের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে যুক্ত আছে ১০ লাখ ৭ হাজার শিশু। এর পাশাপাশি প্রায় ২০ লাখ শিশু গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করলেও তাদের ১২ লাখ কোনো পারিশ্রমিকই পায় না। শুধু দুই বেলা দুই মুঠো খাবারের বিনিময়ে তারা তাদের শ্রম দেয়। মোট শ্রমজীবী শিশুর মধ্যে প্রায় ১০ লাখ ৭০ হাজার শিশু অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। আইএলও এবং ইউনিসেফের সাম্প্রতিক তথ্যে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম কিছুটা কমলেও সার্বিকভাবে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত ৪৩ খাতের মধ্যে পাঁচটিতেই নিয়োজিত রয়েছে ৩৮ হাজার ৮ জন। এক্ষেত্রে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সিদের শিশুশ্রমিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। অমানবিক পরিশ্রম করলেও এসব শিশু শ্রমিক ন্যায্য মজুরি বঞ্চিত। উলটো শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়। কোনো প্রতিকার পায় না। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) নীতি অনুসরণে এ জরিপ কার্যক্রম পরিচালিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) পৃথক দুটি জরিপে তুলে ধরা হয়েছে, দেশের শিশুশ্রমের এ ভয়াবহ এক বেদনাময় চিত্র। শিশুরা মূলত অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ, ব্যাটারি রিচার্ড, জুতা তৈরির কারখানা, অ্যালুমিনিয়াম কারখানা, ইটভাটা, এবং বিড়ি শিল্পের মতো ঝুঁকিপূর্ণ খাতে কাজ করে। শিশুশ্রমের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে পরিবারের চরম দারিদ্র্য এবং অর্থনৈতিক দুরবস্থা। করোনাকালীন সংকটের পর অনেক দরিদ্র পরিবার তাদের সন্তানদের কাজে পাঠাতে বাধ্য হয়েছে। বিভাগীয় শহরগুলোর মধ্যে খুলনায় শিশুশ্রমের হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে প্রায় ১০ শতাংশ শিশু শ্রমের সাথে যুক্ত। রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকাগুলোতেও প্রচুর শিশু কলকারখানায় কাজ করছে। বাংলাদেশ সরকার ২০২৫ সালের মধ্যে সব ধরনের শিশুশ্রম নিরসনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও তা এখনো অধরাই রয়ে গেছে। বরং ঝুঁকিপূর্ণ খাতগুলোতে শিশুশ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে বৈ কমছে না। পাঁচ ঝুঁকিপূর্ণ খাতের মধ্যে শ্রমজীবী শিশুদের সবচেয়ে বড় অংশ নিয়োজিত রয়েছে অটোমোবাইল খাতে। এই খাতে কর্মরত শিশুর ৩৫.৭ শতাংশ গ্রাম এবং ৬৪.৩ শতাংশ শহর এলাকায় বসবাস করে। এই জরিপের তথ্য সংগ্রহ করা হয় ২০২৩ সালের ৩ জুন থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত। ঝুঁকিপূর্ণ খাতে কাজে নিয়োজিত শিশুদের মধ্যে ৯৭.৫ শতাংশ ছেলে এবং ২.৫ শতাংশ মেয়ে শিশু। সেক্টরভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত শিশুশ্রম জরিপ ২০২৩ মূলত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) বাস্তবায়নাধীন প্রথম জরিপ। যেখানে সরকার ঘোষিত ৪৩টি ঝুঁকিপূর্ণ সেক্টর হতে পাঁচটি সেক্টর নির্ধারণ করে জরিপটি পরিচালনা করা হয়েছে।
সম্পদের ইনসাফপূর্ণ সুষম বণ্টন এবং বৈষম্যমুক্ত দেশ গড়ার প্রত্যয়ে ১৯৭১ সালের শহীদদের অপূর্ণ স্বপ্ন বাস্তবায়নে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবেও নতুন স্বাধীন বাংলাদেশ গড়তে শাহাদাত বরণ করেছে প্রায় দুই হাজার ছাত্র-জনতা। পঙ্গুত্ব অন্ধত্ব জীবনে জীবনসংগ্রাম অব্যাহত রেখেছে প্রায় লাখো তরুণ। তারপরও কেন শৈশবেই স্বপ্ন হারাচ্ছে এ দেশের লাখ লাখ শিশু-কিশোর। চরম দারিদ্র্যের কশাঘাতে ভাগ্যবিড়ম্বিত তোমার আমার চারপাশের শিশু-কিশোরদের পাশে দাঁড়াতে হবে। তোমরা যারা ভাগ্যবান তাদের উচিত আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা। এ শুকরিয়া আদায়েরই একটি মাধ্যম হলো যার যার সাধ্যানুসারে তাদের সাহায্য করা। ভুলে গেলে চলবে না, ব্যক্তির সাধ্য সীমিত। তাই এমন দেশ গড়তে হবে যেমন দেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে শহীদরা জীবন দিয়েছেন। যতদিন পর্যন্ত না তাদের স্বপ্ন পূরণ হবে, ততদিন সংগ্রাম চালাতে হবে। এ স্লোগান বুকে ধারণ করে পথ চলতে হবে-‘আবু সাঈদ মুগ্ধ, শেষ হয়নি যুদ্ধ।’
আরও পড়ুন...