৩৬ জুলাইয়ের ডায়েরি থেকে
জুলাই-গল্প সাইদুল ইসলাম জুন ২০২৬
৫ আগস্টের সকালটা যেন আশার নতুন আলো নিয়ে হাজির হয়েছিল। তার আগের রাতে হঠাৎ খবর পেলাম, আগামীকাল ঢাকার উত্তরায় লংমার্চের সমন্বয় করতে হবে আমাদের। খবরটা পাওয়ার পর থেকে মনটা ভারী হয়ে গেল। কারণ এত অল্প সময়ের মধ্যে এত বড় প্রস্তুতি নেওয়া আদৌ সম্ভব কি না। উত্তরা বিএনএস সেন্টার এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। তার ওপর কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারীদের ঘোষিত স্পটগুলোর মধ্যে এই জায়গার নাম ছিল না, ফলে ছাত্র-জনতার উপস্থিতি নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে দাঁড়াল।
তবুও ভরসা পেলাম, কারণ নিশ্চিত হলাম, প্রায় দুই হাজার ছাত্র এবং হাজারখানেক বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষকে উপস্থিত করানো যাবে। লংমার্চ শুরু হওয়ার কথা সকাল ১০:৩০-এ, কিন্তু ভাবলাম, যানবাহনের ঝামেলা এড়াতে সবার আগে পৌঁছানোই ভালো। তাই সকাল ৮:৩০-এ স্পটে পৌঁছে গেলাম। ধানমন্ডি আমার বাসা থেকে উত্তরা প্রায় ২০ কিলোমিটার দূর। স্পটে পৌঁছে দেখি, রাস্তাঘাট ইটপাটকেল আর যুদ্ধবিধ্বস্ত ঘটনার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আগের দিন এই স্পটে দু’জন শাহাদাত বরণ করেছেন এবং অনেকে গুরুতর আহত হয়েছেন। আজকে সকাল থেকেই শত শত আর্মি ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। আশেপাশের ৫-৭ কিলোমিটার এলাকা ঘুরে দেখলাম, রাস্তার চারপাশে শুধু অনিশ্চয়তার ছায়া। মনে হলো, এই এলাকা হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যেই রণক্ষেত্রে পরিণত হবে।
চারপাশটা ঘুরে ঘুরে দেখে নিলাম-কোথায় কোথায় আহতদের জন্য হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং জরুরি মুহূর্তে আশ্রয় নেওয়ার মতো ব্যবস্থা আছে। প্রতিটি মুহূর্তই মনে হচ্ছে, আজকের দিনটি কীভাবে কাটবে, আল্লাহই জানেন। এতকিছুর মধ্যেও এই যুদ্ধের একজন সৈনিক হিসেবে নিজেকে গর্বিত মনে হচ্ছিল। মায়ের কাছে কল দিলাম, হাসিমুখে কথা বললাম। বিদায়ের কথা মুখে না বললেও, মনে মনে যেন একপ্রকার বিদায়ই নিলাম। বড় আপুর মেসেজটা পেয়ে চোখের কোণে পানি চলে এলো। সাবধান বাণীর পাশাপাশি তাতে ছিল দোয়া। মেসেজটা যেন আমার মনকে আরও একবার সজীব করে তুলল।
যুদ্ধের প্রস্তুতির মাঝেও পরিবারের ভালোবাসা আর উষ্ণতা যেন মনের গভীরে এক শক্তি জোগাচ্ছিল।
প্রকৃতি আজ যেন উদারতা ছড়াচ্ছে। আকাশে মেঘের আনাগোনা, মাঝে মাঝে হালকা বৃষ্টিও। সকালটা আজ যুদ্ধের প্রস্তুতির সাথে দোয়া আর আশা-আশঙ্কার মধ্য দিয়েই কাটছে। এ যুদ্ধ শুধু মাটি বা রাজনীতির জন্য নয়, এটি আত্মার যুদ্ধ, অধিকার আদায়ের সংগ্রাম। তখন বাজে ঠিক ১০:২০ এবং ১০ মিনিট পরই লংমার্চ শুরু করার জন্য সবাই রাজপথে নেমে পড়বে। আমরা জানি না, দিনটি কীভাবে শেষ হবে। তবে এই যুদ্ধের সৈনিক হিসেবে শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাব-মনে আর মানসিকতায় একটি অদম্য স্পৃহা নিয়ে।
সকাল ১০টায় উত্তরার রাস্তায় প্রায় দুইশত ছাত্র-জনতা নামলে পুলিশ তাদের সরে যেতে বলে, তবে কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেয়নি। ১০:৪৫ নাগাদ রাস্তার পূর্ব পাশে কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালের সামনে প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থী এবং মেইন রোডের পশ্চিম পাশে বিএনএস টাওয়ারের পাশে সাতশতাধিক পেশাজীবী জমায়েত হতে শুরু করে। স্লোগানে স্লোগানে উত্তরা এলাকা প্রকম্পিত হয়ে ওঠে।
কিছু শিক্ষার্থী এসে জানতে চায়, উত্তরা স্পট থেকে তাদের গন্তব্য কোথায় হবে। আমরা তখনও কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিইনি-কারণ আমাদের কাছে নির্দেশনা ছিল উত্তরাতে অবস্থান করা কিন্তু উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তা সম্ভব হবে না এবং সংশ্লিষ্ট কারো সাথেও যোগাযোগ করতে পারছিলাম না। সকাল ১১টায় ছাত্র-জনতা রাস্তায় নেমে আসে। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর ছোট ছোট ব্যারিকেড সরাতে শিক্ষার্থীরা ছুটে চলে। সেনাবাহিনী অ্যাকশন মুডে থাকার আশঙ্কা ছিল, তবে বিভিন্ন দিক থেকে আসা মিছিল আমাদের সাথে যুক্ত হতে দেখে আশ্বস্ত হলাম।
মিছিলের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে, পাঁচ মিনিটের মধ্যেই প্রায় ৭-৮ হাজার ছাত্র-জনতা শামিল হয়ে যায়। সেনাবাহিনীর নীরব ভূমিকা দেখে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলাম। কারণ এতক্ষণে যদি তারা কোনো পদক্ষেপ নিত, পরিস্থিতি আরও বিশৃঙ্খল হয়ে যেত। তবে তাদের নিরপেক্ষতা আমাদের সাহস জুগিয়েছে।
আমরা মিছিল পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে দেখতে পেলাম, সামনের সারির ছাত্রজনতা প্রায় এক কিলোমিটার এগিয়ে গেছে আর পেছনে আরও প্রায় এক কিলোমিটার লম্বা মিছিল। নতুন মোবাইল নম্বর ব্যবহার করলেও, রাজধানীর বাইরে থেকে কিছু কিছু কল পাচ্ছিলাম; যা থেকে বুঝতে পারছিলাম সারা দেশের মানুষই রাজধানীর দিকে নজর রাখছে। যখন সবাইকে জানাচ্ছি, সেনাবাহিনী নিরপেক্ষ অবস্থানে রয়েছে এবং কখনো কখনো ছাত্রদের সাথে মুলাকাত করছে, সবাই আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করল।
তবে আমরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লাম। কারণ, আমাদের উত্তরায় অবস্থান করার নির্দেশনা ছিল, অথচ আমরা ইতোমধ্যেই ৫ কিলোমিটার অতিক্রম করেছি। আমাদের পরিস্থিতি বুঝিয়ে পুনরায় সিদ্ধান্ত জানানোর জন্য বলেছি। অবস্থা বিবেচনায় লংমার্চ অব্যাহত থাকবে বলে পুনরায় সিদ্ধান্ত পেলাম। আল্লাহর কাছে আবারও শুকরিয়া জানালাম। লংমার্চ চলমান থাকার সিদ্ধান্ত পেয়ে মনে হচ্ছিল, নতুন এক সূর্য উদিত হচ্ছে, যার নাম হবে প্রকৃত স্বাধীন বাংলাদেশ। লংমার্চের অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বিশ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
সবচেয়ে আনন্দ পেয়েছিলাম তখন, যখন সাংবাদিকরা রিপোর্ট করছিল, উত্তরা থেকে প্রায় পঁচিশ হাজার ছাত্রজনতা গণভবনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ডিজিএফআই জানিয়েছে, উত্তরা থেকে ছাত্র-জনতা ৩০ মিনিটের মধ্যেই গণভবনে পৌঁছে যাবে এবং কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকেও গণভবন অভিমুখে ছাত্র-জনতা যাত্রা শুরু করেছে। তখন সময় ছিল দুপুর ১টা ২০ মিনিট, এর কিছুক্ষণ পরেই শুনতে পেলাম স্বৈরাচার শেখ হাসিনা ভারত পালিয়ে গিয়েছেন; যা ছিল অবিশ্বাস্য।
আরও পড়ুন...