আবু বকরের আকুতি
জুলাই-গল্প রফিক মুহাম্মদ জুন ২০২৬
সুমনের মনটা ভালো নেই। সকাল থেকেই আকাশটা কেমন মেঘলা। রোদের দেখা নেই। তবুও এক অস্বস্তিকর ভ্যাপসা গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা। বোশেখ মাস শেষ হতে যাচ্ছে তবু বৃষ্টির দেখা নেই। প্রকৃতি একেবারে রুক্ষ শুষ্ক হয়ে আছে। প্রকৃতির মতো সুমনের মেজাজটাও আজ রুক্ষ। কিছুই ভালো লাগছে না। সকাল থেকে তার শুধু আবু বকরের কথা মনে পড়ছে। আবু বকরের আকুতি ভরা কথাগুলো তার কানে বাজছে।
কান্নাঝরা কণ্ঠে সবার কাছে আবু বকরের একি আকুতি। সে বলছে, ‘আপনারা সবাই মিলে এ দেশটাকে সুন্দর করে গড়ে তুলুন। যাতে আর কোনো অন্যায় অবিচার না থাকে। যাতে আর কোনো হানাহানি মারামারি বৈষম্য না থাকে। আমি তো আর এই সুন্দর দেশটাকে চোখে দেখতে পারব না। স্বৈরাচার ঘাতকের বুলেট আমার দু-চোখের দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছে। তবু আমি মহান আল্লার দরবারে শুকরিয়া আদায় করি যে তিনি আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। এই দেশের জন্য তো আবু সাঈদ, মুগ্ধসহ আরও কতশত মানুষ শহীদ হয়েছেন। আমি তো শুধু দুটি চোখ হারিয়েছি। আরও কতজন পঙ্গু হয়েছেন। আমাদের সবার আকুতি, আমরা যেন একটা সুন্দর-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে পারি। দেখতে না পেলেও সবার মুখে যেন শুনতে পারি আমরা ভালো আছি, শান্তিতে আছি।’
আবু বকর একজন কিশোর জুলাই যোদ্ধা। রাজধানী ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকায় মা আর ছোট তিন ভাই-বোনকে নিয়ে তাদের সংসার। বাবা আবু সালেহ একটি কারখানার গাড়ির ড্রাইভার ছিলেন। তিন-চার বছর আগে তিনি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। মা আর তিন ভাই-বোনের সংসার এসে পড়ে চৌদ্দ বছর বয়সের আবু বকরের কাঁধে। হঠাৎ বাবাকে হারিয়ে ওদের জীবনে নেমে আসে অমানিশার ঘোর অন্ধকার। কোনো উপায় না পেয়ে পড়ালেখা ছেড়ে সংসারের দায়িত্ব পালন শুরু করে। যাত্রাবাড়ী তা’মিরুল মিল্লাত মাদরাসার সামনে প্রতিদিন সে আইসক্রিম বিক্রি শুরু করে। মাদরাসার সামনে আইসক্রিম বিক্রি করে পিতৃহীন আবু বকর তার সংসার চালাচ্ছিল। তবে গত ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ছাত্রদের কোটাবিরোধী আন্দোলনে যখন সারা দেশ উত্তাল, তখন রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকার আন্দোলনও ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। এ আন্দোলনে যোগ দেয় আইসক্রিম বিক্রেতা আবু বকর। জুলাইয়ের ২৮ তারিখ তা’মিরুল মিল্লাত মাদরাসার সামনে থেকে ছাত্র-জনতা মিছিল নিয়ে যাত্রা শুরু করে। সে মিছিলের সামনে থেকে আবু বকর গলা ফাটিয়ে স্লোগান ধরে, ‘কোটা না মেধা/ মেধা মেধা’....। মিছিলটি থানার মোড়ের কাছাকাছি আসতেই পুলিশ হঠাৎ করে দ্রিম দ্রিম আওয়াজে গুলি শুরু করে। মিছিলের সবাই তখন এদিক-সেদিক ছোটাছুটি শুরু করে। অনেকে পুলিশের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। আশপাশের ফুটপাত থেকে ইটের টুকরো কুড়িয়ে নিয়ে পুলিশের দিকে ছুঁড়ে মারে। এতে পুলিশ আরও ক্ষিপ্ত হয়ে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। এ সময় একটা গুলি আবু বকরের বাম চোখের পাশে বিদ্ধ হয়। আবু বকর তখন অচেতন হয়ে রাস্তায় পড়ে যায়। সেখান থেকে মিছিলে আসা কয়েকজন তাকে
ধরাধরি করে পাশের এক ক্লিনিকে নিয়ে যায়। পরে আগারগাঁও চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়। সেখানকার ডাক্তার জরুরি অপারেশন করে তার চোখের কোণে আটকে থাকা গুলি বের করে। তবে এই গুলি চিরতরের জন্য তার চোখের আলো কেড়ে নেয়।
আবু বকরের এই জীবনকাহিনি সুমন গতকাল তার মুখেই শুনেছে। গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে আহত জুলাই যোদ্ধাদের এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠান ছিল। কণ্ঠস্বর নামের একটি আবৃত্তি সংগঠন এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। সুমনের ছোট মামা এ সংগঠনের
একজন সদস্য। ছোট মামার সাথে অনুষ্ঠানে যাওয়ার বায়না ধরে সুমন। ছোট মামা তার বায়না উপেক্ষা করতে পারে না। মিরপুর থেকে
মেট্রোরেলে করে বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশনে নেমে ছোট মামার হাত ধরে হেঁটে চলে সুমন। এ সময় ছোট মামা তাকে জিজ্ঞেস করেন, সুমন, এই যে দেওয়ালে বিভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে, এগুলোকে কী বলে জানিস?
সুমন বলে, এগুলো তো হাতে আঁকা ছবি।
-হ্যাঁ, এগুলো হাতে আঁকা ছবি। তবে এগুলোর আলাদা একটা নাম আছে।
-তাই? কিছুটা অবাক হয়ে সুমন ছোট মামার দিকে তাকায়।
-হ্যাঁ, এগুলোকে বলে গ্রাফিতি। এই যে দেওয়ালে আঁকা আছে, এগুলো হলো জুলাই গ্রাফিতি।
-ও, হ্যাঁ, টিভির খবরে গ্রাফিতির কথা শুনেছি।
-শুধু শুনলে হবে, এ বিষয়ে ভালো করে জানা দরকার বুঝলি? শোন, জুলাই গ্রাফিতি হলো বাংলাদেশে গত দুই হাজার চব্বিশ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে গণঅভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থীদের তৈরি করা দেওয়াললিখন ও শিল্পকর্মের একটি উদ্যোগ। এটি মূলত বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রতিবাদ ও অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যম। যেখানে ছাত্র-ছাত্রীরা নিজেদের অর্থায়নে রং ও তুলি ব্যবহার করে দেওয়ালজুড়ে স্লোগান, প্রতীক ও ছবি এঁকেছে। এর মূল উদ্দেশ্য আন্দোলনের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরা, ন্যায়বিচারের দাবি জানানো এবং একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নকে দৃশ্যমান করা।
-সুমন মুগ্ধ হয়ে দেওয়ালে আঁকা ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে আর ছোট মামার কথাগুলো শুনে।
ছোট মামা বলছে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ‘বুকের ভিতর দারুণ ঝড়/ বুক পেতেছি গুলি কর’, ‘পানি লাগবে পানি’, ‘আমিই বাংলাদেশ’, ‘নাটক করো না পিয়ো’, উই ওয়ান্ট জাস্টিজ, এ রকম স্লোগানে চিত্রসহ নানা রঙে রঙিন হয়ে ওঠে শহরের প্রায় প্রতিটি দেওয়াল। এসব গ্রাফিতিতে ফুটে উঠেছে স্বাধীনতার কথা, রাষ্ট্র সংস্কারের কথা, ফ্যাসিস্ট ও দুর্নীতিবাজদের রুখে দেওয়ার কথা। এই গ্রাফিতির মধ্য দিয়ে আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ওয়াসিম, শান্তসহ আরও যারা শহীদ হয়েছে, তাদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করা হয়েছে।
ছোট মামার সাথে বেড়ানো মানে ছোটখাটো একটা শিক্ষা সফর বলা যায়। আজও এখানে এসে সুমন ছোট মামার কাছে গ্রাফিতি নিয়ে, জুলাই বিপ্লব নিয়ে অনেক কিছু শিখেছে। রাতে বাসায় ফিরে ছাদে যায় সুমন। বৈশাখের আকাশে কোনো তারা দেখা যাচ্ছে না। রাতের তারা ভরা আকাশ দেখতে সুমনের খুবই ভালো লাগে। এই গরমের সময় রাতে লোডশেডিংয়ের সময় প্রায়ই আব্বা-আম্মার সঙ্গে ছাদে আসে। তারা ভরা আকাশ দেখে মুগ্ধ হয়ে। কিন্তু আজ আকাশে কোনো তারা নেই। কেমন যেন এক কালো আঁধারে ঢাকা পুরো আকাশ। সুমনের কিছুই ভালো লাগে না। সে ছাদ থেকে নেমে রুমে গিয়ে শুয়ে পড়ে।
সকালে ঘুম থেকে উঠে আবারও ছাদে যায় সুমন। কিন্তু মেঘলা আকাশ দেখে মনটা তার আরও খারাপ হয়ে যায়। আকাশের দিকে তাকিয়ে সুমনের বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গতকাল সংবর্ধনা দেওয়া আবু বকরের কথা মনে পড়ে। আবু বকরের পৃথিবী তো এমনই অন্ধকারে ঢেকে গেছে। এই পৃথিবীর সৌন্দর্যকে সে আর কোনো দিন উপভোগ করতে পারবে না। তারপরও আবু বকর এ দেশকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে। এ দেশ একটি সুন্দর-সমৃদ্ধ-শান্তিময় দেশ হবে এটাই তার সবার কাছে আকুতি।
আরও পড়ুন...