আবু সাঈদের মা
গল্প আহমদ মতিউর রহমান সেপ্টেম্বর ২০২৬
রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার জাফরপাড়া বাবনপুর গ্রাম। এলাকাটায় এখন বেশ গাছগাছালি। আগে এত গাছ ছিল না। উত্তরের এই জনপদ নদীর পানি শুকিয়ে যাওয়ায় জায়-জঙ্গলে পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। করতোয়া, আখিরা, যমুনেশ্বরী এখানকার নদীর নাম। ওপারে ভারতের অংশে নদীতে বাঁধ দেওয়ায় আগের মতো আর পানি আসে না এসব নদীতে। করতোয়ায় আগের মতো নেই পানির স্রােত। ফলে এলাকাটা যেন মাথা ন্যাড়া জঙ্গল। কারণ গাছ কম। কিন্তু মানুষ বৃষ্টির মৌসুমে কিছু গাছ লাগাতে শুরু করে। কয়েকটি বড় বন্যার পরপর কিছু গাছ তরতাজা পানি পেয়ে বেঁচে থাকে। তারপর থেকে মানুষ কিছু কিছু চারা লাগাচ্ছে। পীরগঞ্জ উপজেলাকে বিল উপজেলা বলা হয়। বিলের পানিতে কিছু গাছও বেঁচে থাকে।
পীরগঞ্জ তিস্তা প্লাবন ভূমিতে অবস্থিত। এর মাটি বালু মিশ্রিত, বেলে দোআঁশ ও এঁটেল দোআঁশ। এই ধরনের মাটি দিয়ে গঠিত সমভূমি, যা উত্তর থেকে দক্ষিণে কিছুটা হলেও ঢালু। ফলে শুষ্ক এলাকা। নামেই বিল। উপজেলার বছরে গড় বৃষ্টিপাত ২১০৬ মিলিমিটার। এগুলো জেলা পরিসংখ্যানের হিসেব। বাস্তবের সাথে মিল অমিল দুটোই আছে। বছরের বেশির ভাগ সময়ই এখানে গরম ও শুকনো আবহাওয়া থাকে। গরমে খুব কষ্ট হয় মানুষের। এপ্রিল থেকে জুন মানে বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ হলো সবচেয়ে গরম মাস। তাপমাত্রা থাকে অনেক।
আবার শীতে উলটো চিত্র। পৌষ মাঘ বা ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি হলো সবচেয়ে শীতল মাস। তখন খুব শীত পড়ে। তাপমাত্রা ১১ ডিগ্রি পর্যন্ত নেমে যায়। শীতে কাতর হয়ে পড়ে মানুষ। শীতের কাপড়ের জন্য থাকে হাহাকার। সূর্যের তাপ থাকলে শীত কিছুটা দূর হয়। কয়েক দিন তো এ সময় সূর্যের দেখাই মেলে না।
জাফরপাড়া বাবনপুর গ্রামেরও একই অবস্থা। কেন এই নাম হয়েছে অন্য অনেকের মতো জানে না সুমি। দেখতে দেখতে সে মাধ্যমিক পাশ করে ফেলেছে। তার মা মনোয়ারাও জানেন না। গ্রামটি অন্য দশটি গ্রামের মতোই। অতি সাধারণ।
আজ গ্রামটিতে যেন অন্যরকম চিত্র। সুমি ও আবু সাঈদের মা মনোয়ারা বেগম। শহীদ আবু সাঈদ। কে চেনে না তাকে? তাদের মাকে? মনোয়ারার মনটা আজ বেশ ছটফট করছে। কেন তা জানা নেই।
ছেলে আবু সাঈদের কারণে সবাই তাকে চেনে। তাকে দেখতে এসেছেন ড. ইউনূস। এটা ২০২৪-এর আগস্ট মাসের কথা।
: কেমন আছেন মা। জানতে চান ইউনূস সাহেব। মা ডাক শুনে কান্না ধরে রাখতে পারেননি মনোয়ারা।
: হামরা কিরুম থাহুম? ছাওয়ালডারে গুললি মারল হাসিনার পুলিশে। আর ফিরত পাইলাম না। এই বলে আবার কান্না।
: মা, আমরা সব বাংলাদেশিরা আপনার ছেলে। বললেন তিনি। তিনি যে সরকারপ্রধান সে কথা ভুলে কান্নাজড়িত কণ্ঠে সান্ত¡না দিলেন।
সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস। তার কথাতে সব হয়। হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর তাকে এই পদে বসিয়েছে সবাই। তাকেই ডাকতার বলেন মনোয়ারা।
ইউনুস বলেন-
: আবু সাঈদ এখন এক পরিবারের সন্তান না। বাংলাদেশের যত পরিবার আছে, তাদের সন্তান। যারা বড় হবে, স্কুল-কলেজে পড়বে, তারা আবু সাঈদের কথা জানবে এবং নিজে নিজেই বলবে, আমিও ন্যায়ের জন্য লড়ব। আবু সাঈদ এখন ঘরে ঘরে।
দিনটি ছিল শনিবার। ১০ আগস্ট ২০২৪। মাত্র চব্বিশ দিন আগে আবু সাঈদ শহীদ হন।
তার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন। ড. ইউনূস হেলিকপ্টারযোগে পীরগঞ্জের জাফরপাড়া বাবনপুর গ্রামে আসেন। সাথে কত লোক।
এত কিছু শুনেও মায়ের মন শান্ত হয় না। হাসিনা পালিয়েছে এটাই বড় সান্ত¡না। তার ছেলেকে হত্যা করেছে হাসিনার লোকেরা আর পুলিশ। আর ভাবতে পারছেন না মনোয়ারা।
২.
আজ ৯ এপ্রিল ২০২৬। ঢাকায় ট্রাইবুনালে আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায় হবে। আবু সাঈদের বাড়ি লোকে লোকারণ্য। জাফরপাড়া বাবনপুর গ্রামের রাস্তাগুলো তত বড় নয়। তবুও রাস্তায়ও লোকের ভিড়।
সময়টা না গরম না ঠাণ্ডা। ফুরফুরে বাতাসেও মনোয়ারার মনটা ফুরফুরে নয়। মনটা ভার হয়ে আছে।
: সাঈদেরও মাও, কী চিন্তা করো? আমার মনে লয় ফাঁসি হবার পারে বেকগুনার। ওরা হুদাহুদিই ছাওয়াডারে গুলি গরছে। বলেন মকবুল হোসেন।
: ঠিকই কইছেন। যদি বিচার না পাই আল্লাহর কাছে বিচার দিম। বললেন মনোয়ারা।
৩.
ছোট ছেলে সাঈদের জন্মের তারিখটা মনে নেই ময়োয়ারার। তবে সালটা মনে হয় বাংলা ১৪০৭ বা ১৪০৮। সাঈদ ছয় ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সবার ছোট। ছোট বলেই মা মনোয়ারার আদর একটু বেশি পেত।
মনে আছে জাফরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেদিন তাকে ভর্তি করতে নিয়ে যাওয়া হয় বাবার সাথে যেতে রাজি হয়নি। বড় ভাইরা গেলেও হবে না। মাকেও যেতে হবে। মা গিয়েছিলেন ।
সেখানেই ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়েছে সাঈদ। ভালো ছাত্র বলে পঞ্চম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়ে উত্তীর্ণ হয় সাঈদ। পরিবারের আনন্দ আর ধরে না। এর পরের লেখাপড়া খালাশপীর ইশকুলে। উচ্চ বিদ্যালয়। মনোয়ারার চোখে সব এখনো ভাসছে। সেই স্কুল, সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট পরে যাওয়া আসা।
সেখান থেকে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়ে এসএসসি পাশ করে। মা তো এত সব বোঝে না। মিষ্টি এনে সাঈদ মাকে বলে-
: হামি ভালো পাশ দিছিরে মাও। নে মিষ্টি খা।
এরপর রংপুর সরকারি কলেজ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে এইচএসসি পাশ করে। ২০২০ সালে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হয়।
পুরোনো আরও কথা মনে পড়ে মনোয়ারার। খুব দুষ্টু ও চঞ্চল ছিল আবু সাঈদ। কিন্তু পড়ার ব্যাপারে তাকে বেশি বলতে হতো না। অনেকগুলো ভাই-বোন ছিল বলে বেশি আবদারও করত না। বড় দুই ভাই আবু হোসেন ও রমজান আলীর মতো ছিল না। আর সুমি ছিল চঞ্চল প্রকৃতির। পিঠেপিঠি ভাই-বোন ওরা দুজন। আবু সাঈদের কাছে ছিল যত তার আবদার। আবু সাঈদ টিউশনির টাকায় বাড়িতে আসার সময় এটা-সেটা আনত। সবার জন্য আনত।
আজ ছোট ছোট সেই ঘটনাগুলো মনে পড়ে যাচ্ছে মনোয়ারার। ছোট ছোট ঘটনা মানে ছোট ছোট দুঃখ। ছোট ছোট দুঃখও বড় দুঃখকে আড়াল করে সামনে আসতে পারে কি? হয়তো পারে। কেন আজ সেগুলো সামনে আসছে? আনমনা হয়ে যান মনোয়ারা।
আবু সাঈদ কলেজ পাশ করার পর বলল আরও পড়বি। বাবা তো মোটেই রাজি না।
: মোক বোধায় ভুলি গেছিস সুমির মাও? বললেন মকবুল। কই দিছলু মোগর আর হরন লাগত না।
: হামার ছাওয়া হরতি চায়। আন্নো না কওক কেনে? বলেন মনোয়ারা। রংপুরের কথার ধরন এ রকমই।
: কায়বা সেদিন কইল, ওই গেরামে একজন হরিছে। এলা কি তার কোনো হিল্লে হইছে?
: কিডা কইছে, মুই কিছুই জানো না!
তারপরও জেদ ধরলো সাঈদ। রংপুর চলে গেল। ভার্সিটিতে চান্সও পেয়ে গেল। ইংলিশ বিভাগ।
মা বললেন-
: অমপুর কি বাড়ির ধারর? কি খাবা কই থাকবা?
সাঈদ হেসে বলল-
: অত ভাবিস কেনে? কত ছাওয়াল হরে অমপুর।
এভাবেই ছেলেটি রংপুর চলে গেল। এই তো সে দিনের কথা।
আবু সাঈদ বাড়ি গেলে মা রাগ করেন-
: তোক দেখপের না পায়া মোর জিউ আউলি গেছিল। কাউয়ে চিলের ন্যাকান ছটপটে বেড়াছু। (তোকে দেখতে না পেয়ে আমার জীবন উলট পালট হয়ে গেছে। মন কাক চিলের মতো ছটফট করে।)
শুনে সাঈদ হেসেছে।
: আর গয়দিন হরের আসিম মাও। ভাবিস না।
কিছুদিন পর ফিরে এসে কাজ করে বাবা মাকে খাওয়াবে, সংসার দেখবে, কত কথা বলত সাঈদ। চাকরি তো আর জুটবে না। চাকরি সব হবে কোটায়। মেধার দাম নেই। তাও তো আর হলো না। কি হয়ে গেল। সব উলট-পালট। ছাওয়াটা চিরদিনের জন্য হাইরে গেল।
এসব ভেবে একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়েন মনোয়ারা।
৪.
জুন মাসে আন্দোলন শুরু হয়ে গেল। চাকরি পাবার আন্দোলন। পড়া শেষ করে তা না হলে চাকরি জুটবে না। চাকরি পাবে কোটায়, মেধার কোনো দাম নেই। না, তা মেনে নেওয়া যায় না। সাঈদও মানল না।
আন্দোলনের জোয়ার এলো রংপুরে। রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সমন্বয়ক হয়ে গেল সাঈদ। প্রতিদিনি মিটিং মিছিল।
কোটা না মেধা? মেধা মেধা।
উই ওয়ান্ট জাস্টিস। আমরা ন্যায়বিচার চাই। লেখা পড়া শেষে কাজ চাই।
এসব স্লোগান।
দেওয়ালে দেওয়ালে লেখা হলো স্লোগান।
এলো জুলাই মাস। আন্দোলন আরও জোরদার। পুলিশ আর সরকারের দোসর ছাত্ররা প্রতিদিনই মারে তাদের। ধাওয়া করে। পিটুনি দেয়।
না ছেলেপুলেরা দমে যাবার পাত্র নয়। তাদের সাথে সাধারণ ছাত্ররা যোগ দিতে থাকে। তারা এখন অনেক জন। মিছিল লম্বা হয়।
ঢাকা থেকে খবর আসে সেখানেও ছাত্ররা জড়ো হয়ে আন্দোলন করছে।
১৬ই জুলাই দিনটি এলো অন্য সব দিনের মতোই।
বাংলা পঞ্জিকায় দিনটি ছিল আষাঢ়ের শেষ দিন। একদিন পরই শুরু হয় শ্রাবণ। সেদিন সকালে রংপুরের আকাশে ঝরছিল বৃষ্টি। কিন্তু অত শত না ভেবে ‘কোটা না মেধা, মেধা মেধা’ স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে উত্তরের শহরটি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আগের দেওয়া কেন্দ্রীয় কর্মসূচির মতে এ দিন বিশাল প্রতিবাদ মিছিলে অংশ নেয় রোকেয়া ভার্সিটির শিক্ষার্থীসহ স্কুল-কলেজের সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা।
খবর এলো ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে বেশ উত্তাপ। ছাত্ররা মাঠে নেমে পড়েছে। নেমে গেছে রাস্তায়।
রংপুরের ছাত্রছাত্রীরাও নামল রাস্তায়।
রোকেয়া ভার্সিটির সামনের রাস্তাটা হয়ে উঠল আন্দোলনের ঘাঁটি।
পুলিশ আর সরকারি দলের ছেলেরা ধাওয়া দিয়ে সরানোর চেষ্টা করে। রাইফেল তাক করে। রইফেলে গুলি ভরা।
আবু সাঈদ সবার সামনে। না সরে যাবে না সে। দূরে পুলিশ রাইফেল তাক করে আছে।
সে ভাবল, তারা তো কোনো অন্যায় করছে না। দাবি জানাচ্ছে। মিছিল করছে। মিছিলে তো নিষেধ নেই।
কয়েকবার ধাওয়া আর পালটা ধাওয়া চলল। দিনটি ছিল মঙ্গলবার ।
সংঘর্ষ শুরু হলে আন্দোলনকারীদের মধ্যে সবার আগে ছিল আবু সাঈদ। অন্যরা একটু পেছনে ছিল। আবু সাঈদের ঠিক সামনে ছিল পুলিশ। অনেক পুলিশ। দেখলেই বুক কাঁপে। কিন্তু আবু সাঈদ নির্ভীক। সে ন্যায়ের পক্ষে লড়াই করছে। সে কাঁপবে কেন? পুলিশ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে।
গুলি করেছে পুলিশ। আর পুলিশের সামনে দুহাত দুদিকে ছড়িয়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল আবু সাঈদ। উলটো দিক থেকে রাবার বুলেট ছুঁড়ছিল পুলিশের সদস্যরা। তারপরও অবস্থান থেকে সরেনি আবু সাঈদ, দাঁড়িয়েই ছিল, তাঁর হাতে ছিল একটি লাঠি। সেই লাঠি দিয়ে রাবার বুলেট ঠেকানোর চেষ্টা করছিল। বহু রাবার বুলেটের মুখে একপর্যায়ে সড়কে বসে পড়ে।
বেলা দুইটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পার্ক মোড়ে গুলিতে আহত হয় সে।
আবু সাঈদের বন্ধু অঞ্জন রায় ছিল পাশে। সে দেখল শরীরে একের পর রাবার বুলেটে ক্ষতবিক্ষত হওয়ার পর মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আবু সাঈদ। তাঁর নাক দিয়ে রক্ত ঝরছিল। এ সময় সংঘর্ষ চলছিল। ফলে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে দেরি হয়। তাঁকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। তবে হাসপাতালে আনার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে চিকিৎসকেরা জানান। তার সঙ্গীরা কান্নায় ভেঙে পড়ে।
আবু সাঈদ হয়তো ভেবেছিল হাত উঁচানো অবস্থায় তাকে গুলি করবে না পুলিশ। কিন্তু তাকে পাখির মতো গুলি করল পুলিশ। ভিডিও করল টিভির সাংবাদিকরা। মুহূর্তে তা প্রচার হয়ে গেল। ২০২৪-এর সফল ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ।
৫.
দেখতে দেখতে দেড় বছর পার হয়ে গেল। বিচার তো পেল না। ডাক্তার সাহেব বলে গেছিলেন বিচার হবে। কই বিচার? ভাবেন মকবুল হোসেন। সাঈদের মাকে তিনি বোঝাতে পারেন না। বলেন-
: হইব বিচাব ভাবিস নায়। আল্লাহ বিচার গরবি।
মনোয়ারা চুপ করে থাকেন। বাড়ির সামনের আমগাছটায় বাতাসের ঝাপটা লাগে। বাতাস যেন কিছু বলতে চায়।
আল্লাহ মুখ তুলে চেয়েছেন। বিচারও হয়েছে। আজ রায় হবে। আজ সেই দিন। আজও আমগাছটায় বাতাসের ঝাপটা। আমের বউল এসছে। বাবনপুর গ্রামে এই ভর দুপুরেও আবু সাঈদের বাড়ি আর কবরের পাশটা লোকে বোঝাই। দিনটি বৃহস্পতিবার। সকাল থেকেই রায়ের জন্য উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষায় ছিল সাঈদের বাবা-মা এবং পরিবারের সবাই। এলাকাবাসীও।
বাজারের দিক থেকে দৌড়ে আসেন প্রতিবেশী জমির আলী। জানালেন খবর।
: ভাউজ, দুইজনের ফাঁসি দিছে গ।
অবাক হন সবাই। মনোয়ারা মকবুলের মুখে কথা সরে না। তারা তো মানতেই পারছেন না। শোকে পাথর হয়ে গেছেন তারা।
মোবাইলে খবর দেখছে মহল্লার কয়েকজন।
আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায়ে দুই পুলিশকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত। বাকি আসামিদের যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদে সশ্রম ও বিনাশ্রম কারাদণ্ড হয়েছে। এমনটাই জানা যাচ্ছে।
খবর শেষ হতে কান্নার রোল পড়ে বাড়িতে। সুমি কাঁদছে। অন্যরা কাঁদছে।
অখুশি মনে আবু সাঈদের কবরের পাশে আসেন মনোয়ারা। বাড়ির পাশেই তাঁর কবর। মকবুল হোসেনও। তাদের সাথে রুহুল আমিন, সাইদের চাচাতো ভাই। সে সামনে থেকে ঘটনাটা দেখেছে। দুঃখ ভরা তার মনেও। কিছুক্ষণ কবরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন মনোয়ারা। হুহু হুহু কান্না তারপর।
: আর কাইন্দো না, কাইন্দে কি হবার পারে সাইদের মাও। এই বলে মকবুলও কান্না ভেজা চোখে হাত ধরেন মনোয়ারার। তা না হলে কখন মাটিতে পড়ে যায়! সাঈদের মৃত্যুর পর মা-বাবা দুজনের স্বাস্থ্যই ভেঙে পড়েছে। তবু চলেন। কথা তেমন বলেন না।
কয়েকজন সাংবাদিক ঘিরে ধরেন তাদের। মনোয়ারা বলেন-
: আমার ছইলের জীবন দিয়া তো কিছুই হইল না। এই বিচারে শাস্তি হয় নাই। মোরও শান্তি হইল না। হামার ছইলের আত্মাও শান্তি পাবার নয়। দুনিয়াত সঠিক বিচার নাই। দুইটা আসামির ফাঁসি দিছে। আরগুলাক ফাঁসি দেয় নাই।
তিনি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠেন। আবার বলেন-
: এলাও অনেকগুলান আসামিক ধরে নাই। মূল আসামি সেগুলাই পালাই গেছে।
: ছাওয়াটারে এইভাবে সবাই মিলে মারল। আর সাজা মাত্র দুই জনের? মকবুল হোসেন অবাক হয়ে বলেন।
: আরও লোকের ফাঁসি হওয়া দরকার ছিল। যে ছেলেটা আমার ছেলেকে গলা টিপে ধরেছিল, তার কঠিন শাস্তি অইল না। আরও কঠিন সাজা দেয়ন দরকার আছিল। বললেন তিনি।
মনোয়ারা কেঁদেই আকুল। তার কান্না থামানো যাচ্ছে না। অনেকক্ষণ ফুঁপিয়ে কাঁদার পর বললেন-
: আমার ছাওয়াডারে যারা মাইরলো অত্যাচার করল তাগোর তো কিছু অইল না।
এই রায় দিয়া আমরা কী গরুম? আমরা খুশি হইত পারলাম না। মোক ছইল অনেক অত্যাচারের শিকার হইছেল। তার বিচার তো পাইলু না।
মেজ ভাই আবু হোসেনের চোখেও পানি। তিনি বললেন-
: আমার ভাইকে যে দুই পুলিশ গুলি করেছে, তাদের মৃত্যুর সাজা হইছে। বাকিদের সাজা অনেক কম। যারা গুল্লি করছে তাগর ফাঁসি হইলেও যারা গুল্লির হুকুম দিলো তাগর ফাঁসি হইল নায়। আশা করছিলাম ন্যায়বিচার পাইম। তা আল পালু নায়।
বিকেল নেমে আসে। বাবনপুর গ্রামে কেমন একটা অশান্তির হাওয়া। কেউ কেউ কান্না থামিয়ে মনোয়ারাকে ভাত খাওয়ানোর চেষ্টা করেন।
কিন্তু তিনি মুখে কিছু তুলতে রাজি হচ্ছেন না। শুধু কেঁদেই যাচ্ছেন।
৬.
ভাই আবু হোসেনের চোখে ভাসে আবু সাঈদের শেষ কথাগুলো। আর শিউরে ওঠে। কী করে এত কঠিন কথা লিখতে পারল তার ছোট ভাইটা আবু হোসেন ভেবে পান না। ১৫ জুলাই উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শামসুজ্জোহাকে উল্লেখ করে ফেসবুকে একটি পোস্ট দেয় আবু সাঈদ : তাতে লেখে-“স্যার! (মোহাম্মদ শামসুজ্জোহা), এই মুহূর্তে আপনাকে ভীষণ দরকার স্যার! আপনার সমসাময়িক সময়ে যারা ছিল সবাই তো মরে গিয়েছে। কিন্তু আপনি মরেও অমর। আপনার সমাধি আমাদের প্রেরণা। আপনার চেতনায় আমরা উদ্ভাসিত।
প্রজন্মে যারা আছেন আপনারাও একসময় মারা যাবেন। কিন্তু যতদিন বেঁচে আছেন মেরুদণ্ড নিয়ে বাঁচুন। ন্যায্য দাবিকে সমর্থন জানান, রাস্তায় নামুন, শিক্ষার্থীদের ঢাল হয়ে দাঁড়ান। প্রকৃত সম্মান এবং শ্রদ্ধা পাবেন। মৃত্যুর সাথে সাথেই কালের গর্ভে হারিয়ে যাবেন না। আজন্ম বেঁচে থাকবেন শামসুজ্জোহা হয়ে। অন্তত একজন ‘শামসুজ্জোহা’ হয়ে মরে যাওয়াটা অনেক বেশি আনন্দের, সম্মানের আর গর্বের।”
আবু হোসেন ভাবেন তার ভাইও কি শামসুজ্জোহার মতো আজন্ম বেঁচে থাকবে? দুই হাত দু-পাশে ছড়িয়ে দিয়ে পুলিশের গুলির সামনে দাঁড়ানো সাঈদের ছবিটা কি তার অসীম সাহসের কথা বলবে?
আরও পড়ুন...