এগিয়ে আসছে ফুটবল বিশ্বকাপ
খেলার চমক আবু আবদুল্লাহ এপ্রিল ২০২৬
এগিয়ে আসছে আরও একটি বিশ্বকাপ ফুটবল। সবকিছু ঠিক থাকলে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদার লড়াইটি এবার শুরু হবে জুন মাসের ১১ তারিখ (যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময়)। এবারের বিশ্বকাপটি অনেক দিক থেকে ব্যতিক্রম। ইতিহাসে এবারই প্রথম বিশ্বকাপের আয়োজক হয়েছে তিন দেশ। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো আর কানাডা। অতীতে দুই দেশে আয়োজনের নজির থাকলেও (জাপান-কোরিয়া ২০০২) তিন দেশ মিলে বিশ্বকাপের আয়োজন এই প্রথম।
তিন দেশের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ১৯৯৪ সালে এককভাবে বিশ্বকাপ আয়োজন করেছিল। মেক্সিকো এককভাবে বিশ্বকাপ আয়োজন করেছিল ১৯৭০ ও ১৯৮৬ সালে। মেক্সিকো প্রথম কোনো দেশ হিসেবে তৃতীয়বার বিশ্বকাপ আয়োজন করতে যাচ্ছে। এই দুটি দেশের সাথে এবার যুক্ত হয়েছে কানাডা-দেশটির প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ ফুটবলের আয়োজক হতে যাচ্ছে।
২০১৮ সালের ১৩ জুন রাশিয়ার রাজধানী মস্কোয় অনুষ্ঠিত ফিফা কংগ্রেসে এবারের বিশ্বকাপের ভেন্যু নির্ধারণ নিয়ে ভোটাভুটি হয়। এতে ১৩৪ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয় যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডার যৌথ উদ্যোগ। এককভাবে আয়োজনে আগ্রহী মরক্কো ভোট পেয়েছিল ৬৫টি।
চার বছর পর বিশ্বকাপ আবার ফিরতে যাচ্ছে জুন মাসে। সাধারণত জুন মাসে আয়োজনের রীতি থাকলেও গত আসরটি (২০২২) শুরু করা হয়েছিল নভেম্বর মাসে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারের প্রচণ্ড গরমের কারণে সেবার জুন মাসের বিশ্বকাপ পিছিয়ে নেওয়া হয় নভেম্বরে।
এবারই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলবে ৪৮টি দেশ। ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স আসরে দেশের সংখ্যা বাড়িয়ে ৩২ করা হয়েছিল। এবার থেকে তা বাড়িয়ে ৪৮ করা হলো। এর ফলে আরও বেশি দেশ বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পাচ্ছে। যা বিশ্বব্যাপী ফুটবলের প্রসার ঘটাতে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছে ফিফা। দেশের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে এবারের বিশ্বকাপে ম্যাচ সংখ্যাও ৬৪ থেকে বেড়ে দাঁড়াবে ১০৪টিতে।
অন্যদিকে ক্রিকেট বিশ্বকাপ এখনো ১০ দলের মধ্যেই আটকে আছে। ২০০৭ সালে দল সংখ্যা বাড়িয়ে ১৬টি করা হলেও পরের আসর থেকেই আবার কমানো হয়। ২০২৭ আসরে খেলবে ১৪টি দল।
যাহোক, ফুটবল বিশ্বকাপ আরও একটি দিক থেকে এগিয়ে আছে। সেটি হলো-এখানে বিশ্বের প্রত্যেক অঞ্চল থেকে কোটার ভিত্তিতে দল নেওয়া হয়। দলগুলোর র্যাঙ্কিংয়ের ভিত্তিতে এই কোটা বরাদ্দ হওয়ার কারণে কারো মধ্যে অসন্তোষ থাকে না। ইউরোপে শক্তিশালী দল বেশি হওয়ায় সবচেয়ে বেশি দল সুযোগ পায় এই মহাদেশ থেকেই। এবারের আসরে ইউরোপ থেকে প্রাথমিকভাবে ১৬টি দল অংশ নিচ্ছে। অবশ্য টুর্নামেন্টের শেষ দুটি কোটা নির্ধারিত হয় আন্তমহাদেশীয় প্লে অফ ম্যাচ থেকে, যে কারণে ইউরোপের আরও দুটি দল বেড়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। আবার অন্য কোনো অঞ্চল থেকেও আসতে পারে সেই দুটি দেশ। এ ছাড়া এএফসি (এশিয়া) অঞ্চল থেকে ৮টি, কনকাকাফ (উত্তর আমেরিকা) অঞ্চল থেকে ৬টি, আফ্রিকা থেকে ৯টি, লাতিন আমেরিকা থেকে ৬টি ও ওশেনিয়া অঞ্চল থেকে একটি দেশ অংশ নিচ্ছে।
বিশ্বকাপের প্রস্তুতি
বিশ্বকাপকে সামনে রেখে দলগুলো পুরোদমে প্রস্তুতি শুরু করেছে এ বছরের শুরু থেকেই। জানুয়ারিতে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ৫০ সদস্যের প্রাথমিক দল ঘোষণা করে প্রস্তুতি শুরু করে। ধীরে ধীরে এটি কমিয়ে চূড়ান্ত ২৩ সদস্যের দল ঘোষণা করা হবে। দলগুলো কে কোথায় বেস ক্যাম্প করবে সেই সিদ্ধান্তও চূড়ান্ত হয়ে গেছে।
যে দেশে বিশ্বকাপ হয় সেই দেশের আবহাওয়ার সাথে মানিয়ে নেওয়ার জন্য দলগুলো সাধারণত দুই-তিন সপ্তাহ আগে বিশ্বকাপ ভেন্যুর আশপাশের কোনো এলাকায় বেস ক্যাম্প করে। খেলোয়াড়দের অনুশীলন ও চূড়ান্ত পরিকল্পনা ঠিক হয় এখান থেকেই।
আর্জেন্টিনা দল তাদের বেস ক্যাম্পের ভেন্যু নির্ধারণ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি অঙ্গরাষ্ট্রের কানসাস সিটিতে। শহরের কম্পাস মিনারেলস ন্যাশনাল পারফরমেন্স সেন্টারে ঘাঁটি গাড়ছে দলটি। বেস ক্যাম্প মানে শুধু অনুশীলন নয়, এটি এক অর্থে টিমের অপারেশনাল হেডকোয়ার্টার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এখানেই দলের সব গুরুত্বপূর্ণ মিটিং, চিকিৎসা, মিডিয়া কার্যক্রম পরিচালিত হয়। বেস ক্যাম্পের পরিবেশ খেলোয়াড়দের মানসিকভাবে চাঙা রাখতে সহায়তা করে বলে দারুণ এই কেন্দ্রটি বেছে নিয়েছে লিওনেল মেসির দল।
এখানে রয়েছে তিনটি ফুল সাইজের প্রাকৃতিক ঘাসের ফুটবল মাঠ, এ ছাড়াও আছে দুটি ফুল সাইজের সিনথেটিক টার্ফ ফুটবল মাঠ। রাতে অনুশীলনের জন্য রয়েছে ফ্ল্যাড লাইট। এ ছাড়া ইনডোরে চিকিৎসা ও জিমনেসিয়াম সুবিধাসহ পৃথিবীর সব আধুনিক সুযোগ-সুবিধা রয়েছে এখানে।
একই শহরের সোপ সকার ভিলেজে বেস ক্যাম্প করবে ইংল্যান্ড দল। এখানে তিনটি প্রাকৃতিক ঘাস ও ছয়টি টার্ফের মাঠসহ সর্বাধুনিক ফুটবল সুবিধা রয়েছে। বিশ^কাপের আরও একটি ফেবারিট টিম তাদের ঘাঁটি গাড়বে এই শহরে। তারা হলো নেদারল্যান্ড। দলটি অনুশীলন করবে কানসাস সিটি কারেন্ট টিমের ফুটবল সেন্টারে।
এ ছাড়া কাতার টিম ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা বারবারায়, অস্ট্রেলিয়া দল ওকল্যান্ডে বেস ক্যাম্প করছে। তবে এই বেস ক্যাম্প করা হয় সম্পূর্ণ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায়। বিশ্বকাপ শুরুর আগে নির্ধারিত সময়ে দলগুলোকে ফিফার নির্ধারিত ফুটবল ভিলেজে উঠতে হবে। সেখানে থেকেই তারা ম্যাচগুলো খেলবে।
আয়োজকদের প্রস্তুতি
বিশ্বকাপ উপলক্ষ্যে যাবতীয় প্রস্তুতি প্রায় শেষ করে এনেছে আয়োজক দেশ তিনটি। তারা বলছে, এবারের বিশ^কাপে ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো ব্যবস্থাপনা ও দর্শকদের জন্য সবচেয়ে আরামদায়ক ফুটবল উপভোগের আয়োজন তারা করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন, লস এঞ্জেলেস, নিউ জার্সি, সান ফ্রান্সিসকো, ফিলাডেলফিয়া, হাউস্টন, ডালাস, মিয়ামি, আটলান্টা, কানসাস, ও শিয়াটল শহরে। মেক্সিকোর মেক্সিকো সিটি, গুয়াদালাজারা, গুয়াদালুপ শহরে এবং কানাডার টরেন্টো ও ভ্যানকুভার শহরে হবে বিশ্বকাপের ম্যাচ।
উদ্বোধনী ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়ামে। আর ফাইনাল হবে নিউ জার্সির মেট লাইফ স্টেডিয়ামে। ৮২ হাজার ধারণ ক্ষমতার এই স্টেডিয়ামটিসহ সব স্টেডিয়াম আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। ফ্যান জোন, মিক্সড জোন, মিডিয়া জোন, খাবার দোকান, গেটে ফেশিয়াল রিকগনিশন এন্ট্রি সিস্টেমসহ সবকিছু প্রস্তুত করা হচ্ছে। এজন্য প্রচুর অর্থ খচর করেছে আয়োজক দেশগুলো। স্টেডিয়াম ছাড়াও শহরগুলোর পরিবহন ব্যবস্থা, খেলোয়াড়দের আবাসন ব্যবস্থা, পর্যটন স্পটগুলোকে আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। নগর কর্তৃপক্ষ বিশ্বকাপ উপলক্ষ্যে আসা বিদেশি দর্শকদের আতিথিয়েতায় কোনো ত্রুটি রাখতে চান না। বিশ্বকাপ উপলক্ষ্যে তৈরি করা হচ্ছে মোবাইল অ্যাপ। যার মধ্যে থাকবে পূর্ণাঙ্গ তথ্য। কোথায় ম্যাচ, স্টেডিয়ামে কীভাবে যেতে হবে, কোথায় খাবার পাওয়া যাবে, আবাসিক হোটেল কোথায়-এমনকি জার্সি কিনতে চাইলে কোথায় যেতে হবে সেটি পাওয়া যাবে অ্যাপে। অনেক শহরে শুধুমাত্র বিশ্বকাপ উপলক্ষ্যে গড়ে তোলা হচ্ছে বিশেষ মেট্রো ট্রেন।
যুক্তরাষ্ট্রের একজন আয়োজক কর্মকর্তা বলেছেন, ফিফা শুধু ম্যাচ আর স্টেডিয়ামকে সুন্দর করছে; কিন্তু প্রতিদিন তো আর ম্যাচ থাকবে না। এই সময় দর্শকরা ঘুরবে, খাবে, কেনাকাটা করবে। কাজেই তাদের জন্য সব আয়োজনই আমাদের করতে হচ্ছে। এবং আমরা এই চেষ্টায় কোনো কমতি রাখছি না।
আরও পড়ুন...