আমাকে বাঁচাও
রহস্যভেদ জুবায়ের হুসাইন জানুয়ারি ২০২৬
(গত সংখ্যার পর)
পাঁচ.
সামনে মোটা একটা গাছ দেখতে পেয়ে আহনাফকে টেনে তার আড়ালে নিয়ে গেল বিপ্লব। ঠোঁটে আঙুল রেখে চুপ থাকতে ইশারা করল। কয়েক মুহূর্ত পরই ওদের ছাড়িয়ো সামনে চলে গেল দুটো ছায়ামূর্তি। ঘুরে গাছের অন্যপাশে চলে গেল ছেলেরা।
পেছন থেকে দেখেও চিনতে কষ্ট হলো না হাসান আর আরিফকে। তাকিয়ে রইল সেদিকে দম প্রায় বন্ধ করে রেখে।
বিপ্লব লক্ষ করল, হাসান ও আরিফ সামনে গিয়েই থমকে গেল। সম্ভবত ওদের দেখতে না পেয়েই এই অবস্থা হয়েছে। মনে মনে একটু হাসল। ভালোই জব্দ করা গেছে তাহলে!
হাসান বলল, ‘হাওয়ায় মিলিয়ে গেল নাকি ব্যাটারা? এত দ্রুত কোথায় গেল?’
আরিফ বলল, ‘বেশি দূরে যেতে পারেনি। আশপাশেই আছে।’
তার কথার সত্যতা প্রমাণ দিতেই যেন গাছের আড়াল ছেড়ে বেরিয়ে এলো বিপ্লব আহনাফকে নিয়ে। বলল, ‘তুমি ঠিকই ধরেছো আরিফ দোস্ত। আমরা এখানেই আছি।’
‘থ’ হয়ে গেল হাসান ও আরিফ।
‘তো-তো-তোমরা!’ তোতলাতে লাগল হাসান। ভাবতে পারেনি বোধহয় বিপ্লবরা তাদের ধরে ফেলবে।
‘অ্যাই,’ তেড়ে গেল আহনাফ। ‘তোমরা আমাদের ওপর নজর রাখছিলে কেন শুনি?’
বিপ্লব থামাল আহনাফকে। বলল, ‘তোমরা নিশ্চয়ই দেখতে চাইছিলে আমরা কী করছি। কিন্তু লুকিয়ে লুকিয়ে কেন? আমাকে বললেই তো আমি জানিয়ে দিতাম।’
আহনাফ চিমটি কাটল বিপ্লবের পিঠে। কেসটার ব্যাপারে সবটা তাদের জানিয়ে দেবে বলে সন্দেহ হলো।
বিপ্লব বুঝতে পেরে হেসে দিলো। বলল, ‘কী জানতে চাও তোমরা? কোনো রহস্যের পেছনে ছুটছি কি না? তাহলো শোনো, রহস্য খুঁজছি আমরা, রহস্য। লম্বা ছুটি। কী করব বলো? সময়টা তো পার করতে হবে, না কি?’
হাসান বলল, ‘স্যরি বিপু, আমরা আসলে...’
তাকে থামিয়ে দিয়ে আহনাফ বলল, ‘কাজটা খুবই অন্যায় করছ তোমরা।’
‘তুমি রেগে যেও না আহনাফ। বিপু ভাইয়ার গোয়েন্দাগিরি সম্পর্কে অনেক শুনেছি তো, তাই তাকে ওভাবে এই এলাকায় দেখে ভাবলাম সে নিশ্চয়ই কোনো রহস্য পেয়ে গেছে এবং সেটারই সমাধানের জন্য ছুটে বেড়াচ্ছে। আমরা সত্যিই খুবই দুঃখিত এবং লজ্জিত।’
‘ঠিক আছে হাসান ও আরিফ।’ পরিবেশটা হালকা করার জন্য বলল বিপ্লব। ‘তোমাদের আমি দোষ দিচ্ছি না। তোমাদের জায়গায় আমি হলেও বোধ হয় একই কাজ করতাম।’
‘আমরা তাহলে এখন যাই।’ বলল আরিফ। ‘ভালো থেকো তোমরা। এসো হাসান।’ বলে হাসানকে নিয়ে চলে গেল।
ওরা চলে যেতেই বিপ্লবকে কাঁকড়ার মতো খপ্ করে বাহু চেপে ধরল আহনাফ। জানতে চাইল, ‘কী দরকার ওদের সাথে কথা বলার? ওরা যদি সবাইকে বলে দেয়?’
‘আরে থামো ভাই,’ আহনাফকে থামানোর চেষ্টা করল বিপ্লব খান। ‘আমরা তো আমাদের কেসের ব্যাপারে কিছুই ওদের বলিনি। কাজেই সবাইকে বলে দেওয়ার মতো কিচ্ছুটি নেই ওদের হাতে।’
তাইতো! শান্ত হলো আহনাফ। কেস সংক্রান্ত কোনো তথ্যই তো ওদের বলেনি বিপু। খালি খালিই উত্তেজিত হয়ে উঠল ও!
সে রাতে আর কিছু ঘটল না। গল্প-গুজব করতে করতে বেশ রাতেই ঘুমিয়ে পড়ল।
পরদিন সকালে খেয়ে দেয়ে আবারও বেরিয়ে পড়ল। দশটার দিকে খোকন নাপিত চুল কাটতে যাবে মাসুমের। ওরা দশটার আগেই কলোনি মোড়ে গিয়ে উপস্থিত হলো। একটু পর এলো খোকন। ওদের দেখে হাসল। তবে মুখে কিছুই বলল না। কাল রাতের ঘটনাটা যেন ভুলেই গেছে! অবশ্য এটা বিপ্লবেরই শিখিয়ে দেওয়া। বিষয়টা যাতে জানাজানি না হয়ে যায়, সেজন্যই এই বাড়তি সতর্কতা।
পাশের একটা চায়ের দোকানে টিভি চলছে। বাংলাদেশ আর দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যে ওয়ান-ডে সিরিজ চলছে। আজ প্রথম ম্যাচ। টস্ জিতে বাংলাদেশকে ব্যাটিংয়ে পাঠিয়েছেন সাউথ আফ্রিকার অধিনায়ক।
চট্টগ্রাম স্টেডিয়ামে সকাল সাড়ে নয়টায় খেলা শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে দুইটি উইকেট পড়ে গেছে বাংলাদেশের। ছয় ওভার দুই বলে মাত্র পনেরো রান তুলতে পেরেছ স্বাগতিক দল।
বেঞ্চে অন্যদের পাশে বসে খেলা উপভোগ করতে লাগল ছেলেরা। এছাড়া আপাতত অন্য কোনো কাজও নেই। খোকন নাপিত ফিরে এলে তবেই পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করা যাবে। তার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
বিপ্লব টিভির পর্দায় চোখ রেখে মনটা উড়িয়ে দিলো অন্যখানে। খোকনকে বলে দেওয়া প্ল্যানটা আরেকবার মিলিয়ে নিল। সব যদি ঠিকঠাক মতো হয়, তাহলে ব্যর্থ হবার কোনো চান্সই নেই।
‘ছক্কাআআআ..’ বলে চিল্লিয়ে উঠল দোকানে বসা কয়েকজন। ভাবনায় ছেদ পড়ল বিপ্লবের। দৃষ্টি ফিরে এলো বাস্তবে। টিভিতে মুশফিকুর রহীমের ছক্কা হাঁকানোটা রিপ্লে করে দেখাচ্ছে। চমৎকার ছয় মেরেছে টাইগারটা। লং অনে দাঁড়ানো ফিল্ডারের অনেকটা ওপর দিয়ে গ্যালারিতে দর্শকদের মাঝে গিয়ে পড়েছে বলটা।
খোকন নাপিতের ফিরে আসতে সাড়ে এগারোটা পার হয়ে গেল। কিন্তু তার চেহারার দিকে তাকিয়ে কিছুই বোঝা গেল না। শঙ্কিত হয়ে উঠল বিপ্লব। তাহলে প্ল্যান মতো কাজটা করতে পারেনি সে?
সেলুনের ভেতরে জিনিসপত্র রেখে ওদের ইশারা করে এয়ারপোর্টের দিকে চলে গেল।
একটু পর বিপ্লব ও আহনাফও গেল সেদিকে।
‘খোকন ভাই, আপনাকে বড্ড চিন্তিত দেখাচ্ছে!’ বিপ্লবের জিজ্ঞাসা।
জবাবে খোকন নাপিত জানাল যে, মাসুমের চুল কাটানোর জন্য তাকে আর যেতে হবে না।
শুনে বিপ্লব বলল, ‘ও। কিন্তু খোকন ভাই, তুমি নিশ্চয়ই এই কারণে চিন্তিত নও? আরও কিছু ঘটেছে, আমি বুঝতে পারছি? মাসুমকে জানাতে পেরেছ কথাটা?’
‘হুঁ, জানিয়েছি। কিন্তু আমার মনটা খারাপ অন্য কারণে।’ একটু থেমে নিজেই আবার মন খারাপের ব্যাখ্যা দিলেন, ‘আজ বিকালে মাসুমের ফুফু আসবেন, ঢাকা থেকে। মূলত সে কারণেই আজ মাসুমের চুল কাটানোর জন্য ডেকেছিল।’
‘সে তো ভালো কথা! এতে আপনার মন খারাপ কেন, সেটা তো বুঝতে পারছি না!’
‘ব্যাপারটা আমার কাছে ভালো ঠেকছে না বিপু। মাসুমের ফুফুর হঠাৎ আসাটা মোটেও ভালো লক্ষণ না। মনে হচ্ছে জটিল কোনো কিছু ঘটেছে বা ঘটছে যাচ্ছে।’
‘কী বিপদের আশঙ্কা করছ তুমি?’
‘মহিলা চলে যাওয়ার পর ছেলেটার ওপর নির্মম নির্যাতন শুরু হবে, এটা আমি নিশ্চিত। সে রকমই শুনে এসেছি আমি।’
‘তুমি কি বুঝতে পেরেছ কী ঘটতে পারে?’
‘কিছুদিন আগেও একবার এসেছিলেন মহিলা। চলে যাওয়ার পরদিনই ছেলেটার ওপর নির্যাতন শুরু হয়। স্কুলও বন্ধ করে দেওয়া হয়।’
বিপ্লব চিন্তায় পড়ে গেল। আহনাফ সেটা খেয়াল করে জিজ্ঞেস করল, ‘কী ভাবছ, বিপু ভাইয়া?’
‘আমাদের আর বেশি সময় নেওয়া ঠিক হবে না।’ জবাব দিলো বিপু। ‘আজ যেহেতু মাসুমের ফুফু আসছেন, আর খোকন ভাইয়ের তথ্য অনুযায়ী তার ওপরে নির্মম নির্যাতন হওয়ার আশঙ্কা আছে, কাজেই যা করার, আগামীকালের মধ্যেই করতে হবে আমাদের।’
‘বিষয়টা যদি এতই জটিল হবে, তাহলে আজই নয় কেন?’
‘কারণ, আজ মাসুমের ফুফু আসছেন। আজ আর তার ওপরে কোনো নির্যাতন হবে বলে আমার মনে হচ্ছে না। ফুফুর সামনে তার ভাইপোকে যতেœর শেষটি করে দেখানো হবে। খোকন ভাইয়ের কথা শুনে সেটাই বোঝা যাচ্ছে। আজকের দিনটা তার জন্য ঈদের দিনের মতো হবে। আচ্ছা খোকন ভাই, মাসুমের ফুফু কতদিন থাকবেন, তা কি কিছু জানতে পেরেছ?’
‘এবার থাকবেন চার-পাঁচদিন, তেমনই বলাবলি করছিল মামুনের মা আর নানি।’ জবাবে বলল খোকন।
বার দুয়েক নিচের ঠোঁটে দাঁত দিয়ে চিমটি কেটে বিপ্লব ওর পরিকল্পনা প্রকাশ করল। বলল, ‘আহনাফ, আগামীকাল সকালেই একটা ক্রিকেট ম্যাচের আয়োজন করো।’
‘এত অল্প সময়ে কি সম্ভব হবে? সবাইকে পাওয়া কষ্টকর হয়ে যাবে।’ আহনাফ তার সংশয়ের কথা প্রকাশ করল।
‘যে কয়জন পাওয়া যাবে, তাদের নিয়েই ম্যাচ হবে।’
‘ঠিক আছে, আমি ব্যবস্থা করছি। তুমি আজ রাতটাও থাকবে তো আমাদের বাড়ি?’
‘কেসটার যতদিন একটা সমাধান না হচ্ছে, ততদিন আছি আমি। মামি নিশ্চয়ই রাগ করবেন না?’
‘আরে দূর! আম্মুকে তুমি এখনও চিনতে পারোনি। তুমি এলে আম্মু খুশিই হন।’
‘খোকন ভাই, তোমার অনেক সময় নিয়ে নিলাম। এখন গিয়ে কাজে মন দাও। প্রয়োজন পড়লে আবারও তোমার সহযোগিতা নেবো আমরা।’ খোকন নাপিতের উদ্দেশে বলল বিপ্লব।
খোকন নাপিত জানাল, ‘মাসুমের কোনো উপকারে লাগতে পারলে আমার খুব ভালো লাগবে। জানিও আমাকে দরকার পড়লে।’ বলে নিজের সেলুনের দিকে হাঁটা ধরল।
খোকন নাপিত চলে যেতেই আহনাফ জিজ্ঞেস করল, ‘কী করবে এখন?’
‘কেসটা যতটা সহজ হবে ভেবেছিলাম, ততটা সহজে মিটবে না। আরও গভীরে যেতে হবে আমাদের।’ রহস্যময়ভাবে কথাটা বলল বিপ্লব। তারপর কী করতে হবে, আহনাফকে বুঝিয়ে দিলো।
প্রশ্ন করবে করবে করেও করল না আহনাফ, বিপু ভাইয়া সিরিজ পড়ে বুঝেছে, এখন পেটে বোমা মারলেও নিজে না চাইলে একটি কথাও বলবে না কিশোর গোয়েন্দা বিপ্লব খান ওরফে বিপু ভাইয়া।
ছয়.
তখন দুপুর পেরিয়ে বিকেল শুরু হয়েছে, এই সময় বেরিয়ে পড়ল বিপ্লব ও আহনাফ। বিপ্লবের সাইকেলের সামনের রডে বসেছে আহনাফের ছোট বোন নামিয়া। ওর বয়স পাঁচ পেরিয়ে ছয়ে পড়েছে। বায়না ধরেছে বিপু ভাইয়ার সাথে ঘুরবে। কলোনির পাশের এয়ারপোর্টের পাশের মাঠটা ছোট একটা পার্ক মতো করা হয়েছে, ওখানে নিয়ে গিয়ে ঘোরাতে হবে। বিপ্লব এক কথায় রাজি হয়ে গেছে। ছোট ছোট বাচ্চারা দু’চোখের মণি। রাসূল (সা)-এর সুন্নত মেনে ও তাদের অত্যন্ত ভালোবাসে। সুযোগ পেলেই একসাথে খেলে।
পার্কটা ইতোমধ্যে মানুষে ভরে গেছে। অল্প দিনেই ছোট বড়ো সব বয়সি মানুষের কাছে প্রিয় হয়ে উঠেছে রানওয়ে পার্কটা। এখানকার বিশেষত্ব হচ্ছে-অনেকগুলো পুরোনো বিমান প্রদর্শনীতে রাখা হয়েছে। কোনো কোনোটার ভেতরেও যাওয়া যায়। ইচ্ছেমতো ছবি তোলা যায়। এ ছাড়া আছে সরু ক্যানেলে নৌকা বাওয়ার ব্যবস্থাও।
অনেক আনন্দ করল ওরা। বিশেষ করে নামিয়া। নামিয়াকে হাওয়াই মিঠাই আর বিশেষ পদ্ধতিতে হাতে তৈরি কোণ আইসক্রিম খাওয়ালো। কোণ আইসক্রিম খেলো বিপ্লব ও আহনাফও। মোটামুটি স্বাদের।
নামিয়া এই মুহূর্তে ডান হাতের আঙুলে রঙবেরঙের একগুচ্ছ বেলুন ধরে ছুটে বেড়াচ্ছে অন্যান্য বাচ্চাদের সাথে। কখনও দোলনায় দোল খাচ্ছে তো পরক্ষণই স্লিপারে উঠে স্লিপ খাচ্ছে। পরক্ষণই ঢেঁকির দু’পাশে দু’জন বসে ওপর-নিচ খেলছে। ছেলেমেয়েদের ছোটাছুটি, খেলাধুলা আর চিৎকার চেঁচামেচিতে মুখরিত হয়ে আছে পার্কটা।
‘বিপু ভাইয়া, কেমন আছ?’ বিপ্লবের পাশে এসে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল তানজিম।
বিপ্লব দেখল, তানজিম একা না, তার সাথে আকাশ ও হাসানুজ্জামানও এসেছে। হেসে জবাব দিলো, ‘আলহামদুলিল্লাহ। তোমরা সবাই কেমন আছ?’ সবার সাথে মুসাফাহা করল।
আকাশ বলল, ‘আমরাও আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি।’
‘মনে মনে তোমাকেই খুঁজছিলাম আমরা।’ এবার কথা বলে উঠল হাসানুজ্জামান। ‘আমরা মাঝে মাঝে বসতে চাই। তোমার আলোচনাটা আমাদের ভালো লেগেছে। অনেক ভেবে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমরা ওই ধরনের বই আরও পড়ব। শুধু নিজেরাই পড়ে ক্ষান্ত হবো না, অন্যকেও পড়তে দেবো এবং সেই অনুযায়ী আমল করব।’
‘হ্যাঁ বিপু ভাইয়া,’ যোগ করল তানজিম। ‘সেজন্য তোমার সহযোগিতা লাগবে আমাদের।’
খুশি হলো বিপ্লব। বলল, ‘এ তো খুবই খুশির কথা! ঠিক আছে, মাঝে মাঝে আমি তোমাদের সময় দেবো। তবে অন্তত একদিন আগে জানাতে হবে আমাকে।’
জোর করে বিপ্লব ও আহনাফকে ঝালমুড়ি খাওয়ালো ওরা। নামিয়াকে একটা প্লেনের খেলনা কিনে দিলো।
পৃথিবী থেকে প্রায় ১৪.৯৬ কোটি কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এবং যেখান থেকে আমাদের এই পৃথিবীতে আলো আসতে আট মিনিট উনিশ সেকেন্ড সময় নেওয়া সূর্যটা পশ্চিম আকাশে একেবারেই ঢলে পড়েছে। পৃথিবীর তুলনায় একশো নয় গুণ অর্থাৎ তেরো লক্ষ বিরানব্বই হাজার কিলোমিটার ব্যাসের এবং তিন লক্ষ তিরিশ হাজার গুণ বেশি ভরের সূর্যটা খানিক বাদেই টুপ্ করে হারিয়ে যাবে পৃথিবীর অপর প্রান্তে। কেন্দ্রভাগে সংঘটিত নিউক্লীয় সংযোজন বিক্রিয়ার মাধ্যমে অবিরাম হাইড্রোজেন পুড়িয়ে হিলিয়াম উৎপাদন করে তাপ-উত্তাপ সৃষ্টি করে সৌরজগতে বিকিরণ ঘটিয়ে কিয়দংশ আমাদের এই ধরায় আপতিত করে সূর্য। কাজটা বারো ঘণ্টার জন্য ওপারে সচল রাখবে। তারপর আবারও ফিরিয়ে আনবে আমাদের সবুজ বাংলাদেশে।
যেহেতু সঙ্গে নামিয়া রয়েছে, তাই আর দেরি না করে ফেরার পথ ধরল।
মামি শোল মাছ দিয়ে লাউ ঝোল এবং কুচো মাছ চচ্চড়ি করেছেন। দুটো তরকারিই বিপ্লবের পছন্দের। তাই খাওয়াটা একটু বেশিই হয়ে গেল। বাধ্য হয়েই গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ খেতে হলো।
‘বিপু, তুমি সারাদিন বাইরে বাইরে থাকছ। কী নিয়ে ব্যস্ত আছ তা জানছি চাইছি না, তবে সাবধানে থেকো।’ খাবার টেবিলে বললেন মামি।
‘তুমি চিন্তা করো না মামি, আমরা সাবধানেই থাকব। আল্লাহ না চাইলে কোনো সমস্যা হবে না ইনশাআল্লাহ।’ অভয় দিয়ে বলল বিপ্লব।
খাওয়া শেষে আহনাফের রুমে ঢুকল ওরা। পিছু পিছু নামিয়াও এলো। ওকে গল্প শোনাতে হবে।
বিছানার ওপরে গোল হয়ে বসল তিনজন।
বিপ্লব গল্প বলা আরম্ভ করল: ‘আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদরের মেয়ে হযরত ফাতেমা রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহা। তিনি শিশু বয়স থেকেই আদর্শ পিতার আদলে গড়ে উঠতে থাকেন। তিনি সবসময় সত্য কথা বলতেন। অত্যন্ত লাজুক, ন¤্র ও সরলমনা ছিলেন নবীর নয়নের মণি। যেমন তুমি তোমার আম্মুর চোখের আলো। সব সময় পিতা আর মাতার কথা মেনে চলতেন। পাড়ার ছেলেমেয়েদের সাথে খেলাধুলা করতেন। কিন্তু অযথা সময় নষ্ট করতেন না। কখনও কারো সাথে ঝগড়া করতেন না। বরং অন্যদের মধ্যকার ঝগড়া খুবই সুন্দরভাবে মিটিয়ে দিতেন। আমাদের নবী তো ছিলেন খুউব গরিব। তাই সব সময় তাঁর ঘরে খাবার থাকত না। সে কারণে কোনোকিছু নিয়ে বায়না করতেন না। তিনি বুঝতে পারতেন, এমনটি করলে আব্বু-আম্মু দু’জনেই খুব কষ্ট পাবেন। তিনি তার পিতার প্রতিটি নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতেন। একদিন তিনি তার আম্মু খাদিজা রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহার কাছে প্রশ্ন করলেন, আচ্ছা আম্মু, আমাকে বলো তো আমাদের আল্লাহ তো সর্বশক্তিমান ও নিরাকার। আখেরাতে কি আমরা তাঁর সাক্ষাৎ পাব? মেয়ের কথা শুনে আম্মু মুচকি হাসি দিয়ে বললেন, বিশ্বপ্রভু আল্লাহ তায়ালা যেমনিভাবে আমাদের চলতে হুকুম করেছেন, তেমনিভাবে যদি আমরা চলি তাহলে আমরা অবশ্যই পরকালে তাঁর দেখা পাব।
নবীদুলালী ফাতেমা রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহার প্রিয় আম্মু মারা গেলে একদিন তিনি কাঁদতে কাঁদতে আব্বুকে জজ্ঞেস করলেন, আব্বু, আপনি জিবরাইল ফেরেশতার নিকট জিজ্ঞেস করে দেখেন আমার মা কেমন আছেন? নবী অন্তরে খুবই ব্যথা পেলেন। আবেগ জড়ানো কণ্ঠে ¯েœহের সুরে সান্ত¡না দিয়ে বললেন, তোমার আম্মুর মতো আম্মু পৃথিবীতে ক’জন আছে বলো? আল্লাহপাক বেহেশতের মধ্যে তোমার আম্মুকে শান্তিতে রেখেছেন। তুমি কান্না না করে আল্লাহর কাছে তাঁর জন্য দু’হাত তুলে দোয়া করবে। আর একদিনের ঘটনা। দয়ার নবী কাবা ঘরে নামাজ পড়ছিলেন। এই সময় একদল খারাপ মানুষ এসে তাঁকে আবোল-তাবোল বলতে লাগল এবং তিনি সিজদায় গেলে একটা উটের নাড়িভুঁড়ি তাঁর মাথার ওপর ঢেলে দিলো। তিনি নাড়িভুঁড়ির চাপে মাথা তুলতে পারছিলেন না। ফাতেমা কাঁদতে কাঁদতে ছুটে এসে আব্বুর মাথার ওপর থেকে নিজের হাতে নাড়িভুঁড়িগুলো ফেলে দিলেন। আর খারাপ পাপী লোকগুলোকে বকতে লাগলেন। লোকগুলো লজ্জা পেয়ে চলে গেল।
আরেকটি ঘটনা বলি তোমাকে। বোনেদের সাথে তিনি এক বিয়েবাড়িতে যাচ্ছিলেন। তার তো ভালো জামাকাপড় ছিল না। তাই ছেঁড়া কাপড়খানা পরেই রওনা দিলেন। বোনেরা তাকে ভালো কাপড় পরে নিতে বললে তিনি বললেন, আমার আব্বু তো সর্বক্ষেত্রে অনাড়ম্বর জীবন-যাপন পছন্দ করেন। তাই ভালো ও নতুন কাপড়ের আমার কোনো প্রয়োজন নেই।
এমনই ছিলেন তিনি। সে জন্যই তো তিনি বেহেশতে সকল নারীর সরদার হবেন!
এতক্ষণ মন দিয়ে বিপু ভাইয়ার গল্প শুনছিল নামিয়া। গল্প শেষ হলেও খানিকক্ষণ কোনো কথা বলল না।
বিপ্লব খেয়াল করল, নামিয়ার চোখজোড়া ছলছল করছে। মুচকি হেসে বোনটাকে বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে আদর করল। মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ‘বেহেশতে তোমাদের সরদার তিনি। কাজেই তার মতোই কিন্তু তোমাকে গড়ে তুলতে হবে। কী, পারবে না নামিয়া?’
নামিয়া চোখ মুছে বলল, ‘অবশ্যই পারব বিপু ভাইয়া। বেহেশতে আমি তার পাশে থাকতে চাই।’ দৃঢ়তা ফুটে উঠল তার কণ্ঠে।
নামিয়ার মনের দৃঢ়তা দেখে খুবই ভালো লাগল বিপুর। মুখ দিয়ে উচ্চারণ করল, ‘আমিন।’
আহনাফ যতো দেখছে তার এই ভাইকে, ততোই অবাক হচ্ছে। কী সুন্দর করে কাহিনিটা গল্পের মতো করে বলল! সিদ্ধান্ত নিল, ও-ও এখন থেকে নিজেকে তৈরি করা আরম্ভ করবে।
নামিয়া ঘুমাতে চলে গেলে আহনাফের একটা খাতা আর কলম টেনে নিয়ে বসলো বিপ্লব। অনেক ভেবেচিন্তে খস্খস্ করে কী সব লিখল।
আহনাফ জিজ্ঞেস করল, ‘কী লিখলে বিপু ভাইয়া?’
‘সেটা কালই জানতে পারবে। আল্লাহ চাহেতো এই লেখাটাই আমাদেরকে মাসুমের কেসটার সমাধান করতে সাহায্য করবে।’ জবাবে বলল বিপ্লব। কাগজটা প্যান্টের পকেটে সুন্দর করে রেখে দিয়ে শুয়ে পড়ল।
‘ফোঁস্’ করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে ওর পাশে শুয়ে পড়ল আহনাফও।
[আগামী সংখ্যায় সমাপ্য]
আরও পড়ুন...