আমাকে বাঁচাও

রহস্যভেদ জুবায়ের হুসাইন ফেব্রুয়ারি ২০২৬

(গত সংখ্যার পর)

সাত.

তানজিম রাজি হয়ে গেল ওদের সহযোগিতা করতে। আহনাফের বন্ধুদের মধ্যে তানজিম ওর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ। কী করতে হবে, তাকে সব বুঝিয়ে বলা হলো।

সবটা শুনে তানজিম চোখে-মুখে দৃঢ়তা এনে বলল, ‘বিষয়টা যদি সত্যিই হয়, তাহলে আমি একশবার রাজি কাজটা করতে। আমিও চাই এর একটা বিহিত হোক।’

খুশি হলো বিপ্লব। আহনাফ বন্ধুর সাথে কোলাকুলি করল।

আজ সব ছেলেরা আসেনি খেলতে। তাই যারা এসেছে তারা দুই দলে ভাগ হয়ে গেল। ভাগ করার সিস্টেমটাও চমৎকার! বিপ্লব দুজনকে ক্যাপ্টেন বানিয়ে দিলো-আহনাফ ও তানজিম। সবাই এতে খুশিই হলো। ওরা দুজন সমান মানের প্লেয়ার। এরপর আহনাফ একজনকে দলে ডাকে তো তানজিম অন্য একজনকে। দুই দলে সাতজন করে প্লেয়ার হলো।

আহনাফ টস্ জিতে তানজিমকে ব্যাটিংয়ের জন্য আমন্ত্রণ জানাল। তানজিমের সাথে ওপেনিংয়ে নামল টুটুল। প্রথম বোলার বিপ্লব। ওয়াইড হলো প্রথম বলটা।

খেলা চলতে থাকল। দুই ওভার পর সাত রান করে আউট হলো টুটুল। ব্যাট করতে এলো মুস্তাক। প্রথম বলেই চার হাঁকাল।

বোলিংয়ে বিপ্লব এবং ব্যাটিংয়ে তানজিম। চোখের ইশারায় তানজিমকে বুঝিয়ে দিলো কী করতে হবে। ‘ওকে!’ তানজিমও চোখের ইশারা করল।

কিছুটা স্লো বল ছুঁড়ল বিপ্লব। সজোরে ব্যাট চালাল তানজিম। ছক্কা! বলটা সরাসরি পাঁচিল টপকে বাড়ির ভেতরে গিয়ে পড়ল। ওখানে ফিল্ডিংয়ে ছিল আহনাফ। পাঁচিলে চড়ে বসল। নিচ থেকে সাহায্য করল বাবু। পাঁচিলের ওপাশে পা ঝুলিয়ে দিয়ে ভেতরটা দেখে নিল একবার। সন্তুষ্ট হয়ে লাফ দিলো ভেতরে।

সবাই অপেক্ষা করতে থাকল আহনাফের বল কুড়িয়ে আনা পর্যন্ত।

বিপ্লবরে বুকের ভেতরটা ‘ঢিবঢিব’ করছে। সফল হবে তো প্ল্যানটা? আহনাফ পারবে কাজটা করতে? মৃদু ঘামের রেখা দেখা দিলো ওর কপাল, কানের পাশ আর ঘাড়ের ওপরে।

রীতিমতো দরদর করে ঘামছে তানজিম। অপলক তাকিয়ে রয়েছে বাড়িটার দিকে।

প্রায় মিনিট পাঁচেক পর লাল টেপ জড়ানো বলটা নিয়ে একমাত্র গেটটা দিয়ে বেরিয়ে এলো আহনাফ। মুখে চিকন হাসি। ক্রমে প্রশস্ত হচ্ছে। বিপ্লব ইশারায় সাবধান করল। আহনাফ চোখমুখের ইশারায় বুঝিয়ে দিলো, ‘ডান!’

পরের বলেই আউট হয়ে গেল তানজিম। তারপরের বলে মুস্তাক। এরপর অল্প রান তুলতেই ছয় উইকেট খোয়ালো তানজিমের টিম। মাত্র আটচল্লিশ রানের টার্গেট দিলো আহনাফের দলকে।

ব্যাটিংয়ে নামল বিপ্লব ও আশিক। প্রথম বলে এক রান নিলো আশিক। ব্যাটিংয়ে এখন বিপ্লব। তানজিমের দ্বিতীয় বলে আউট হয়ে গেল ও। শর্ট অনে ক্যাচ দিলো।

খেলা আর বেশিদূর এগোল না। তেত্রিশ রান তুলতেই অল আউট হলো আহনাফের টিম। দ্রুত খেলা শেষ হয়ে গেল। আসলে এখন আর খেলার দিকে মন নেই বিপ্লব, আহনাফ আর তানজিমের।

খানিকক্ষণ গল্পগুজব করে বিদায় নিল বাকিরা-বিপ্লব, আহনাফ আর তানজিম বাদে।

মাঠের মাথায় গিয়ে সবুজ ঘাসের ওপরে বসে পড়ল সাইকেলগুলো পাশে দাঁড় করিয়ে রেখে।

আহনাফ জানাল সে কী করে এসেছে-বিশাল উঠানে তখন কেউ ছিল না। বাড়ির মেয়েরা রান্নাঘরে ব্যস্ত ছিল। শুধু মামুন বাইরে থেকে আসা বলটা নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখছিল। ইশারায় ওকে কাছে ডেকে জিজ্ঞেস করে মাসুমকে কোন ঘরে আটকে রাখা হয়েছে। মামুন হাত দিয়ে দেখিয়ে দিলো। মাসুম ঘরের মধ্যে আটক নয়; বরং বারান্দায় খাটে বসে পিঠা খাচ্ছে। ফুফু নিয়ে এসেছেন।

কাছে এগিয়ে যায় আহনাফ। আস্তে করে অনুচ্চ স্বরে বলে, ‘বপু পাঠিয়েছে আমাকে।’ চকচক করে ওঠে ছেলেটার চোখ। এরপর একটা কাগজ ওর শার্টের বুক পকেটে ঢুকিয়ে দিয়ে বলে, ‘ঘরে গিয়ে দরজা আটকে চুপিচুপি পড়বে। আমরা অপেক্ষা করব তোমার জন্য।’ মাসুম আস্তে করে ঘাড় নাড়ে। তারপর আর দেরি করে না আহনাফ। মামুনকে বলে, ‘স্যরি, বলটা একটু জোরে মেরে ফেলেছে তানজিম। আর যেন না আসে সেদিকে খেয়াল রাখব।’

রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন মাসুমের ফুফু। আগে থেকেই আহনাফকে চেনেন। বললেন, ‘অ্যাই, কেমন আছ তুমি? তোমার মা কেমন আছেন? বসো, পিঠা খেয়ে যাও।’

আহনাফ এককথায় জবাব দেয়। এখন পিঠে খাবে না বলে দ্রুত বেরিয়ে আসে গেটটা দিয়ে।

ও পেছন ফিরলে হয়তো দেখতে পেত রান্নাঘর থেকে মুরব্বি মতো একটা মহিলা কটমট করে ওর দিকে তাকিয়ে আছেন।


আট.

সেদিন আসরের পর রানের মাথার ছোট পার্কটার ভেতের গিয়ে এলোমেলো ঘোরাঘুরি করছে বিপ্লব, আহনাফ এবং তানজিম। কিছুর জন্য যেন অপেক্ষা করছে। ক্রমে অধৈর্য হয়ে উঠছে।

‘ও বোধহয় আসবে না!’ হতাশা ঝরে পড়ল আহনাফের কণ্ঠে।

তানজিম বলল, ‘বাড়ির লোককে ম্যানেজ করতে পারেনি হয়তো।’

বিপ্লব কিছু বলছে না। আশা ছাড়তে রাজি নয় মোটেই। ওর এখনও বিশ্বাস, ছেলেটা আসবেই। এত ব্রেন খাটিয়ে করা প্ল্যানটা মিস করে পারে না। কিছুতেই না!

নিচের ঠোঁটে ঘনঘন চিমটি কেটে চলেছে।

বিকেলটা দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে।

বুকের ভেতরের আশার প্রদীপটাও যেন ক্রমে নিভু নিভু হয়ে আসছে।

পার্কে ঢোকার গেটটার দিকে ঘনঘন তাকাচ্ছে। একই জায়গায় বারবার ঘুরছে তিন কিশোর। থাকছে গেটের সামনের দিকটাতেই।

‘ওই.. ওই যে আসছে!’ গেটের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল আহনাফ।

ঝট করে সেদিয়ে যেন আছড়ে পড়ল বাকি দুইজোড়া চোখ। হ্যাঁ, হ্যাংলা-পাতলা একটা ছেলে গেট দিয়ে প্রবেশ করছে। সাথে একজন ভদ্রমহিলা। তাদের সামনে ছোট আরেকটা ছেলে-মামুন। একরাশ আনন্দ যেন আছড়ে পড়ল তিন কিশোরের চোখেমুখে। প্ল্যান কাজ করেছে!

এগিয়ে গেল ছেলেরা। মহিলার সামনে গিয়ে সালাম দিলো। মহিলা সালামের জবাব দিয়ে বিপ্লবকে দেখিয়ে বললেন, ‘তুমিই নিশ্চয় বিখ্যাত গোয়েন্দা বিপু ভাইয়া? আই মিন বিপ্লব খান?’

বিপ্লব খানিকটা লজ্জামিশ্রিত কণ্ঠে জবাব দিলো, ‘জি, আমার নাম বিপ্লব খান। বিখ্যাত কি না জানি না, তবে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি রহস্যের সমাধান করেছি।’

‘আমি ওর ফুফু।’ রোগা ছেলেটাকে দেখালেন বেশ লম্বা মহিলা।

‘কেমন আছ মাসুম ভাই?’ জিজ্ঞেস করল বিপ্লব।

জবাবে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল ওর দিকে মাসুম। তারপর তাকাল ফুফুর দিকে।

‘চলো, বসা যাক কোথাও।’ বলে ওদের পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেলেন মহিলা।

মহিলাকে অনুসরণ করল বাকি সবাই।

নিরিবিলি দেখে এক পাশে গিয়ে বসলো দলটা। মহিলা তার পার্স থেকে টাকা বের করে তানজিমকে দিয়ে বললেন, ‘যাও জাদু, কিছু খাবার কিনে নিয়ে এসো।’

তানজিম টাকাটা নিয়ে উঠে গেল।

‘আমি তোমার চিঠিটা পেয়েই আর দেরি না করে চলে এসেছি।’ বললেন মাসুমের ফুফু, বিপ্লবকে লক্ষ্য করে। ‘ব্যাপারটা আমি আগেই খেয়াল করেছিলাম।’ কথা বলা চালিয়ে গেলেন মহিলা। ‘তাই তোমার চিঠিটা পাওয়ার পর সন্দেহটা দানা বেঁধে উঠল।’

ফুফুকে থামিয়ে দিয়ে প্রশ্ন করে উঠলো আহনাফ, ‘বিপু ভাইয়া আপনাকে চিঠি লিখেছে? কখন? কই, আমি তো কিছু জানি না?’

ওর দিকে তাকিয়ে হাসল বিপ্লব। বলল, ‘প্রথম যেদিন আমাকে বাচাও লেখা চিরকুটা পেয়েছিলাম, সেদিন রাতে আমি যে বাড়ি চলে গিয়েছিলাম, এবং বলেছিলাম যে রাতে আমার গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ আছে, মনে আছে তোমার?’

‘হ্যাঁ, মনে আছে।’ বলল আহনাফ।

‘ওই দিনই আমি শহরে খোঁজ নিয়ে ফুফুর ঠিকানা ম্যানেজ করে কুরিয়ার সার্ভিসে চিঠি লিখে পাঠিয়েছিলাম।’ চিঠি লেখার গোপন রহস্য প্রকাশ করল বিপ্লব।

অবাক হয় আহনাফ। তারপরও সন্দেহ পুরোপুরি দূর হয় না, ‘কিন্তু ফুফুর ঠিকানা পেলে কীভাবে?’

‘মাসুমের বাবা একজন বড় ব্যবসায়ী, সেটা তো তোমার কাছ থেকেই জেনেছিলাম। তাই বাকি কাজটা আমার কাছে মোটেই কঠিন হয়নি।’

চুপসে গেল আহনাফ। কত সামান্য সূত্র থেকেই বড় একটা কার্য সম্পাদন করে ফেলল বিপু ভাইয়া, অথচ ওর মাথায় এসব কিছুই ঢোকেনি। এ জন্যই ও ‘বিপু ভাইয়া’ হতে পেরেছে।

সবার জন্য চটপটি নিয়ে হাজির হলো তানজিম। মেলামাইনের একটা বড় গোল প্লেটকে ট্রে বানিয়ে এনেছে।

সবাই একটি করে চটপটির প্লেট হাতে তুলে নিল কেবল মাসুম নিতে দ্বিধা করতে লাগল। তাকাচ্ছে ফুফুর দিকে। বোঝা যাচ্ছে, ফুফু ওর খুবই প্রিয়!

ফুফু বললেন, ‘চটপটি খা বাবা, আমি জানি তুই অনেকদিন এসব খাবার খাস্নি।’ মাসুমের মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে দিলেন। চোখজোড়া সজল হয়ে উঠল।

বিপ্লব চটপটির অবশিষ্ট প্লেটটা মাসুমের হাতে ধরিয়ে দিলো। মাসুমে হাতটা কাঁপছে। ধরে রাখতে পারছে না চটপটির প্লেট।

বিপ্লব ছেলেটার পাশেই বসেছিল। নিজের প্লেট ঘাসের পরে রেখে মাসুমের প্লেটটা হাতে উঁচু করে ধরে বলল, ‘নাও, আমি ধরছি তোমার প্লেটটা। তুমি খাও।

ছেলেটার জন্য খুবই মায়া হচ্ছে বিপ্লবের। না জানি কত অত্যাচারের ধকল গেছে তার ওপর দিয়ে! কিন্তু আর না, এর একটা বিহিত আজই করতে হবে। চোয়ালজোড়া শক্ত হয়ে উঠল বিপুর। বলল, ‘তুমি আর কোনো চিন্তা কোরো না মাসুম ভাই, তোমাকে আর কিছু বলতে পারবে না কেউ। ’

‘হ্যাঁ মাসুম ভাই,’ যোগ করল আহনাফ। ‘আমরা তোমাকে মুক্ত করতে এসেছি।’

মাসুম চটপটি গিলতে গিয়ে শ্বাসনালীতে বাঁধিয়ে ফেলল। ‘হাইক! হাইক!’ করে হেঁচকি তুলতে লাগলো। তানজিম দৌড়ে চটপটিওয়ালার কাছ থেকে এক গ্লাস পানি নিয়ে এলো।

বিপ্লব বলল মাসুমকে, ‘মাসুম ভাই, তুমি শ্বাস নিয়ে পাঁচ পর্যন্ত গোনো, এরপর শ্বাস ছেড়ে পাঁচ পর্যন্ত গোনো।’ ও যা বলল, মাসুম তাই করল। ‘এবার বড় করে একটা শ্বাস নাও। পনেরো সেকেন্ড ধরে রাখো। এখন আস্তে আস্তে করে ছেড়ে দাও।’

মাসুম তারপরও হেঁচকি তুলতে লাগল।

বিপ্লব এবার মাসুমের মেরুদণ্ড বরাবর ওপরের দিকে হাতের আলতো চাপ দিলো। ঘাড়ের গোড়া থেকে পিঠের নিচের দিকে চাপ দিলো। একসময় হেঁচকি ওঠা বন্ধ হয়ে গেল।

‘একটু ধীরে খাও সোনা!’ বললেন মাসুমের ফুফু।

মাসুম এবার সাবধানে চটপটি খেতে লাগল।

ভীষণ খারাপ লাগছে বিপ্লবের। বুকটা ব্যথায় গুঁড়িয়ে যাচ্ছে। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলালো।

‘আমার ভাইটা একেবারেই খারাপ না।’ একসময় বলে উঠলেন ফুফু। ‘অনেকটা চাপে পড়েই দ্বিতীয় বিয়েটা করেছিল। ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয়েছিল। আমাকে বলেছে সে কথা। বিয়েটা না করলে ভাইয়ের অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যেত। ব্যবসায়িক যশ-খ্যাতি সব শেষ হয়ে যেত। কিন্তু ভাবী বিষয়টাকে সহজভাবে নিতে পারেননি। আসলে প্রচণ্ড মানসিক আঘাতের কারণে তিনি আর স্বাভাবিক হতে পারেননি। ভাইটি আমার অনেক চেষ্টা করেছেন। অনেক বড় বড় ডাক্তার দেখিয়েছেন। কিন্তু ছোটবেলায় যে ‘সুখী মানুষ’ গল্পটিতে পড়েছিলাম-‘মনের মধ্যে অসুখ থাকলে ওষুধে কোনো কাজ হয় না’-সেটাই ঘটল ভাবীর বেলায়। চলে গেলেন ভাবী চিরকালের মতো। মাতৃহারা হলো আমার ভাইপোটা।’ মাসুমের দিকে তাকালেন একবার। ‘আর এই সুযোগে বাড়িতে এসে উঠল ভাইয়ের দ্বিতীয় বউটা।’ মামুনের মাথার চুলে হাত বুলালেন। ‘তাদের পরকিল্পনা বাস্তবায়নের সময় যে হয়ে গেছে! কিন্তু ভাই আমার শক্ত রইলেন। কিছুতেই তাদের পাতা ফাঁদে পা দিলেন না।’

ফুফুকে থামাল আহনাফ। জিজ্ঞেস করল, ‘ফুফু, আপনি তাদের কথা বলছেন। তার মানে মামুনের মা একা নয়!’

‘হ্যাঁ, মামুনের মা একা নয় এর পেছনে।’ জবাব দিলেন ফুফু।

‘আসলে মামুনের নানিই হচ্ছেন আসল মানুষ।’ এবার বলল বিপ্লব।

ফুফু বলে উঠলেন এই কথার পিঠে, ‘আসল মানুষ হচ্ছে মামুনের বড় মামা।’

সবক’টি চোখ এবার ফুফুর দিকে ঘুরে গেল। নিজেকে সামলে জিজ্ঞেস করল বিপ্লব, ‘তার মানে তিনিই আসলে সকল চক্রান্তের মূলে?’

‘মামুনের মা আসলে এসব জানত না।’ জবাবে বললেন ফুফু। ‘মা আর বড় ভাইয়ের চাপাচাপিতে বিয়েতে রাজি হয়েছিল। অবশ্য তাদের প্ররোচনায় পড়ে তাদের প্ল্যান বাস্তবায়নে সঙ্গী হয়। কিন্তু নিজের সন্তান জন্মাবার পর মাতৃত্বের মায়া বুঝতে পেরে মাসুমকেও কাছে টেনে নিতে থাকে। তার বড় ভাই আর ভেবেছিল হয়তো সাময়িকের জন্য এমনটা করছে মেয়েটা। কিন্তু মাসুমের প্রতি মায়ার টানটা বাড়তে থাকলে তারা শঙ্কিত হয়ে ওঠে। তারপর শুরু হয় অন্য মিশন।’

ফুফু দম নেওয়ার জন্য থামতেই বলে উঠল বিপ্লব, ‘মামুনের নানিকে পুশ করা হয় এ বাড়িতে। এবং...’

ফুফু হাসলেন। ‘তুমি বুদ্ধিমান ছেলে। বাকিটাও তাহলে তুমি বুঝতে পেরেছ। ঠিক আছে, তুমিই বলো, ভুল হলে আমি শুধরে দেবো।’

সবার চটপটি খাওয়া শেষ হয়ে গিয়েছিল। একটা ছেলে দুই লিটারের একটা বোতলে পানি নিয়ে এলো। সবার পানি খাওয়া হলে বোতল ও ট্রে-সহ পিরিচ-চামচগুলো নিয়ে চলে গেল।

‘এবং মাসুমের ওপর চলতে থাকে অত্যাচার। বন্ধ করে দেওয়া হয় স্কুল। দিনের পর দিন ঘরে আটকে রেখে খাওয়াদাওয়া সীমিত করে দেওয়া হয়। পুষ্টিকর খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া হতে থাকে ধীরে ধীরে। অনেক সময় দিনের বেলাতেও ঘরটা অন্ধকার করে রাখা হয়।’ সরাসরি মাসুমের চোখের নিচের কালিটার দিকে ইঙ্গিত করল বিপ্লব।

‘কিন্তু এগুলো কেন করা হলো, সেটাই তো বুঝতে পারছি না!’ কথার মাঝে বলে উঠল আহনাফ।

বিপ্লব বা ফুফুর আগেই জবাব দিলো তানজিম, ‘সব কিছু করা হচ্ছে মাসুমের আব্বুর সম্পত্তির জন্য।’

‘মানে!’

‘আমিই বলি শোনো।’ বিপ্লব এগিয়ে এলো আহনাফের প্রশ্নের জবাব দিতে। ‘মূলত সবটা করা হয় মাসুমের বাবা মাহমুদ হাসানের ব্যবসা আর সম্পত্তি হাত করার উদ্দেশ্যে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে থাকে তারা। আর তাদের অন্যায় পরিকল্পনার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করে মামুনের আম্মুকে। কিন্তু মামুনের আম্মু অন্যায়টাকে মেনে নিতে পারেন না। কিংবা বলা যায়, নিজের সন্তানের প্রতি টানটা থেকে মাতৃহারা মাসুমের বেদনাটা বুঝতে পারেন। তার সরল মন বিরোধিতা করতে থাকে। মাসুমকে নিজের ছেলের মতোই ভালোবাসতে থাকেন। কিন্তু এভাবে করলে তো এত দিনের সাজানো প্ল্যান ভেস্তে যাবে! তাই এবার মামুনের নানিকে এ বাড়িতে পাঠানো হলো। এবং নতুনভাবে তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের কাজ চলতে থাকল। মাসুমকে তিলে তিলে মৃত্যুর কোলে ঠেলে দেওয়াই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। আর সেটা করতে পারলেই উত্তরাধিকার সূত্রে পুরো সম্পত্তির মালিক হয়ে যাবে মামুনের মা আর মামুন।’

শিউরে উঠল আহনাফ ও তানজিম। কী সাংঘাতিক! এগুলো তো শুধু নাটক-সিনেমা আর বইয়ের গল্প-উপন্যাসে হয়। বাস্তবেও কি এটা হতে পারে?

‘মানুষ এতটা নির্মম হতে পারে?’ মনের কথাটাই জিজ্ঞেস করল আহনাফ।

‘সম্পত্তির লোভে এত নিষ্ঠুর পরিকল্পনা, এ তো অবিশ্বাস্য!’ তানজিমের গলাটা কেঁপে উঠল।

বিপ্লব বলল, ‘আমি সামান্য যে সময়টুকু পেয়েছি, তাতে খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি যে, মামুনের বড় মামা জমির ব্যবসা করেন। পাশাপাশি তার অন্য একটা ব্যবসাও আছে। জোর করে অন্যের জমি ও সম্পত্তি দখল করে বেশি দামে বিক্রি করে দেন। যেখানে জোর খাটিয়ে কাজ হয় না, সেখানে এই রকমই করেন, যেটা মাসুমের বাবার বেলায় করছেন। আচ্ছা ফুফু, আমরা তাকে পুলিশে ধরিয়ে দিতে পারি না?’

‘আমি সেটা আগেই ভেবে রেখেছি বিপু ভাইয়া। দ্রুতই আমি একটা কেস করব।’ শেষের দিকটা ফুফুর কণ্ঠ বেশ কঠিন শোনাল।

‘সেটা আর দরকার হবে না আপা!’

কথাটা ভেসে এলো পেছন থেকে। মহিলা কণ্ঠ।

সেদিকে তাকাল সবাই।

‘বড় ভাইকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে।’ আবার বললেন মহিলা।

মাসুমের ফুফু উঠে মহিলাকে ধরে ওদের পাশে বসালেন। জিজ্ঞেস করলেন, ‘কখন?’

‘আমি বড় ভাইয়ের অ্যারেস্টের বিষয়টা কনফার্ম হয়েই এখানে এসেছি।’

‘আপনিই তাহলে ফোন করেছেন পুলিশকে?’ জিজ্ঞাসা বিপ্লবের।

‘তাকে আমার ভাই বলে পরিচয় দিতে আমার লজ্জা করছে।’ বলে মাসুমকে কাছে টানলেন।

একটু ভয় পেলেও ফুফুর ইশারায় তার কোলে আশ্রয় নিল মাসুম। আজ কতদিন পর মায়ের আঁচলের গন্ধ যেন বুকে প্রবেশ করল। ‘আম্মু!’ বলে তাকে গভীরভাবে জড়িয়ে ধরে রইল। মামুন তার অন্যপাশ দিয়ে জড়িয়ে ধরল।

‘মাকে আমি কালই বাড়ি পাঠিয়ে দেবো।’ আবার বললেন মামুন-মাসুমের মা। ‘আমি চাই না আমার সংসারে অন্য কেউ এসে নাক গলাক। আমাদের ছোট সংসারটা আমি ঠিক সামলে রাখতে পারব। আমার দুই সন্তানকে নিয়ে আমি সুখের বাগান গড়ে তুলব। সেই বাগানে আর কখনও কোনো দুষ্ট কীট ঢুকতে পারবে না।’ মামুন ও মাসুমের কপালে আদরের চুমু এঁকে দিলো।

কিছুক্ষণ নীরবে কাটল। পুরো বিষয়টা আহনাফ ও তানজিমের কাছে এখনও স্বপ্নের মতো লাগছে।

‘কিন্তু ওই আমাকে বাচাও লেখা চিরকুটটার মানে কী?’ আহনাফের প্রশ্ন।

‘ওটাই তো আমাদেরকে এই রহস্যটার কাছে নিয়ে গেল।’ জবাবে বলল বিপ্লব। ‘মাসুম ভাই, তুমিই বলো, কেন লিখেছিলে ওটা? আর বাইরেই বা পাঠালে কীভাবে?’

মাসুম মায়ের কোলে ওভাবে থেকেই বলল, ‘সেদিন নানি আমাকে ঘরে আটকে রেখে চলে গেলে আমি মাথা ঘুরে পড়ে যাই। অজ্ঞান হয়ে পড়ি। জ্ঞান ফিরতেই দেখি আমার বাম হাতের কনুই থেকে রক্ত ঝরছে। খাটের কোনায় লেগে কেটে গেছে। খুবই ব্যথা করছিল। ঘরে তো কোনো কাগজ ছিল না। তাই খাটের ওপরে চাদরের নিচে বিছিয়ে দেওয়া বিস্কিটের কার্টন থেকে কাগজের টুকরোটুকু ছিঁড়ে নিয়ে তাতে লিখি কথাটা। রাতে ভাত দিতে এসে মামুন পেয়ে যায় কাগজটা। ও নিয়ে বাইরে চলে যায় আমি মানা করার পরও। কিন্তু...’ আর বলতে পারে না মাসুম। থেমে যায়।

মাসুম থামতেই বলে ওঠে মামুন, ‘কাগজটা আমিই বাইরে ফেলে দিই। আমার ভয় হচ্ছিলো, নানি যদি ওটা দেখে ফেলে, তাহলে মাসুমকে খুব মারবে!’

‘আর কাগজটা বাতাসে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে ফেলেছে সরিষার ক্ষেতে।’ বলল বিপ্লব।

‘যাতে করে তোমার হাতে পড়ে,’ কথাটা বলল আহনাফ।

‘এবং তুমি জটিল এই রহস্যের সমাধান করতে পারো।’ কথাটা শেষ করল তানজিম।

মাসুমের লেখা চিরকুটটায় যে একটা বানান ভুল আছে অর্থাৎ বাঁচাও বানানে চন্দ্রবিন্দু ( ঁ) দেওয়া হয়নি, সেটা আর তুলল না ইচ্ছে করেই। এই পরিবেশে ওটা বলা ঠিক হবে না।

পরিবেশটা বেশ হালকা হয়ে গেল।

মামুন তার ভাই মাসুমের হাত ধরে নিয়ে গেল একটা প্লেনের কাছে। সিঁড়িতে নিজে আগে পা রেখে ভাইয়ের দিকে হাতটা বাড়িয়ে দিলো।

এখানে বসে থাকা সবার বুক থেকে যেন বিরাট ওজনের বিশাল একেকটা পাথর নেমে গেল।

[সমাপ্ত]

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ