আমার আব্দুল আহাদ কিছু স্মৃতি

জুলাই-গল্প মোঃ আবুল হাসান আগস্ট ২০২৬

সন্তানকে নিয়ে স্মৃতি লিখতে বসব কখনো ভাবিনি। তাও এমন স্মৃতি, যেখানে আমার ছেলেটা থাকবে কেবল স্মৃতিতে, সামনে এসে আর বলবে না, “বাবা, আমার জন্য কী এনেছ?”

আমার ছোট ছেলে আব্দুল আহাদ। জন্ম ১২ জুলাই ২০২০। আমাদের ঘরের সবচেয়ে ছোট মানুষ, কিন্তু সবচেয়ে বেশি প্রাণচাঞ্চল্যে ভরা। আহাদ আর তার বড় ভাই মেহরাজ হাসান (দিহান)-এই দুই ভাইকে ঘিরেই ছিল আমাদের সংসার, আমাদের স্বপ্ন।

আমি চাকরির কারণে ঢাকায় থাকতাম। কদমতলীর রায়েরবাগে আমাদের বাসা। অফিস শেষে বাসায় ফেরার সময় প্রায় প্রতিদিনই আহাদের একটা না একটা আবদার থাকত। ফোন করে বলত, “বাবা, চিকেন ফ্রাই আনবা, চাউমিন আনবা, চকলেট আনবা।” কখনো খেলনা বাস, কখনো জিপ, কখনো মোটরসাইকেল-ওর ছোট ছোট চাওয়াগুলোই ছিল আমাদের বড় আনন্দের বিষয়।

আহাদ খুব চঞ্চল ছিল। সারাদিন মায়ের পেছনে পেছনে ঘুরত। বাসার এদিক-ওদিক দৌড়াত, খেলনা নিয়ে খেলত। তার মধ্যে ছিল একরাশ সরলতা আর কৌতূহল। আমরা স্বপ্ন দেখতাম, বড় ভাইয়ের মতো একদিন আহাদকেও কুরআনের হাফেজ বানাব। সেই স্বপ্ন নিয়ে কত কথা বলেছি, কত পরিকল্পনা করেছি-কিন্তু কিছু স্বপ্ন আল্লাহ হয়তো নিজের কাছেই রেখে দেন।

২০২৪ সালের জুলাইয়ের সেই দিনটার কথা মনে করতে এখনো বুকের ভেতর কাঁপন ধরে। ১৯ জুলাই। শুক্রবার। আহাদ ঘুমিয়ে ছিল। আমি জুমার নামাজ পড়ে বাসায় ফিরেছি। কিছুক্ষণ পর বাইরে হইচই শুরু হলো। হঠাৎ বিকট শব্দে আহাদের ঘুম ভেঙে গেল। দৌড়ে বারান্দায় এসে বলল, “বাবা দেখো, নিচে মারামারি হচ্ছে!”

আমি আর ওর মা ওর পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। আহাদ আমাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে ছিল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সব বদলে গেল।

হঠাৎ একটি গুলি এসে আমার ছেলের ডান চোখে লাগে। এক মুহূর্ত আগেও যে শিশু কথা বলছিল, দৌড়াচ্ছিল-সে আমার চোখের সামনে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল।

তারপরের সময়গুলো আজও ঝাপসা। তাকে কোলে তুলে হাসপাতালে ছুটে যাওয়া, চিকিৎসার অপেক্ষা, আইসিইউর সামনে দাঁড়িয়ে থাকার মতো ঘটনাগুলো দুঃস্বপ্নের মতো। আমরা বারবার ভেবেছি, আহাদ ফিরে আসবে। কিন্তু ২০ জুলাই রাতে আমার আহাদ চলে গেল। চার বছরের একটি শিশুর জীবন। মাত্র চার বছর নয় দিন। কিন্তু এই অল্প সময়েই সে আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় ভালোবাসা হয়ে উঠেছিল।

আহাদকে আমরা আমাদের গ্রামের বাড়ি পুখুরিয়ায় দাফন করেছি। আমাদের কোনো পারিবারিক কবরস্থান ছিল না। আহাদকে দিয়েই সেই কবরস্থানের শুরু। একজন বাবা হিসেবে এটা কখনো আমার কল্পনায়ও ছিল না, আমার সন্তানের কবর দিয়েই আমাদের পরিবারের কবরস্থানের সূচনা হবে।

অফিস থেকে ফেরার পথে কখনো কখনো মনে হয়, কিছু কিনে নিয়ে যাই। তারপর মনে পড়ে, এখন আর কেউ দরজা খুলে বলবে না, “বাবা, আমারটা এনেছ?”

সন্তান হারানোর কষ্ট ভাষায় বোঝানো যায় না। এ শূন্যতা কেউ চোখে দেখতে পাবে না। কিন্তু প্রতিটি মুহূর্তে এটি অনুভব করা যায়।

আমার আহাদ ছিল নিষ্পাপ একটি শিশু। সে কোনো পক্ষের ছিল না, কোনো আন্দোলনেরও অংশ ছিল না। সে শুধু নিজের বাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। আমি সবার কাছে আমার সন্তানের জন্য দোয়া চাই। আল্লাহ যেন তাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেন। এই দেশ যেন আর কোনো বাবাকে এমন স্মৃতি লিখতে বাধ্য না করে।

[চব্বিশের জুলাইয়ে শহীদ শিশু আব্দুল আহাদের পিতা]

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ