বান্না ও জিফার সাঁতার শেখা
গল্প সোলায়মান আহসান মার্চ ২০২৬
ঈদের এক সপ্তাহ বাকি থাকতে ওরা গ্রামের বাড়ি চলে এসেছে। ওরা মানে বান্না-ওজিফারা। স্কুল ছুটি হয়েছে পনেরো রোজার পর।
ঈদের আগে রাস্তাঘাটের পরিস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। সে কারণে কুতুবউদ্দিন তার স্ত্রী সানজিদার সাথে বান্না-ওজিফা ও কাজের মেয়ে বুলবুলিকে আগেভাগে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। এবার অবশ্য আগে পাঠানোর আরেকটা উদ্দেশ্য আছে। বান্না-ওজিফার সাঁতার শেখা। সাঁতার শেখার জন্য একজন ট্রেইনার ঠিক করা হয়েছে। বান্না-ওজিফাদের সম্পর্কে চাচা। মোমিন চাচা। গ্রামে আসলে চাচা-ফুপুর অভাব হয় না। ম্যালা চাচা-ফুপু পাওয়া যায়। দাদা-দাদির কিন্তু নিজের বংশের তেমন কেউ বাড়িতে থাকে না। কেউ কেউ দেশের বাইরে। শরিক দাবিদার আছে যারা এ বংশেরই তবে অন্য দাদার। তারাই বাড়িটা দেখেশুনে রাখে।
বান্না-ওজিফাদের দাদা বাড়ি টিলার ওপর। বেশ উঁচু টিলা। স্থানীয়রা ‘উঁচা টিল্লা বাড়ি’ বলে থাকে। আরও নাম আছে এ বাড়ির। বান্না-ওজিফার পরদাদারা মশহুর আলেম ছিলেন। যে কারণে ‘মৌলভী সাহেবের বাড়ি’ বলে থাকে বয়স্ক লোকেরা।
বান্না-ওজিফাদের চার চাচা ও তিন ফুপু। তিন চাচা ও দুই ফুপু বিদেশে থাকেন। এক চাচা ও এক ফুপু দেশে। ফুপু সিলেটের গোলাপগঞ্জ আর চাচা সিলেট শহরে। এরা মাঝে মাঝে বাড়িমুখো হয়। কুতুবউদ্দিন দুই ঈদে আসে। কুরবানির ঈদে বাড়িতে একটা আস্ত গরু কুরবানি করে গ্রামে মাংস বিতরণ করে থাকে।
বান্না-ওজিফার দাদাদের আমলের আদি বাড়ির অস্তিত্ব এখন নেই। সেটা ছিল দোতলা কাঠের কারুকার্য খচিত। ছোটবেলায় ওরা দেখেছে। ছবিতে আছে। স্মৃতিতে আছে। একবার প্রচণ্ড ঝড়ে কাঠের দোতলা হেলে পড়ে। বছর দুয়েক গড়ান গাছের খুঁটি দিয়ে ঠেক দিয়ে রাখা ছিল। তারপর পাঁচ ভাইয়ের মিলিত সিদ্ধান্তে কাঠের বাড়ি ভেঙে পাকা বাড়ি বানায়। একতলা ভিক্টোরিয় স্টাইলে সুন্দরভাবে বানিয়েছে। টাইলস দিয়ে যতটা সম্ভব মনোহর করেছে। পাঁচ ভাই মিলে করেছে বাড়িটা। এখন বিদ্যুৎ আছে, সিলিন্ডারে গ্যাসসহ মোটর দিয়ে পানি তোলার মতো আধুনিক সুবিধা রয়েছে বাড়িতে। আগে এসব ছিল না।
বাড়ি দেখেশুনে রাখার জন্য বাড়ির মসজিদের ইমাম হাফেজ সাহেবকে মূল বাড়ির একটু দূরে একটা ঘর করে দেওয়া হয়েছে। ফ্যামিলি নিয়ে থাকেন তিনি।
কুতুবউদ্দিন বাড়ি এলে চাচাতো ভাইদের মেহমান বনে যায়। আদর-আপ্যায়ন তারাই করে। আর গোলাপগঞ্জ থেকে বড় বোন শরীফাও এসে হাজির হয় কখনো।
সেভাবেই এবার ঈদ উপলক্ষ্যে বাড়ি আসা বান্না-ওজিফার। ওদের আব্বু ব্যাংকার। ঈদের ছুটিছাটা কম। একেবারে ঈদের আগের দিন আসতে পারবেন। চাঁদ রাতেও আসতে পারেন।
বান্না-ওজিফাদের বাড়ি বৃহত্তর সিলেট জেলার মধ্যে পড়েছে। সিলেট জেলার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হলো, পাহাড়-পর্বত, হাওর-বিল-নদী-সৌন্দর্যের লীলাভূমি। ওদের বাড়ির পরিবেশ সুন্দর ও মনোহর। ছোট-বড় টিলা, টি-গার্ডেন, নদী, বিল, হাওর, ঝরনা-কী নেই! বান্না-ওজিফাদের বাড়িতে এলে বেড়িয়ে, বাড়ি বাড়ি দাওয়াত খেয়ে মহানন্দে কাটে।
সেভাবেই সময় কাটছিল। এবার বান্না-ওজিফার সাঁতার শেখার পালা। বাড়ির নিচে বিশাল পুকুর। টলটলে পানি, পাকা ঘাট। এক পাশে দাদার আমলের জামে মসজিদ। ওজুর জন্য পুকুরে আরেকটা ঘাট। তবে মসজিদে ওজুর জন্য কল আছে।
পুকুরটা অনেক পুরোনো হলেও পানি পরিষ্কার। এক পাশে বাঁশঝাড়। পুকুরের খানিকটা ছায়াঘেরা। সূর্যের কিরণ পড়ে না। তাই পানি শীতল। সেই পুকুরে হবে সাঁতার শেখার আয়োজন। এর আগেও একবার চেষ্টা হয়েছিল। বান্না এসে পানিতে নামতেই চায়নি। ওজিফা একটু-আধটু শিখে ফেলেছিল। কিন্তু ছুটি শেষ। ঢাকা ফিরে যেতে হলো।
এবার ওদের আব্বুর বড় ভাইয়ের মানে বড় চাচার শালাকে ট্রেইনার হিসেবে আনা হচ্ছে। কুতুবউদ্দিন বলেছে-মোমিন, বান্না-ওজিফাকে সাঁতার শিখিয়ে দিতে পারলে এনাম হিসেবে একটা বাই-সাইকেল পাবে। মোমিনের আগ্রহ তাই প্রবল।
মোমিন স্পোর্টসম্যান। সুইমিংয়ে নামডাক কিনেছে বেশ। জাতীয় পর্যায়ে গেছে। কী সব পদক মেডেল পেয়ে বেশ পরিচিতি পেয়েছে। তাই মোনিকে পাওয়া কম সৌভাগ্যের বিষয় নয়। একদিকে টেকনিক্যালি সে দক্ষ অপরদিকে আত্মীয়। এবার বান্না-ওজিফার সাঁতার শেখা বাকি থাকবে না। মনে মনে কুতুবউদ্দিন ঠিক করে রেখেছে একটা ছোটখাটো অনুষ্ঠান করে মোমিনকে একটা রেসের দামি বাই-সাইকেল হাতে তুলে দেবে। বান্না-ওজিফাকে সাঁতার শেখানোর জন্য।
ক্যালেন্ডার অনুসারে এখন শীতকাল। পৌষের শেষ প্রান্তে। কয়েকদিন পর মাঘ। মাঘের জাড় বাঘের গায়ে। এখনও বাঘের শীতের দেখা পাওয়া যায়নি। পৌষের মাঝামাঝি হাড় কাঁপানো শীত পড়েছিল দিন পাঁচেকের জন্য। ঢাকায় ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নামে। ঢাকার বাইরে সিলেটের শ্রীমঙ্গলে ৮ ডিগ্রি পর্যন্ত নামতে শুনেছে। উত্তরবঙ্গের খবর একই রকম।
ঢাকার শীতে থোরাই কেয়ার! একটা সোয়েটার কিংবা জ্যাকেট চড়ালেই শীত পালাই পালাই। কিন্তু গ্রামের শীত মোটেও ভদ্রসভ্য না-দাঁতে দাঁত ঘষানো ঠক্ ঠক্ শীত যাকে বলে। বান্না-ওজিফাদের বাড়ি আবার হিলিল্যান্ড মানে পাহাড়ি এলাকা। বাঘটাঘও থাকে। চেরাপুঞ্জির কাছে বলে বর্ষাকালে প্রচুর বৃষ্টি হয়। মেঘালয়ের প্রতিবেশী বলে শীতটাও হামলে পড়ে। যাকে বলে ছোটলোকি শীত। কনকনে শীত আর বুনো বৃষ্টির সুনাম আছে এ এলাকার।
শীতের অজুহাত দেখিয়ে বান্না-ওজিফারা পুকুরে নামেনি। পুকুরে নামবে কি গোসলই করেনি। সানজিদা বুলবুলি পুকুরে নেমে সাঁতার কেটেছে। বান্না-ওজিফা ঘাটে বসে সে দৃশ্য দেখেছে। হাততালি দিয়েছে। সবশেষে শরীফ বাড়ির ভাবি রোজিনার পীড়াপীড়ি টানাটানিতে একদিন নামে বান্না। ওজিফা না।
অবশেষে সূর্য ঝিকিমিকি হেসে বান্না-ওজিফদের আমন্ত্রণ জানাল পুকুরে অবগাহন করতে। থুক্কু! সাঁতার শিখতে। বান্না-ওজিফাদের সাঁতার শেখা তো একটা ঘটনা-অবশেষে উৎসবে রূপ নেয়।
রোদ উঠেছে ঝিকিমিকি
খোকা খুকু আও দেখি
সাঁতার কাটি পুকুরে
মনিমুক্তো পুকুরে।
ছড়া আওড়াতে থাকে ওজিফা। ওজিফাকে সবাই স্বভাব কবি বলে স্কুলের বান্ধবীরা।
রোদ উঠেছে বেশ সকাল থেকে। এর আগে কয়েকদিন সূর্য মামা উঠতে এগারোটা বাজাতো। মোমিন সাতসকালে হাজির। আজই বান্না-ওজিফারা পানিতে নামবে। আব্বু দুটো লাইফ জ্যাকেট কিনে দিয়েছেন। মোমিন দুটো লাল টিউব নিয়ে এসেছে। এগুলো ফর্মাল সাঁতার শেখার জন্য। এ ছাড়া মেন্দি চাচা বুনো নারকেল জোড়ায় জোড়ায় বেঁধে পানিতে দুই জোড়া ভাসিয়ে দেন।
বান্না-ওজিফা সাঁতারুদের ড্রেস পরে বেরিয়ে পড়ে। পুকুরঘাটে সানজিদা, বুলবুলি, শরীফ বাড়ির চাচিরা, ভাবিরা, ভাই-বোনেরা ও আশেপাশের বাড়ির ছোট ছেলেমেয়েরা হাজির। একটা উৎসব উৎসব ভাব।
মোমিন খুব সকালে এলেও পানিতে ঝাঁপ দেয় বেলা এগারোটার পর। কিছু সময় একাকী সাঁতার কাটে। সাঁতারের কসরত দেখায়। কোন সাঁতারের কী নাম, কীভাবে কাটতে হয় বুঝিয়ে দেয়। এটা কাটারফ্লাই, এটা ব্যাক-স্ট্রোক, এটা ব্রেস্ট-স্ট্রোক, এটা ফ্রি স্টাইল, এটা সাইড স্ট্রোক-সাঁতার কেটে দেখায়। সবাই উপভোগ করে। হাততালি দেয়। বান্না-ওজিফা খুব মজা পায়। মনে মনে মোমিন চাচার মতো সাঁতারু হবার স্বপ্ন আঁকে।
অবশেষে সেই মহার্ঘ মুহূর্ত উপস্থিত হলো। হাততালির ভেতর বান্নাকে টিউব ধরে পানিতে ভেসে সাঁতার কাটতে পুকুরের মাঝামাঝি নিয়ে গেল মোমিন। কিন্তু বান্না ভয়ে কান্না জুড়ে দেয়। মোমিন তাকে ঘাটে ফিরিয়ে দেয়।
এবার ওজিফার পালা। ওজিফাকেও টিউব ধরে পানিতে ভেসে সাঁতার কেটে কেটে মাঝ পুকুরে নিয়ে যায় মোমিন। ওজিফা কান্নার পরিবর্তে হাসতে থাকে। সবাই করতালি দিতে থাকে। ওজিফাকে দুটো চক্কর দিয়ে ঘাটে রেখে আসে মোমিন।
ভয়টা কমেছে? বান্নাকে জিজ্ঞেস করে মোমিন।
বান্না মাথা নেড়ে জানায়, কমেছে।
চল এবার তোমার দ্বিতীয় রাউন্ড। বান্না টিউব ধরে গা ভাসিয়ে মোমিনের সহায়তায় সাঁতার কাটতে লাগে। ধীরে ধীরে মাঝ পুকুর পর্যন্ত যায়। দুই চক্কর ঘুরেফিরে আসে ঘাটে। বান্না এবার কান্না করেনি।
মোমিন বলল-স্যুটিং প্যাক আপ। আজ এ পর্যন্ত। আগামীকাল আবার সাঁতার শেখা হবে। ঠিক সকাল দশটায়। এই বলে সে ঝাঁপ দিলো পানিতে। আর এতক্ষণ ঘাটে যেসব ছেলেমেয়ে সাঁতার শেখা উপভোগ করছিল, তারা ঝুপঝাপ পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। কে কত বড় সাঁতারু তার প্রতিযোগিতা যেন শুরু হয়ে গেল।
আরও পড়ুন...