বিলুপ্ত আগ্নেয়গিরি ডায়মন্ড হেড
বিজ্ঞান হামিদ আদনান জুন ২০২৬
প্রায় এক মিলিয়ন বছর আগে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতে প্রশান্ত মহাসাগরের বুক চিরে উৎপত্তি হয়েছিল হাওয়াই দ্বীপের। এখানেই রয়েছে আগ্নেয়গিরি ডায়মন্ড হেড। হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে ভোরের আলো ফোটার সময় আগ্নেয়গিরি ডায়মন্ড হেডকে দেখতে এক বিশাল মুকুটের মতো মনে হয়। স্থানীয়দের কাছে এটি লেআহি নামে পরিচিত। যার আক্ষরিক অর্থ টুনা মাছের কপাল।
এটি প্রশান্ত মহাসাগরের তীরে হোনোলুলু শহরের একটি আইকনিক ল্যান্ডমার্ক হিসেবে পরিচিত। এর আকৃতি অনেকটা অর্ধচন্দ্রাকৃতির ঢিবির মতো। এই দ্বীপে যেমন রয়েছে বিস্তৃত জলরাশি, রেইন ফরেস্ট, সারি সারি পর্বত উপত্যকা তেমনি রয়েছে ডায়মন্ড হেড আগ্নেয়গিরি!
আমেরিকার মূল ভূখণ্ড থেকে হাওয়াইয়ের দূরত্ব দুই হাজার তিন শ নব্বই মাইল। জাপান থেকে এর দূরত্ব তিন হাজার আটশ পঞ্চাশ মাইল।
ডায়মন্ড হেড নামের পেছনে রয়েছে একটি মজার গল্প। ১৮২৫ সালে একদল ব্রিটিশ নাবিক এই পাহাড়ের ঢালে কিছু পাথরকে রোদে চিকচিক করতে দেখে সেগুলোকে হীরা ভেবে ভুল করেছিলেন। যদিও পরে দেখা যায় সেগুলো অতি সাধারণ ক্যালসাইট স্ফটিক। সেখান থেকেই ডায়মন্ড হেড নামটি ইতিহাসের পাতায় স্থায়ী হয়ে যায়।
প্রশান্ত মহাসাগরের ওপরে ছোট বড় মাঝারি এবং ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র শত শত দ্বীপ নিয়ে গড়ে উঠেছে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ! মোট ১৩২টি দ্বীপ রয়েছে এখানে। দ্বীপগুলো তৈরি হয়েছে হাজার বছর ধরে। আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতে এদের সৃষ্টি।
ভূতাত্ত্বিকদের মতে, প্রায় ৩ লক্ষ বছর আগে এক প্রলয়ংকরী আগ্নেয় বিস্ফোরণ থেকে এই জ্বালামুখ বা ক্রেটারের জন্ম। তবে এটি এখন সম্পূর্ণ মৃত।
ভূতাত্ত্বিক ভাষায় একে টাফ কোন বলা হয়। ম্যাগমা যখন সমুদ্রের পানির সংস্পর্শে আসে, তখন প্রচণ্ড বাষ্পীয় বিস্ফোরণে ছাই ও পাথর জমাটবেঁধে এই পাহাড় তৈরি হয়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা প্রায় ৭৬২ ফুট।
১৯০৫ সালে মার্কিন সরকার এটি কিনে নেয়। ১৯০৮ সালে হুয়াই দ্বীপের উপকূলীয় প্রতিরক্ষার জন্য মার্কিন সেনাবাহিনী এখানে গড়ে তুলেছিল সামরিক ঘাঁটি ফোর্ট রুজার। পাহাড়ের ভেতর এবং চূড়ায় এখনো পুরোনো সামরিক বাংকার, ভূগর্ভস্থ টানেল এবং কামানের ব্যাটারি দেখা যায়। সৈন্যরা এখান থেকে হাওয়াইয়ান উপকূলে আসা জাহাজ ও নৌযানের গতিবিধি লক্ষ করতেন। তবে যুদ্ধের সময় কখনো কোনো গোলাবর্ষণ করা হয়নি। এখানে ১৯১৭ সালে একটি লাইটহাউস বা বাতিঘরও নির্মাণ করা হয়েছিল।
পর্যটকদের কাছে ডায়মন্ড হেডের প্রধান আকর্ষণ হলো এর হাইকিং ট্রেইল। প্রায় ১.৬ মাইল দীর্ঘ এই ট্রেইল পৌঁছে যায় পাহাড়ের ৭৬২ ফুট উচ্চতায়। চূড়ায় পৌঁছাতে প্রায় ৩০-৪৫ মিনিট সময় লাগে। পর্যটকদের জন্য এটি এই দ্বীপের সবচেয়ে জনপ্রিয় হাইকিং ট্রেইল।
অবাক করা বিষয় হলো দ্বীপটি ধীরে ধীরে এর অবস্থান পরিবর্তন করছে। হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ প্রতি বছর চার ইঞ্চি করে সরে যাচ্ছে জাপানের কাছে। প্যাসিফিক প্লেট এবং পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন এর প্রধান কারণ। প্যাসিফিক প্লেট বিশ্বের দ্রুততম গতিসম্পন্ন প্লেট হিসেবে পরিচিত। এই প্লেটের কারণে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ প্রতিবছর ৩ থেকে ৪ ইঞ্চি জাপানের দিকে সরে যাচ্ছে। অর্থাৎ ২০ বছরের মধ্যে হাওয়াই প্রায় ৫ ফুট জাপানের কাছে চলে আসে। অন্যদিকে, বেশির ভাগ টেকটোনিক প্লেট প্রতি বছর ১ ইঞ্চিরও কম গতিতে অবস্থান পরিবর্তন করে।
এই দ্বীপপুঞ্জ প্যাসিফিক প্লেটের একটি আগ্নেয়গিরির হটস্পট দ্বারা গঠিত। প্লেটটি যত এগিয়ে চলে, ততই নতুন দ্বীপ গঠিত হয় এবং পুরোনো দ্বীপগুলো হটস্পট থেকে দূরে সরে যায়।
ডায়মন্ড হেড কেবল একটি পাহাড় নয় এটি এক অসাধারণ প্রাকৃতিক স্থাপত্য। ১৯৬৮ সালে এটিকে ‘ন্যাশনাল ন্যাচারাল ল্যান্ডমার্ক’ ঘোষণা করা হয়। বর্তমানে এটি ‘ডায়মন্ড হেড স্টেট মনুমেন্ট’ হিসেবে সংরক্ষিত।
আরও পড়ুন...