বিশ্বকাপে বিশ্ব কাঁপে

গল্প মোহাম্মদ লিয়াকত আলী জুন ২০২৬

মাসুম খুব ভীতু ছেলে। কেউ জোরে ধমক দিলে কেঁদে দেয়। স্কুলের খেলাধুলায় সে শুধু হারে। তাই কেউ তাকে খেলায় নেয় না। কিন্তু মনটা খেলতে চায়। সে শুধু দেখে আর হাততালি দেয় বিজয়ী দলের সাপোর্টার হয়ে। মনে মনে গান করে:

আমার টিম জিতিল, হাতে তুড়ি মারিল,

বোকার দল হারিল, হায় হায় করিল!

খেলোয়াড়রা কষ্ট করে খেলে। জিতলে পুরস্কার, হারলে তিরস্কার পায়। কিন্তু সাপোর্টারদের ভাগ্যে কিছু নেই। তবু তাদের ছাড়া খেলা জমে না। মাঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার, ঢোল, বাঁশি-সব মিলিয়ে যেন এক আলাদা উৎসব।

তবে মাসুমের সাপোর্টারি জীবন খুব সুখের ছিল না। খেলা শেষে প্রায়ই শুরু হতো মেঘ ছাড়া বৃষ্টি মানে ইটের বৃষ্টি! সাথে মিষ্টি কমেন্ট: এই চামচিকের বাচ্চা! ঢিল মারার জায়গা পাওনা!

-এমন সান্টিং দেবো, বাব-দাদার নাম ভুলে যাবি!

এসব শুনে মাসুম ভাবত, “খেলা না খেলেই যদি এত কষ্ট, খেললে তো জানটাই যেত!”

এদিকে বিশ্বকাপ-২০২৬ শুরু হতে যাচ্ছে। গ্রামের ভাষায় বিশ্বযুদ্ধ! চায়ের দোকানে তর্ক, হাটে-বাজারে বাজি, কেউ বলে এই দল জিতবেই, কেউ বলে আরেক দল।

একদিকে সুপারস্টার লিওনেল মেসি, অন্যদিকে আরেক সুপারস্টার রোনালদো-যেন আকাশে বজ্রপাতের মতো উত্তেজনা।

মাসুমেরও ইচ্ছে হলো এবার মাঠে গিয়ে খেলা দেখবে। অনেক দিনের সঞ্চয় ভেঙে সে টিকিট কিনল। মনে মনে বলল, “জীবনে এত হারলাম, এবার একটু আনন্দ তো পাই!”

খেলার দিন মাঠ ভরা মানুষ। মাসুম ঢুকে পড়ল দর্শকের ভিড়ে। চারদিকে চিৎকার শোনা যাচ্ছে। পতাকা উড়ছে। এসব দেখে সে এতটাই উত্তেজিত যে, ভুলেই গেল সে ভীতু।

খেলা শুরু হলো। হঠাৎ একসময় গ্যালারিতে ছোটখাটো ঝামেলা বেঁধে গেল। ঠেলাঠেলিতে মাসুম সামনে গিয়ে পড়ে। আর কী আশ্চর্য! গড়াগড়ি খেতে খেতে একেবারে মাঠের ভেতর!

দর্শক চিৎকার করছে, খেলোয়াড়রা অবাক। রেফারি বাঁশি বাজাচ্ছে। মাসুম উঠে দাঁড়িয়ে দেখে-সে গোলপোস্টের সামনে!

এরই মধ্যে বিপক্ষ দল পেনাল্টি পেয়ে গেছে।

সবাই চিৎকার করছে-“এই ছেলেটা কে?”

“গোলকিপার কোথায়?”

আসল গোলকিপার তখন আহত হয়ে বাইরে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়াল-মাসুমকে দাঁড়িয়েই থাকতে হলো গোলপোস্টে!

মাসুম ভাবল, “যা হওয়ার হোক!” চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল।

শট নেওয়া হলো-বল সোজা তার গায়ে লেগে বাইরে!

পুরো মাঠ স্তব্ধ। তারপর বিস্ফোরণের মতো চিৎকার!

দ্বিতীয় পেনাল্টি।

এবার সে ভয়ে ডানে ঝাঁপ দিলো, বল গেল বামে, কিন্তু গোলপোস্টে লেগে ফিরে এলো!

তৃতীয় পেনাল্টি।

সে পড়ে গেল, বল গেল তার পায়ের সাথে লেগে।

এভাবে কয়েকটা শট ঠেকিয়ে দিলো সে, পুরোটাই ভাগ্যের জোরে। শেষে তার দল জিতে গেল।

খেলা শেষে সাংবাদিকরা ছুটে এলো।

-আপনার অনুভূতি কী?

মাসুম একটু ভেবে বলল, ফেইলিউর ইজ দ্য পিলার অব সাকসেস। আমি এতদিন পড়ে পড়েই শিখেছি কীভাবে পড়ে থাকতে হয়!

আরেকজন জিজ্ঞেস করল, আপনার এই সাফল্যের রহস্য কী?

মাসুম গম্ভীর হয়ে বলল, ভয়। আমি এত ভয় পেয়েছিলাম যে বলও ভয় পেয়ে আমার কাছে আসতে চায়নি!

গ্রামে ফিরে সে এখন নায়ক। যে ছেলেকে কেউ খেলায় নিত না, সে এখন “বিশ্বসেরা গোলকিপার” নামে পরিচিত।

বন্ধুরা এসে বলে, তুই কীভাবে পারলি? আমাদের কিছু উপদেশ দে।

মাসুম হেসে বলে, খেলায় জিতার জন্য একজন ট্যারা গোল কিপার ও একজন ট্যারা স্টাইকারই যথেষ্ট। গ্রামাঞ্চলে চোখের এ-ই প্রবলেমকে বলে টেগরা। কোন দিকে তাকিয়ে থাকে, বোঝাই যায় না। ট্যারা গোলকিপার চাইয়া থাকে বাম দিকে, বল ঢুকে যায় ডান দিকে।

জীবন যুদ্ধে বারবার হেরে যাওয়া মাসুম আজ বিশ্বসেরা গোলকিপার। যুদ্ধ জয়ের মহা আনন্দ নিয়ে ঘরে ফিরে মাসুম। ফুর্তির চোটে চিত হয়ে শুয়ে পড়ে। বারবার হেরে যাওয়া মাসুম আজ বিশ্ববিজয়ী।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ