বনের রাত

রহস্য গল্প খন্দকার নূর হোসাইন সেপ্টেম্বর ২০২৬

আজ বিকেল থেকেই আকাশের মুখ ভার। বাড়ি ফিরছে সবাই। কোলাহল থেমে চারদিকে নেমে এসেছে নীরবতা। নিতুলের স্কুলে বিজ্ঞান মেলার আয়োজন ছিল। মেলার কাজ শেষে এখন ফেরার পালা। বন্ধুদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিজের সাইকেলে চেপে বসল। সন্ধ্যা নেমে এসেছে। রাস্তার পাশ থেকে মাগরিবের নামাজ পড়ে আবার রওনা দিলো। মোবাইলে উঠে আছে তিনটি মিসড কল। মা দিয়েছেন। দ্রুত বাড়ি ফিরতে হবে। সাইকেলের প্যাডেলে পায়ের চাপ বাড়ল। লোকালয় পেরিয়ে বনের রাস্তায় ঢুকে পড়ল ও। ঘুটঘুটে অন্ধকার। আধাকিলোমিটার বন পেরিয়ে এসে বুঝল এ রাস্তায় কোনো গাড়ি চলছে না। বনের কোনো গাছ নড়ছে না। একটানা শোনা যাচ্ছে ওর সাইকেলের শনশন শব্দ। মনে হচ্ছে ঝড় আসবে। ঝড়ের আগের নীরবতা এটা। প্যাডেলে পায়ের চাপ আরও বাড়ল।

হঠাৎ কটাস শব্দে সাইকেলের চেন পড়ল। ব্রেক কষে থেমে গেল নিতুল। ঘেমে গেছে। হালকা বাতাসে শান্তির পরশ বুলিয়ে দিলো। তারপরই শুরু হলো মড়মড় শব্দে। পশ্চিম দিকে থেকে তেড়ে আসছে পাগলা ঝড়। চেন তুলে সাইকেলে চেপে বসল ও। বেশিদূর এগোতে পারল না। রাস্তার সামনে বিকট শব্দে ভেঙে পড়ল গাছের ডাল। কোনো কিছুর সাথে ধাক্কা লেগে সাইকেল উলটে পড়ল। গাছের পাতার সরসর শব্দ ভেদ করে কড়াৎ শব্দে বাজ পড়ল। ক্ষণিকের জন্য আলোকিত হওয়া বনের একদিকে ফুটে উঠল বাড়ির অবয়ব।

সাইকেল নিয়ে অনুমানের ওপর বাড়ির দিকে ছুটল নিতুল। ঝড়ের সাথে লড়াই করে বন পেরোনো যাবে না। পেছনে ভাঙছে গাছের ডাল। ঠিক তখনই আকাশ ফেটে বৃষ্টি নামল। যেন বিপদের ষোলোকলা পূর্ণ করে দিলো। ভিজে গেল ও। মাথার ওপর পড়ল গাছের পাতা। চোখের কাছ থেকে পাতা সরিয়ে দিতেই আবার বিজলি চমকাল। ওই তো বাড়িটি দেখা যাচ্ছে। পৌঁছে গেছে নিতুল। বারান্দার পরে দরজাটি আধখোলা। ভেতরে ঢুকে সাইকেলটি দেওয়ালের সঙ্গে রেখে দরজা বন্ধ করল ও।

ঘরজুড়ে ধুলা আর স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। ভাঙা জানালা দিয়ে মাঝে মাঝে বিদ্যুতের আলো ঢুকে পুরো ঘরটিকে মুহূর্তের জন্য সাদা করে দিচ্ছে। মোবাইল বের করে দেখল নেটওয়ার্ক নেই। ব্যাটারিও শেষের দিকে। ভাঙা একটি চৌকির ওপর বসে অপেক্ষা করতে লাগল নিতুল। ভেজা পোশাক গায়ে লেপ্টে অস্বস্তি জোগাচ্ছে। জামা খুলে ফেলল। টর্চের আলোয় খুঁজল। পুরো বাড়িতে কেউ আছে বলে মনে হলো না। ড্রয়িংরুমের পাশের বেড রুমে পুরোনো আলমারিতে কিছু পোশাক খুঁজে পেল ও। এ বাড়ির কোনো কিশোরের হবে। পরে নিল। তোয়ালে দিয়ে মাথাটা মুছল। এখন বেশ সতেজ লাগছে।

বাইরে ঝড় থেমে গেলেও বৃষ্টি থামল না। ঝমঝম করে পড়ছেই। বিছানায় জমা ধুলো ঝেড়ে শুয়ে পড়ল নিতুল। নিজের অজান্তেই ঘুমিয়ে পড়ল। ঘন বন ও পরিত্যক্ত বাড়ির ভয়কে হার মানাল সারা দিনের ক্লান্তি।

গভীর রাত! বৃষ্টি থেমে গেছে। নিতুলের ঘুম ভেঙে গেল। কোনো একটা শব্দে ঘুম ভেঙেছে ওর। দূরে শিয়ালের ডাক শোনা গেল। আবারও নীরবতা। হঠাৎ ঠাস! সদর দরজায় যেন কেউ জোরে থাবা মারল। নিতুল চমকে উঠল। কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করল। আবারও ঠাস! ঠাস! মনে হলো, কেউ বাইরে দাঁড়িয়ে দরজা খুলতে বলছে।

সাহস সঞ্চয় করে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল ও। এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলল। বাইরে কেউ নেই। শুধু বৃষ্টিভেজা বারান্দার ওপারে দুলছে কদমগাছ।

দরজা বন্ধ করে ফিরে আসতেই ওপর তলা থেকে যেন কিছু একটা গড়িয়ে পড়ার শব্দ এলো। এবার ওর বুক ধড়ফড় করতে লাগল। নিজেকে বোঝাল, পাজি বিড়াল দৌড়াদৌড়ি করছে। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পর আবার শব্দ। এবার যেন কারও পায়ের আওয়াজ। ধীরে ধীরে। ধাপ...ধাপ...ধাপ...। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছে কেউ।

নিতুল মোবাইলের টর্চ জ¦ালাল। ক্ষীণ আলোয় সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে রইল। কেউ নেই। ঠিক তখনই আলো নিভে গেল। না, চার্জ আছে। অতিরিক্ত আতঙ্কে নিজেই নিভিয়ে দিয়েছে। আর কোনো শব্দ নেই। শুধু নিজের নিশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। হঠাৎ কানের কাছে ফিসফিস করে কে যেন বলল, ‘পালাও!’

নিতুল ঘুরে দাঁড়াল। কেউ নেই। এটাও হয়তো ওর নিজের বানানো ভয়। ভাবনা শেষ হলো না। বাড়ির পেছন দিক থেকে ধাতব কিছু পড়ে যাওয়ার বিকট শব্দ ভেসে এলো। এত কিছু ¯্রফে মনের ভুল হতে পারে না। নিতুল সিদ্ধান্ত নিল, যাই হোক দেখে আসবে।

পেছনের করিডোর ধরে এগিয়ে একটি ছোট ঘরে পৌঁছাল। দরজাটি বাইরে থেকে মরিচা ধরা শিকল দিয়ে আটকানো। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ভেতর থেকে যেন মৃদু আলো বেরোচ্ছে। ঠিক তখনই আবার সেই থাবার শব্দ। এবার সামনে নয়। তার পেছনের দরজায়। ঘুরে তাকাল ও। কেউ নেই। তবে দরজার নিচে কাদামাখা বড় বড় পায়ের ছাপ। মানুষের নয়, আবার পুরোপুরি কোনো প্রাণীরও নয়। ওর গা শিউরে উঠল। শিকল দেওয়া ঘরের দিকে তাকাল ও। এক মুহূর্ত দ্বিধা করল। তারপর মরিচা ধরা শিকল খুলে ফেলল। দরজা খুলতেই আলো নিভে গেল। ভেতরে একটি ছোট ঘর। এক কোণে পুরোনো কাঠের বাক্স। আর কিছু নেই। বাক্সের ঢাকনায় নতুন আঁচড়ের দাগ। একটানে ঢাকনা খুলে ফেলল ও। ভেতরে দেখতে পেল ব্যাটারিচালিত ছোট স্পিকার। ঠিক তখনই স্পিকার থেকে ভেসে এলো সেই একই ফিসফিসে কণ্ঠস্বর-পালাও!

নিতুল এবার ভয় না পেয়ে অবাক হলো। এটা তাহলে মানুষের কাজ! বাক্সের পাশে খুঁজে পেল একটি থাবা যন্ত্র। এটা দড়ির সাহায্যে কাজ করে। কেউ এ বাড়িতে ঢুকলে দরজায় থাবা দিয়ে ভয় পাইয়ে দেয়। তাহলে ঝড়ের সময় ও কেন এ থাবা শুনতে পেল না? উত্তর নিজেই খুঁজে পেল। ও ঢোকার পর যন্ত্রটা সক্রিয় হতে সময় নিয়েছে। অথবা ঝড়ের শব্দে দরজার থাবা শুনতে পায়নি। যেকোনো কিছু হতে পারে। যেটাই হোক, কেউ একজন চায় না এখানে অন্য কেউ আসুক। ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দিতে চায়। নানা উপায়ে কৃত্রিম ভয়ের পরিবেশ তৈরি করার কারণ এটাই। কিন্তু কেন?

একটি রহস্যের সমাধান হতে সাহস বেড়ে গেল নিতুলের। ওই রুম থেকে বেরোতেই কারো গোঙানির আওয়াজ এলো। নাকি আর্তনাদ? খুবই ক্ষীণ। দরজা বাইরে থেকে আটকানো। জোরে থাক্কা দিলো ও। খুলে গেল। টর্চের আলো গিয়ে পড়ল বিছানায়। একি! ছোট্ট একটি মেয়ে বিছানায় গুটিশুটি হয়ে শুয়ে আছে। বয়স ছয়-সাত হবে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। টর্চের আলোয় মুখ ঢাকল মেয়েটা। মনে হলো ওকে দেখে ভয় পাচ্ছে। ‘এই! কে তুমি? এখানে কী করছ?’

নিতুলের কথার জবাব দিলো না মেয়েটা। তবে উঠে বসেছে। হাঁটু গেড়ে বিছানার পাশে বসে পড়ল নিতুল। ‘ভয় পেয়ো না। আমি নিতুল।’

‘তুমিও নিশ্চয় ওদের লোক!’ চোখ মুছল মেয়েটা।

‘ওদের বলতে? কাদের কথা বলছ তুমি?’

‘যারা আমাকে গতকাল ধরে এনেছে। জানো, আমার বাবা জানলে ওদের আস্ত রাখবে না।’

দ্রুত ভাবনা চলছে নিতুলের মাথায়। মেয়েটা বলল, ‘আমি মিতু। তুমি এখানে কেন এসেছ?’

‘ঝড়ে নিয়ে এসেছে। আটকে পড়েছি।’

বাইরে মানুষের কথাবার্তা শোনা গেল। ‘আজ কেউ ঢুকেছিল মনে হয়।’

‘খুঁজে দেখ!’

নিতুলের শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেল। ভূত নয়-আসল বিপদ মানুষ। ও দ্রুত জানালার ভাঙা অংশ দিয়ে বাইরে তাকাল। দেখল, তিনজন লোক টর্চ হাতে বাড়ির দিকে এগিয়ে আসছে। ‘মিতু, আমাদের এখান থেকে পালাতে হবে। ভয় পেয়ো না। তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দেবো।’

নিতুলের মনে পড়ল পুরোনো একটি ভূগর্ভস্থ নিষ্কাশনপথ দেখেছে এখানে আসার সময়। মিতুকে নিয়ে পাশের রুমে চলে এলো ও। সেই সরু পথ ধরে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে এলো বাড়ির পেছনের বনে। হালকা বৃষ্টি নামল আবার। গাছের পাতা বেয়ে পড়ছে পানি। ভিজে যাচ্ছে ওরা। বাড়ির ভেতরে তখন শোনা গেল দুজন লোকের উত্তেজিত কথাবার্তা। পৌঁছে গেছে লোকগুলো। দাঁড়াল না ওরা। দৌড়ে চলল। রাস্তা কোনদিকে জানা আছে নিতুলের। মেইন সড়কে ওঠার আগে ফিরেও তাকাল না কেউ।

অনেক কষ্টে মূল সড়কে পৌঁছাল ওরা। দুজনই হাঁপাতে হাঁপাতে রাস্তার পাশে বসে পড়ল। বুকের ভেতর যেন এখনো ধুকপুক করছে পেছনে ফেলে আসা পরিত্যক্ত বাড়ির ভয়।

ঠিক তখনই দূরে একটি ক্ষীণ আলো দেখা গেল। মুহূর্তে আলোটি বড় হতে লাগল। নিস্তব্ধ বন কাঁপিয়ে ভেসে এলো ভারী ইঞ্জিনের গর্জন। উৎকর্ণ হয়ে তাকাল নিতুল আর মিতু। গাড়িটি যতই কাছে আসছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে তার অবয়ব। ক্যাবটা হলুদ নয়। মানে এটি কোনো সাধারণ ট্রাক নয়। জলপাই-সবুজ ক্যামোফ্লেজ রঙে মোড়া বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি ট্রাক। এক মুহূর্তও দেরি করল না নিতুল। মিতুর হাত শক্ত করে ধরে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে দু-হাত উঁচু করে নাড়তে লাগল। ট্রাকের হেডলাইটে আলোকিত হয়ে উঠল তাদের ক্লান্ত, কাদামাখা মুখ। কয়েক সেকেন্ড... তারপর তীক্ষè ব্রেকের শব্দ। ট্রাকটি থেমে গেল।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ