বৃত্তির জ্যাকেট
অনুবাদ গল্প মূল : মার্থা সালিনাস | অনুবাদ : রিয়াজ মোরশেদ সায়েম মে ২০২৬
আমি যে ছোট্ট টেক্সাসের স্কুলটিতে পড়তাম, সেখানে অষ্টম শ্রেণির বিদায় অনুষ্ঠানে একটি বিশেষ প্রথা ছিল। প্রতি বছর ক্লাসের সর্বোচ্চ ফলাফলধারী শিক্ষার্থীকে দেওয়া হতো সোনালি ও সবুজ রঙের একটি দৃষ্টিনন্দন জ্যাকেট। এটি তৈরি করা হতো স্কুলের নিজস্ব রঙে। জ্যাকেটের বাম পাশে বড় সোনালি অক্ষরে ‘ঝ’ লেখা থাকত। আর পকেটের ওপর সোনালি সুতো দিয়ে সেলাই করে লেখা থাকত বিজয়ীর নাম।
কয়েক বছর আগে আমার বড় বোন রোজি এই জ্যাকেটটি পেয়েছিল। তাই আমিও মনে মনে ধরে নিয়েছিলাম, একদিন এটি আমারই হবে। তখন আমার বয়স চৌদ্দ। সবেমাত্র অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি। প্রথম শ্রেণি থেকে আমি টানা এ প্লাস পেয়ে আসছিলাম। দশম শ্রেণির বছরটিতে এই জ্যাকেট পাওয়ার স্বপ্নই যেন আমাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।
আমার বাবা ছিলেন দিনমজুর। খেতে খামারে কাজ করে আহার জোগাড় করত। আট সন্তানের সংসার চালাতে তিনি ইতোমধ্যে হিমশিম খাচ্ছিলেন। তাই ছয় বছর বয়সে আমাকে দাদা-দাদির কাছে পড়াশোনার জন্য দিয়ে দেওয়া হয়। আমাদের পক্ষে খেলাধুলা নামক বাড়তি বিনোদনের সুযোগ ছিল না। কারণ, দলে নাম লেখানো সম্ভব ছিল না। এতে বাড়তি খরচ থাকত। যেমন : নিবন্ধন ফি, ইউনিফর্ম, বাইরে ম্যাচ খেলতে যাওয়া; সবই বাড়তি খরচ। তাই আমরা যতই খেলাধুলায় ভালো হই না কেন, স্পোর্টস জ্যাকেট কখনো আমাদের কপালে জুটত না। তাই এই বৃত্তির জ্যাকেটটাই ছিল আমাদের একমাত্র সুযোগ।
মে মাস এলেই স্কুলে এক অদ্ভুত অস্থিরতা নেমে আসত। পড়াশোনায় কারও মন বসত না। সবাই জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকত। কবে যে শেষ হবে এই অপেক্ষা!
আমি আয়নার দিকে তাকালে হতাশ হয়ে যেতাম। আমাকে দেখতে অনেকটা শিমের লতার মতো লাগত। এটা ঠিক আমার কথা নয়। আমার বান্ধবীরা আমাকে এ নামে ডাকে। অতিরিক্ত হ্যাংলা হলে যা হয়। চৌদ্দ বছরের একটি মেয়ের জন্য এমন চেহারা খুব সুবিধার নয়। কেবল খানিকটা মেধা ছিল আমার সম্বল।
সেদিন শারীরিক শিক্ষার ক্লাসে যাওয়ার পথে মনে পড়ল, আমার পোশাক তো ডেস্কের নিচে রয়ে গেছে! কোচ থম্পসন রেগে যেতেন যদি কেউ ড্রেস পরে না আসে। তিনি বলতেন আমি নাকি ভালো ফরোয়ার্ড খেলি। একবার দাদিকে রাজি করানোর চেষ্টা করেছিলেন আমাকে দলে নেওয়ার জন্য। কিন্তু দাদি সাফ না করে দিয়েছিলেন।
আমি ক্লাসরুমের কাছে যেতেই শুনলাম ভেতরে উঁচু গলায় কথা হচ্ছে। থমকে দাঁড়ালাম। গলা শুনে বুঝলাম, আমাদের ইতিহাসের শিক্ষক মি. স্মিথ আর গণিত শিক্ষক মি. বুন কথা বলছেন। না, তর্ক করছেন। তাদের তর্ক কিছুক্ষণ আড়ি পেতে শোনার পর বুঝলাম, তর্কের বিষয়-আমি।
মি. স্মিথ রেগে বললেন, “আমি এটা কখনোই করব না! মার্থার ফলাফলের সঙ্গে অন্য কারও তুলনাই চলে না। আমি মিথ্যা বলতে পারব না।”
মি. বুন শান্ত গলায় বললেন, “কিন্তু জোয়ানের বাবা স্কুল বোর্ডের সদস্য, আবার শহরের একমাত্র দোকানের মালিকও। আমরা অন্তত এটা বলতে পারি-দুজনের ফল কাছাকাছি ছিল।”
আমার মনে হলো, কানের কাছে বিকট শব্দের বজ্রপাত হলো। বাকিটা আর পরিষ্কার শুনতে পেলাম না। শুধু ভেসে এলো, ‘‘আমি রাজি নই।” অনুমান করছিলাম, মি. স্মিথ স্যারের গলা। আমি দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। যেন পুরো শরীর অবশ হয়ে গেছে।
পরদিন প্রধান শিক্ষক আমাকে ডেকে পাঠালেন। তাকে দেখে মনে হলো, তিনি খানিকটা অস্বস্তিতে আছেন। কাগজপত্রে চোখ বোলাচ্ছেন অনবরত, আমার দিকে তাকাচ্ছিলেন না। “মার্থা,” তিনি বললেন, “এই বছর থেকে বৃত্তির জ্যাকেটের নিয়মে একটু পরিবর্তন হয়েছে। আগে এটি বিনা মূল্যে দেওয়া হতো। এখন বোর্ড সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এটি পেতে হলে পনেরো ডলার দিতে হবে।”
আমি হতবাক। তিনি যোগ করলেন, “যদি তুমি টাকা দিতে না পারো, তাহলে জ্যাকেটটি পরের শিক্ষার্থীকে দেওয়া হবে।”
আমি কষ্ট চেপে বললাম, “আমি দাদার সঙ্গে কথা বলে আগামীকাল জানাব, স্যার।”
বাড়ি ফেরার পথে কাঁদতে কাঁদতে চোখ ফুলে গেল আমার। দাদিকে কিছু না বলে দাদাকে খুঁজতে মাঠে গেলাম। তিনি ঝুঁকে ঝুঁকে শিমগাছের আগাছা পরিষ্কার করছিলেন। দাদাকে বললাম, “দাদা, একটা অনুরোধ আছে। এবার বৃত্তির জ্যাকেটটা পেতে পনেরো ডলার লাগবে। আগামীকালই টাকা দিতে হবে।”
তিনি থেমে জিজ্ঞেস করলেন, “বৃত্তির জ্যাকেট মানে কী?”
আমি বললাম, “স্কুলে আট বছরে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ার জন্য এটি পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হয়।”
তিনি শান্তভাবে আবার আগাছা তুলতে লাগলেন। তারপর বললেন, “যদি এর জন্য টাকা দিতে হয়, এটা কি আর বৃত্তির জ্যাকেট থাকে? প্রধান শিক্ষককে বলবে, আমি টাকা দেবো না।”
আমি রাগে-দুঃখে ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়লাম। কিন্তু বুঝলাম, দাদা ঠিকই বলেছেন।
পরদিন প্রধান শিক্ষককে দাদার কথা জানালাম। তিনি অবাক হয়ে বললেন, “তোমার দাদার তো টাকা আছে!”
আমি দৃঢ় গলায় বললাম, “তিনি বলেছেন, যদি কিনে নিতে হয়, তাহলে সেটা আর বৃত্তি নয়।”
তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর জানালার বাইরে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
শেষে বললেন, “ঠিক আছে, তোমার ক্ষেত্রে আমরা ব্যতিক্রম করব। তুমি জ্যাকেটটি পাবে।”
আমি যেন আকাশ ছুঁয়ে ফেললাম। আনন্দে কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে এলাম। সেদিন ইতিহাস শিক্ষক আমাকে চোখ টিপে বললেন, “শুনেছি, এবার তুমিই পাচ্ছ।”
আমি আর কিছু বলতে পারিনি স্যারকে।
বাড়ি গিয়ে মাঠে দাদার পাশে বসে আগাছা তুলতে লাগলাম। বললাম, “দাদা, আমি জ্যাকেটটা পাচ্ছি। তুমি যেভাবে বলতে বলেছ, সেভাবেই বলেছিলাম।”
দাদা কাঁধে হাত রেখে মুচকি হাসলেন। বললেন, “চলো, দাদির কাজে সাহায্য করো।”
আমি দৌড়ে বাড়ির দিকে গেলাম। মনের ভেতর এক অদ্ভুত আনন্দ।
সেদিন আমি শিখলাম, সম্মান কখনো কেনা যায় না। সততা আর পরিশ্রমের মূল্য টাকার চেয়ে অনেক বড়।
লেখক পরিচিতি : মার্থা সালিনাস একজন মার্কিন লেখক। যিনি মূলত শিক্ষা, সামাজিক বৈষম্য নিয়ে লেখেন। তাঁর রচনায় প্রান্তিক মানুষের আত্মমর্যাদা ও নৈতিক দৃঢ়তার বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে আসে। ১৯৮৬ সালে গল্পটি প্রকাশিত হয়। পরে এটি আমেরিকার পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত হয়। অর্থ, ক্ষমতা ও পরিচয়ের প্রভাবের বিপরীতে সততা ও ন্যায়ের অবস্থান, এই দ্বন্দ্বই এ গল্পের মূল প্রেক্ষাপট।
আরও পড়ুন...