ক্রোনো এক্সপ্লোর

রহস্যভেদ রিয়াজ মোরশেদ সায়েম অক্টোবর ২০২৫

গ্রীষ্মের ছুটি। বিকেল গড়িয়ে এসেছে। ফাহাদ, রাহুল আর আনাস তিন বন্ধু মিলে বসে আছে ফাহাদের নানাবাড়ির পুরোনো দোতলায়। বাড়ির চারপাশে বিশাল বাগান, আম-কাঁঠালের গাছ, পাখিদের কিচিরমিচির। ঘরে ঘরে পুরোনো কাঠের আসবাব। ফাহাদের চোখে পড়ল বুকশেলফের নিচে লুকিয়ে থাকা এক মোটা বই। অনেক দিন ধরে কেউ খোলেনি। মলাট ছিঁড়ে ধুলোমাখা। সে খুলতেই ভেতর থেকে ভাঁজ করা এক টুকরো কাগজ মাটিতে পড়ল।

রাহুল কাগজটা তুলে নিল। দেখল, এটা একটা মানচিত্র। অদ্ভুত সব পাহাড়, জঙ্গলের ভেতরে  আঁকা বিশাল পায়ের ছাপ, আর কোণায় লাল কালিতে লেখা, টাইম গেট।

আনাস অবাক হলো, ‘মানে কী? সময়ের দরজা?’

ফাহাদ কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে রইল। হতে পারে টাইম মেশিনের সূত্র। রাহুল হাসল, চলো না দেখি! হতে পারে গুপ্তধনের মানচিত্র।

মানচিত্রের নিচে আরও লেখা আছে, ‘গহীন বনে পুরোনো ঘড়ির টাওয়ারে খুঁজে নাও পথ!’

তিনজনের চোখ বিস্ময় বিস্ফারিত হওয়ার মতো। এ তো সরাসরি অভিযানের ডাক! একজন অপরজনের দিকে তাকিয়ে সায় দিলো অভিযান প্রস্তুতির।

পরদিন ভোরেই তারা রওনা দিলো। মানচিত্র হাতে তিনজন পা বাড়াল গ্রামের সীমানা পেরিয়ে বনের ভেতর। বনে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। নানা পাখির গান। পাতা ঝরার মৃদু আওয়াজ। সব মিলিয়ে বন যেন জীবন্ত!

আনাস বলে উঠল, ‘বন কি আসলেই এমন?’ অন্য দুজন তার প্রশ্নকে গুরুত্ব দিলো না। তাদের চোখে বিস্ময়।

ঘণ্টাখানেক হেঁটে গিয়ে তারা হঠাৎ এক ভাঙাচোরা ঘড়ির টাওয়ার দেখতে পেল। টাওয়ারের দরজাটা কেমন যেন কাঁপছিল। ভেতরে ঢুকতেই তারা বিস্ময়ে থমকে গেল।

সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল যন্ত্র। দেখতে অনেকটা গাড়ির মতো। তবে মাথার ওপরে অদ্ভুত অ্যান্টেনা, পাশে অজ¯্র বোতাম। ধাতব শরীরের গায়ে লেখা দেখল, ক্রোনো এক্সপ্লোর।

রাহুল ফিসফিস করে বলল, ‘এটা কি সত্যিই টাইম মেশিন?’

আনাস উচ্ছ্বাসে লাফিয়ে উঠল, ‘আমরা যদি বসি তাহলে হয়তো...!’

ফাহাদ একটু থেমে বলল, ‘সাবধান! এটা খেলনা নয়।’

তবু কৌতূহল জয় করল ভয়কে। তারা ভেতরে ঢুকল। কন্ট্রোল প্যানেলে একটা বোতাম ঝিলমিল করছিল। ফাহাদ সেটাতে চাপ দিতেই যন্ত্রটি আরও কেঁপে উঠল। আলো ঝলসে উঠল। পর্দায় ভেসে উঠল ম্যাসেজ, গন্তব্য : ৭০ মিলিয়ন বছর আগের ক্রিটেশিয়াস পিরিয়ড।

মুহূর্তের মধ্যে চারপাশ অন্ধকার, মাথা ঘোরা, গর্জন, আলো-আর তারপর হঠাৎ সব থেমে গেল। যখন চোখ খুলল, তারা আর সেই ঘড়ির টাওয়ারে নেই। চারপাশে ঘন জঙ্গল। গাছগুলো বিশাল। পাতাগুলো হাতপাখার মতো বড়ো। বাতাসে অজানা ফুলের গন্ধ। দূরে শোনা গেল ভীতিকর গর্জন।

রাহুল কাঁপা গলায় বলল, ‘আমরা আমরা ডাইনোসরের দেশে চলে এলাম নাকি? ডাইনোসরের গর্জন কেন শোনা যাচ্ছে?’

আনাস বলল, ‘এটা কি ডাইনোসরের আওয়াজ?’

রাহুল ভীত মাথাটা একবার সম্মতিসূচক নাড়াল। আনাস আবার ভীত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, ‘ডাইনোসরের আওয়াজ তুমি কোথায় শুনেছ আগে?’ রাহুল কিছু একটা বলতে যাবে এমন সময় তাদের সামনে হঠাৎ দুলে উঠল বিশাল এক গাছ। তারপর ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলো ব্রাকিওসরাস। তার লম্বা গলা আকাশ ছুঁয়েছে। দাঁত দিয়ে সে শান্তভাবে পাতাগুলো ছিঁড়ে খাচ্ছে।

আনাস চমকে উঠে বলল, ‘ওরে বাবা! এটা যে বাড়ির চেয়েও বড়ো!’ ফাহাদ গভীর দৃষ্টিতে দেখল। এরা নিরীহ। ঘাস-পাতা খায়।

তিনজন মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকল। ঠিক তখনই ঝোপের ভেতর থেকে ছোট ছোট প্রাণী ছুটে এলো। দেখতে অনেকটা মুরগির মতো। এরা কম্পসোগনাথাস। তারা কিচিরমিচির করে এদিক-ওদিক ছুটে বেড়াতে লাগল।

রাহুল হেসে বলল, দেখ, আমাদের মুরগির দৌড়ের মতো!

আনাস হাত বাড়াতে চাইলে প্রাণীগুলো হুট করে পালিয়ে গেল।

কিছুক্ষণ পর আকাশে ছায়া পড়ল। বিশাল ডানা মেলে উড়ে গেল এক প্টেরোসর। তার ডানা যেন ছোট বিমান। বাতাস কেঁপে উঠল।

আনাস মাথা নিচু করে বলল, ‘আরে, ও কি আমাদের নিয়ে যাবে নাকি?’

তারা একসাথে লুকিয়ে পড়ল এক দৈত্যাকার গাছের আড়ালে। এ যেন এক নতুন পৃথিবী, যেখানে প্রতিটি মুহূর্তে ভয় আর বিস্ময় মিশে আছে।

তিনজন হাঁটতে হাঁটতে একটা হ্রদের ধারে পৌঁছাল। পানির ধারে কাদা জমে আছে। হঠাৎ তারা দেখল, একটা ছোট্ট ট্রাইসেরাটপস কাদায় আটকে গেছে।

ছোট্ট প্রাণীটা প্রাণপণে বের হতে চাইছে, কিন্তু পারছে না। চোখে ভয়। ফাহাদ দৌঁড়ে গিয়ে একটা ডাল এনে সেটা দিয়ে টানতে লাগল। রাহুল আর আনাসও সাহায্য করল। কিছুক্ষণ পর তারা ছোট্ট ডাইনোসরটাকে কাদা থেকে টেনে বের করল।

প্রাণীটা হাঁপ ছাড়ল। তারপর তাদের দিকে তাকাল অদ্ভুতভাবে। তার চোখে যেন কৃতজ্ঞতা ঝলসে উঠল। সে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রইল, নরম গলায় একটা ডাক দিলো।

আনাস খুশিতে চিৎকার করে উঠল, ‘ওর নাম রাখি ট্রিকো!’

হঠাৎ তাদের সামনে এসে দাঁড়াল এক বিশাল ট্রাইসেরাটপস-ট্রিকোর মা। শিংগুলো ধারালো, দেহ বিশাল।

তিনজন ভয়ে পাথর হয়ে গেল। কিন্তু মা ডাইনোসর ছানার গা শুঁকে বুঝল, ওরা তার ছানাকে বাঁচিয়েছে। তাই আক্রমণ করল না। বরং মাথা নেড়ে শান্তভাবে চলে গেল।

তাদের বুক থেকে ভয়ের পাথরটা সরে গেল। ফাহাদ বলল, ‘প্রতিটি প্রাণীর ভেতরেই কৃতজ্ঞতা আছে। ভয় পেলেই কেবল তারা হিং¯্র হয়।’

হঠাৎ বাতাস ভারী হয়ে উঠল। চারদিকে অদ্ভুত নীরবতা। পাখির ডাক থেমে গেল, ছোট প্রাণীরা লুকিয়ে পড়ল। রাহুল ফিসফিস করে বলল, ‘এটা নিশ্চয় ভালো কিছু নয়।’

ঠিক তখনই জঙ্গল কাঁপিয়ে বেরিয়ে এলো এক বিশাল ছায়া। সামনে এসে দাঁড়াল ভয়ংকর টি-রেক্স।

তার চোখ জ্বলছে, মুখে ধারালো দাঁতের ঝলক। সে গর্জন করতেই চারপাশ কেঁপে উঠল।

আনাস চিৎকার করে উঠল, ‘দৌড়াও!’

তিনজন প্রাণপণে দৌঁড়াতে লাগল। টি-রেক্স তাদের পেছনে তাড়া করছে। মাটির কম্পনে মনে হচ্ছিল পৃথিবী ভেঙে যাবে।

ফাহাদ চিৎকার করে বলল, ‘ওই পাহাড়ের গুহায় ঢুকতে হবে।’

তারা প্রাণপণে ছুটে গুহার ভেতরে ঢুকে পড়ল। টি-রেক্স গুহার সামনে দাঁড়িয়ে গর্জন করতে লাগল, দাঁত দিয়ে গুহার পাথর কামড়ে ফেলার চেষ্টা করল। তিনজন অন্ধকারে দম আটকে বসে রইল।

হৃদস্পন্দন যেন কানে বাজছে। মনে হচ্ছিল তারা আজ এখানেই শেষ।

গুহার ভেতরে হঠাৎ রাহুলের চোখে পড়ল ধাতব কিছু। তারা এগিয়ে গিয়ে দেখল, কিছু পুরোনো যন্ত্রপাতি পড়ে আছে। হয়তো আগে কোনো অভিযাত্রী এসেছিল।

ফাহাদ একটি ফ্লেয়ার গান হাতে নিল। সে গম্ভীর গলায় বলল, ‘টি-রেক্স আগুন আর আলো ভয় পায়। আমাদের চেষ্টা করতে হবে।’

আনাস কাঁপা গলায় বলল, ‘ভুল হলে তো...!’

ফাহাদ দৃঢ় স্বরে বলল, ‘ভয় পেলে বাঁচব না। সাহসী হতে হবে এ সময়।’

সে ফ্লেয়ার গান ছুঁড়ে দিলো গুহার বাইরে। হঠাৎ আকাশে আগুনের ফুলকি ছড়িয়ে পড়ল। গর্জন করে পিছিয়ে গেল টি-রেক্স। আলোতে তার চোখ ভয় পেয়ে ঝলসে উঠল। একসময় সে গর্জন করতে করতে জঙ্গলে মিলিয়ে গেল।

তিনজন হাঁপ ছাড়ল। রাহুল বলল, ‘বুদ্ধি না খাটালে আজ আমরা পরকালে চলে যেতাম!’

তারা বুঝল, এই দেশে বেশি দিন থাকা সম্ভব নয়। রাত নেমে এলে পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর হবে। তাই টাইম মেশিনে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।

হঠাৎ কোথা থেকে যেন ট্রিকো ছুটে এলো। তাদের পিছু পিছু চলল। সে যেন ওদের যেতে দিতে চাচ্ছে না। তার ছোট্ট চোখে পানি চিকচিক করছে।

আনাস কাঁদো গলায় বলল, ‘ওকে ফেলে যেতে ইচ্ছে করছে না।’

ফাহাদ শান্ত কণ্ঠে বলল, ‘প্রতিটি প্রাণীর জায়গা আলাদা। আমাদের জায়গা আমাদের সময়, ওর জায়গা এই যুগ।’

তিনজন টাইম মেশিনে উঠে বসল। আবার আলো ঝলসে উঠল, যন্ত্র গর্জন করল। কিছুক্ষণ পর তারা সেই পুরোনো ঘড়ির টাওয়ারে ফিরে এলো।

বাইরে তখন বিকেলের সূর্য ডুবছে। পাখির ডাক, বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ-সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও বুঝতে পারছিল তারা অন্য এক জগত থেকে ফিরেছে।

রাহুল স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল, ‘অবিশ্বাস্য! আমরা সত্যিই কোটি বছর আগের পৃথিবী ঘুরে এলাম।’

আনাস ফাহাদের হাত ধরে বলল, ‘আমরা শিখলাম-প্রকৃতি যত ভয়ংকরই হোক, সাহস, বুদ্ধি আর বন্ধুত্ব থাকলে বেঁচে থাকা যায়।’

ফাহাদ হাসল, ‘আর শিখলাম-প্রতিটি প্রাণীর ভেতরই একটা হৃদয় আছে।’

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ