চঞ্চল কৈশোরের স্বপ্ন

জুলাই-নিবন্ধ নাসীমুল বারী অক্টোবর ২০২৫

[ গত সংখ্যার পর ]

নয়.

রাত সাড়ে এগারোটা বাজে মাত্র। হঠাৎ ফেসবুক লাইভে দেখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন বলছে, রাজুতে চলে আসুন, সবাই রাজুতে আসুন। লাইভে মিছিল হচ্ছে, মিছিলের ভিডিও দেখা যাচ্ছে। ফেসবুক থেকে বের হয়ে সাথে সাথে ফোন দেয় রাফিদ, তানভীর ও জামানকে। চারজন একসাথে হয়। সৌরভ বলে, তাড়াতাড়ি চল রাজু ভাস্কর্যের মিছিলে।

ব্রিটিশ কাউন্সিল থেকে একটু এগিয়ে ভিসি চত্তরের কাছে আসতেই সৌরভরা শুনতে পায় মিছিলের উত্তাল গর্জন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস জুড়ে মিছিল। সবারই গন্তব্য রাজু ভাস্কর্য।

“আমি কে, তুমি কে-রাজাকার, রাজাকার

কে বলেছে, কে বলেছে-স্বৈরাচার’ স্বৈরাচার”

কী ব্যাপার! যেন আকাশ থেকে পড়েছে ওরা! এমন স্লোগান কেন? স্লোগানে এমন ভাষা কেন? নিজেদের রাজাকার ঘোষণা দেওয়া এই স্লোগান কারা দিচ্ছে? কেন দিচ্ছে? ঠিক মিছিলে আসছে তো ওরা?

ভিসি চত্বরের ত্রিভুজ আইল্যান্ডের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ভাবছে ওরা। রাফিদ সৌরভকে বলে, লাইভে ঘোষণা শুনেই তো এলাম। আচ্ছা আমরা কি এই মিছিলেরই ঘোষণা লাইভে শুনেছিলাম?

স্লোগানের ভাষা মর্মান্তিক বৈপরীত্য। আমাদের সমাজ কৃষ্টিতে রাজাকার একটি মানবিক অবমাননার নাম। এখনকার প্রজন্ম তো নিজের ইচ্ছেতেই জোর গলায় এ স্লোগান দিচ্ছে! এ চরম বাস্তবতাটা তো চোখের সামনেই। সেই মানবিক অবমাননার বিশেষণটি এ প্রজন্ম ধারণ করতে চাইছে কেন?

না, এ প্রজন্ম ধারণ করতে চাচ্ছে না। রাজাকারের এমন ধারণত্বের মধ্যে নতুন প্রজন্মে আনন্দ-উচ্ছ্বাস নয়; বরং প্রতিবাদী উত্তপ্ততা দেখা যায়। আগুনের মতো প্রতিবাদ। এমন প্রতিবাদ তো বাস্তবতার বৈপরীত্য। কেন?

এ কেন-র উত্তর মেলে স্লোগানের পরের প্রতি উত্তর স্লোগানে-

“কে বলেছে, কে বলেছে- স্বৈরাচার স্বৈরাচার”

সাথে সাথে আরেকটি স্লোগানও শোনা যায়; তাতেও ওই কেন-র উত্তর মেলে। স্লোগানটি-

“চাইলাম অধিকার-হয়ে গেলাম রাজাকার।”

এসবই আন্দোলনের মূল গতি। বিপ্লবের স্রোতধারা।

মাঠে আন্দোলন গড়ে ওঠে স্লোগানের ভাষায়। একটি আন্দোলনের ভিত্তি যা-ই থাকুক, এর অন্যতম প্রধান অস্ত্র হলো মুখ্য বা কেন্দ্রীয় একটি স্লোগান। স্লোগানটি হবে স্পষ্ট, তীক্ষè ও সজীব একটি স্লোগান। এমন স্লোগান আন্দোলনের আত্মাকে ভাষা দেয়, প্রতিবাদের ছন্দে কাঁপিয়ে তোলে। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পার হলেও বাংলাদেশ কার্যত একটি ন্যায্য, বৈষম্যহীন রাষ্ট্রিক-সামাজিক কাঠামো দাঁড় করাতে পারেনি। মেধা যখন অবহেলিত হয়, তখনই জন্ম নেয় ক্ষোভ, সংগ্রাম আর প্রতিরোধ। কোটাবিরোধী আন্দোলন ছিল সেই ক্ষোভের অগ্নিশিখা; যা বর্তমান প্রজন্মকে নিজের অধিকার, নিজের স্থান এবং নিজের স্বপ্ন রক্ষার জন্য জাগিয়ে তোলে প্রচণ্ডভাবে। তীব্র একটা আন্দোলন গড়ে তোলার রাস্তা দেখিয়ে দেয়। দেশ মাতৃকার জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানের স্বীকৃতিতে তাদের জন্য কোটাসংরক্ষণ করাটা একটা সম্মান। এ নিয়ে কোনো বিরোধ কখনোই ছিল না, এখনো না। এ অবদান একান্তই মুক্তিযোদ্ধাদের নিজস্ব-বংশপরম্পরায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের নয়। বাবা-দাদাদের অবদানের স্বকীয়তা উত্তর প্রজন্ম বহন করে না। বাবা-দাদাদের সে মর্যাদাকে যদি বংশানুক্রমে বণ্টনের পণ্যে পরিণত করা হয়, তাহলে সেটি হয়ে দাঁড়ায় একপ্রকার অসম্মানই। ফলে কোটার সূত্র ধরে বংশপরম্পরায় কোটার সুযোগ গ্রহণ মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানের সম্মানকে ধূসর করে তোলে। বংশপরম্পরার এ কোটা মূলত বর্তমান প্রজন্মের মেধাকে আটকে দেয়, অবহেলা করে। মেধাবীর সম্ভাবনার দ্বারও রুদ্ধ করে দেয়। বর্তমান প্রজন্ম তাই গর্জে ওঠে। দাঁড়িয়ে যায় সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে। তখনই প্রতিবাদী এ প্রজন্মকে স্বাধীনতা যুদ্ধের মানবিক অবমাননা ‘রাজাকার’ বিশেষণে বিশেষায়িত করা হয়। এটা করেন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা স্বয়ং। তখন এ প্রজন্ম আত্মরক্ষার চিৎকারে, অপমানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী আর শ্লেষাত্মক স্লোগানে সেটা জানান দিতেই বলে ওঠে এ মাঝরাতে-

“তুমি কে আমি কে- রাজাকার, রাজাকার।”

প্রতিবাদের ভাষা প্রতিউত্তরে আরও খরস্রোতা হয়ে ওঠে সরকারের প্রতি-

কে বলেছে, কে বলেছে-স্বৈরাচার, স্বৈরাচার।”

কৈশোরিক কণ্ঠে ওরাও এমন উত্তপ্ত স্লোগান দিতে দিতে রাজু ভাস্কর্যের দিকে আগাতে থাকে।


দশ.

টিভির স্ক্রিনে ভেসে ওঠে পুলিশের সরাসরি গুলি করার দৃশ্যটা। দুই হাত দুই দিকে ছড়িয়ে বুক পেতে দাঁড়িয়ে আছে ছাত্রনেতা আবু সাঈদ। হঠাৎ রাবার বুলেট এসে পড়ে আবু সাঈদের বুকে। পড়ে যায় আবু সাঈদ। আবার উঠে দাঁড়িয়ে হাতের ক্রিকেট স্ট্যাম্প দিয়ে গুলি ঠেকানোর চেষ্টা করে।

কিন্তু না! আর পারেনি না আবু সাঈদ। গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যায় বুক। লুটিয়ে পড়ে রাস্তায়। রক্ত গড়িয়ে পড়ছে।

কয়েকটি টিভি স্ক্রিনের সরাসরি দেখায় আবু সাঈদের এই দৃশ্য। সাক্ষাৎ গুলির দৃশ্য।

ইস! কী ভয়াবহ দৃশ্য! কী ভয়ংকর দৃশ্য! দেখল পুরো দেশবাসী। দেখল তাবৎ দুনিয়া।

লুটিয়া পড়ার পরপরই অবরোধে অংশ নেওয়া কর্মীরা দৌড়ে আসে। রক্ত বয়ে যাচ্ছে অবিরত।

মহাসড়কে আন্দোলনের রক্তবন্যার লাইভ শো

টিভিতে এই দৃশ্য দেখে আঁতকে ওঠে সৌরভ। বিমূঢ় বাক্্রুদ্ধ হয়ে যায়। হৃদয়ের সব শব্দ নিঃশব্দ হয়ে যায়।

মনের ভাবনায় অস্পষ্ট স্বরে বিড়বিড় করে বলে, মেধার অধিকার চাইতে গিয়ে এভাবে গুলি খেলো? তবে কি এগুলি আমাদের অধিকারকে আরো পোক্ত করে দিলো?

টিভির সামনে থেকে উঠে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। একটু পরে ওরা সবাই মিলে শাহবাগে যাওয়ার কথা। তানভীর অবশ্য বলেছিল নটর ডেম কলেজের ওদিকে যেতে। নটর ডেমের শিক্ষার্থীদের সাথে ওরা অবরোধ করবে, বাংলা ব্লকেড পালন করবে। রাস্তায় নেমে এসব আলোচনা ঠিক করার কথা ছিল। কিন্তু এখন!

বারান্দা থেকে রাস্তাটা দেখা যায়। গ্রিলে হাত ধরে দাঁড়িয়ে দেখে রাফিদ ওরা কেউ এলো কি না।

বারান্দা থেকে আবার টিভির সামনে আসে। আবু সাঈদের নির্মম হত্যার এই লাইভ দৃশ্য ন্যানো সেকেন্ডেই ছড়িয়ে পড়ে পুরো দেশে। পুরো বিশ্বে। বারবার দেখাচ্ছে। টিভিতে প্রতিবাদের খবরও দিয়ে যাচ্ছে, শাহবাগে প্রতিবাদী মিছিলের ঘোষণা আসছে।

টিভিতে আবার ব্রেকিং নিউজ-চট্টগ্রামের ছাত্রবিপ্লবী শান্ত-ওয়াসিমসহ তিনজন নিহত হয়েছে। ঢাকার সায়েন্সল্যাব মোড়ে দুজন নিয়ত হয়েছে। পুলিশের গুলিতে এরা সবাই নিহত হয়।

এত হত্যা! এত হিংস্রতা পুলিশের! এসব ভাবতে ভাবতে ফেসবুক ওপেন করে সৌরভ। তাতেও লাইভ ঘোষণা আসছে মিছিলে আসার জন্য।

সে মুহূর্তে সৌরভের ফোন বেজে ওঠে। রাফিদ ফোন করেছে। ফোনটা রিসিভ করতে করতেই আরেকটি ফোন ঢুকে যায়; তানভীর কল ওটা।

ওরা নটর ডেম কলেজের দিকে যাওয়ার পরিকল্পনা বাদ দিয়ে শাহবাগে যাওয়ার পরিকল্পনা নেয়। সবাইকে জানিয়ে দেয় দ্রুত আজিমপুর মোড়ে আসতে।

রাজু ভাস্কর্যের কাছাকাছি আসতেই ওরা দেখে প্রতিবাদী জনতায় ভরে গেছে। আগের প্রচলিত স্লোগানের সাথে সাথে আজকে আরো নতুন দুটি স্লোগান শুনতে পায় ওরা। ‘তোর কোটা তুই নে-আমার ভাই ফিরিয়ে দে’। ‘আমার খায় আমার পরে আমার বুকে গুলি করে’।

রাজু ভাস্কর্যের সামনে এসে দেখে আরেক চিত্র। হেলমেট পরিহিত ছাত্রলীগের একটি দল লাঠি হকিস্টিক হাতে পালটা মিছিল করছে টিএসসি শহীদ মিনারের মাঝামাঝি। ওই মিছিল রাজু ভাস্কর্যের দিকে আসছে। ওরা এসেই কি মারামারি বাঁধিয়ে দেবে? এখানেও কি আরেকজন শহীদ আবু সাঈদ সৃষ্টি হবে? দীপ্ত সাহসে দৃঢ়কণ্ঠে সৌরভ বলে, দেখ হেলমেট বাহিনী আসছে। ওদের রুখতে হবে। ওদের তাড়াতে হবে। আমরাও থাকব ওদের তাড়ানো অভিযানে।

এক বাক্যে সবাই বলে, হ হ ঠিক।

কিছুক্ষণের মধ্যে ছাত্রলীগের হেলমেট বাহিনী এসে শুরু করে হট্টগোল, মারামারি।

শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। সৌরভরাও সে প্রতিরোধে যোগ দেয়।

অবশেষে হেলমেট বাহিনীকে তাড়িয়ে শাহবাগে আসে সৌরভরা। প্রতিবাদ-প্রতিরোধের মিছিলে মিছিলে একাকার এখানেও। অশ্রুসিক্ত এ মিছিল প্রতিবাদের বিক্ষোভ। অশ্রুসিক্ত এ মিছিল তপ্ত আগুনের লাভা।

ঢাকা থেকে ঘোষিত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বাংলা ব্লকেড কর্মসূচি সারা দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই পালিত হচ্ছে। ছাত্রদের দাবি আদায়ের এ কর্মসূচি পুরো দেশকে অচল করে দিয়েছে। সে কর্মসূচি পালন করতে গিয়েই রংপুরে আবু সাঈদের, চট্টগ্রামে ওয়াসিমের প্রাণ কেড়ে নেওয়া হলো। সরকারের এ নিয়ে কোনো বক্তব্য নেই। অসত্য বয়ানে পুলিশ জানিয়েছে আবু সাঈদ নিজেদের প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত হয়েছে। সরাসরি টেলিকাস্ট করা এমন খবরকে মিথ্যাচারে উলটে ফেলা? কী নির্লজ্জ মিথ্যাচার! সরকারের সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের দম্ভ করে বলেন, এ আন্দোলন দমানোর জন্য ছাত্রলীগই যথেষ্ট। হ্যাঁ, ছাত্রলীগের হেলমেট বাহিনী সে প্রমাণই দিচ্ছে প্রতিদিন। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের সে চরম ঔদ্ধত্যই বেরিয়ে আসে রূঢ় মুখায়বের কথায় ‘আন্দোলন যাবে, আন্দোলন আসবে। কিন্তু ছাত্রলীগ থাকবে। সবকিছুই মনে রাখা হবে এবং জবাব দেওয়া হবে। একটি ঘটনাও জবাব ছাড়া যাবে না।’

শাহবাগ মোড় থেকে ঘোষণা আসে আগামীকাল দুপুরে রাজু ভাস্কর্যের সামনের সড়কে আবু সাঈদ এবং অন্যান্য শহীদদের গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হবে তারপর কফিন মিছিল।


এগারো.

গায়েবানা জানাজার জন্য রাজু ভাস্কর্যের দিকে রওনা দেয় সৌরভরা তিনজন। আজ জামান আসেনি। পলাশীর মোড়ে এসে পুলিশের বাধায় পড়ে। কাউকে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না পুলিশ। সৌরভ এগিয়ে যায়। পুলিশের কাছে গিয়ে বলে, আমরা ক্যাম্পাসের ভেতরে যাব।

একজন একটু কর্কশ স্বরে বলে, এই পিচ্চিরা, তোমরা ওখানে গিয়ে কী করবা? বাসায় যাও, বাসায় যাও।

ঠিক তখনই দশ-বারোটা বাইক আসে, দ্রুত ঢোকার ব্যবস্থা করে দেয় পুলিশ। প্রত্যেকটা বাইকেই তিনজন করে। প্রত্যেকের মাথায় হেলমেট। বাইকগুলো ছেড়ে দিতে গিয়ে পুলিশকে ব্যারিকেড সরাতে হয়। এ ফাঁকে দ্রুত সৌরভরা ঢুকে পড়ে। ঢুকে পড়ে আরো অনেকেই।

রাজু ভাস্কর্যের কাছে গিয়ে দেখে পুলিশ লাঠিচার্জ করে সবাইকে ছত্রভঙ্গ করে দিচ্ছে। প্রতীকী কফিনগুলো রাস্তার ওপর; কিন্তু কাউকে দাঁড়াতে দিচ্ছে না। পুলিশের সাথে হেলমেট পরে একদল আছে। ওরা হকি স্টিক নিয়ে আক্রমণ করছে ছাত্র-জনতার ওপর। পুলিশ মারছে টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেরনেড। কেউ আর ওখানে দাঁড়াতে পারছে না। হঠাৎ পুলিশ একজনকে ধরে ফেলে। রাফিদ বলে, কেরে উনি? চেনা চেনা লাগে রে!

-ধ্যাৎ, চিনিস না? উনি তো আক্তার ভাইয়া। দুই দিন ওনার সাথে কথা হয়েছিল। সালমান ভাইয়া পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।

ডাকসুর সাবেক সমাজকল্যাণ সম্পাদক আক্তার হোসেনকে পুলিশ তুলে নিয়ে যায়। সাউন্ড গ্রেনেড, হামলা এবং ছাত্রলীগের যৌথ আক্রমণের হট্টগোলে এখনো গায়েবানা জানাজা শুরু করতে পারেনি। কফিনগুলো পড়ে আছে রাস্তায়। জানাজায় আসা সকল ছাত্র-জনতা প্রতিবাদ প্রতিরোধে খ- খ- মিছিল করছে।

সৌরভরা একটু পশ্চিমে এগিয়ে গুরুদুয়ারার সামনে এসে দাঁড়ায়। এমন সময় এক ছাত্রীকে একদল ছাত্র ঘিরে ধরে। সেখানে হেলমেটধারীও আছে কজন। ২০১৮-র নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময়ও ছাত্রলীগের হেলমেট বাহিনী ছাত্রীদের ওপর হামলা করেছিল এই তো ঢাকার জিগাতলায়। আজও কি হেলমেট বাহিনী এই ছাত্রীদের ওপর হামলা-নির্যাতন করবে?

সৌরভরা আস্তে আস্তে ওখানে যায়। হেলমেট পড়া একজন ওই শিক্ষার্থী শাঁসাচ্ছে এখনই যেন সে ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যায়। রাফিদ নিচু কণ্ঠে সবাইকে বলে, এই উনারে না আমরা শাহবাগে মিছিল করতে দেখেছি?

সৌরভ একটু নিরীক্ষণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, হ্যাঁ তাইতো! কিন্তু উনি এ রকম একা এখানে এলো কেন? জানাজা তো শুধু ছেলেরা পড়বে, উনি এলো কেন এখানে? ততক্ষণে রাজু ভাস্কর্যের দিক থেকে একদল একটি মিছিল নিয়ে এগিয়ে আসে। মিছিলে আগের স্লোগানের সাথে আরেকটি স্লোগান শোনে-আমার বোনের ওপর হামলা কেন, ভিসি স্যার জবাব চাই।

সৌরভ রাফিদরা একটু চমকে যায়। এ খবরটা চলে গেছে ওখানে। মিছিলের বহর দেখে যারা ওকে ঘিরে ধরছিল, ওরা দ্রুত পালিয়ে যায় নীলক্ষেতের দিকে।

এরই মধ্যে কফিন নিয়ে মিছিল এগিয়ে আসছে। ভিসির বাসার সামনে গায়েবানা জানাজা হবে। পুলিশ আর ছাত্রলীগের আক্রমণকে উপেক্ষা করে শিক্ষার্থীরা ভিসির বাসভবনের সামনে জড়ো হতে থাকে। বিকাল ৪টায় অনুষ্ঠিত হয় গায়েবানা জানাজা।

তবে শান্তিমতো হতে পারেনি। পুলিশের টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড হামলায় কোনো রকমে নামাজ শেষ করেই সবাই ছাত্রভঙ্গ হয়ে যায়। জানাজার নামাজে ইমামতি করা ছাত্রনেতাটিকেও পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। সৌরভরা তার নামটি জানতে পারেনি।

পুলিশের টিয়ারশেল সাউন্ড গ্রেনেড আর তাড়া খেয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে সৌরভরাও এদিক-সেদিক দৌড়ে দূরে সরে যায়। সৌরভ কলা ভবনের ভেতরে ঢুকে যায়। রাফিদ তানভীর রেজিস্টার ভবনের মাঠের দিকে চলে যায়।

এদিকে হলে হলেও মিছিল চলছে। প্রতিবাদ-প্রতিরোধের মিছিল। ছাত্রলীগকে বহিষ্কার করার মিছিল।

সৌরভ কী করবে ঠিক বুঝতেছে না। ধীরে ধীরে রেজিস্টার ভবনের মাঠের দিকে আসছে। মাঠের মাঝামাঝি এসে দাঁড়িয়ে ভিসি ভবনের দিকে তাকিয়ে দেখছে কী ঘটতেছে। তখনই রাফিদ তানভীর এসে হাজির। খুব চিন্তাক্লিষ্ট।

সৌরভ নীরব হয়ে ভিসি চত্বরের দিকেই তাকিয়ে থাকে।

চুপচাপ কয়েক মিনিট ওরা তিনজন। নীরবতা কাটিয়ে রাফিদ বলে, জানাজা পড়ব সেটাও দিচ্ছে না। কী নিষ্ঠুররে বাবা!

সৌরভ ঘুরে ওদের দুজনের মুখোমুখি দাঁড়ায়। তারপর মোবাইলটা খুলে ফেসবুক ওপেন করে।

এ কি!

ভীষণ চমকে ওঠে সৌরভ। সাথে সাথে ওদের দুজনকে জানায়, এই সরকার নোটিশ দিয়েছে সন্ধ্যার মধ্যে ইউনিভার্সিটির হল ছেড়ে দিতে হবে ছাত্রদের।

-তাহলে কালকে থেকে কি আন্দোলন হবে না?

-জানি না। তবে আমার মনে হয় আন্দোলনটা আরো বাড়বে। সবাই তো আর হলে থাকে না।

-ঠিকই আমরা তো বাসা থেকে আসি। আমাদের মতো অনেকে বাসা থেকে আসে। আঙ্কেল-আন্টিরা বাসা থেকে আসে। বড়ো ভাইয়ারাও বাসা থেকে আসে। সালমান ভাইয়া, নাহিদ ভাইয়া ওরাও তো বাসা থেকে আসে।

হাত মুষ্টিবদ্ধ করে দৃঢ়কণ্ঠে সৌরভ বলে, বিজয় আমাদের হতেই হবে। আমরা থাকব এ আন্দোলনে আমাদের সুন্দর আগামীর জন্য।


বারো.

‘কমপ্লিট শাটডাউন।’

-কি রে! আমাদের আন্দোলন কম্পিউটার প্রোগ্রাম হয়ে গেল নাকি?

নাহিদ ইসলামের ঘোষণা শুনে তানভীর প্রশ্ন করে।

আন্দোলনের গতি এখন গণআন্দোলনে রূপ নিয়েছে। শুধু শিক্ষার্থী নয়, অভিভাবক বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যুক্ত হয়ে গেছে। এতে অনেকটা ভীত হয়েই পুলিশের সাথে সরকারি দলের নানা অঙ্গসংগঠন এক হয়ে আক্রমণ চালাচ্ছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচির ওপর। পুলিশের গুলিতে অসংখ্য মানুষ নিহত হয়েছে। বিবিসি বাংলা, ডয়চে ভেলে, আল জাজিরা প্রমুখ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও এসব আক্রমণ-নিহতের ঘটনা উঠে আসছে। দেশের পত্রপত্রিকা থেকে ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ায় নিহতের সংখ্যার তারতম্য থাকল তা এখন পর্যন্ত ছয়-সাত শতাধিক হয়েছে। আন্দোলনটা সরকারবিরোধী না হওয়ার পরও সরকার এবং তার দলের ভয়াবহ দমন-পীড়ন আর হতাহতের কারণে আন্দোলনের তারুণ্য চেতনা ক্রমেই সরকার হটানোর দিকে চলে যাচ্ছে। এমনি স্বাভাবিক পরিণতির জন্যই বাংলা ব্লকেডের চেয়ে আরও কঠোর কর্মসূচি ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ মানে ‘সম্পূর্ণ অবরোধ’-এর ঘোষণা দেয় প্রধান সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম গত ১৮ জুলাই।

র‌্যাব হেলিকপ্টার থেকে গুলি করে মেরেছে মাদরাসার ছোটো শিক্ষার্থী জোবায়ের ইমনকে। মিরপুরের জানালা দিয়ে পুলিশের গুলি ঢুকে নিহত হয়েছে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাফকাত সামির। উত্তরায় আন্দোলনের বিপ্লবীদের পানি খাওয়ানো অবস্থায় পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছে মীর মুগ্ধ।

ধানমন্ডির ২৭ নম্বরে পুলিশ আর যুবলীগের হামলায় নিহত হয়েছে রেসিডেন্সিয়াল মডের কলেজের শিক্ষার্থী ফাইয়াজ ফারহান। ফাইয়াজের কথা মনে হতেই খুব কান্না পায় সৌরভের। সেদিন রাফা প্লাজার সামনে ফাইয়াজ সাথে ক্ষণিকের পরিচয় হয়েছি। চমৎকার স্লোগানের একটা টি-শার্ট পরে এসেছিল। স্লোগানটা যেন কী? হ্যাঁ মনে পড়েছে- “এ বিক্ষোভ রক্তে আগুন জ্বলা একটি প্রজন্মের ‘না’-সূচক।”

এ পর্যন্ত শুধু ঢাকা শহরে স্কুল শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে সত্তরজনের মতো। নিরস্ত্র আর শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের সশস্ত্র হামলা স্বাভাবিকই অভিভাবকদেরকে উদ্বিগ্ন করে তোলে। উদ্বিগ্ন এখন সৌরভ, তানভীর, জামান, রাফিদের মা-বাবারাও। টিএসসির অতি কাছাকাছি এলাকায় থাকায় ওরা যখন-তখন চলে আসে টিএসসি, রাজু ভাস্কর্য, শাহবাগ ইত্যাদিতে। আন্দোলনের ভয়াবহ তীব্রতার মুখে তাই ওদের মা-বাবারা যেতে দিচ্ছে না এখন আর। জামান ফাঁকি দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে টিএসসিতে এখন আছে। জামানের ফোনটা পেয়ে আরো মন উতলা হয়ে ওঠে সৌরভের।

আবার রাফিদ ফোন দেয় সৌরভকে, জামান আমাকে তো ফোন দিলো না, আমার ফোনটা ধরল না।

-মনে হয় মিছিলে আছে।

দুপুরের দিকে সৌরভ বাসা থেকে বের হওয়ার অনুমতি পায়। সাথে সাথেই রাফিদ তানভীরকে জানায়। তানভীর সাথে সাথে ওর আম্মুকে ফোনটা দিয়ে কথা বলতে বলে। ও প্রান্ত থেকে সৌরভকে বলে, কে বাবা সৌরভ?

-জি খালামণি, আমি সৌরভ।

-তুমি কি শাহবাগে যাচ্ছ?

-জি খালামণি। তানভীর.....

-আমি জানি তুমি তানভীরের কথা বলবে। আচ্ছা আমি ওকে দিতে পারি, কিন্তু।

-জি খালামণি, বলেন।

-দেখো, ওর বাবাও এ রকম মিছিল রাজপথে থাকত। তারপর তাকে তুলে নিয়ে গেছে, আজও পাই না।

কথাগুলোতে কান্না জড়িয়ে আসে। সৌরভ কিছু বলে না। উনি আবার বলেন, বাবা তোমার আম্মু কি আছে কাছে?

সৌরভ দৌড়ে গিয়ে মাকে ফোনটা দেয়। তিনি ফোনটা ধরেই বলেন, আসসালামু আলাইকুম আপা।

-ওয়া আলাইকুমুস সালাম। জিনাত আপা, আমার ছেলেকে ঘরে রাখতে পারছি না। ছেড়ে দিলাম। কী বলেন আপা? আল্লাহ বাকিটা দেখবেন।

কোনো কথা বলেন না কয়েক মুহূর্ত। তারপর শুধু শান্ত কণ্ঠে বলেন, ছেলেটাকেও আমি রাখতে পারছি না। তাই আমিও ছেড়ে দিলাম।

-আপা, শুধু ওদের না আমাদেরও এখন এই আন্দোলনে যাওয়া দরকার। আমাদের ভবিষ্যতের জন্যই এ আন্দোলনকে সফল হতে দেওয়া উচিত।

শান্ত ও গলা ধরা কণ্ঠে মিসেস জিনাত বলেন, আন্দোলনের জন্য আমার কোনো ভয় নেই। এ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন আমার আপনার সন্তানদের জন্যই। কিন্তু ভয়টা হলো বন্দুকের মুখে খালি হাতে আমার-আপনার সন্তানদের লড়াই। আবু সাঈদ, মুগ্ধ এদেরকে দেখুন। পাষাণ পুলিশ কীভাবে গুলি করেছে। আবার দেখছি গুলি করে মন্ত্রীকে জানায়, “গুলি করলে একটা মরে, বাকিটি যায় না, স্যার। এটাই বড়ো ভয়ের বিষয়।” কী পাষাণ দেখলেন পুলিশটা। ইচ্ছে হয় জুতা দিয়ে দুই গাল মেরে ফাটিয়ে দিই।

কিছুটা কান্নাজড়িত কণ্ঠে তানভীরের মা মিসেস মর্জিনা বলেন, আপা, আর বলবেন না এসব। আমি ওর বাবাকে হারিয়েছি। এখন ছেলেকেও হারাতে চাই না। ভাবছি ছেলেকে যখন ছেড়ে দিয়েছি, আমিও আন্দোলনে যাব, শাহবাগে যাব।

-আমিও যাব।

আন্দোলনে টিএসসি, রাজু ভাস্কর্য এখন স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত। মিসেস জিনাত, মিসেস মারজিনার মতো শত শত অভিভাবকও হাত তুলে স্লোগান দিচ্ছে।

আজ মা-বাবারও এসেছেন সন্তানদের জন্য বৈষম্যমুক্ত সমাজ গড়ে দিতে। মেধার গায়ে বুলেট লাগলে, জাতির হৃদয় রক্তাক্ত হয়। মায়ের চোখের অশ্রু এভাবেই রাজপথে বজ্র হয়ে নামে।


তেরো.

চারিদিকে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছেই। সাথে সাথে মা-বাবার দুশ্চিন্তাও বাড়ছে। একদিকে কমপ্লিট শাটডাউন, অন্যদিকে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, শহরে কারফিউ-যুদ্ধাবস্থার মতো এক ভীতিকর পরিস্থিতি চলছে এখন সারা দেশে। টিভি নিউজে, পত্রিকায় এবং নেটে খবর ছড়িয়ে পড়েছে হাজারের অধিক শহীদের সংখ্যা।

এত মানুষ মরেছে!

তারপরও তো মিছিলে আন্দোলনে মানুষের অংশগ্রহণ থামানো যাচ্ছে না। শুধু সৌরভদের মতো কিশোররাই নয়, মা-বাবা, বিভিন্ন পেশার সাধারণ মানুষজন নিয়মিতই আন্দোলনে, অবরোধে অংশ নিয়ে আন্দোলনকে আরো তাঁতিয়ে তুলছে। সরকারের নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে সাথে ছাত্রলীগ-যুবলীগ একযোগে আন্দোলনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। হয়তো এ কারণেই মৃত্যুর মিছিলটাও বড়ো হচ্ছে।

সাইফুল্লাহ ভাইয়ার ঘটনাটার পর থেকেই আজিমপুরে থমথমে অবস্থা। এমন থমথমে অবস্থার মধ্যেও এখন সকালবেলা আজিমপুর চৌরাস্তার মোড়ে আসে সৌরভ। চলে আসে ওর অন্য তিন সাথীও। ওখান থেকে ওরা দ্রুত চলে আসে রাজু ভাস্কর্যের সামনে। আন্দোলনের চলছে কমপ্লিট শাটডাউন আর সরকারের চলছে কারফিউ। এই দুয়ের আপেক্ষিক গুরুত্বে শাটডাউনটাই এখন তীব্রতর। কারফিউ তাই গৌণ।

সৌরভরা রাজু ভাস্কর্যের দক্ষিণে টিএসসির দেওয়ালঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ দেখে একটি অটো পালকি রিকশায় একটি রক্তাক্ত দেহ নিয়ে দুজন শিক্ষার্থী যাচ্ছে। রিকশার সাথে সাথে দৌড়ে চলতে চলতে কয়েকজন বলছে, সাইড প্লিজ, সাইড প্লিজ! আহত ভাইটির জন্য রক্ত লাগতে পারে, আপনারা রক্তের জন্য ইমার্জেন্সিতে আসুন।

থমকে দাঁড়ায় সৌরভরা। ভাবছে হাসপাতালে যাবে কি না? ঠিক তখনই আরেক দল আরেকটা রিকশায় দুজন আহতকে নিয়ে যাচ্ছে ঢাকা মেডিকেলের দিকে।

ওরা মেডিকেলের দিকে যাবে, তখনই দেখে তানভীরের আম্মু মার্জিনা খালামণিকে। সাথে আছে আরো কিছু খালামণি, উনারা স্লোগান দিচ্ছেন। সৌরভকে দেখে বলেন, ও তোমরা এখানে! তোমার আম্মু জিনাত আপা আসেননি?

ওরা একটু থামে। সৌরভ বলে। জানি না খালামণি, আসবে বলেছিল তো। আমরা মেডিকেলে ইমার্জেন্সিতে যাচ্ছি, অনেক ভাইয়া আহত।

কথাটা বলেই ওরা মেডিকেলের দিকে যেতে থাকে।

চানখারপুলের ওখানে ইমার্জেন্সি গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকেই দেখে ভয়াবহ পরিস্থিতি। আরো অনেক আহত শিক্ষার্থী, সাধারণ মানুষ আসছে। কেউ গুলিবিদ্ধ, কেউ লাঠির আঘাতে আহত। ঢাকা শহরের সব জায়গাতেই পুলিশের সাথে সাথে ছাত্রলীগ-যুবলীগ লাঠি নিয়ে হামলা চালাচ্ছে। তারই ফলাফল এই আহত। আল্লাহই জানেন নিহত হয়েছে কতজন!

গোয়েন্দা পুলিশ নাহিদ, আসিফ, বাকের মজুমদারকে তুলে নিয়ে গেছে। পুলিশ বলছে নিরাপদ হেফাজতে নিয়েছে। ওদিকে সরকারের তিন মন্ত্রী আনিসুল হক, মহিবুল আলম, আলী আরাফাত অন্য তিন সমন্বয়ক হাসনাত, সারজিস আর তানভীরকেও ধরে নিয়ে গোপন বৈঠকে বসেছে। বৈঠক থেকে এ তিন সমন্বয়কের নামে আট দফা দাবি ঘোষণা করা হয়। সরকারই তা প্রচার করে। প্রচার করা এ আট দফা দাবিতে কোটা সংস্কার বা আন্দোলনে মূল দাবি পূরণের নির্দেষ বা আশ্বাস কোনোটাই ছিল না। এমন দফা বা দাবি তো মানা যায় না। বাইরে থাকা সমন্বয়করাও বিচ্ছিন্ন। সরকার নেট বন্ধ করে দেওয়ায় যোগাযোগও করা যাচ্ছে না ঠিকমতো। সমন্বয়ক সালমান ঘটনাটা দেখে ঝুঁকি নিয়ে যাদের যাদের সম্ভব যোগাযোগ করার চেষ্টা করে। আবদুল কাদের, ফরহাদ, মাহিন সরকার, হান্নান মাসউদ এদের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়, তবে সবাই ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানে ছিল। বাইরে থাকা এসব কোনো সমন্বয়কই ওই সরকারি ৮ দফা মানেনি। মানার প্রশ্নই আসে না। তারা অনলাইন অ্যাক্টিভিটিতে জানিয়ে দেয়, সরকারের এসব দফা ভুয়া, বিভ্রান্তিকর। এরই মধ্যে সালমান আর আবদুল কাদেরের উদ্যোগে এবং ফরহাদসহ আরও কয়েকজনের সহযোগিতায় আন্দোলনকে আরও কার্যকর, গণমুখী ও তীব্র করতে ৯ দফা দাবি প্রণয়ন করা হয়। এ ৯ দফা আবদুল কাদেরের বাটন মোবাইলের ম্যাসেজ দিয়ে দিয়ে বিভিন্ন সাংবাদিকের কাছে পাঠানো হয়। এ কাজের সময় আবদুল কাদের বাসা ও লোকালয় থেকে দু-তিন কিলোমিটার দূরের এক মাঠে গিয়ে পাঠায়। সালমান দেশি ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে পাঠায়।

সরকার আর আন্দোলনের দুই ধারার দুই ধরনের দফা ঘোষণায় আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে ৯ দফা দাবির পক্ষে। পুলিশের আক্রমণও চরম অমানবিক, তীব্র হয়ে ওঠে। আহত নিহতের সংখ্যাও তাই বাড়তে থাকে দ্রুত।

ইমার্জেন্সির গেটে দাঁড়িয়ে সৌরভরা একটু হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। কী করবে! বুঝতে পারছে না। শুধু আহত আর আহত। এর মধ্যে কয়জন তো একদম নিস্তেজ। ট্রলি, হুইলচেয়ারেরও সংকট। সৌরভ বলে, চল তো ভেতর থেকে খালি ট্রলি, হুইলচেয়ারগুলো আমরা নিয়ে আসি।

সৌরভ একটা ট্রলি নিয়ে আসে সাথে মেডিকেলের একজন লোক। একজন আহতকে তুলতে যাবে, অমনি লোকটি বলে ২০০ টাকা লাগবে। কথাটা শুনেই পাশে থাকা এক তরুণ শিক্ষার্থী বলে টাকা কীসের জন্য? এটা তো মেডিকেলের ট্রলি।

-এমনই নিয়ম এখানে। টাকা লাগবে স্যার।

অমনি পাশ থেকে আরেকজন তার কলার চেপে ধরে দেয় থাপ্পড়। এই ইমার্জেন্সিতে অবস্থিত সাধারণ মানুষে আর মেডিকেলে বিশেষ লোকজন জড়ো হয়ে যায়। কথা-কাটাকাটি চলতে থাকে। এরই মধ্যে এক ডাক্তার এসে জানতে চান কী হয়েছে? ঘটনাটা শুনে মেডিকেলের লোকগুলোকে সরিয়ে দিয়ে উনি ছাত্রদেরকে বলেন, তোমরা ইনজুরড পেশেন্ট ওঠাও ট্রলিতে। ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডে নিয়ে যাও, আমরা দেখছি।

লোকজন বলাবলি করছে এ পর্যন্ত ১৫-২০ জনের মতো আহত এসেছে। কয়েকজন তো মরছেই।

ঠিক তখনই আরেকজন আহত আসে। তাকে দেখে আঁতকে ওঠে রাফিদ বলে, বেঁচে আছেনি?

-জ্ঞান নেই। হয়তো বেঁচে আছে।

সৌরভের এ কথায় আশপাশে কেউ কেউ বলে, না, মরে গেছে। আবার কেউ কেউ বলে, না বেঁচে আছে, তবে জ্ঞান নেই।

ওরা চেষ্টা করছে ট্রলি জোগাড় করে এনে এসব রোগীকে ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডে পাঠাতে।

আহত আসা একটু কম। ওরা ইমার্জেন্সি গেট দিয়ে বেরিয়ে রাস্তায় আসে। ঠিক তখনই ওদের সামনে একটি টিয়ারশেল এসে পড়ে। সাদা ধোঁয়া তীব্র গতিতে বেরুতে থাকে। চোখ-মুখ জ্বালা করছে। ওরা দ্রুত মেডিকেলের ভেতর ঢুকে গিয়ে দোতলার পর্যন্ত চলে যায়। দোতলা মাঝামাঝি এসে দাঁড়ায়। এ জায়গাটা চারদিকের যাতায়াত লবি, আর দুটি সিঁড়ি। ঠিক যেন চার রাস্তার মোড়!

একপাশে দাঁড়িয়ে মোবাইল নেট অন করে সৌরভ। কোনো নির্দেশনা আছে কি না, দেখছে।

আচমকা খুশি ভাব নিয়ে সৌরভ বলে, নতুন কর্মসূচি দিয়েছে।

-কী?

এই বলে রাফিদ ওর মোবাইলে নেট ওপেন করে। অন্যরাও তা-ই করে।

আগস্টের এক তারিখ সবাই ফেসবুক প্রোফাইল লাল রঙের করবে। এক অভিনব প্রতিবাদ।


চৌদ্দ.

গল্প শুনেছে যুদ্ধের। যুদ্ধের সময় সাধারণ মানুষ পালায়। রাস্তাঘাট থমথমে থাকে। গোলাগুলিতে একাকার হয়ে থাকে। এখনো রাস্তা থমথমে। মাঝে মাঝে গুলির শব্দ। হ্যাঁ, যুদ্ধের মতো মর্টারশেল, কামান কিংবা ক্ষেপণাস্ত্র নয়; এসব সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল। হৃদকাঁপানো ভীষণ শব্দ আর ওদিক শরীর জ্বালাপোড়া করার মতো তীব্র যন্ত্রণাদায়ক টিয়ারশেল। কিশোর বালক সৌরভের মাঝে এটাই যেন ভীষণ যুদ্ধের দিন। মনের চিন্তা ওদেরকে আন্দোলনে থাকতে হবে। রাজপথে থাকতে হবে। শহীদ মিনারে থাকতে হবে। রাজু ভাস্কর্যে থাকতে হবে। শাহবাগে থাকতে হবে। সাইন্সল্যাবে থাকতে হবে। আজিমপুরেও থাকতে হবে। ওদেরকে বাসায় আটকে রাখতে পারে না, তাই বাসাতেও এখন খুব একটা কড়াকড়ি নেই। শুধু সাধারণ একটি কথা-সাবধানে থেকো, মারামারি মাঝে যেয়ো না।

প্রতিদিন সকালে আজিমপুর মোড়ে আসে আগে। তারপর প্ল্যান করে কোন দিকে যাবে। এখন আর পাড়ার মাঠে খুব একটা যায় না।

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে যাবে আজ।

শহীদ মিনারে চলছে সমাবেশ গান। একপাশে ওরা দাঁড়িয়েছে। সৌরভ বলে, আমাদের অনেকগুলো কাজ করতে হবে।

-কী? কী কী করব?

রাফিদের কথা শেষ হতেই তানভীর বলে, সারা দেশে এখন যুদ্ধ চলছে আমরা এখন কী করতে পারি রে?

-কিন্তু যুদ্ধে ড্রোন মিসাইল এসব থাকবে। এখানে কোথায়? রাফিদ বলে। 

সৌরভ সাথে সাথে কৌতুকচ্ছলে বলে, আরে ধ্যাৎ! এটা এখনকার যুদ্ধ না, পানিপথের যুদ্ধ।

-পানিপথের যুদ্ধ মানে! ভীষণ চমকে যায় সবাই।

-শোন মোগলরা পানিপথের যুদ্ধে জয়ী হয়ে মোগল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল এ উপমহাদেশে। তখন যুদ্ধ হতো সামনাসামনি অস্ত্র নিয়ে। ভারতের পানিপথ নামক মাঠে সে যুদ্ধ হয়েছিল। আমরা কিন্তু এখন তা-ই করছি। রাজু ভাস্কর্য, শাহবাগ, যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, রংপুর, রাজশাহী, সিলেট, কুমিল্লা, বরিশাল, চট্টগ্রাম-দেশের সব জায়গায় আমরা সরাসরি মাঠে যুদ্ধ করতেছি। পুলিশ ও সরকার দলীয় লোকের সাথে আমরা শিক্ষার্থী ও সাধারণ জনগণ। পানিপথের তলোয়ারের সামনে তলোয়ারে যুদ্ধ হয়েছে। এখন মিছিলের সামনে শর্টগান-লাঠিতে। তেমনি দেয়ালে দেয়ালে গ্রাফিতি আঁকার সামনে শর্টগান-লাঠিতে। গানে গানের সামনে শর্টগান-লাঠিতে। এই দেখ শহীদ মিনারে এখন গান হচ্ছে, বিপ্লবী গান। এটাও এখনকার যুদ্ধের অস্ত্র। আমরা আমাদের অধিকার-দাবি নিয়ে মিছিল করলেও গুলি খাই। গ্রাফিতি এঁকে প্রতিবাদ জানালেও গুলি খাই। রাস্তায়-মোড়ে গান গেলেও গুলি খাই। সবগুলোই সামনাসামনি যুদ্ধ। বল এটা পানিপথের যুদ্ধ না!

সবাই সৌরভের কথা চুপ হয়ে শুনতে থাকে। হঠাৎ মোবাইলটা দেখিয়ে রাফিদ বলে, দেখ দেখ নতুন কর্মসূচি পেয়েছি।

-কি রে?

সবাই আগ্রহ নিয়ে দেখতে চায়।

-নতুন কর্মসূচির নাম ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোস’ অর্থাৎ ‘আমাদের বীরদের স্মরণ’।

-কী করতে হবে এ কর্মসূচিতে?

সাথে সাথে সৌরভ হাসি দিয়ে বলে, রাখ্, এই দেখ আরেকটা কর্মসূচি আছে?

সৌরভের এককথায় সবাই আবার বলে, আরও একটা? কী সেটা?

-জুলাই মাসকে লম্বা করার কর্মসূচি। মাস লম্বা করা কর্মসূচি বিশ্বে এই প্রথম।

-মানে?

বিস্ময় নিয়ে সবাই জানতে চায়।

হাসিভাব থামিয়ে স্বাভাবিকতায় সৌরভ বলে, আমরা থামিনি। আমাদের স্বপ্নও থামেনি। অতএব, জুলাইও থামবে না। অধিকারের দাবিতে বিজয় না হওয়া পর্যন্ত জুলাই চলবে। তার মানে জুলাই মাসের ৩১-এর পরের দিন আজ ৩২ জুলাই। তারপর ৩৩ জুলাই। এভাবে চলতে থাকবে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অফিসিয়াল ফেসবুকে ১ আগস্ট ২০২৪ তারিখে জানানো হয়, “জুলাই চলবে মুক্তি না আসা পর্যন্ত আজ ৩২ জুলাই”। লাল ব্লকের মধ্যে সাদা লেখায় এ কর্মসূচি জানানো হয়।

ওই পোস্টটা দেখিয়ে সৌরভ হাসতে হাসতে আবারও বলে, দেখ আমরা এখন থেকে আগস্ট মাসকে জুলাই মাসের হিসেবে গণনা করব।

-তাহলে ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোস’টা কী হবে রে?

সৌরভ এবার গম্ভীর হয়ে বলে, কর্মসূচিটা হলো-‘নির্যাতনের ভয়ংকর দিন-রাতগুলোর স্মৃতিচারণ, শহীদ ও আহতদের নিয়ে পরিবার এবং সহপাঠীদের স্মৃতিচারণ, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হওয়া নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে চিত্রাঙ্কন, গ্রাফিতি, দেয়াল লিখন, ফেস্টুন তৈরি, ডিজিটাল পোর্ট্রেট তৈরি প্রভৃতি।’

কথাটা শেষ করেই সবার দিকে তাকায়।

সৌরভ এবার উৎসাহ নিয়ে বলে, এই চল আমরা আমাদের এলাকার শহীদ খালিদ সাইফুল্লাহ ভাইয়ের বাসায় যাই। খালু, খালামণির সাথে কথা বলি, খোঁজখবর নিই। উনাদের পারিবারিক রক্তে এ আন্দোলন সিক্ত।

তানভীর বলে, চমৎকার! চল এখনই যাই।

ওরা আজিমপুর মোড় থেকে সাইফুল্লাহর বাসার উদ্দেশে রওনা দেয়। ওই তো লালবাগের আমলিগোলায় ওদের বাসা।

অল্প সময়ের মধ্যে ওরা বাসায় হাজির। অনেক মানুষ এসেছেন। হাফেজ রাজ্জাক জামেয়ার প্রিন্সিপাল নিজাম উদ্দিন স্যারও এসেছেন। ওরা চমকে যায় মুহিত আর সালমান ভাইয়াকে দেখে। উনারা এসেছেন সাইফুল্লাহ ভাইয়ার বাবা-মায়ের সাথে দেখা করতে। এলাকার রাশেদ ভাইও আছেন।

ওরা একপাশে দাঁড়ায়। ধীরে ধীরে খালুর কাছে যায় ওরা। সৌরভ বলে, খালু সাইফুল্লাহ ভাইয়া আমাদের খুব আদর করতেন। আমরা উনাকে খুব মিস করব। আল্লাহ উনাকে ভালো রাখুন।

খালিদ সাইফুল্লাহর বাবা কামরুল হাসান চোখ মুছতে মুছতে ওদের আদর করে বলেন, তোমরা লেখাপড়া করে একজন ভালো মানুষের মতো মানুষ হও, দেশের জন্য কাজ করো। তবেই সাইফুল্লাহর রক্ত সার্থক হবে।

সালমান ভাইয়া কাছে টেনে আদর করেন। তারপর তিনিও বলেন, তোমরা আগামীর নাগরিক। তোমরা যদি ভালো থাকো দেশ ভালো থাকবে। লেখাপড়া করে নিজেকে দেশের জন্য তৈরি করা তোমাদের একমাত্র কাজ। এটা ভুলো না কিন্তু।

খালিদ সাইফুল্লাহর বাবা ও মায়ের থেকে বিদায় নিয়ে ওরা বেরিয়ে আসে।

ঘোষণার সাথে সাথে এভাবেই পালিত হচ্ছে “রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোস” কর্মসূচি।

খালিদ সাইফুল্লাহর বাসা থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ওরা আবার চলে আসে আজিমপুর মোড়ে। এখানে এখন অনেক মানুষ জড়ো হয়ে গেছে। পুলিশ মাঝে মাঝে মানুষদেরকে রাস্তা থেকে সরিয়ে দিতে চেষ্টা করে। স্লোগান আর মুহুর্মুহু করতালিতে আজ আজিমপুর মোড়টাও বেশ উদ্দীপ্ত।

আজিমপুর মোড় থেকে ওরা ভিসি চত্বর, কলা ভবনের ভেতর দিয়ে নজরুল মাজার এলাকায় আসে। সামনে রাস্তায় উঠতে পারে না। যুদ্ধ। ভয়াবহ এক যুদ্ধ পরিস্থিতি। টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড, সাথে রয়েছে স্নাইপারের গুলি। পুলিশের প্রচণ্ড হিংসাত্মক আর অমানবিক অভিযান। একদিকে সশস্ত্র পুলিশ আরেক দিকে নিরস্ত্র ছাত্র; আত্মরক্ষার্থে তাই ইট-পাটকেলই ছাত্রদের ভরসা। সৌরভরাও সবার মতোই ইট ছোঁড়াতে জড়িয়ে পড়ে। কটি ইট ছুঁড়েই ওরা ছেড়ে দেয়। অভ্যাস নেই, তাই হাত ব্যথা হয়ে গেছে। একটু পিছিয়ে ওরা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের কাছে এসে দাঁড়ায়। এখানে দাঁড়িয়ে দেখছে ইট ছোঁড়াছুঁড়ি আর পুলিশের টিয়ার গ্যাস ছোঁড়া। সাউন্ড গ্রেনেড মারা। পুলিশের আক্রমণ একটু বেশি। এসব দেখে জামান বলে, কি রে, আমরা গাজার যুদ্ধে এসে গেছি মনে হয়!

ওই ইট পাটকেল টিয়ারশেলের যুদ্ধের ভেতর দিয়েও ওরা দেখল অটোরিকশায় করে অনেক আহতকে নিয়ে যেতে। তা দেখে সৌরভ বলে, ইস আজও মনে হয় মেডিকেলে অনেক আহত মানুষ এসেছে।

চিন্তিত সৌরভ এবার বলে, চল আমরা আবার হাসপাতালে যাই। ঢাকা মেডিকেলে। ওখানে গিয়ে আমরা আহতদের সেবা করি।

আন্দোলন রুখে রাখা যায়, কিন্তু চেতনা রোখা যায় না। ওরা কিশোর। এ আন্দোলন ওদেরও আন্দোলন। এখানে দাঁড়াতে পারেনি পুলিশের টিয়ারশেলের ঝাঁজে। তাই বলে কি থেমে যাবে ওদের চেতনা, আন্দোলনের চেতনা। ওদের চঞ্চল ও দুরন্ত মন আন্দোলনকে সহায়তা করার জন্যই কেঁদে ওঠে। আর সেই আকুলতাই সৌরভের কণ্ঠে আসে মেডিকেলে গিয়ে আহতদের চিকিৎসা করা।

ঢাকা মেডিকেলে যাবে, এমন সময় তানভীর বলে ওঠে-এই দেখ্, দেখ্. . .।

সবাই আগ্রহ নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে বলে, কী!

-এই দেখ নেট আসছে। ফেসবুকে আসছে। এই দেখ ‘দ্রোহযাত্রা’! এটা কী?

-এটা আবার কী!

কৌতূহল নিয়ে জানতে চায় সৌরভ।

-এই দেখ লাইভে কী দেখাচ্ছে।

মোবাইলটা এগিয়ে দেয় তানভীর।

শিক্ষক ও নাগরিক সমাজের ডাকা দ্রোহযাত্রা। জাতীয় প্রেসক্লাব থেকে শুরু হয়ে দোয়েল চত্বর টিএসসি হয়ে এখন শহীদ মিনারে এসে থেমেছে। ওখানে সকাল থেকেই প্রতিবাদী সমাবেশ করছে ডাক্তার, মেডিকেল ও ডেন্টাল শিক্ষার্থীরা। বৈষম্যবিরোধী এই আন্দোলনে হতাহতের ঘটনায় বিচারের দাবিতে তাদের এ প্রতিবাদ সমাবেশ। কয়েক হাজার মানুষ নিয়ে দ্রোহযাত্রাটি ওই প্রতিবাদ সমাবেশে এসে একাত্মতা ঘোষণা করে। ওরাও এর প্রতিবাদ জানায়। বিচার দাবি করে।

টিয়ারশেলের ঝাঁজে আর দাঁড়াতে পারছে না সৌরভরা। পুরো মুখ জ্বলছে, ঘাড়, হাত জ্বলছে। মোবাইলটা তানভীরকে দিয়ে সৌরভ বলে, চল তাড়াতাড়ি ওখানেই যাই। শহীদ মিনারের প্রতিবাদ তো আমাদেরও প্রতিবাদ। রাজপথে ছাত্রদের পা পড়লে শোষকরা কাঁপে রে, বুঝলি?


পনেরো.

“আমি বায়ান্ন দেখিনি, উনসত্তর দেখিনি, নব্বই দেখিনি। আমি দেখছি চব্বিশ। চব্বিশ আমাকে দেখতে হবে। চব্বিশ আমাকে ধারণ করতে হবে। চব্বিশ আমাকে জয় করতে হবে। আজ ছত্রিশ জুলাই মানে পাঁচ আগস্ট। ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ সফল করে চব্বিশকে জয় করতে চললাম। গণভবন দখল করে এ সরকারকে আমরা তাড়াতে চললাম।”

কথাগুলো বলে সৌরভ বাসা থেকে বের হয়ে যায়। ওর বাবা সালেহ আকরাম নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে শুধু বলেন, সাকসেস হও বাবা। এখন তোমরাই পারবে। এখন তারুণ্য তোমাদের, যুদ্ধে যাবার সময়ও তোমাদের।

দরজা খুলে সিঁড়ি বেয়ে নেমে যায় সৌরভ।

বাসা থেকে নিচে নেমে গেছে সৌরভ। তানভীর, রাফিদ, জামান এসে দাঁড়িয়ে আছে। সকাল সাতটার এ ভোরেই ওরা শহীদ মিনারে যাবে। আজ চূড়ান্ত হিসাব-নিকাশের দিন-লং মার্চ টু ঢাকা। সারা দেশ থেকে ঢাকায় আসবে গণভবন ঘেরাও করতে। গণভবন ঘেরাও করে সরকারকে তাড়াতে হবে।

এই যে মাসাধিকাল ধরে এত হাজার হাজার মানুষ মারল, আহত করল-এসবের বিচার কে করবে? এ সরকার ক্ষমতায় থাকলে তো বিচার হবে না। ছাত্র-জনতার মূল দাবি কোটারও সংস্কার হবে না। মেধাও রক্ষা করতে পারব না। তাই চাই নতুন বাংলাদেশ। নতুন বাংলাদেশ চাইতে হলে এ সরকারকে বিদায় করতেই হবে। তাড়াতেই হবে। বিজয়ী নতুন সরকার আনতে হবে।

৩ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম ঢাকা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিশাল সমাবেশে ঘোষণা করেন-

“আমরা বর্তমান স্বৈরাচারী সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করছি।”

সরকারকে তাড়ানোর আন্দোলনের এ ১ দফা বাস্তবায়নের জন্যই ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি দেওয়া হয়।

ওরা শহীদ মিনারের পাদদেশে এসে দাঁড়ায়। ডাক্তার ও চিকিৎসা শিক্ষার্থীরা এবং ঢাকা শহরের এই দক্ষিণাঞ্চলের পুরনো ঢাকার ছাত্র-জনতা শহীদ মিনারের সমবেত হবে। এখান থেকে লং মার্চ করে গণভবনে যাবে। ঢাকার চারিদিকের প্রবেশপথ দিয়ে আজকের লং মার্চে ঢাকায় প্রবেশ করবে ছাত্র-জনতা।

শহীদ মিনারে অনেক মানুষ উপস্থিত হয়েছে। আচমকা পুলিশ টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ছোঁড়ে। রাবার বুলেটেরও ফায়ার করে। শহীদ মিনারের পশ্চিম দিক থেকে একদল ছাত্র লাঠি-হকিস্টিক নিয়ে আসে। শহীদ মিনারে উপস্থিত সবাই প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করে।

শহীদ মিনার থেকে চানখারপুল-পুরো এলাকা রণক্ষেত্র। টিয়ারশেল, জলকামানের গরম পানি আর সাথে আছে এখন সরাসরি বুলেট ফায়ার। ছাত্র-জনতাও উত্তেজিত। একদিক দিয়ে ছত্রভঙ্গ করে ওরা আবার ঘুরে একত্র হয়।

সৌরভরা ছোটো মানুষ, আর থাকতে পারছে না। ওরা তাই দ্রুত হাসপাতালে ভেতর দিয়ে ইমার্জেন্সি এলাকার দিকে চলে যায়। এখানে এ চানখারপুল এলাকাতেও গোলাগুলি ধাওয়া-পালটা ধাওয়া চলছে খুব।

খবর ছড়িয়ে পড়েছে বিশাল জনমানুষের স্রোত উত্তরার দিক থেকে ঢাকা শহরে প্রবেশ করতেছে। গাবতলী দিয়েও বিশাল জনমানুষের স্রোত ঢাকামুখী। যাত্রাবাড়ীতে একটি জনমানুষের স্রোত পুলিশ আর স্থানীয় আওয়ামী লীগ-যুবলীগ আটকে দেওয়ার চেষ্টা করছে। প্রচণ্ড মারামারি আর গোলাগুলি হচ্ছে। শহীদ মিনারের দলটি বারবার সংগঠিত হয়ে সামনের দিকে আগাতে যাচ্ছে। সবগুলো দলের গন্তব্য গণভবন ঘেরাও করা। জাতীয় সংসদের পাশে আসাদগেট, সাইন্সল্যাব, ফার্মগেট, মহাখালী, মিরপুর ১০-বলা যায় পুরো ঢাকা শহর লোকে লোকারণ্য। “লং মার্চ টু ঢাকা” কর্মসূচিতে সাড়া দিয়েছে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, পেশাজীবীসহ নানা ধরনের মানুষ।

একদিকে মানুষের মিছিল অবরোধ গণভবনমুখী যাত্রা, অন্যদিকে পুলিশ এবং সরকার দলীয় লোকদের লং মার্চ ঠেকানোর প্রচেষ্টা। তবে সাধারণ মানুষের উপস্থিতি এত বেশি, পুলিশ কুলিয়ে উঠতে পারছে না। কোথাও কোথাও পুলিশ ছেড়ে দিয়েছে অ্যাকশন। আবার কোথাও পুলিশ খুব খুব বেপরোয়া, ভয়ংকর।

ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডের সামনে এসে দাঁড়ায় সৌরভরা। হঠাৎ দেখে ওদের বয়সী এক কিশোরকে ধরাধরি করে নিয়ে আসছে কয়েকজন কিশোর। প্রচুর রক্ত ঝরছে, নিস্তেজ দেহ। ঘামে আর আহত কিশোরের রক্তে ওই সহযোগী কিশোররাও একাকবার।

-আহ...! একি! ও তো নড়ছে না...!

কথাগুলো বলতে বলতে সৌরভও এগিয়ে গিয়ে কিশোরটিকে ধরে। এগিয়ে আসে কজন। তানভীর, জামান, রাফিদ ওরা একটা ট্রলি নিয়ে আসে।

-গুলি লেগেছে। সরাসরি গুলি। এমন আহত আরও কজন হয়েছে।

সাথে থাকা এক কিশোর বলে। তারপরই আবার সবাইকে বলে, তাড়াতাড়ি ওকে তোলেন ট্রলিতে।

ট্রলিতে ওঠাতে ওঠাতে সৌরভ জিজ্ঞেস করে, তুমি কি ওর সাথে এসেছ?

-হ্যাঁ, ও আমাদের বন্ধু আনাস। শাহরিয়ার খান আনাস। আমরা সবাই সকাল থেকে একসাথে এখানে।

-কোথা থেকে এসেছ?

-গেন্ডারিয়া থেকে। আমরা সবাই গেন্ডারিয়া হাইস্কুলে পড়ি।

সৌরভ সাথে সাথে বলে, আমরাও স্কুলে পড়ি। আজিমপুরের ওয়েস্ট অ্যান্ড হাইস্কুলে। তবে তো তোমরা আমাদেরও বন্ধু। এ আন্দোলনেরও সাথী।

দ্রুত নিয়ে যায় ট্রলিটা ইমারজেন্সি ওয়ার্ডে। নিস্তেজ শরীর। বিপজ্জনক অবস্থা।

তখনও চানখারপুলে গোলাগুলি ধাওয়া-পালটা ধাওয়া চলছে। হতাহত বেড়েই চলছে। একের পর এক হতাহতদের নিয়ে আসা হচ্ছে। ঠিক তখনই লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ে খবর সেনাপ্রধান নাকি ভাষণ দেবে জাতির উদ্দেশে। মোবাইলে লাইভে দেখা যাচ্ছে মানুষের মধ্যে কেমন যেন উৎসব উৎসব ভাব। বিজয় কি তবে সন্নিকটে? এদিকে আনাসের কী অবস্থা জানার জন্য উদগ্রীব ওরা।

ডাক্তার ইমারজেন্সি ওয়ার্ল্ড থেকে বেরিয়ে এসে বলেন, এই ছেলেটার সাথে কে এসেছে?

সেই কিশোর বলে, আমরা আছি, আমরা আছি।

-দুঃখিত।

এ বলে তিনি আবার ওয়ার্ডে ঢুকে যান। ওরা কেঁদে উঠে হাউমাউ করে। একসাথে এতগুলো কিশোরের হাউমাউ কান্না। ভারী হয়ে ওঠে ইমারজেন্সি এলাকা। ওদিকে সেনাপ্রধানের ভাষণের খবরে উৎসব ভাব।

সৌরভ কান্না স্বরে এগিয়ে এসে বলে, আমাদের বন্ধুটাও শহীদ হলো এ আন্দোলনে! আমাদের সামনেই শহীদ হলো? ওর এ তাজা শহীদে বিজয়ের বাতাস পাচ্ছি? তবে কি শেষ হাসিটাই রক্তাক্ত পথের সব কান্নাকে সার্থক করে তুলবে? 

কথাগুলো বলতে বলতে সৌরভ কেঁদে দেয়। কাঁদছে রাফিদ। কাঁদছে জামান, তানভীর আরও কেউ কেউ। জড়ো হয়েছে অনেক মানুষ। ঠিক তখনই মেডিকেল পুলিশ এসে তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয় আনাসের লাশটা।

সৌরভরা আর ওখানে থাকতে পারে না। একটু সরে এসে কাঁদতে কাঁদতে বলে, ও আমাদের সমবয়সী স্কুলবন্ধু। আজ এই বিপ্লবের দিন ও আমাদের সামনেই মরে গেল পুলিশের গুলিতে। এসব রক্তের কি কোনো বদলা পাব না আমরা? আমাদের আন্দোলন কি বিজয় হবে না?

হঠাৎ করে হাসপাতাল চত্বরে একটি স্লোগান ওঠে-পালাইছে, পালাইছে, স্বৈরাচার পালাইছে।

চমকে সৌরভ বলে, কী হইছে রে? স্বৈরাচার পালাইছে-মানে সরকারের পতন?

দ্রুতই ঢাকা মেডিকেলের এই ইমার্জেন্সি এলাকার রূপ বদলে যায়। পালাইছে-স্বৈরাচার পালাইছে স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে।

খবর রটে যায় চারিদিকে।

গণভবনমুখী গণযাত্রায় ভীত হয়ে সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা আত্মসমর্পণ করেছেন। শেখ হাসিনা এবং তার বোন রেহানা পালিয়ে ভারতের দিকে চলে গেছেন সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে চড়ে। পালানোর সে ভিডিও ইন্টারনেটে ভাইরাল হয়ে গেছে এরই মধ্যে। জনতার পা সম্মিলিতভাবে সামনে আগালে শাসকের শক্তি থেমে যায়। পনেরো বছরের দোর্দণ্ডপ্রতাপ এক নিমিষেই উড়ে গেল হেলিকপ্টারে।

গণভবন জয় করতে সাধারণ মানুষের ঢল নেমেছে শেরেবাংলা নগরের দিকে।

সৌরভ চোখ মুছতে মুছতে আনাসের বন্ধুদের বলে, বিজয়ের চূড়ান্ত ক্ষণে আনাস জীবন দিলো; কিন্তু বিজয় দেখতে পেল না। বিজয়ের শেষ শহীদ হয়তো আনাসই। কিন্তু ওর মা! ওর বাবা! ওনারা কী জানেন? বিজয়ের আনন্দ আর আনাস শহীদের শোক-সমান্তরাল এখন এ সময়ে।

শহীদ আনাসের সহপাঠী বন্ধুটি সৌরভকে বলে, তোমরা যাও, গণভবনের দিকে যাও। তাড়াতাড়ি যাও। বিজয়ের এ মাহেন্দ্রক্ষণটা তোমাদের থেকে বঞ্চিত হলে আনাসের আত্মদান অপূর্ণ থেকে যাবে। আনাসহারা গোধূলির এ আগুনে সারাদিনের পোড়া শরীরে এখন স্নিগ্ধতা অনুভব করছি।

যাও। তাড়াতাড়ি যাও।

ছত্রিশ জুলাইয়ের বিজয়-উৎসবটা গণভবনে গিয়েই করো।

[সমাপ্ত] 

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ