দেশের জন্য ভালোবাসা
প্রবন্ধ নিবন্ধ শাহাদাৎ সরকার মার্চ ২০২৬
বন্ধুরা দেশের জন্য ভালোবাসার বান দেখেছ তোমরা? নিশ্চয়! ২০২৪-এর বর্ষা বিপ্লবের উত্তাল সময়ের চিত্র এখন জীবন্ত তোমাদের সামনে। তোমরা দেখেছ এদেশের মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায়ে কীভাবে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিল আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ওয়াসিম। ফ্যাসিবাদী শাসনের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মিছিলে। বাঙালি সব সময়ই এমনভাবে থেকেছে সরব। প্রাচীন বাংলা থেকে বর্তমান। তোমাদের মনে আছে পাল শাসনামলে ব্রাহ্মণদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে দীব্বক করেছিলেন কৈবর্ত্য বিদ্রোহ। মধ্যযুগে দিল্লির শাসনের বিরুদ্ধে বারো ভূইঁয়া নেতা ঈসা খাঁর বিদ্রোহ। ব্রিটিশ শাসনামলে শরীয়তুল্লাহর ফারায়েজী আন্দোলন, তিতুমীরের বাঁশের কেল্লার বিদ্রোহ, ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ, ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, ১৯৪৭ সালের আজাদি আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় বায়ান্নোর রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা। প্রতিটি আন্দোলনের পেছনে ছিল নিখাদ দেশপ্রেম। দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য ভালোবাসা। আর তাই এসব আন্দোলন আমাদের জাতীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ইতিহাসের বাঁক পরিবর্তনকারী এই সমস্ত ঘটনা শুধু ইতিহাসের পাতায় আবদ্ধ থাকেনি, এগুলো হয়ে উঠেছে শিল্প-সাহিত্যের অংশ। আমাদের আজাদি আন্দোলনের সময় অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছিল কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা। তবে তোমাদের মতো কিশোরদের জন্যও তিনি সাহসের বীজ বুনেছিলেন ‘খোকার সাধ’ কবিতায়-
আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে?
তোমার ছেলে উঠলে গো মা রাত পোহাবে তবে!
এটি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময়ে সৃজিত হলেও জুলুমের প্রতিবাদে মজলুমের জাগরণে এর ভূমিকা চিরকালীন।
তো যা বলছিলাম, মার্চ মাস মানে স্বাধীনতার মাস। তোমরা জানো, ২৬ মার্চ আমাদের স্বাধীনতা দিবস। এই দিবসটি আমাদের জাতীয় জীবনে অতি গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, স্বাধীনতা অর্জনের মধ্য দিয়ে আমরা বাঙালি মুসলমান গড়ে তুলি একটি বাংলা ভাষাভিত্তিক স্বাধীন রাষ্ট্র। যা অন্য কোনো অঞ্চলের বাংলা ভাষী জনগোষ্ঠী এখনো করতে সক্ষম হয়নি। তো বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি আঙ্গিক হলো কিশোর কবিতা। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের কিশোর কবিতায় স্বাধীনতা হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। অনেকেই স্বাধীনতা নিয়ে কবিতা লিখেছেন। খ্যাতিমান হয়েছেন। আমরা হয়তো সীমাবদ্ধতার কারণে সবার লেখা বা নাম উল্লেখ করতে পারব না। তবে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন কবির কবিতা উপস্থাপনের চেষ্টা করব।
আমাদের স্বাধীনতা একদিনে অর্জিত হয়নি। তার রয়েছে দীর্ঘ প্রেক্ষাপট। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের আগেই পূর্বে পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) স্বাধীনতা পূর্ব কতগুলো আন্দোলন হয়। এর মধ্যে উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান উল্লেখযোগ্য। কারণ এই গণঅভ্যুত্থানই আমাদের স্বাধীনতা-সংগ্রামের আন্দোলনকে করে বেগবান। উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সেই সময়কে তুলে ধরেছেন কবি আল মাহমুদ এভাবে-“ট্রাক! ট্রাক! ট্রাক!/ শুয়োরমুখো ট্রাক আসবে/ দুয়োর বেঁধে রাখ।/ কেন বাঁধবো দোর জানালা/ তুলবো কেন খিল?/ আসাদ গেছে মিছিল নিয়ে/ ফিরবে সে মিছিল।/ ট্রাক! ট্রাক! ট্রাক!/ ট্রাকের মুখে আগুন দিতে/ মতিয়ুরকে ডাক।/ কোথায় পাবো মতিয়ুরকে/ ঘুমিয়ে আছে সে!/ তোরাই তবে সোনামানিক/ আগুন জ্বেলে দে।” (উনসত্তরের ছড়া-১)
কবি আসাদ চৌধুরী লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘তখন সত্যি মানুষ ছিলাম’। এই কবিতায় তিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের চিত্র তুলে ধরেন প্রতীক-উপমার মাধ্যমে। কবিতাটি এরূপ-“নদীর জলে আগুন ছিল/ আগুন ছিল বৃষ্টিতে/ আগুন ছিল বীরাঙ্গনার/ উদাস-করা দৃষ্টিতে।/ আগুন ছিল গানের সুরে/ আগুন ছিল কাব্যে,/ মরার চোখে আগুন ছিল/ এ কথা কে ভাববে?/ কুকুর-বেড়াল থাবা হাঁকায়/ ফোঁসে সাপের ফণা/ শিং কৈ মাছ রুখে দাঁড়ায়/ জ্বলে বালির কণা।/ আগুন ছিল মুক্তি সেনার/ স্বপ্ন-ঢলের বন্যায়-/ প্রতিবাদের প্রবল ঝড়ে/ কাঁপছিল সব-অন্যায়।”
বিখ্যাত ছড়াকার সুকুমার বড়–য়ার একটি বহুল প্রচলিত ছড়া রয়েছে ‘মুক্তিসেনা’। যে ছড়ায় তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন এভাবে-“ধন্য সবাই ধন্য/ অস্ত্র ধরে যুদ্ধ করে/ মাতৃভূমির জন্য।/ ধরল যারা জীবন বাজি/ হলেন যারা শহীদ গাজি/ লোভের টানে হয়নি যারা/ ভিনদেশিদের পণ্য।/ দেশের তরে ঝাঁপিয়ে পড়ে/ শক্ত হাতে ঘায়েল করে/ সব হানাদার সৈন্য/ ধন্য ওরাই ধন্য।/
এক হয়ে সব শ্রমিক কিষাণ/ ওড়ায় যাদের বিজয় নিশান/ ইতিহাসের সোনার পাতায়/ ওরায় আগে গণ্য।”
সেদিন মানে ১৯৭১ সালে যেমন আমরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের লড়াইয়ে, ঠিক তদ্রƒপ ২০২৪-এর বর্ষা বিপ্লবেও দিল্লির আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে স্লোগানে স্লোগানে মুখর করে তুলেছিলাম রাজপথ। জীবন বাজি রেখে আমরা পতন ঘটাতে সক্ষম হয়েছি ফ্যাসিস্ট খুনি হাসিনার। জেনজিরা এটা স্বাধীনতা ২.০ বলে উল্লেখ করছে। আমাদের প্রিয় কবি আবদুল হাই শিকদার কিশোরকণ্ঠে কবিতা লিখেছেন-“মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছি মুগ্ধতাময় দেশে,/ লক্ষ-কোটি প্রভাত আসে দেশকে ভালোবেসে।/ মুগ্ধ ছিল মুগ্ধ আছে রক্তধারা বেয়ে,/ মুগ্ধ হয়ে থাকুক জেগে দেশের ছেলেমেয়ে।/ এমন মোহন মুগ্ধ মানুষ কে দেখেছে আর,/ দেশের সীমা পেরিয়ে ছেলে হয়েছে সবার।/ রাত পোহাবে প্রভাত হবে মুগ্ধ কি আর নাই?/ সব হৃদয়ে তার বাড়িঘর সব মানুষের ভাই।/ চাঁদনি রাতে মুগ্ধ হব দুপুরবেলার ঘাম,/ স্বাধীনতার সব মিছিলে থাকবে তারই নাম।”
এভাবেই দেশ প্রেমিক নাগরিক দেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কেন পড়ে? সে কেবল দেশকে প্রাণের চেয়েও ভালোবাসার কারণেই। কবি মোশাররফ হোসেন খান যেভাবে বলেছেন-
স্বদেশ আমার ব্যাকুল হৃদয় আকুল করা গান
দেশের জন্য ভালোবাসা বান ডেকেছে বান।
আরও পড়ুন...