ধূমকেতুর কান্না

সাইন্স ফিকশন সরকার হুমায়ুন মার্চ ২০২৬

পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব যত বেশিই হোক না কেন-তবুও এর আলো ও উত্তাপে শান্ত পৃথিবী, পরিপূর্ণ ফুল-ফল, পরিতৃপ্ত জীববৈচিত্র; এই কি যথেষ্ঠ নয়? প্রশান্ত মনে বিশাল আকাশপানে তাকালে আবছা আলো ছায়ায় নীলাভ জোনাক-জ্বলা যেসব তারকারাজি কল্পজগতে দোলা দেয় এরাও আমাদের সূর্যের প্রতিরূপ।

অগনিত গ্যালাক্সি-নীহারিকা তারা-নক্ষত্র, গ্রহ-উপগ্রহ, ধুমকেতু এবং উল্কা-গ্রহানু নিয়ে এই বিপুল আয়তনের মহাবিশ্ব। এরই বুকে সুজলা-সুফলা শস্য শ্যামলা পৃথিবীতে আমাদের বসবাস। সৌন্দর্যের লীলাভূমি হয়ে আকাশ আমাদের চিরকাল আকৃষ্ট করে। শুধু রং আর রং মাখিয়ে আকাশ তার মহাশূন্যতার রাজত্বকে সাজিয়ে রেখেছে এক অজানা রহস্যে। এই অজানাকে জানার আগ্রহ মানব মনের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। দুনিয়াকে জানতে এই সীমাহীন আঙিনার যতই গভীরে মানুষ প্রবেশ করছে অনুসন্ধিষ্ণু মনে ততই বাড়ছে কৌতূহলী প্রশ্ন আর প্রশ্ন। একটি প্রশ্নের উত্তর না মিলতেই নতুন করে দানা বাঁধছে হাজার জিজ্ঞাসার। ইস্টার এই রহস্যময় তারকালোকের বাসিন্দা। 

ইস্টার তখন একজন তরুণ তারকা। সে সব সময় সুপারনোভা হওয়ার জন্য স্বপ্ন দেখতো।

মহাকাশ রাজ্যের সবার চাইতে সে নিজেকে উজ্জ্বল রাখার জন্য চেষ্টা করতো। তার বন্ধু স্টারলাকে দেখাতে চাইতো; সেই তারকালোকের আকাশের সবচেয়ে সুন্দর তারা।

সে প্রতিদিন কঠোর পরিশ্রম করতো। তার ঔজ্জ্বল্য ধরে রাখার জন্য জ্বালানি প্রচুর পরিমাণে পোড়াতো। ভর বেড়ে আকারে সে আরও বড় হতে থাকলো।

সে সব সময় আশা পোষণ করতো, একদিন সে ঠিকই তার প্রত্যাশার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যাবে। আলো ও শক্তির একটি মহিমান্বিত বিস্ফোরণে সে একদিন বিস্ফোরিত হবে।

শিরিন অবশ্য ইস্টারের এমন উচ্চাকাক্সক্ষা সমর্থন করতো না। তারা ছিল বাল্য বন্ধু। 

শিরিন (তারার নাম) ভাবতো যে, ইস্টার খুব অহংকারী, খুব উচ্চাভিলাষী এবং খুব বেপরোয়া। তাই সে ধূমকেতুর সঙ্গ পছন্দ করতো। যে একজন ভদ্র এবং দুঃসাহসিক ভ্রমণকারী ছিল।

ধূমকেতু প্রতি কয়েক বছর পরপর শিরিনকে দেখতে যেত। তারা একসাথে মজা করতো। মহাবিশ্বের বিস্ময়কর বিষয়গুলো নিয়ে অন্বেষণ করতো। 

ইস্টার ধূমকেতুকে হিংসা করতো এবং তাকে ঘৃণা করতো। সে ধূমকেতুকে বোহেমিয়ান, ভবঘুরে এবং যাযাবর ভাবতো।

ধূমকেতু এবং শিরিনের মধ্যে যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক; এটা ইস্টার কখনো মেনে নিতে পারতো না। বিষয়টি নিয়ে সে ক্লাস্টারের নিকট অভিযোগ করেছিল। এই দ্বন্দ্বের জন্য ধূমকেতুকে সে চ্যালেঞ্জ করেছিল।

ধূমকেতু তার চ্যালেঞ্জ প্রত্যাখ্যান করেছিল। সে যুদ্ধ করতে চায় না বলে। ইস্টার খুব জোরে সোরে বলেছিল যে, সে ধূমকেতুকে শিরিনের সঙ্গে আর কখনো দেখা করার সুযোগ দেবে না।

ধূমকেতু মেনে নিয়েছিল, কিন্তু শুধুমাত্র যদি ইস্টার তাদের একা ছেড়ে দেয়।

এই নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছিল। বিষয়টি মিমাংসার জন্য ইস্টার, ধূমকেতু এবং শিরিনসহ অন্যান্য নক্ষত্র দূরের আকাশে একটি নিরপেক্ষ অবস্থানে মিলিত হয়েছিল।

ইস্টার ছিল আত্মবিশ্বাসী এবং ধূমকেতুকে নিয়ে টানাটানি করতো। ধূমকেতু শান্ত ছিল এবং ইস্টারকে উপেক্ষা করতো। ধূমকেতুর ওপর একদিন ইস্টার বজ্রপাতের মতো ভয়ানক শক্তি চার্জ করেছিল। যেন ধূমকেতু টুকরো টুকরো হয়ে চিরতরে ধ্বংস হয়ে যায়। ধূমকেতু ইস্টারকে ফাঁকি দিয়ে তার লম্বা লেজের মাধ্যমে চাবুক মেরে কেটে পড়েছিল। ইস্টার হতবাক হয়ে গেল এবং তীব্র ব্যথা অনুভব করল।

ধূমকেতু তার পদক্ষেপের পুনরাবৃত্তি করে আবার ইস্টারকে আঘাত করেছিল। ইস্টার রাগান্বিত হয়ে ধূমকেতুকে ধরার চেষ্টা করছিল। ধূমকেতু দ্রুততর ছিল এবং ইস্টারকে সর্বদা এড়িয়ে চলতো। ইস্টার ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল এবং বুঝতে পেরেছিল যে, সে ভুল করছে। ধূমকেতু দুর্বল ছিল না। সে ছিল একজন যোদ্ধা।

ইস্টার তার শেষ অবলম্বন ব্যবহার করার জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

সে তার সমস্ত শক্তি সংগ্রহ করেছিল এবং সুপারনোভা যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল। সে ভেবেছিল যে, ধূমকেতুকে তার সাথে নিয়ে যাবে এবং সেখানে  সে তার শক্তি উন্মোচন করে বিশাল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ধূমকেতুকে শেষ করে দেবে।

সে একটি উজ্জ্বল ফ্ল্যাশ দেখাচ্ছিল এবং এতে তার মধ্যে অহংকারের ঢেউ অনুভব করেছিল। ধূমকেতু কিছুই দেখেনি এবং কিছুই অনুভব করেনি।

ধূমকেতু দেখেছে যখন ইস্টার বিস্ফোরিত হয়েছে। ধূমকেতু ইস্টারের পরিকল্পনা জানতো এবং সে এটাও জানতো যে, কীভাবে এটি মোকাবেলা করতে হয়। সে তার মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ব্যবহার করে ইস্টারকে তার দিকে টেনে নিয়েছিল। সে ইস্টারের শক্তি শুষে নিয়েছিল এবং ইস্টারকে প্রচণ্ড ধাক্কা মেরে তার কাছে ফিরিয়ে দিয়েছিল। সে ইস্টারের সুপারনোভা হওয়ার স্বপ্নকে ব্ল্যাক হোলে পরিণত করেছিল। ধূমকেতু হেসে বলেছিল, “বিদায়, ইস্টার। তুমি বোকা ছিলে।”

ধূমকেতু ঘটনাস্থল ছেড়ে শিরিনের কাছে ফিরে আসে। সে তাকে কী ঘটেছিল তার বিস্তারিত বলল এবং আনন্দে কোলাকুলি করল। শিরিন ধূমকেতুকে ইস্টারের জ্বালাতন থেকে বাঁচানোর জন্য তাকে ধন্যবাদ জানালো এবং দোয়া করল যে, তাদের বন্ধুত্ব যেন চিরকাল টিকে থাকবে। 

ধূমকেতুও শিরিনকে একই কথা বলেছিল। 

ইস্টার ব্ল্যাক হোলের  অন্ধকারে নিঃসঙ্গ শূন্যতায় পতিত হয়েছিল। এদিকে ধূমকেতু ও শিরিন সুখে-দুঃখে দিন কাটাতে থাকলো। তারা ভালো বন্ধু। তারা সব সময় গল্পে মেতে থাকতো। নিজেদের পরিকল্পনার কথা বলতো। পিতা-মাতাকে নিয়ে গর্ব করতো। একদিন শিরিন ধূমকেতুকে একটি গল্প শোনালো।

তারকা এবং গ্রহ ছিল সেরা বন্ধু। তারা বিস্তীর্ণ মহাকাশে একসাথে খেলতে, ধূমকেতুকে তাড়া করতে এবং গ্রহাণুকে ফাঁকি দিতে পছন্দ করতো।

তারাটি উজ্জ্বল এবং প্রফুল্ল ছিল, সর্বদা একটি উষ্ণ আলোতে জ্বলজ্বল করতো। গ্রহটি শান্ত এবং শান্ত ছিল, সর্বদা একটি মৃদু গতিতে ঘুরছিল।

একদিন তারকা গ্রহকে একটি উজ্জ্বল ধারণা দিলো, “আরে, প্ল্যানেট, তুমি কি চাঁদকে নিয়ে একটি মজার খেলা খেলতে চাও?”

প্ল্যানেট বলল, “চাঁদ একটি লাজুক এবং শান্ত প্রতিবেশী। যে প্রায়শই পৃথিবী গ্রহের পেছনে লুকিয়ে থাকে।

কী ধরনের মজার খেলা?” প্ল্যানেট কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইলো।

তারা হাসতে হাসতে বলল, “চলো  ভান করি যে, আমরা হারিয়ে গেছি। আমরা লুকোচুরি খেলতে চাই। চাঁদ এতে অবাক এবং বিভ্রান্ত হবে।”

প্ল্যানেট বলল, “রাজি। ঠিক আছে, এটা মজার শোনাচ্ছে। কিন্তু আমরা এটা কীভাবে করবো?” 

তারকা আনন্দে উত্তেজিত হয়ে বলল, “আমাদের একটা গ্যালাক্সির আড়ালে লুকিয়ে থেকে অভিনয় করতে হবে। আমরা একে অপরকে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলবো, মজার মজার গল্প করবো। জোকস বলবো। এভাবে কাটিয়ে দেবো দীর্ঘ সময়। চাঁদ আমাদের হন্য হয়ে খুঁজে বেড়াবে সারা আকাশময়। ডার্ক ম্যাটারের অন্ধকার রাজ্যে আমাদের খুঁজে পাবে না।”

প্ল্যানেট একটু নার্ভাস হয়ে বলল, “ঠিক আছে, এটা করা যাক। কিন্তু ভুলে যাবে না, এটা একটা প্র্যাঙ্ক। আমরা আসলেই হারাবো না, তাই না?”

“অবশ্যই না। আমরা শুধুই বন্ধু, আর কিছু না।” আশ্বস্ত করে বলল তারকা।

তাই তারা তাদের কৌতুক শুরু করে। তারা হারিয়ে যাবার ভান করে এবং চাঁদের সাথে তাদের আড়ির ঘোষণা দেয়। চাঁদ হতবাক এবং নির্বাক। সে কি বলবে বা করবে বুঝতে পারছিল না। আড়ি ঘোষণার কথা জানতে পেরে আনন্দিত, কিন্তু দুঃখিত এবং একাকি বোধ করেছিল। সে ভাবছিল, সে কখনো প্ল্যানেটের দেখা পাবে কি না!

স্টার এবং প্ল্যানেট চাঁদের প্রতিক্রিয়া উপভোগ করে কিছুক্ষণ তাদের কৌতুক চালিয়েছিল। তারা একে অপরকে মিষ্টি জিনিস বলেছিল। তারা তাদের জীবনের পরিকল্পনার কথা একে অপরকে বলছিল। তাদের সমস্ত বন্ধুদের নিমন্ত্রণ করেছিল। তারা বিশাল পার্টির আয়োজন করেছিল। তারা খুব খুশিতে ছিল।

কিন্তু সময় গড়ানোর সাথে সাথে অদ্ভুত কিছু ঘটলো। তারা একটি সিগন্যাল ট্রান্সমিশন বার্তা পেলো। যেটি অজানা তারার রাজ্য থেকে এসেছিল। বার্তাটিতে কেবল বলা ছিল, “আমরা বিদ্যমান এবং আমরা এটা জেনে আনন্দিত যে, আপনাদের মতো আরও বুদ্ধিমান জীব দুনিয়াতে আছে।”

আমরা এখনও জানতে সক্ষম হইনি কে এটি পাঠিয়েছে? তবে আপনারা যদি কেউ এই বার্তাটি ধরতে পারেন তবে জেনে রাখুন যে, আমরা আছি এবং আমরা খুবই খুশি, আপনারাও আছেন।

তারা ফিরতি বার্তা পাঠালো,

“আমরা কি এই বার্তাটি অন্য কোথাও পাস করব? একটি চেইন চিঠির মতো?”

উত্তর এলো, “হ্যাঁ। এটি কমপক্ষে আরও ২০টি জীব রাজ্যে পাস করে দেন।”

বার্তার অনুরোধ অনুযায়ী তারা এটি মহাকাশের বিভিন্ন অজানা রাজ্যে পাস করে দিলো। প্ল্যানেট আফসোস করে স্টারকে বলল, “আহা! যদি আমার বুকে জীবিত প্রাণীদের বসবাস থাকতো, তবে এ জীবন সার্থক হতো। আর যদি জীবিতদের মধ্যে বুদ্ধিমান জাতি থাকতো তাহলে আমি আল্লাহর কাছে শুকরিয়া করে আজীবন সুখে কাটাতাম। বুদ্ধিমানরা আমার বুকে থেকে সারা দুনিয়ায় এরকম বার্তা পাঠাতো। সারা দুনিয়া আমাকে চিনতো।”

স্টার বলল, “দুঃখ করো না বন্ধু। মহান আল্লাহ তোমার দোয়া কবুল করবেন। আচ্ছা, তুমি কি এর আগে ভিনগ্রহের বাসিন্দাদের কাছ থেকে আসা কোনো বার্তা শুনেছ?”

প্ল্যানেট বলল, “হ্যাঁ শুনেছি। পৃথিবী নামক গ্রহ থেকে আগত এ ধরনের একটি বার্তা শুনেছিলাম। সেই গ্রহে বুদ্ধিমান মানুষ জাতি রয়েছে। তাদের প্রেরিত যানে একটি রেকর্ড বাজছিল। রেকর্ডটি বলে বেড়াচ্ছে : এই বিশাল দুনিয়ায় কোথাও কি কেউ আছো? এখন পর্যন্ত কারও সাড়া মেলেনি। দুটি মহাকাশযান থেকে এ আহ্বান করা হচ্ছিল। যতকাল এরা মহাকাশে থাকবে  ততকাল এ আহ্বান নাকি চলতে থাকবে। পৃথিবীর বুদ্ধিমান জীবেরা  নভোযানে দুই কপি করে ‘সোনালি রেকর্ড’ যুক্ত করে দিয়েছেন। একটি রেকর্ডে আছে তিমির আওয়াজ থেকে শুরু করে সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুর কান্নার শব্দসহ পৃথিবীর জীবজন্তুর নানা ধরনের ধ্বনির আওয়াজ। আরেকটি রেকর্ডে ৫৫টি ভাষায় স্বাগত জানিয়ে বলা হচ্ছে ‘এই অনন্ত দুনিয়ায় কোথাও কি কেউ আছো?’ মহাজাগতিক কোনো প্রাণী যদি থেকে থাকে একদিন হয়তো তারা এসব রেকর্ডের কথা ও ধ্বনির মর্মোদ্ধার করতে পারবে। রেকর্ড দুটি বেজেই চলেছে এবং অন্তত একশো কোটি বছর ধরে বেজে চলার কথা। আমরা জানি না এটি থামবে কোথায় বা কার হাতে! মানুষ জাতিও চিরকাল থাকবে না! কিন্তু মানুষ ধ্বংস হবার পরেও ভয়েজারের কারণে থেকে যাবে সেই মানুষের ভালোবাসার বিশ্বাসটুকু।  কোনো সভ্যতা যদি সত্যিই খুঁজে পায় এই ডিস্ক, তবে হয়তো কিছুটা হলেও জানবে মানব সভ্যতার ইতিহাস।  হয়তো বিলিয়ন বছর পরে তা কারো হাতে পৌঁছুবে। হয়তো তারা ডিকোড করবে। তবে একটি ব্যাপার নিশ্চিত! মানুষের অস্তিত্বের কথা তারা না জানলেও হয়তো ক্রন্দনরত শিশুর কণ্ঠ শুনে বুঝতে পারবে মানুষের জন্মের ইতিহাস।”

স্টার এমন আশ্চর্যজনক কথা শুনে প্ল্যানেটকে বলল, “তুমি ধূমকেতুকে ডাকো। দেখো ও আবার কখন এসে পড়ে তোমার ডাকার আগেই। সে এ বিষয়ে তোমাকে সাহায্য করতে পারবে। সে তো যাযাবরের মতো মহাকাশ চষে বেড়ায়। ধূমকেতু তোমার বুকে পানির প্রবাহ সৃষ্টি করবে। আমি জানি, প্রাণ সঞ্চারের প্রথম শর্ত হলো পানি। জীবন গড়ে ওঠে পানিতে। জীবন বেঁচে থাকে পানিতে। পানির অপর নাম জীবন। দুনিয়ার বিভিন্ন গ্রহ-নক্ষত্রে ধূমকেতুর যাওয়া আসা রয়েছে। সে তোমাকে পানির খোঁজ দিতে পারবে। আমাদের বন্ধত্বের সুবাদে সে পানি তোমার বুকে বয়ে আনবে। মহান আল্লাহ তোমার স্বপ্ন পূরণ করবেন। একদিন তোমার বুকে জীব জন্তুরা হেসে খেলে বেড়াবে। বৃক্ষ তরুলতায় তোমাকে ঢেকে দেবে। তুমি হবে সবুজময় সম্রাজ্ঞী। তুমি তোমার স্বপ্নের কথা বলেছো। আমার কথা ভাবো- মহাকাশে ঘূর্ণায়মান গ্যাসকণা ও ধূলিকণা থেকে জন্মলাভ করে স্বপ্ন আঁকি নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার। এই বিলানোর মধ্যেই আমার পরম শান্তি। আলোক সৌন্দর্য মেলে ধরি মহাকাশে। দিনের আকাশ তখন নেচে উঠে আনন্দে। রাতের আকাশ যেমন হেসে ওঠে রূপমাধুর্যে। আলো ও উত্তাপে সবুজ জীবনময় গ্রহের উন্মেষ ঘটে। সজীবতায় ভরে ওঠে প্রাণময় গহ-উপগ্রহ। পরিপূর্ণ হয় ফুলে ফলে। জীবন বৈচিত্র্যের মিলন মেলা উপভোগ করি। প্রকৃতির সঙ্গে খেলা করি। আমার একটি গ্রহে প্রাণী আছে। এর প্রাণিকূলকে ভালোবাসি। খারাপ লাগে যখন চরম পরিণতির কথা ভাবি। কেননা, আমার সঙ্গে শেষ গন্তব্য পথের সাথী হতে হবে আমার পরিবারভুক্ত সবাইকে। আমি ছুটে চলেছি আমার শেষ গন্তব্যের পথে। যেখানে আমার জন্য মৃত্যু ফাঁদ পেতে রাখা হয়েছে। এক অজানা রহস্যঘেরা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে আমাকে ছুটতে হচ্ছে অনিচ্ছা সত্ত্বেও। আর সেই পরিনতির চূড়ান্ত রূপ হলো মৃত্যু। এক পরম সত্যের অপর নাম মৃত্যু। মৃত্যুকে ফাঁকি দেওয়ার সাধ্য কারও নেই।

সেই মহাসত্যকে সমর্থনের উদ্দেশ্যে সর্বদা ধাবিত হচ্ছি মৃত্যুর দিকে। প্রতিটি গ্যালাক্সি তার অধীনস্ত সকল গ্রহ নক্ষত্রসহ মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। মিল্কিওয়ে ঘুরছে তার আপন নীহারিকপুঞ্জকে কেন্দ্র করে এবং সরেও যাচ্ছে শেষ পরিণতির দিকে। আমিও ঘুরছি মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিকে কেন্দ্র করে। প্রতি সেকেন্ড ২৫০কি.মি বেগে প্রায় ২২ কোটি বছর সময়ে মিল্কিওয়েকে একবার আবর্তন করতে সমর্থ হই।

একই সঙ্গে ঘূর্ণিকালে প্রতি সেকেন্ড ২০কি.মি গতিতে আমার কক্ষের সরণ ঘটছে একটি সুনির্দিষ্ট দিকে।

আমার এই সরণ বা পশ্চাৎ অপসরণ ভেগা নামক উজ্জ্বল নক্ষত্রের দিকে। আলফা লাইরি কনসস্পেলেশনের দিকে (সোলার এপেক্স) একটি নির্দিষ্ট বিচ্যুতি নিয়ে ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছি আমি। যেখানে আমার জন্য মৃত্যু বা ধ্বংস অপেক্ষা করছে। ইতোমধ্যে আমি ৫০০ কোটি বছরের পথ অতিক্রম করে ফেলেছি। আরও পাঁচশো থেকে এক হাজার কোটি বছর পথ চললেই আমি পৌঁছে যাবো আমার সর্বশেষ গন্তব্যে। হাইড্রোজেন জ্বালানি নিঃশেষ হয়ে যাবে। লাল দানবে রূপান্তরিত হয়ে জ্বালানি সংকটে ভুগবো। অভিকর্ষ বলের প্রভাবে শুরু হবে ধ্বংসপতন ক্রিয়া। অধিক চাপের প্রভাবে কেন্দ্র বিন্দুতে সৃষ্টি হবে শ্বেতবামন তারকা। আমার আকার আরও বড় হবে। আমার আশপাশের  গ্রহগুলোকে টেনে নেবো আমার ভেতরে। আমার গ্রহগুলো তখনো টিকে থাকবে। যা অচিরেই শীতল অনুজ্জ্বল নির্জীব পদার্থে পরিণত হতে থাকবে। আমি কালো বামন তারায় রুপান্তরিত হবো। এ অবস্থায় ভেতরাস্থিত ফোটনকণাগুলো ঝড়োগতিতে জেট ইঞ্জিনের আকার ধারণ করে পরস্পর বিপরীতমুখী হয়ে ছড়িয়ে পড়বে। তখন মৃতপ্রায় আমার মধ্যে একটি বিস্ফোরণ ঘটে মহাজগতিক উচ্ছিষ্টে পরিণত হয়ে যাবো আমি। যে ধুলো বায়ুকণা থেকে জন্মলাভ করেছিলাম সেই ধূলিকণা আর বায়ুকণায়ই ফিরে যাবো। আমার শক্তিমত্তা চিরতরে তলিয়ে যাবে মহাবিশ্বের বুক থেকে। প্রতিনিয়ত এভাবেই ধ্বংসপ্রাপ্ত হচ্ছে হাজার-হাজার, লাখ-লাখ, তারা নক্ষত্রের। 

যেহেতু, আমার জ্বালানি শক্তিতে সৌরমণ্ডলের সকল গ্রহ-উপগ্রহ টিকে আছে; সেহেতু আমার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে গ্রহমণ্ডলীতে আকষর্ণ বলের ভারসাম্যে বিঘœ ঘটবে। কাজেই গ্রহমণ্ডলীসহ সবকিছুই ছিন্ন বিছিন্ন হয়ে মহাশূন্যে চিরতরে হারিয়ে যাবে। এতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। এটাই আল্লাহর বিধান। তবে অচিরেই তা ঘটছে না। কেননা, আগামী ৫০০ কোটি বছরের আগে অন্তত আমার জ্বালানি শেষ হবে না।”

ইতোমধ্যে ধূমকেতু এসে হাজির হলো। স্টার ও প্ল্যানেট দু’জনকেই বিষন্ন দেখে সে কোনো কথা বলল না। সে কিছুক্ষণ ভিজে বিড়ালের মতো বিমর্ষ হয়ে থাকলো।

স্টার বলল, “তোমার কথাই বলছিলাম। তুমি কি জানো, পৃথিবী নামক গ্রহে প্রাণ আছে? এই প্রাণের উৎস পানি পৃথিবী কোত্থুকে পেলো?’

ধূমকেতু ছানাবড়া চোখে বলল, “এ কথা জিজ্ঞেস করছেন কেন? আপনি কি শুনেননি, আমার পূর্ব পুরুষের অন্তিম ইতিহাস?  যাদের অবদানে দুনিয়ার প্রতিটি গ্রহে যেখানে যেখানে জীব সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছে; সেখানেই ধূমকেতুরা প্রাথমিক ভূমিকা রেখেছিল।

পৃথিবী গ্রহটিকে আপনারও চেনার কথা। কেননা, এটি মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির একটি প্ল্যানেট। আপনি একই গ্যালাক্সির একটি স্টার বা তারকা। আপনার গ্রহমণ্ডলীর মধ্যে একটিতে প্রাণীরাজ্য আছে। যদিও তাদের মধ্যে এখনও বুদ্ধিমান প্রজাতি হয়ে ওঠেনি। এক্ষেত্রে পৃথিবী স্পেশাল। বুদ্ধিমান প্রাণী মানুষের জন্য পৃথিবী গ্রহটি দুনিয়ার মধ্যে কিংবদন্তী হয়ে উঠেছে। তবে এর পেছনে রয়েছে কোটি কোটি বছরের ইতিহাস। রয়েছে যেমন পৃথিবীর মতো বিশেষ গ্রহের উত্থানের ইতিহাস; তেমনি রয়েছে হাজার হাজার গ্রহ উপগ্রহ, গ্রহাণু-ধূমকেতুর পতনের ইতিহাস। তাদের ধ্বংসের করুণ কাহিনী। অনেক অনেক মহাকাশীয় বস্তুর ধ্বংসের বিনিময়ে এবং অনেক সভ্যতার বিলুপ্তির পর তিলে তিলে মহান আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন মানব জাতি।

পৃথিবী কোত্থেকে এত পানি পেল? এই প্রশ্নের পেছনেও রয়েছে অনেক কথা।

পৃথিবী পানি প্রধান গ্রহ। এর জীব জন্তু সবকিছুই পানিকেন্দ্রিক। পৃথিবীর উপরিভাগের তিন চতুর্তাংশ দখল করে রেখেছে পানি। এর কেন্দ্রের সাতশো মাইল গভীরেও নাকি মহাসাগর লুকিয়ে রয়েছে। ওপরে যে পরিমাণ পানি আছে; তার চেয়ে ৩ গুণ বেশি রয়েছে ভূগভীরে। এর জীবজন্তুর শরীরের ওজনের ৬০% পর্যন্ত পানি থাকে। পানি ছাড়া গ্রহবাসী কয়েক দিনের বেশি বাঁচতে পারে না।

পানি আর পানি পৃথিবীর সর্বত্র জুড়ে কিন্তু তা এলো কোত্থুকে? এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের পৃথিবীতে জীবনের উৎপত্তি বুঝতে সাহায্য করতে পারে। পৃথিবীর বাইরে এক্সোপ্ল্যানেট ও এক্সোমুনসহ অন্যান্য বিশ্বের পানি সম্পর্কে কী আশা করতে হবে তা আমাদের শেখাতে পারে।

পৃথিবী কতটুকু পানি দিয়ে তৈরি? খুব সামান্য কি? যদিও সাগর মহাসাগরগুলো পৃথিবী পৃষ্ঠের প্রায় ৭১% শতাংশ জুড়ে রয়েছে। এই মহাসাগরগুলোর গভীরতা পৃথিবীর ব্যাসার্ধের তুলনায় খুবই কম। 

গ্রহাণু এবং ধূমকেতুর মতো মহাকাশীয় বস্তু জল-বোঝাই করে গ্রহ গঠনের পরে এখানে পানি এনেছিল।

প্রায় ৪.৫১ বিলিয়ন বছর আগে, থিয়া নামে মঙ্গল গ্রহের আকারের মতো একটি গ্রহ পৃথিবীর সাথে সংঘর্ষ ঘটেছিল বলে মনে করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় পৃথিবীর কিছু আবরণ গলে গিয়েছিল এবং সংঘর্ষ থেকে অবশিষ্ট উপাদান পৃথিবীর চাঁদ তৈরি করেছিল। থিয়া কি প্রক্রিয়ায় পৃথিবীতে জল আনতে পারে? অন্তত একটি গবেষণায় এটিকে সমর্থন করা হয়েছে।

আরেকটি তত্ত্ব হলো পৃথিবী নিজেই কেবল তার নিজস্ব পানি তৈরি করেছে। তবে তত্ত্বটি অতটা শক্তিশালী নয়। 

কোনো গ্রহাণু অথবা ধূমকেতু কি পৃথিবীতে পানি এনেছিল?

হ্যালির ধূমকেতুসহ পৃথিবীতে ভ্রমণকারী ধূমকেতুর শরীরে বিপুল পরিমাণ বরফ পাওয়া গিয়েছিল। পরিদর্শনকারী রোসেটা ধূমকেতুতে পৃথিবীর তুলনায় ভিন্ন রাসায়নিক উপাদানের পানির খোঁজও পাওয়া গিয়েছিল। 

কিছু গ্রহাণু থেকে নমুনা সংগ্রহ করে দেখা গিয়েছে যে, গ্রহাণুর শিলায় আটকে থাকা পানি পৃথিবীর মহাসাগরে পাওয়া পানির প্রকারের সাথে মেলে। যা পৃথিবীর মহাসাগরে পানির মোট ভরের ৩০% সরবরাহ করতে পারে।

আরেকটি ইঙ্গিত দেয় যে, ধূমকেতু গ্রহাণুগুলো পৃথিবীর বেশিরভাগ পানির জন্য দায়ী হতে পারে। নমুনাগুলোর চলমান বিশ্লেষণ বেনুর মতো গ্রহাণুগুলো পৃথিবী গ্রহে পানি এনেছিল কিনা সে সম্পর্কে আরও সূত্র উন্মোচন করতে পারে। 

পৃথিবীর বাইরে এক্সোপ্ল্যানেট ও এক্সোমুনসহ অন্যান্য বিশ্বের পানি সম্পর্কে  প্রত্যাশা কী?  একটি মজার তথ্য হলো-একটি মাঝারি আকারের ধূমকেতুতে এত জল থাকে যে, পৃথিবীর সমস্ত মানুষ সারাজীবন বেঁচে থেকে পানির চাহিদা মিটিয়েও কখনও তা শেষ করতে পারবে না।”

স্টার এবার প্ল্যানেটের সারা জীবনের স্বপ্নের কথাটি ধূমকেতুকে জানালো। এ কথা শুনে ধূমকেতু একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে দীর্ঘক্ষণ চুপ করে থাকলো। প্ল্যানেটের খোঁচায় তার খেই ফিরে এলো।

প্ল্যানেট খুবই রহস্য করে বলল, “আমি আমার অন্ধকারময় কারাগার থেকে হামাগুড়ি দিয়ে আবার আলোতে দাঁড়ালাম। আমার মুখের ওপর তারার ঝলমলে আলো। আমার উদ্ভাসিত গল্পেরা মস্তিষ্কে তালাবদ্ধ। এক টুকরো পেন্সিল খুঁজে এনে আমি আমার ছোট আকারের গল্পগুলো লিখেছিলাম। কিন্তু কেউ শুনতে আগ্রহী ছিল না। এখন তারা দ্বিগুণ আকারের কিছু চেয়েছিল। প্রযুক্তি আমাকে অচল করে দিয়েছে।”

ধূমকেতু আবেগ জড়িত কণ্ঠে বলল, “তোমার গল্পগুলো আমি চিরকাল শুনতে থাকবো। তুমি আকাশ পানে তাকিয়ে গল্প বলবে। আকাশে উজ্জ্বল আলোর ঝিলিক তুলে যে ধূমকেতু তোমাকে রাঙিয়ে তুলতো তাকে আর আকাশে খুঁজোও না বন্ধু! তোমার বুকের পানি হয়ে তোমার সাথেই মিশে থাকবো।”

এরপর হঠাৎ একদিন ধূমকেতুটি প্ল্যানেটের বুকে আছড়ে পড়লো। মরুভূমিসম প্রাণহীন প্ল্যানেটের বুক বন্যায় সয়লাব হয়ে গেল।

স্টার এবং প্ল্যানেট আলাদা অনুভব করতে শুরু করে। তারা বুঝতে পেরেছিল যে তারা আর ভান করছে না। তারা আসলে একে অপরের প্রকৃত বন্ধু ছিল। তারা তাদের হৃদয়ে একটি উষ্ণ এবং অস্পষ্ট অনুভূতি অনুভব করেছিল। তারা চিরকাল একসাথে থাকতে চেয়েছিল।

তারা চাঁদকে সত্য বলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা তাদের ভান করার জন্য ক্ষমা চেয়েছে এবং তাদের অনুভূতি স্বীকার করেছে। তারা আশা করেছিল যে, চাঁদ তাদের বুঝতে পারবে এবং ক্ষমা করবে। 

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ