ডিপফেক ও ফিশিং লিংক যাচাই করো
আইটি কর্নার টি এইচ মাহির জুন ২০২৬
আজকের এআই যুগে এআইভিত্তিক কনটেন্টের ছড়াছড়ি। তোমরা হয়তো সোশ্যাল মিডিয়ায় এআই দিয়ে তৈরি ছবি-ভিডিও দেখে থাকো। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব ছবি ভিডিও দেখে বোঝার উপায় থাকে না যে এগুলো আসল নাকি নকল। সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় ফেলে ভিডিওগুলো। দেখে মনে হয় আসল ভিডিও। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব ভিডিও মিথ্যা বা ভুয়া তথ্য ছড়ায়। এআই দিয়ে বানানো এসব ভিডিওকে বলা হয় ডিফফেক ভিডিও। সোশ্যাল মিডিয়ায় এসব ভিডিও অসৎ উদ্দেশ্যেই বেশি ছড়ানো হয়। কাউকে হেয় করতে, ভুয়া তথ্য ছড়াতে কিংবা কোনো বিষয়ে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ছড়াতে এসব ডিফফেক ছড়িয়ে দেয় অসৎ লোকেরা। তবে চাইলেই এসব ভিডিও ঠিকই বিভিন্ন উপায়ে ডিফফেক কিনা যাচাই করা যায়। চলো আজকে জেনে নিই কীভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভাইরাল ভিডিওটি আসল নাকি ডিফফেক তা যাই করা যায়। তা ছাড়া আরেকটি বিষয় সম্পর্কেও জেনে নেব, কীভাবে ফিশিং লিংক শনাক্ত করা যায়। কেননা আমরা অনেকেই না জেনেই অনেক ভুয়া লিংকে প্রবেশ করে প্রতারিত হই।
খালি চোখে ডিপফেক যাচাই
এআই ব্যবহার করে তৈরি সাইবার হুমকি তৈরি করা ডিফফেক খালি চোখে বোঝারও কিছু উপায় আছে। যুক্তরাষ্ট্রের এমআইটি বিশ্ববিদ্যালয় বের করেছে তেমনই কিছু উপায়। উন্নত ডিপফেকগুলোতেও এখনও অসংগতি দেখা যায়। তাই খালি চোখে খেয়াল করলে অনেক ডিপফেক ভিডিও যাচাই করা সম্ভব। ডিপফেক ভিডিওগুলোয় দেখা যায় নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে আক্রমণ করতে বা হেয় করতে হুবহু তার মুখমণ্ডল ব্যবহার করা হয়। তাই প্রথমেই নজর দিতে পারো মুখের দিকে। কেননা অনেক ক্ষেত্রে শুধু ব্যক্তির মুখ পরিবর্তন করেই ডিপফেক তৈরি করা হয়। তারপর গাল ও কপালের দিকে মনোযোগ দিতে পারো। ত্বক কি খুব মসৃণ নাকি খুব কুঁচকানো দেখাচ্ছে? ত্বকের বয়সের ছাপ কি চুল এবং চোখের বয়সের ছাপের মতো? ডিপফেক কিছু দিক থেকে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। চোখ এবং ভ্রুর দিকে মনোযোগ দাও। প্রত্যাশিত স্থানে কি ছায়া দেখা যাচ্ছে? ডিপফেক কোনো দৃশ্যের স্বাভাবিক পদার্থবিদ্যাকে সম্পূর্ণরূপ উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হতে পারে। চশমা থাকলে চশমাটির দিকে মনোযোগ দাও। কোনো ঝলক আছে কি? ঝলকটা কি খুব বেশি? ব্যক্তিটি নড়াচড়া করলে ঝলকের কোণ কি বদলায়? ডিপফেক আলোর প্রাকৃতিক পদার্থবিদ্যাকে পুরোপুরি তুলে ধরতে ব্যর্থ হতে পারে। মুখের লোম আছে কি নেই, সেদিকে মনোযোগ দাও। এই লোম কি আসল দেখাচ্ছে? ডিপফেক দাড়ি-গোঁফ যোগ করতে বা বাদ দিতে পারে। ডিপফেক মুখের লোমের পরিবর্তনকে পুরোপুরি স্বাভাবিক করে তুলতে ব্যর্থ হতে পারে। মুখের তিলের দিকে মনোযোগ দাও। তিলটি কি আসল বলে মনে হচ্ছে? চোখের পলক, ঠোঁটের নড়াচড়ার দিকে মনোযোগ দাও। চোখের পলক কি অস্বাভাবিক লাগছে কিংবা ঠোঁটের নড়াচড়া কি কথা বলার সাথে সামঞ্জস্য নেই? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলেই তুমি ভিডিওটি আসল নাকি ডিপফেক বুঝতে পারবে। খালি চোখে এভাবে ডিপফেক যাচাই করতে এমআইটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ডিটেক্ট ফেকস’ নামক ওয়েবসাইটে অনুশীলন করতে পারো।
টুলের সাহায্যে ডিপফেক যাচাই
ডিপফেক যাচাইয়ের বিভিন্ন টুল আছে। অনলাইনেই অনেক ফ্রি টুল পাওয়া যায়। কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার মতো এআই স্ক্যানারও আছে। তুর্কি ডিপফেক ভিডিও স্ক্যানার, ডিপওয়্যার এআই। এই ওয়েবসাইটে প্রবেশ করলেই স্ক্যানার অপশন আসবে। সেখানে সন্দেহজনক ভিডিওর লিংক কিংবা সরাসরি ভিডিও আপলোড দেওয়া যাবে। তারপর স্ক্যানারটি বলে দেবে ভিডিওটি কতটুকু আসল। স্ক্যান করার পরও মনে সন্দেহ থাকলে এক্সপার্টদের রিভিউ নেওয়া যাবে। ডিপফেক যাচাই করার আরেকটি অনলাইন টুল সেনসিটি এআই। এখানেও অডিও, ভিডিও, ছবি আপলোড দিয়ে ডিপফেক কিনা যাচাই করা যাবে। ভিডিও বা অডিওর ডিপফেক অ্যানালাইসিস বিশদ বিবরণ আকারে পাওয়া যাবে। দ্যা হাইভ এআই নামে আরেকটি টুল পাওয়া যাবে। এটি এআই দিয়ে তৈরি ছবি, ভিডিও বিশদভাবে শনাক্ত করতে পারে। তবে এখানে বিভিন্ন সাবস্ক্রিপশন বা ক্রেডিট কিনতে হয়। ফ্রিতে কিছু ক্রেডিট পাওয়া যাবে। এসব টুল ছাড়াও আরও অনেক অনলাইন টুল পাওয়া যায় ডিপফেক যাচাইয়ের জন্য। অনেক ওপেনসোর্স সফটওয়্যার, টুল আছে। সেগুলো নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে পারো।
খালি চোখে ফিশিং লিংক যাচাই
ফিশিং হলো এক ধরনের সাইবার আক্রমণ, যেখানে আক্রমণকারীরা ব্যবহারকারীর তথ্য চুরি করার জন্য ছদ্মবেশ ধারণ করে। এই ধরনের আক্রমণে প্রায়শই নকল ওয়েবসাইট বা ই-মেইল ব্যবহার করা হয়, যা দেখতে হুবহু আসলগুলোর মতো হয়। যার ফলে সেসব লিংকে ক্লিক করে আমরা প্রতারিত হই। এসব লিংক খালি চোখেই অনেক ক্ষেত্রে শনাক্ত করা যায়। সেক্ষেত্রে প্রথমেই চোখ বোলাতে হবে লিংক অ্যাড্রেসে। অধিকাংশ ফিশিং লিংকে বিখ্যাত কোম্পানি বা ওয়েবসাইটের নকল হয়ে থাকে। তাই বানান পরিবর্তন করা হতে পারে। যেমন : ভধপবনড়ড়শ.পড়স এর জায়গায় ভধশবনড়ড়শ.পড়স। আবার লিংকের শেষাংশের (যেমন .পড়স, .ড়ৎম) ক্ষেত্রেও অস্বাভাবিকতা লক্ষ করা যায়। অনেক অপরিচিত ডোমেইন ব্যবহার করা হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ ও বিভ্রান্তিকর লিংক দেখা যায়। এসব লিংকে ফ্রি এমবি, অমুক কোম্পানির অর্থ প্রধান এসব দেওয়া থাকে। লিংকে ঐঞঞচঝ আছে কিনা যাচাই করতে পারো। অধিকাংশ ফিশিং লিংকে ঐঞঞচঝ থাকে না।
টুলের সাহায্যে ফিশিং লিংক যাচাই
টুলের মাধ্যমে ফিশিং লিংক যাচাই করতে ব্যবহার করতে পারো ‘ভাইরাস টোটাল’ নামক ওয়েবসাইট। এখানে সন্দেহজনক লিংক, ফাইল যাচাই করা যায়। সত্তরটির বেশি নিরাপত্তা ইঞ্জিন দিয়ে এটি লিংকগুলো স্ক্যান করে। ‘ইউআরএল স্ক্যান’ নামে আরেকটি ওয়েবসাইটেও ফিশিং লিংক যাচাই করা যায়। এই ওয়েবটুলের আরেকটি সুবিধা হলো সন্দেহজনক ওয়েবসাইটির একটি প্রিভিউ দেখা যাবে। অর্থাৎ লিংকে ক্লিক না করেই সেখানে প্রবেশ করে কী দেখা যাবে তা জানা যাবে। ‘লিংকগার্ড’ নামে আরেকটি ওয়েবটুলেও লিংক যাচাই করা যাবে। ভুয়া লিংক এবং মেইল শনাক্তে বধংুফসধৎপ.পড়স/ঃড়ড়ষং/ঢ়যরংযরহম-ঁৎষ ব্যবহার করা যেতে পারে। এখানে নির্দিষ্ট ই-মেইল বা লিংকটি দিলেই তা ভুয়া কিনা যাচাই করে দেবে। এসব টুলের সাহায্যে ফিশিং লিংক যাচাই করার পাশাপাশি ব্রাউজিংয়ের সময় সরাসরি লিংক যাচাই করার জন্য এক্সটেনশন ব্যবহার করা যেতে পারে। যেগুলো ওয়েবঅ্যাড্রেস বা সাইটটি আসল কিনা যাচাই করবে। এক্সটেনশন হলো ছোট ছোট সফটওয়্যার প্রোগ্রাম যা আমাদের ব্রাউজিংয়ে সহায়তা করতে ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন ব্রাউজারের ওয়েবস্টোরে কিছু এক্সটেনশন পাওয়া যায়। ম্যালোওয়ার বাইটস ‘ব্রাউজার গার্ডস’ নামের এই এক্সটেনশন ট্র্যাকারদের ব্লক করে এবং বিরক্তিকর বিজ্ঞাপন এবং অন্যান্য অবাঞ্ছিত কনটেন্ট ফিল্টার করে। এটি ভাইরাস আছে কিনা যাচাই করে। ‘ইউব্লক অরিজিন এক্সটেনশন’ ক্ষতিকারক ইউআরএল যাচাই করে। এসব এক্সটেনশন ক্রোম ব্রাউজারের ওয়েবস্টোরে পাওয়া যাবে।
আরও পড়ুন...