দুঃসাহসী দুই কিশোর
রহস্যভেদ এনায়েত রসুল সেপ্টেম্বর ২০২৬
(জুন ২০২৬ সংখ্যার পর)
দশ.
এবার চিন্টু সারা দিনের কথা ভেবে চলল। ভাবতে ভাবতে একসময় ওর নিজেকে অসহায় মনে হলো। চিন্টু ভাবল, আজ যা কিছু ঘটেছে, সব ঘটেছে আমার প্রতিকূলে। পিন্টুকে নিয়ে এতক্ষণে কত দূরে চলে যেতাম। অথচ বেচারা ঝন্টুর হাতে বন্দি হয়ে আছে। দিনটাও শেষ হয়ে যাচ্ছে। ওদিকে ওদের চিন্তায় মাম্মী আর বাপি সম্ভবত পাগল হয়ে যাচ্ছেন। মামা বলেছিলেন পিন্টু বাড়িতে পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে তাকে খবর জানাতে। সে খবরও জানানো যাচ্ছে না। তিনিও নিশ্চয় পিন্টুর খবর জানার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছেন। ধ্যাত, সবকিছু একেবারে তালগোল পাকিয়ে গেছে, আর সব হয়েছে চিন্টুর স্টেশনে দেরিতে পৌঁছার কারণে। যা হোক, চিন্টুকে এখন অধৈর্য হলে চলবে না। ধৈর্য ধরে উপযুক্ত সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে আর যেকোনো মূল্যে পিন্টুকে নিয়ে পালাতে হবে। তবে সবকিছুর আগে নতুন করে পিন্টুর সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুলতে হবে। কিন্তু পিন্টু কোথায়? চিন্টু পিন্টুকে বাড়ির ভেতর নিয়ে যেতে দেখেছে। কিন্তু পিন্টুকে যে ঝন্টু দোতলার ঘরে বন্দি করে রেখেছে, সে কথা ওর তখনও জানা ছিল না। তাই গাছের আড়াল থেকে বের হয়ে কিছুক্ষণ আগে পিন্টুকে যে ঘরে বন্দি করে রাখা হয়েছিল, চিন্টু সেই ঘরের জানালায় উঁকি দিলো। কিন্তু এবার আর সে পিন্টুকে সেখানে দেখতে পেল না। তার মানে পিন্টুকে ঝন্টু অন্য কোনো ঘরে বন্দি করেছে।
এবার চিন্টু খুব সতর্কতার সঙ্গে এক এক করে নিচতলার অন্য ঘরগুলোর জানালায় উঁকি দিয়ে চলল। দু-তিনটি ঘর দেখা শেষ করে চিন্টু যখন রান্নাঘরের জানালায় উঁকি দিলো তখন সে সেখানে ঝন্টুকে দেখতে পেল। জানালার দিকে পেছন ফিরে ঝন্টু রান্না করছে। রান্নাঘরের সামনে থেকে সরে এসে চিন্টু ভাবল, নিচের সবগুলো ঘর তো দেখা হলো। কোনো ঘরেই পিন্টুকে দেখতে পেলাম না। তাহলে কি ওকে ওপরের কোনো ঘরে আটকে রাখা হয়েছে? এ ছাড়া তো অন্য কিছু হতে পারে না। অবশ্যই পিন্টুকে দোতলার ঘরে আটকে রেখেছে। এখন আমার প্রথম কাজ হবে ওকে কোন ঘরে আটকে রাখা হয়েছে তা খুঁজে বের করা। আর কাজটা করতে হবে খুবই সাবধানে। কিছুতেই ছেলেধরাটার চোখে পড়া যাবে না।
চিন্টু তীর্থের কাকের মতো অপলক চোখে দোতলার জানালাগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। ওর ধারণা ছিল কোনো না কোনো সময় পিন্টু যেকোনো একটা জানালার সামনে এসে দাঁড়াবে। কিন্তু দুঃসহ পনেরোটি মিনিট কেটে যাবার পরও পিন্টু এসে দাঁড়াল না। ওদিকে প্রতি সেকেন্ডে দিনের আলো শেষ হয়ে আসছে। এসব কারণে চিন্টুর মন বিরক্তিতে ছেয়ে গেল। সেই বিরক্তির আরও বাড়িয়ে দিলো একটা কাকের কর্কষ ডাক। প্রায় পনেরো মিনিট ধরে কাকটা ডেকেই চলেছে! কত আর মেজাজ ঠিক রাখা যায়?
এ সময় চিন্টুর ওর মায়ের কথা মনে পড়ল। কাকের কা-কা মাম্মী সইতেই পারেন না। তিনি বলেন, কাকের ডাক শুধু কর্কষই নয়, অশুভও। আসলে মাম্মী ঠিকই বলেন-কাকের ডাক অশুভ। কাকটা যখন থেকে ডাকছে চিন্টুও তখন থেকে দোতালার জানালাগুলোর দিকে তাকিয়ে পিন্টুকে খুঁজেছে। কিন্তু পিন্টু কোন ঘরে আছে তা বুঝতে পারছে না। পিন্টুও জানালার সামনে এসে দেখা দিচ্ছে না। এই যে অযথা অনেকটা সময় নষ্ট হচ্ছে, এটাও তো চিন্টুর জন্য অশুভ একটি ঘটনা। এই সমস্যার জন্য হয়তো কাকটাই দায়ী। ওকে তাড়িয়ে দিলে কোনো সুফল পাওয়া যায় কি না, একবার সে চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে।
এ কথা ভেবে চিন্টু একটা ইটের টুকরো নিয়ে কাকটিকে লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মারল। সেই ইট অবশ্য কাকের গায়ে লাগল না। অন্য একটা ডালে লেগে নিচে পড়ে গেল। তবে ভয় পেয়ে কাকটা উড়ে অনেক দূরের এক গাছে গিয়ে বসল। ইটের টুকরোর এই সাফল্য দেখে চিন্টুর মনে অদ্ভুত এক বুদ্ধি এলো। চিন্টু ভাবল, এক কাজ করলে কেমন হয়? আমি এক এক করে জানালাগুলোতে ইট মেরে যাই। ইটের ভয়ে কাক পালিয়ে গেছে-পিন্টু হয়তো উলটো কাজ করবে। কে ইট মেরেছে তা দেখার জন্য সে জানালার সামনে এসে দাঁড়াবে।
ব্যাস, পিন্টু কোন ঘরে বন্দি আছে তা আবিষ্কার হয়ে যাবে। দেখা যাক পরীক্ষা করে।
যা কল্পনা করেছে বাস্তবেও যে তা ঘটবে, চিন্টু ভাগ্যের ওপর অতটা আস্থা রাখতে পারেনি। কিন্তু ওকে অবাক করে দিয়ে সত্যি সত্যিই তাই ঘটল। দুটো জানালা লক্ষ্য করে ইটের টুকরো ছুঁড়ে মারার পর চিন্টু তৃতীয় জানালায় একটা ইটের টুকরো ছুঁড়ে মারল। তার দু কি তিন সেকেন্ড পরেই চিন্টু একটা খসখসে শব্দ শুনতে পেল। চিন্টু দেখল তৃতীয় জানালার ফ্রেম সরিয়ে পিন্টু এদিক-ওদিক তাকিয়ে কিছু একটা দেখার চেষ্টা করছে। পিন্টুকে দেখতে পেয়ে চিন্টু দ্রুত তৃতীয় জানালার নিচে গিয়ে দাঁড়াল, ফলে পিন্টুও ওকে দেখতে পেল। সঙ্গে সঙ্গে পিন্টুর কণ্ঠ চিরে বিস্ময়ধ্বনি বেরিয়ে এলো-ওয়াও! তুমি এখনো এখানে আছ? চিন্টু যতটা সম্ভব চাপা স্বরে বলল, আমি তো বলেছি তোমাকে না নিয়ে কোথাও যাব না।
: আমিও তাই চাই। ঝন্টুর মাতব্বরিতে আমি অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছি। কিন্তু ভাই, তুমি কি ভেবে রেখেছ, কেমন করে আমাকে বের করে নেবে? এখন তো আমি নিচে নেই। পিন্টুর কণ্ঠ চিন্তিত শোনাল।
তার জবাবে চিন্টু বলল, তোমাকে ওপরের ঘরে আটকে রাখা হয়েছে। এটা খুবই বড় সমস্যা আমাদের জন্য। আর এখন পর্যন্ত কোনো পথও ভেবে পাইনি। তবে এটুকু নিশ্চয়তা দিতে পারি, ইনশাআল্লাহ তোমাকে আমি মুক্ত করবই করব।
পিন্টু বলল, এখন আমারও বিশ্বাস হচ্ছে তুমি তা পারবে। কিন্তু সমস্যা কি জানো? ঝন্টু আমাকে তালা মেরে রেখেছে।
চিন্টু বলল, আরে ভাই, তুমি লকিং সিস্টেমকে আনলকিং করে ফেলো। বাইরে থেকে লক করে দিলেও তো ভেতর থেকে লক খোলা যায়।
: খোলা যায় বলেই ঝন্টু ডোর লক লাগায়নি। হ্যাজবোল্ডে ভিন্ন তালা লাগিয়েছে। তার ওপর আমি রয়েছি দোতলার ঘরে। তাই আগের বারের মতো বেরিয়ে আসতে পারব না।
পিন্টুর কথা শুনে এই প্রথম চিন্টু চিন্তায় পড়ল। চিন্টু ভাবল, আসলেই তো তাই। দোতলার ঘরে পিন্টুকে তালা দিয়ে রাখা হয়েছে। সে বের হবে কেমন করে? ওখান থেকে তো লাফিয়ে পড়া সম্ভব নয়। না, ওকে ছাড়িয়ে নেওয়ার কাজটা সত্যি সত্যিই চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চিন্টু বলল, ঝন্টু বদমাশটা তোমাকে তালা দিয়ে রেখেছে। এখন তো দেখছি সেই তালা খোলার জন্য আমাকেই দোতলায় উঠতে হবে। কিন্তু চাবি জোগাড় করব কোথা থেকে?
: চাবি চুরি করতে হবে।
: চুরি? কি বলছ! চুরি করব কেমন করে?
প্রশ্নের পর প্রশ্ন ঝরে পড়ল চিন্টুর কণ্ঠে। তাতে একটুও বিচলিত না হয়ে পিন্টু বলল, এ কাজটা তুমি সহজেই পারবে।
চিন্টু বলল, তুমি তো বলছ সহজেই পারব। কিন্তু কেমন করে তা করব, সে কথা বলো।
পিন্টু বলল, বলছি। নিচতলার যে ঘরটাতে ঝন্টু আর আমাকে কথা বলতে দেখেছিলে, সেই ঘরের ওয়াল কেবিনেটের গায়ে এ বাড়ির সব চাবি ঝুলিয়ে রাখা হয়। আরেক গোছা চাবি থাকে রান্নাঘরে কাপবোর্ডের সঙ্গে ঝোলানো অবস্থায়। তুমি যেকোনো এক ঘরে ঢুকে চাবি চুরি করবে। সবচেয়ে ছোট চাবিটা দিয়ে এ ঘরের তালা খোলা যাবে।
পিন্টুর কথা শুনে চিন্টুর মেজাজ বিগড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হলো। তবু সে নিজেকে কন্ট্রোলে রেখে বলল, তুমি তো গড়গড় করে বলে দিলে ঘরে ঢুকে চাবি চুরি করব আর সবচেয়ে ছোট চাবি দিয়ে তোমার ঘরের তালা খুলব। কিন্তু ঘরে ঢুকব কেমন করে, সে কথা বলোনি। নিচের সব দরজা বন্ধ করে রাখা হয়েছে।
পিন্টু বলল, আমি তা জানি। এ বাড়িতে ঝন্টু আর আমি ছাড়া কেউ নেই, সেজন্য নিচের সব দরজা-জানালা বন্ধ করে রাখা হয়েছে। তবে সেজন্য ঘাবড়িও না। আমি যা বলছি তা মন দিয়ে শোনো।
: বলো।
: বলছি। এ বাড়ির পেছন দিকে একটা দরজা আছে। সকাল ছয়টা থেকে রাতে ঘুমোতে যাবার আগপর্যন্ত সেই দরজা খোলা থাকে। তুমি সেখান দিয়ে ঢুকে কোথাও লুকিয়ে থাকবে। তারপর ওই পাজিটা ঘুমিয়ে পড়লে চাবি নিয়ে এসে আমাকে ছাড়িয়ে নেবে।
পিন্টুর কথা শুনে চিন্টু অবাক হলো। সে ভাবল, আমার ভাইটি এমনভাবে কথা বলছে, যেন এ বাড়িতে সে বহুদিন ধরে বাস করছে! আসলে চুয়াডাঙার মতো ছোট শহরে বেড়ে ওঠা ছেলে হলেও পিন্টু খুব বুদ্ধিমান। তাই যেটুকু সময় পেয়েছে ঝটপট সবকিছু দেখে নিয়েছে। এমন স্মার্ট ছেলের কাছে তো কিছুতেই হার মানা চলবে না। চ্যালেঞ্জ আমাকে মাথা পেতে নিতেই হবে।
চ্যালেঞ্জ নেওয়ার সংকল্প গ্রহণ করে চিন্টু বেশ দৃঢ় কণ্ঠেই বলল, ঠিক আছে, তুমি যেমনভাবে বললে আমি তেমনভাবেই সব কাজ করব। তবে চাবি চুরি করার জন্য রাত আটটার পর থেকে চেষ্টা চালাব। তাতে ঝন্টুুর হাতে ধরা পড়ার ভয়টা একটু কম থাকবে। আর সে ঘুমিয়ে পড়ার পর তালা খুলে তোমাকে বের করে আনব।
পিন্টু বলল, আচ্ছা। তুমি যা ভালো মনে করো তাই করো।
চিন্টু বলল, সবকিছু ম্যানেজ করে আনতে হয়তো অনেক রাত হয়ে যাবে। তুমি ঘুমিয়ে পড়ো না ভাই। তাহলে সমস্যায় পড়ে যাব।
পিন্টু বলল, তোমাকে সমস্যায় পড়তে দেবো না। কথা দিচ্ছি, আমি এক সেকেন্ডের জন্যও...কথা শেষ না করে পিন্টু ঝট করে পেছন দিকে তাকাল। পরক্ষণেই চিন্টুর দিকে ঘুরে বলল, লুকিয়ে পড়ো লুকিয়ে পড়ো। তালা খোলার শব্দ পাচ্ছি। পাজিটা মনে হয় ঘরে আসছে। চিন্টু ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই দোতলার জানালা বন্ধ হয়ে গেল।
এগারো.
পিন্টুর সাথে কথা বলার পর আরও কিছুটা সময় কেটে গেছে। এ সময়ের ভেতর রাতের অন্ধকার নেমেছে। সেই বাড়ির প্রতিটি ঘরে বাতি জ্বালানো হয়েছে। বাতির আলোয় প্রতিটি ঘর ঝলমল করছে। আলোর ছিটেফোঁটা বাগানেও এসে পড়েছে। তার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে জ্বলছে আর নিভছে জোনাকির আলো। সেই গুঁড়োগুঁড়ো আলোর দিকে তাকিয়ে চিন্টু মুগ্ধ হয়ে গেল-আহ্, কী সুন্দর! যেন আলোর ফুলকি উঠছে-নামছে-এদিক যাচ্ছে ওদিক যাচ্ছে। কিন্তু সেই সৌন্দর্যের দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকার মতো সময় ছিল না। এতক্ষণে হয়তো রাত আটটা পেরিয়ে গেছে। চিন্টুকে এখন এ বাড়ির ভেতরে ঢোকার সুযোগ খুঁজতে হবে।
চিন্টু গাছের আড়াল থেকে বের হয়ে বাড়ির পেছনের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দরজাটা সে সময় পুরোপুরি খোলাও ছিল না আবার বন্ধও ছিল না-পাল্লা দুটো কাছাকাছি আনা ছিল। তাই মাঝখানটা সমান রেখার মতো ফাঁক হয়ে ছিল। চিন্টু খুব সাবধানে সেই ফাঁক দিয়ে ভেতরে ঢুকল। আর হাঁটা চলার সময় যেন কোনো শব্দ না হয়, সেজন্য জুতা খুলে হাতে নিল। পেছনের দরজা থেকে কয়েক গজ এগোলেই দোতলায় ওঠার সিঁড়ি। সেই সিঁড়ির নিচের তিনকোণা ধরনের একটু জায়গা আছে। সেই জায়গাটিতে দুটি বাক্স আর নীল রঙের একটা ড্রাম রাখা আছে। চিন্টু ঝটপট সেই ড্রামটির পেছনে গিয়ে পা গুটিয়ে বসল।
সিঁড়ির নিচে আশ্রয় নেওয়ার পর চিন্টুর সময় যেন আর কাটতেই চাইছে না। ছোট্ট এক টুকরো জায়গায় প্রচ- ঠা-ার মাঝে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতে থাকতে চিন্টুর সারা শরীর ব্যথায় টনটন করছে। কতক্ষণ এভাবে বসে থাকতে হবে কে জানে! একটু পরপরই রান্নাঘর থেকে খসখসে শব্দ ভেসে আসছে-বইয়ের পাতা ওলটানোর মতো শব্দ। তার মানে সেই পাজি বদমাশটা এখনো রান্নাঘরেই আছে। এত সময় লাগিয়ে কী করছে সে রান্নাঘরে-বই পড়ছে না রান্না করছে? তা যা ইচ্ছে করুক। বদমাশটা যে এখনও রান্নাঘরে রয়েছে, সেটাই বড় কথা। আচ্ছা, এই ছেলেধরাটা রাতে ঘুমায় না নাকি-এসব ভেবে চিন্টুর মনে বিরক্তি ধরে গেল।
চিন্টু ভাবল, রাত যে অনেক হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আর বাপি-মাম্মী যে ওর আর পিন্টুর চিন্তায় অস্থির হয়ে উঠেছেন, তাতেও কোনো সন্দেহ নেই। এমনও হতে পারে ওরা বাড়ি ফিরছে না বলে তারা পুলিশে খবর দিয়েছেন। খবরের কাগজেও নিখোঁজ সংবাদ ছাপানোর ব্যবস্থা করতে পারেন।
আচ্ছা, এ জায়গাটা থেকে ওদের বাড়ি কত দূরে? পথ চিনে চিন্টু বাড়িতে যেতে পারবে তো? বাস সার্ভিস বন্ধ হয়ে গেলে সমস্যায় পড়তে হবে।
চিন্টু যখন এসব কথা ভাবছিল সে সময় কাক্সিক্ষত ঘটনাটি ঘটল-বাতি নিভিয়ে ঝন্টু রান্নাঘর থেকে বের হয়ে এলো। তবে ঘুমোনোর জন্য ওপরে গেল না, ড্রইংরুমে গিয়ে বসল। হয়তো টিভি ছেড়ে কোনো মুভি দেখবে। তার মানে আরও অন্তত এক-দেড় ঘণ্টা ঝন্টু ড্রইংরুমেই থাকবে। এ সুযোগে চিন্টু দোতলায় উঠে যেতে পারে। কিন্তু তাতে কি কোনো লাভ হবে? মনে তো হচ্ছে না লাভ হবে। কারণ পিন্টুকে বের করে আনার জন্য ওর ঘরের তালা খুলতে হবে। তালা খোলার জন্য চাবির প্রয়োজন হবে। চাবি তো এখনো ওর হাতেই আসেনি। সুতরাং ধৈর্যের অসীম পরীক্ষা দিয়ে হাত-পা মুড়িয়ে মাথা নিচু করে চিন্টুকে আরও কিছুক্ষণ ড্রামের পেছনে বসে থাকতে হবে-উহ্, অসহ্য!
ওদিকে ক্লান্তি আর ঘুমের কারণে চিন্টুর চোখ বন্ধ হয়ে আসছিল। কিন্তু কিছুতেই তো ঘুমোনো চলবে না। তাই চিন্টু নিজেকে নিজেই শাসন করে বলল, না চিন্টু সোনা, তোমাকে এখন ঘুমোলে চলবে না। যে কাজে হাত দিয়েছ সে কাজ শেষ না করে ঘুমিও না সোনা।
শরীরের জড়তা কাটানোর জন্য চিন্টু নড়েচড়ে ঠিক হয়ে বসল। কিন্তু সমস্যা হলো, চিন্টু যতই নিজেকে শাসন করুক, যতই ধৈর্য ধরার জন্য মনকে প্রবোধ দিক, ধৈর্য ধরারও তো একটা সীমা আছে! অবশেষে একসময় সেই সীমাটাই ভেঙে গেল। চিন্টু ভাবল, নাহ্, এভাবে আর বসে থাকা সম্ভব নয়। ছেলেধরা বদমাশটা ঘরে শিকড় গেড়ে বসে আছে। এ সুযোগে বরং চাবিটাকে হাতে নিয়ে নিই। তাহলে বাকি কাজ সহজ হবে। সিদ্ধান্ত মতোই চিন্টু কাজ করল-সিঁড়ির নিচ থেকে বের হয়ে খুব সাবধানে হাতড়ে হাতড়ে রান্নাঘরে ঢুকল। এখানেও ভাগ্য ওর সহায় হলো। কারণ সে দেখতে পেল জানালা দিয়ে আলো ঢুকে রান্নাঘরের ভেতরটাকে দৃশ্যমান করে রেখেছে। খুব স্পষ্ট না হলেও মোটামুটি সবকিছুই দেখা যাচ্ছে। এমনকি চারটা ঝুলন্ত কাপের পাশে একটা হুকের সঙ্গে চাবির গোছাটাকেও দেখতে পেল সে।
যে চাবিগুলোর কথা পিন্টু বলেছিল সেই চাবি দেখতে পাওয়ায় চিন্টু সবচেয়ে আগে আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া জানাল। তারপর চাবি নেওয়ার জন্য হাত বাড়াল। কিন্তু হাত পুরোপুরি না বাড়াতেই চিন্টুকে থমকে যেতে হলো। কারণ ঠিক সে সময় চিন্টু কারো পায়ের শব্দ শুনতে পেল, যেন কেউ রান্নাঘরের দিকে আসছে। কেউ বলতে ঝন্টু নামের ওই ছেলেধরাটা ছাড়া আর কে? ওর হাতে কিছুতেই ধরা পড়া যাবে না। কোথাও না কোথাও লুকিয়ে পড়তে হবে। লুকোনোর জন্য চিন্টু দ্রুত এদিক-ওদিক তাকাল। সে সময় দেওয়াল থেকে একটু দূরত্বে রাখা একটা আলমারির ওপর ওর চোখ পড়ল। ওটার পেছনে যেটুকু জায়গা রয়েছে তাতে ভালো ভাবেই একজন মানুষ দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে। চিন্টু আর দেরি করল না। চোখের পলকে সেই আলমারির পেছনে গিয়ে লুকিয়ে পড়ল। এর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ঝন্টু রান্নাঘরে এলো। সে প্রথমেই রান্নাঘরের বাতি জ্বালিয়ে জানালা দুটো বন্ধ করা হয়েছে কি না তা পরখ করল। তারপর কাপবোর্ড খুলে কয়েক টুকরো পাউরুটি আর মাখন নিয়ে রান্নাঘর থেকে বের হয়ে গেল। যাবার সময় বাতি নিভিয়ে যেতে ভুলল না।
ঝন্টু চলে যাবার পর আলমারির পেছন থেকে বের হয়ে চিন্টু দরজার সামনে গিয়ে ঝন্টুকে দেখতে চেষ্টা করল। কিন্তু দেখতে পেল না, তবে ড্রইংরুমে আলো জ্বলছে দেখতে পেল। তা থেকে চিন্টু এটা বুঝল, ঝন্টু এখনো সেখানেই আছে। নিশ্চয় বসে বসে মজা করে মাখন মেখে পাউরুটি খাচ্ছে। হায় আল্লাহ! ওই পাজি নচ্ছারটা কি ঘুমোতে যাবে না?
রাগে-দুঃখে চিন্টু নিজের মাথার চুল নিজেই খামচে ধরল। ওর মনে হলো চিৎকার করে বলে, এবার তুমি ঘুমোতে যাও বদমাশ ছেলেধরা। আমাকে আর কষ্ট দিয়ো না।
হয়তো একসময় ধৈর্য হারিয়ে চিন্টু চিৎকার করে উঠত, তবে তার আগেই ভাগ্য ওর প্রতি সদয় হলো। চিন্টু কারো পায়ের শব্দ শুনতে পেল। সে দরজার আড়াল থেকে উঁকি মেরে দেখল, ঝন্টু নামের ছেলেধরাটা সিঁড়ি মাড়িয়ে ওপরে উঠে যাচ্ছে।
বারো.
ঝন্টু দোতলায় উঠে যাবার পর রান্নাঘর থেকে বের হয়ে চিন্টু সিঁড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। সে সময় ঝন্টুর পায়ের শব্দ চিন্টুর কানে এলো। সেই শব্দটা করিডোর দিয়ে যেতে যেতে একেবারে শেষ মাথার একটা ঘরের সামনে গিয়ে শেষ হলো। একটু পর দরজা খোলা ও বন্ধ করার শব্দ হলো। যে ঘরে পিন্টুকে আটকে রাখা হয়েছে সেটি এ বাড়ির মাঝামাঝিতে থাকা একটি ঘর। আর ঝন্টু করিডোরের শেষ মাথার একটি ঘরের দরজা খুলেছে। সে কারণে চিন্টুর বুঝতে সমস্যা হলো না যে ঝন্টু নিজের ঘরে ঘুমোতে গেছে। এই মূল্যবান সত্যটি আবিষ্কার করার পর চিন্টু নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করল-এখন আমার কী করা উচিত? গটগট করে উঠে গিয়ে পিন্টুকে মুক্ত করব, না ছেলেধরাটার ঘুমিয়ে পড়া পর্যন্ত অপেক্ষা করব? মনে হচ্ছে অপেক্ষা করাটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ পিন্টুকে বের করে আনার সময় যদি কোনোভাবে বদমাশটা বুঝতে পারে তার শিকার পালিয়ে যাচ্ছে, তাহলে তীরে এসে তরি ডুবার মতো অবস্থা হবে। এতটা সময় ধৈর্য ধরার পর এখন আর ঝুঁকি নেওয়া ঠিক হবে না।
কোনো কিছুর জন্য প্রতীক্ষায় থাকা যে কি কষ্টকর, চিন্টু তা মর্মে মর্মে অনুভব করে সিঁড়ির সামনে দাঁড়িয়ে রইল-সেকেন্ডগুলো মিনিটের মতো আর মিনিটগুলো ঘণ্টার মতো দীর্ঘ মনে হতে লাগল। এভাবে কয়েকটি দুঃসহ মুহূর্ত কেটে যাবার পর সারাটা বাড়িতে যখন নিঃসীম নিস্তব্ধতা নেমে এলো, তখন চিন্টু খুব সাবধানে পা ফেলে সিঁড়ি পেরিয়ে দোতলায় উঠে গেল।
দোতলার করিডোরে কোনো বাতি জ্বালানো ছিল না। তাই অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে চিন্টু তালা দেওয়া ঘর খুঁজে চলল। বাগান থেকে পিন্টুকে দেখার সময়ই চিন্টু বুঝতে পেরেছিল দোতলার মাঝামাঝিতে থাকা কোনো ঘরে পিন্টুকে আটকে রাখা হয়েছে। তাই সেই ঘরটি খুঁজে বের করতে তেমন সমস্যা হবে না। সমস্যা হবে চাবির গোছা থেকে দরকারি চাবিটি খুঁজে বের করতে।
এ সময় চিন্টুর মনে পড়ল পিন্টু ওকে বলেছিল, পিন্টুকে যে ঘরে আটকে রাখা হয়েছে, সবচেয়ে ছোট চাবি দিয়ে সেই ঘরের তালা খুলবে। সুতরাং সবচেয়ে ছোট চাবি কোনটি, তাই এখন ওকে খুঁজে বের করতে হবে। পিন্টুর ঘর আর প্রয়োজনীয় চাবি বের করে একবার চেষ্টা করতেই খুট করে ঘরের তালা খুলে গেল। এই প্রাথমিক সাফল্যে মন নেচে উঠলেও পরক্ষণেই চিন্টু নিজেকে শাসন করল-না-না চিন্টু, এই সামান্য সাফল্যে তোমাকে এত খুশি হলে চলবে না। তোমাকে আরও সচেতনতার সঙ্গে আরও দক্ষতা নিয়ে কাজ করতে হবে। তালা খোলার সময় খুট করে একটা শব্দ হয়েছিল। ওটা হয়েছে তোমার তাড়াহুড়োর জন্য। কিন্তু দ্বিতীয়বার আর অমন শব্দ হতে দেওয়া যাবে না।
তালা খোলার শব্দ শুনে ঝন্টুর ঘুম ভেঙে গেছে কিনা তা যাচাই করে দেখার জন্য চিন্টু একটা পিলারের আড়ালে গিয়ে দাঁড়াল। সেখানে দাঁড়ানো অবস্থায় তিন-চার মিনিট কেটে যাবার পরও যখন ঝন্টুর ঘরের দরজা খোলার কোনো শব্দ শুনতে পেল না, তখন চিন্টু নিশ্চিত হলো ঝন্টু তালা খোলার শব্দ শুনতে পায়নি। এবার পিন্টুর ঘরে যাওয়া যাবে।
চিন্টু এবার খুব সাবধানে পিন্টুর দরজা ফাঁক করে ঘরের ভেতর উঁকি দিলো। কিন্তু ঘরের ভেতরে অন্ধকার ছিল। তাই পিন্টু জেগে আছে না ঘুমিয়ে পড়েছে, চিন্টু তা বুঝতে পারল না। ফলে বাধ্য হয়েই চিন্টুকে ফিসফিস করে ডাকতে হলো-পিন্টু! তুমি জেগে আছ?
: হ্যাঁ চিন্টু, জেগে আছি। তুমি তালা খুলতে পেরেছ? অন্ধকারের ভেতর থেকে পিন্টুর উচ্ছ্বসিত কণ্ঠ ভেসে এলো।
অমনি চিন্টু শঙ্কিত কণ্ঠে ওকে বাধা দিয়ে বলল, তুমি চেঁচিয়ে কথা বোলো না। বদমাশটা শুনতে পেলে আর পালাতে পারবে না।
: কিন্তু পালাতে পারব তো?
: ইনশাআল্লাহ পারব। আমি তোমাকে ঝন্টুর আস্তানা থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যাব।
: তুমি তো প্রথম থেকেই এ কথা বলছ। কিন্তু এখন আমার আশা-ভরসা হারিয়ে যাচ্ছে। কি যে ভাগ্যে আছে কে জানে! শঙ্কিত কণ্ঠে পিন্টু আশঙ্কা প্রকাশ করল।
তবে সঙ্গে সঙ্গেই ওকে ভরসা দিয়ে চিন্টু বলল, ইউ আর রাইট। নান ক্যান টেল এ্যাবাউট দ্যা ফিউচার। বাট আই ক্যান সে আই উইল বি উইথ ইউ ফর দ্যা রেসকিউ। সো...
: সো, আমি আল্লাহর ওপর ভরসা করে তোমার সঙ্গে পা বাড়াতে পারি-এই তো?
: হ্যাঁ।
: বেশ, চলো আমরা বেরিয়ে পড়ি। আর এক সেকেন্ডও এখানে নয়।
চিন্টু জিজ্ঞেস করল, তুমি পুরোপুরি রেডি তো? এখনই বেরিয়ে পড়তে পারবে?
পিন্টু বলল, অবশ্যই পারব। শব্দ যেন না হয় সেজন্য জুতা খুলে হাতে নিয়েছি।
: খুব ভালো করেছ। চলো, আমরা কেটে পড়ি। তুমি আমার পেছন পেছন এসো।
পিন্টুকে নিয়ে চিন্টু পিঁপড়ের মতো পা টিপে টিপে নিঃশব্দে সেই বাড়ি থেকে বের হয়ে এলো। তারপর জনমানবহীন রাস্তায় দাঁড়িয়ে দুজন ভেবে চলল এর পর কী করবে? [চলবে]
আরও পড়ুন...