ঈদুল আহজার শিক্ষা

প্রচ্ছদ রচনা মুসা আল হাফিজ মে ২০২৬

ঈদুল আজহা যখন আসে। আকাশ থেকে নেমে আসে খুশির আলো। আনন্দের বৃষ্টি ঝরে টাপুরটুপুর। সবাই সিক্ত হয়, সকল মন ভিজে যায়। 

ঈদুল আজহাকে আমরা বলি কুরবানির ঈদ। এটি মুসলিম সমাজের অন্যতম পবিত্র ও তাৎপর্যপূর্ণ উৎসব। আনন্দ ও উৎসবের পাশাপাশি এই দিনে আছে অনেক বড় শিক্ষা। কারণ, কুরবানির ঈদে নিহিত আছে আল্লাহর প্রতি গভীর আনুগত্য, আত্মত্যাগ এবং মানবিক দায়িত্ববোধের নমুনা।

আমরা জানি, এই ঈদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাসের এক মহান ঘটনা। অনেক দিন আগের কথা। আল্লাহর রাসূল হযরত ইবরাহিমকে (আ) হুকুম করা হলো, নিজের সবচেয়ে প্রিয় জিনিস কুরবানি করো। 

পুত্র ইসমাইল (আ) ছিলেন তাঁর কাছে সবচেয়ে প্রিয়। তিনি তাকে কুরবানি করতে চাইলেন আল্লাহর জন্য।

পবিত্র কুরআনের সূরা সাফফাত (আয়াত ১০০-১১১)-এ বর্ণিত হয়েছে, কীভাবে আল্লাহ স্বপ্নে ইবরাহিম (আ)-কে তাঁর প্রিয় পুত্রকে কুরবানি করার আদেশ দেন। এই হুকুমের সামনে তিনি বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি। অন্যদিকে ইসমাইল (আ)-ও সম্পূর্ণ সমর্পণের সঙ্গে এই আদেশ মেনে নিয়েছিলেন। তাঁদের এই ত্যাগ ও আনুগত্যের পুরস্কার হিসেবে আল্লাহ শেষ পর্যন্ত একটি দুম্বা প্রেরণ করেন। ফলে হযরত ইসমাইলের বদলে দুম্বা কুরবানি করা হয়।

কুরবানির ঘটনাটি আমাদের শেখায়, নিজের ইচ্ছাকে আল্লাহর আদেশের সামনে কীভাবে নত করতে হয়।

এই ঘটনার সময় হযরত ইসমাইল (আ) ছিলেন একজন কিশোর। কোনো কিশোরের জন্য জীবনের সবচেয়ে প্রিয় জিনিস হলো নিজের অস্তিত্ব, নিজের ভবিষ্যৎ। কিন্তু তিনি বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে বলেছিলেন-হে আমার পিতা! আপনি যা আদেশ পেয়েছেন, তা-ই করুন।

ঘটনাটির প্রতি খেয়াল করো। ইসমাইলের (আ) জীবনে কী কঠিন মুহূর্ত এসেছে। অপরদিকে তিনি সেই মুহূর্তেও সত্য ও আদর্শের পথে পাথর-সমান অবিচল! একেই বলে মুমিনের চূড়ান্ত মজবুতি! 

কুরবানির ঘটনাটি কেবল ত্যাগের নয়; বরং নিঃশর্ত আনুগত্যের প্রতীক। ইসমাইল (আ)-এর এই আত্মসমর্পণ আমাদের শেখায়-আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস রাখলে কোনো ভয় বা সংকোচ থাকে না।


আধুনিক জীবনে বহু কিশোররা নানা ধরনের আকর্ষণ ও বিভ্রান্তির মুখোমুখি হয়। যেখানে যখনই প্রলোভন আমাদের ভুল পথে ডাকে, তখন এই ঘটনা আমাদের বলে-সাবধান, বিভ্রান্তির দিকে যেয়ো না। নিজের ভয়, ইচ্ছা ও আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। আমাদের জানা ও মানা উচিত যে, নৈতিক শক্তি ও আত্মনিয়ন্ত্রণই প্রকৃত সফলতার চাবিকাঠি।

হযরত ইসমাইলের (আ) এই শিক্ষা আমাদের সঠিক পথে থাকতে অনুপ্রাণিত করে। কিশোর বয়স সাধারণত আবেগপ্রবণতার সময়। কিন্তু ইসমাইল (আ) দেখিয়েছেন-ধৈর্য ও মানসিক দৃঢ়তা থাকলে যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি মুকাবিলা করা সম্ভব। তিনি ভয় পাননি, অভিযোগ করেননি; বরং ধৈর্য ধরে আল্লাহর সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছেন। এটি কি আমাদের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নয়? 

এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পিতা ও পুত্রের মধ্যে গভীর আস্থা ও ভালোবাসা। ইবরাহিম (আ) তাঁর পুত্রকে জোর করেননি; বরং তাঁর মতামত জানতে চেয়েছেন। আর ইসমাইল (আ) আনন্দের সাথে তা মেনে নিয়েছেন। এই পারস্পরিক সম্মান ও বিশ্বাস আজকের পরিবারগুলোর জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।

ইসমাইল (আ)-এর কুরবানি কিশোরদের মনে একটি বড় প্রশ্ন জাগিয়ে তোলে। সেটা হলো, জীবনের আসল উদ্দেশ্য কী? ইসমাইল (আ) আমাদের শেখান যে, শুধু ভোগবিলাস নয়; বরং একটি উচ্চতর লক্ষ্য ও আদর্শের জন্য বেঁচে থাকাই মানুষের প্রকৃত পরিচয়।

কুরবানির ঘটনাটি কিশোরদের সাহসী হতে শেখায়। নিজের জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তেও ইসমাইল (আ) যে সাহস ও আত্মবিশ্বাস দেখিয়েছেন, তা কিশোরদের জন্য এক অনুপ্রেরণার উৎস। এটি আমাদের কানে কানে বলে দেয়, সত্যের পথে থাকলে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।

কুরবানির এই শিক্ষা কিশোরদের শুধু ব্যক্তিগতভাবে নয়, সামাজিকভাবেও উন্নত হতে সাহায্য করে। আমরা বুঝতে পারি-একজন আদর্শ মানুষ হতে হলে ত্যাগ, সততা ও নৈতিকতা খুব দরকার।

ফলে পিতা ও পুত্রের ত্যাগের এই কাহিনি যুগে যুগে মুসলমানদের অনুপ্রাণিত করে আসছে।

কিশোরবেলায় আমি যখন ঘটনাটি পড়েছিলাম, অবাক প্রজ্ঞার নাগাল পেয়েছিলাম। ডায়েরিতে লিখেছিলাম-আমরা যা কিছু ভালোবাসি, তা-ও আল্লাহর জন্য ছেড়ে দিতে পারলে সেটাই সবচেয়ে বড় সাহস।

এই উপলব্ধির সাথে আশা করি তুমিও একমত হবে।

ঈদুল আজহা কেবল পশু কুরবানি নয়; এটি আত্মত্যাগে নিমজ্জিত হওয়ার এক আহ্বান। আমরা জানি, মানুষের ভেতরে লুকিয়ে থাকে লোভ, অহংকার, হিংসা, স্বার্থপরতার পশু। প্রকৃত কুরবানি হলো এই অন্তর্গত পশুত্বকে জবেহ করা। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এই সত্যকেই উচ্চারণ করেছেন কবিতার ভাষায়-

‘মনের মাঝে পশু যে তোর

আজকে তারে কর জবেহ।’

এই আহ্বান কিশোরদের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এই বয়সেই মানুষের চরিত্র গড়ে ওঠে। যদি তারা এই সময় থেকেই নিজেদের ভেতরের খারাপ প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে, তবে তারা ভবিষ্যতে একজন আদর্শ মানুষ হতে পারবে।

ঈদুল আজহা আমাদের সাহস ও ন্যায়ের পথে চলারও শিক্ষা দেয়। ঈদুল আজহা শেখায়, অন্যায়, জুলুম, অবিচার ও মিথ্যার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোই ঈমানের পরিচয়। 

এই শিক্ষা আমাদের মধ্যে সামাজিক সম্প্রীতি ও মানবিকতার বোধ জাগিয়ে তোলে। আমরা বুঝতে শিখি-মানুষে মানুষে বিভেদ নয়; বরং মিলনই জীবনের মূল সুর। তাকওয়ার মাধ্যমে যা প্রতিষ্ঠিত হয়, স্থায়ী হয়। 

পবিত্র কুরআনে সূরা হজের ৩৭ নম্বর আয়াতে ঘোষণা হচ্ছে-“তোমাদের কুরবানির পশুর রক্ত-মাংস আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না; আল্লাহর কাছে পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।”

এই আয়াত স্পষ্ট বলে দেয়-আল্লাহ বাহ্যিক কাজের চেয়ে মানুষের অন্তরের অবস্থা দেখেন। তাকওয়া মানে হলো আল্লাহভীতি, আত্মশুদ্ধি এবং অন্যায় থেকে নিজেকে বিরত রাখা। অতএব, আমাদের প্রতিটি কাজের পেছনে যেন থাকে সততা, নিষ্ঠা ও আল্লাহর সন্তুষ্টির আকাক্সক্ষা। কুরবানি আমাদের কাছে এটাই চায়।

ঈদুল আজহার প্রচলন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর যুগ থেকেই। তিনি নিজ হাতে কুরবানি করতেন এবং তাঁর উম্মতের জন্যও কুরবানি দিতেন। কুরবানির সময় তিনি বলতেন, “বিসমিল্লাহ, আল্লাহু আকবার।” তাঁর এই আমল থেকে আমরা শিখি-কুরবানি একটি ইবাদত, যা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে সম্পন্ন করতে হয়, কোনো প্রদর্শন বা লোকদেখানোর জন্য নয়।

ইসলামী পণ্ডিত ইমাম ইবনে জারির তাবারি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ তাফসিরে তাবারি-তে উল্লেখ করেছেন, কুরবানির প্রকৃত তাৎপর্য হলো নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম। এটি এক ধরনের আধ্যাত্মিক জিহাদ, যেখানে মানুষ নিজের ভেতরের খারাপ প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে। এই ব্যাখ্যা থেকে স্পষ্ট হয় যে-কুরবানি কেবল একটি বাহ্যিক রীতি নয়; বরং এটি আত্মশুদ্ধির এক গভীর প্রক্রিয়া।

ঈদুল আজহার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সামাজিক ন্যায় ও সহমর্মিতা। কুরবানির গোশত তিন ভাগে ভাগ করা হয়-এক ভাগ নিজের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়স্বজনের জন্য এবং এক ভাগ গরিব-দুঃখীদের জন্য। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সমাজে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত হয় এবং ধনী-গরিবের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন তৈরি হয়। কিশোররা এখান থেকে শেখে-নিজের আনন্দ অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়াই প্রকৃত মানবতা।

ঈদুল আজহা আমাদের ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা দেয়। এই দিনে ধনী-গরিব, বড়-ছোট সবাই একসঙ্গে নামাজ আদায় করেন, একে অপরের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। এতে সমাজে ভালোবাসা, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বৃদ্ধি পায়। আজকের বিভক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে এই শিক্ষা অত্যন্ত জরুরি। 

ঈদের সময় আমরা দেখি, সবাই নিয়ম মেনে কাজ করেন। গোসল করা, ভালো জামা পরা, গুরুজনের দোয়া নেওয়া, ঈদগাহে যাওয়া, খুতবা শোনা, তাকবির বলা, কুরবানি দেওয়া-সবই সুন্দর নিয়ম। এখান থেকে আমরা শিখি আনুগত্য ও শৃঙ্খলা। যখন আমরা ঠিকভাবে কাজ করি, তখন আমাদের জীবন সুন্দর ও সুশৃঙ্খল হয়।

ঈদুল আজহা শিশু-কিশোরদের দায়িত্ববান হতেও শেখায়। কুরবানির সময় বড়দের সাহায্য করা, গোশত ভাগ করা, গরিবদের মধ্যে বিতরণ কর-এসব ছোট ছোট কাজের মধ্য দিয়ে তারা দায়িত্ব নিতে শেখে। যাতে তারা বড় হয়ে ভালো মানুষ হতে পারে।

ঈদুল আজহা আমাদের দেয় আনন্দ। একই সাথে তৈরি করে আমাদের ভেতরকে বদলে দেওয়ার এক মহান সুযোগ। কুরবানির শিক্ষা আমাদের ডেকে বলে-জীবনের আসল সৌন্দর্য ভোগে নয়, ত্যাগে; জয়ের গৌরব দাপটে নয়, আত্মসংযমে।

কিশোরদের জন্যও ঈদ একটি পথনির্দেশ। যেখানে লেখা আছে, নিজের ভেতরের খারাপ প্রবৃত্তিকে দমন করো, সত্যের পথে দৃঢ় থাকো এবং মানুষের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতে শেখো।

যদি আমরা এই শিক্ষাগুলো হৃদয়ে ধারণ করতে পারি, তবে আমাদের প্রতিটি দিনই হয়ে উঠবে এক একটি সত্যিকারের ঈদ।

এসো, আমরা নিজেদের অহংকার, লোভ ও হিংসাকে কুরবানি করি। ত্যাগ, সাহস, আনুগত্য, খোদাপ্রেম ও মানবসেবার গুণাবলি দিয়ে নিজেদের সাজাই। তাহলেই ঈদুল আজহা সত্যিই আমাদের জীবনে আলোর বন্যা বইয়ে দেবে।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ