এক্সোপ্লানেটের পথে
সাইন্স ফিকশন রায়হান হোসাইন সেপ্টেম্বর ২০২৬
“অ্যামাজনের গহিন অরণ্য থেকে কোনো এক অদৃশ্য শক্তিতে গায়েব হয়ে যাচ্ছে মাটি। বনের বিভিন্ন জায়গায় দেখা যাচ্ছে সুগভীর গর্ত। প্রশ্ন থেকে যায়-কোথায় যাচ্ছে এসব মাটি? ব্রাজিল সরকার ও পৃথিবীর বিভিন্ন অনুসন্ধানকারী জোর তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছেন।
“সাইবেরিয়ার বিস্তৃত বরফরাজ্যে ঘটে চলেছে একের পর এক অদ্ভুত ঘটনা। স্থানীয় এস্কিমো উপজাতিদের মতে, রাতে অজানা কোনো উৎস থেকে ভেসে আসছে এক অদ্ভুত শব্দ। একনাগাড়ে সারা রাত, কখনো-বা কয়েক ঘণ্টা শোনা যায় এ শব্দ। আবার এই অদ্ভুত শব্দের সঙ্গে বেগুনি একধরনের আলোও মাঝে মাঝে দেখা যাচ্ছে। তবে শব্দের উৎসের সন্ধান পাওয়া যায়নি। আরও চিন্তার বিষয়-স্থানে স্থানে বিভিন্ন প্রাণীর মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। এসব ঘটনায় এস্কিমোসহ অন্যান্য উপজাতি খুব আতঙ্কে রয়েছে।”
বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। টেবিলে সহকারী বন্ধু হুগোর মুখোমুখি বসে আছি। বিদেশের মাটিতে বন্ধুত্বটা বেশ পোক্ত। সন্ধ্যা থেকেই বৃষ্টি। মুষলধারে। বিকেলেও আকাশ পরিষ্কার ছিল। নিউইয়র্কে এমন বৃষ্টি খুব কম দেখেছি।
বৃষ্টির মাঝেই ডেলিভারি রোবট এসে পিৎজা দিয়ে গেল। খেতে খেতে হুগো বলল, ‘দেখেছ নিউজ?’
‘বিকেলেই পড়লাম।
‘কী বুঝলে?’
‘মনে হয় ঘটনা দুটির মধ্যে মিল আছে।’
‘কোথায় মধ্য আমেরিকার ব্রাজিল আর কোথায় রাশিয়া! ভৌগোলিক ব্যবধান দেখেছ?’
‘একটু অন্যভাবে ভাবো। নিউজগুলো সমসাময়িক। একটার পর একটা সামনে এসেছে।’
‘তবে সবাই সাইবেরিয়ার বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছে, সবাই ছুটছে ব্রাজিলে।’
‘হুম, এটা খেয়াল করেছি। আমরাও যাব, তবে ব্রাজিল নয়-সাইবেরিয়ায়!’
দুই.
সবাই যখন ব্রাজিলে ছুটছে মাটি অনুসন্ধানে, তখন আমরা একটু অন্য পরিকল্পনায় এগোলাম। যদিও পরিবেশ ছিল বেশ প্রতিকূল।
নিউইয়র্কের ব্যস্ত শহর থেকে আজ সাইবেরিয়ার নিস্তব্ধ বরফাচ্ছন্ন এলাকায় এসেছি। আমাদের টিম এগিয়ে চলছে শব্দের দিকে। এর আগে কয়েকটি টিম আসলেও বিরূপ আবহাওয়ায় টিকে থাকতে পারেনি।
বড় একটা পাইনগাছের তলায় আমাদের তাঁবু। আজব ওই শব্দের অনেকটাই কাছে পৌঁছেছি এখন।
‘হুগো, শব্দটা বাড়ছে।’ একটু জোরেই বললাম।
‘আলোটা দেখা যাচ্ছে না।’
‘তুষারপাত না থাকলে স্পষ্ট দেখা যেত। হচ্ছে কী ওখানে?’
‘কাল দেখা যাবে।’
‘আগুনে একটু কাঠ দাও। ঘুমানোর চেষ্টা করি।’
বিকেলেই পাইনের কিছু ডাল কেটে রাখা হয়েছিল। ভেজা থাকলেও ড্রাই লেজার দিয়ে মুহূর্তেই শুকিয়ে নেওয়া হয়েছে।
রাতে তেমন কিছু ঘটেনি আর। অদ্ভুত একঘেয়ে শব্দটা বন্ধ হয়ে গেছে রাতের শেষাংশে।
তবে সকাল থেকে হুগোকে বেশ চিন্তিত লাগছিল। টিম মেম্বারদের অনেকেই অসুস্থ। এসব নিয়েই ভাবছে হয়তো। কী মনে করে বলে উঠল, ‘আমরা ঠিক পথে আছি তো?’
‘এস্কিমো আর আমাদের অনুমান ভুল না হলে, সঠিক পথেই আছি।’
‘শব্দটা যেভাবে শোনা গেল, কয়েক কিলোমিটারের মধ্যেই হয়তো।’
‘বিকেলের মধ্যেই পৌঁছাতে হবে। আর দুপুরের দিকে স্পাই ড্রোন পাঠিয়ে খোঁজ নিতে হবে ওপাশের।’
‘খেয়াল করেছ, কম্পাস কাজ করছে না?’
‘সকালে রবার্ট এসে জানিয়েছে। তুমি তাঁবু গোটানোর নির্দেশ দাও, ড্রোন সেটআপ দিয়ে রাখো।’
টিমের উদ্যমী সদস্য রবার্ট। কম্পাস কাজ না করার কারণ রাতের মধ্যেই বের করে ফেলেছে। রেডিওমিটারে পশ্চিম দিক অর্থাৎ শব্দের দিক থেকে তীব্র রেডিয়েশনের সিগন্যাল পাওয়া গেছে। তা এতটাই তীব্র যে, কয়েক কিলোমিটার দূর থেকেও কম্পাসের ম্যাগনেটিক ফিল্ড সম্পূর্ণ বিকল করে দিয়েছে!
তিন.
বরফের ওপর দিয়ে গোধূলির স্নিগ্ধ হিমেল হাওয়া বয়ে আসছে। মাঝে মাঝে নিচু গর্ত। চারপাশে কোনো প্রাণী দেখা যাচ্ছে না। বসবাস কঠিন হলেও সাইবেরিয়ার এ অঞ্চলে ধূসর নেকড়ে, টুন্দ্রা নেকড়ে দেখা যায়। হয়তো রেডিয়েশনের জন্য পালিয়ে গেছে।
সামনে একটা পাহাড়। ওপাশে একটু আগেই হুগো ড্রোন পাঠিয়েছে। হয়তো রহস্যময় জায়গাটা বেশি দূরে নয়। কিন্তু হঠাৎ ড্রোন ডিসকানেক্টেড হয়ে যায়। শেষ মুহূর্তে স্ক্রিনে দেখা গিয়েছিল একটা ফাঁকা মাঠ।
‘ড্রোনও কি ওই শক্তির শিকার?’ হতাশ কণ্ঠে বলল হুগো।
‘হতে পারে। তবে পাহাড়ের ওপাশেই সেই শক্তির পাওয়ার স্টেশন।’
‘চলো, ওঠা যাক পাহাড়ে।’
বাকি টিম মেম্বারদের নিচে রেখে আমরা পাহাড়ে উঠতে থাকি। পাহাড়ে ওঠার পরপরই রাতের অন্ধকার যেন গ্রাস করে নিল। ইনফ্রারেড গগলস আর সেফটি জ্যাকেট পরে নিতেই চারপাশ স্পষ্ট হলো।
ড্রোনে দেখা ফাঁকা মাঠটা এবার দেখা যাচ্ছে। তবে মাঝখানে কিছু একটা দাঁড়িয়ে আছে। অনেকটাই বড়। স্পেসশিপ নাকি! ওপরের দিকটা বেশ সরু। তবে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না।
আগের রাতের শব্দটা শুরু হলো। অনেক গম্ভীর। আওয়াজও অনেক জোরে।
হঠাৎ একটা ড্রোনের মতো অবজেক্ট এসে মাথার ওপর বিপ বিপ শব্দে সাইরেন বাজাতে লাগল।
‘আমরা তাদের রাডারে ধরা পড়ে গেছি, হুগো। আমাদের আরও স...’
কথা শেষ না হতেই জাহাজের সার্চলাইটের মতো তীব্র চোখধাঁধানো আলো গায়ে লাগল। মুহূর্তেই আরও কয়েকটা অবজেক্ট এসে হাজির। আমরা নড়তে পারছি না। কোনো এক শক্তি থামিয়ে রেখেছে যেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই কফিনের মতো একটা বক্সে ঢুকিয়ে লক করে দিলো।
কিছু দেখতে পাচ্ছি না। বুঝলাম কোথাও ওঠানো হচ্ছে। দাঁড়িয়ে থাকা শিপটাতে হয়তো।
হাতের রেডিয়াম ডায়ালে দশ মিনিট পেরিয়ে গেল। একটু নড়ে উঠল চারপাশ। ঝাঁকুনি টের পেলাম। অর্থাৎ শিপ ফ্লাই করতে শুরু করেছে! কোথায় নিয়ে যাচ্ছে তারা?
ঘটনাগুলো খুব দ্রুত ঘটে গেল। তবে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়-কিছুক্ষণ পর আরেকটা মৃদু ঝাঁকুনিতে বুঝলাম ল্যান্ড করেছে তারা।
ধীরে ধীরে বক্সের ঢাকনা খুলে গেল। চারদিক পরিষ্কার হতে শুরু করেছে। সামনে ভেসে উঠল একটা বড় ঘর। দেখি, কফিনের মতো বক্সটা আসলে স্বচ্ছ কাচের মতো পদার্থ দিয়ে তৈরি কিউব।
হঠাৎ বাইরে দৃষ্টি ফেরাতেই চমকে উঠলাম। এ কী! বাইরের পরিবেশে ঝকঝকে আকাশ দেখা যাচ্ছে। এখন দিন? বন্দি হওয়া থেকে এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ বিশ মিনিট কেটেছে। এ স্বল্প সময়ের মধ্যে সাইবেরিয়ার অন্ধকার রাত দিন হলো কীভাবে?
ছিলাম বিস্তৃত বরফের মাঝে। এখানে দেখা যাচ্ছে সবুজ বনাঞ্চল। ওরা কি সাইবেরিয়ার টাইগা বনাঞ্চলে নিয়ে এসেছে?
তা কী করে হয়! বাইরে তো বরফে ঢাকা ধূসর গাছ নয়; বরং সবুজ গাছ। সবচেয়ে বড় বিষয়-কয়েক মিনিটে কীভাবে টাইমজোন পালটাতে পারে?
চার.
“ছেআ ইকটিক হবিস ইয়ে যন।”
অদ্ভুত ভাষায় দরজার কাছে কিউব থেকে দূরে দাঁড়িয়ে অস্বাভাবিক গঠনের একটা প্রাণী কথা বলে উঠল।
লম্বায় চার ফুট। পায়ের স্থানে তিনটা বলের মতো কী যেন। হাত আছে কি না বোঝা গেল না। সম্পূর্ণ দেহটা অস্বাভাবিক আকৃতির। মাথা, চোখ, মুখ, পা আলাদাভাবে চেনার উপায় নেই। সম্পূর্ণ ব্ল্যাঙ্ক একটা নীল রঙের বোর্ড বলা যায়।
তবে কথা বলল কীভাবে? দ্বিতীয়বার কথা বলতেই বোঝা গেল, কথা বলার সময় দেহের ওপরের অংশে ষড়ভুজাকৃতির একটা চোখ ও গোল একটা মুখাবয়ব দৃশ্যমান হচ্ছে।
তবে আবারও অদ্ভুত সে ভাষার কিছুই বুঝলাম না। একটু পর সে একটা হেলমেটের মতো কিছু মাথায় পরিয়ে দিলো। সে সময় অটোমেটিক হাতের মতো একটা কিছু তার বডি থেকে বেরিয়ে এলো। কাজ শেষে আবারও ঢুকে গেল। অনেকটা কচ্ছপের মতো।
হুগো পাশে এসে দাঁড়াল। এলিয়েনটার মধ্যে কোনো পরিবর্তন দেখলাম না। সে হাতে একটা যন্ত্র নিয়ে কী যেন কমান্ড প্রেস করল। হয়তো ট্রান্সলেটর। এবার তার কথা বোঝা যাচ্ছে।
“ভয় নেই। আমি গ্যাপিন্ট। আপনারা এখন লুটেক্স নামক স্পেসশিপে। আমরা ব্রিউয়ার্স গ্রহ থেকে এসেছি পৃথিবীর মাটির উপাদান সংগ্রহ ও গবেষণা করতে।”
এটুকু বলেই থেমে গেল। আমরা হতবাক। এদের মধ্যে নামকরণ পদ্ধতিও আছে।
তাকে বললাম, ‘আমরা কোথায় আছি?’
‘অ্যামাজনে।’
‘আমাদের টিম মেম্বাররা কোথায়?’
‘তাদের নিয়ে আসা হয়নি।’
আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই চলে গেল।
মাথায় অনেক ভাবনা ঝড়ের মতো ঘুরছে। আমরা অ্যামাজনে, সাইবেরিয়া থেকে! কীভাবে সম্ভব! কয়েক মিনিটে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে আসা!
তবে কি তাদের কাছে ‘ডিপ ড্রাইভ টেকনোলজি’ আছে, যা দিয়ে মুহূর্তেই কয়েক আলোকবর্ষ পাড়ি দেওয়া যায়?
পাঁচ.
শেষবারের মতো পৃথিবীকে কিছু সময়ের জন্য দেখতে পেলাম। পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে চাঁদের পাশ দিয়ে যাচ্ছে লুটেক্স। চলছে সাধারণ গতিতে। শুক্রের কক্ষপথে হাজির হয়েছি। সূর্য থেকে বেশি দূরে নয়।
সেদিন রাতেই অ্যামাজন থেকে আমাদের নিয়ে এলিয়েন স্পেসশিপ লুটেক্স যাত্রা শুরু করেছে। স্পেশাল একটা খোলসের মতো কিছু পরিয়েছে আমাদের। পৃথিবী ছাড়িয়ে বুধের কক্ষপথে এখন লুটেক্স।
ডিপ ড্রাইভ টেকনোলজি ব্যবহার করছে না তারা। কেন, সেটা জানানো হয়নি। পৃথিবীতে বলেছে-আমাদের আবার ফেরত পাঠানো হবে।
এই কদিনে গ্যাপিন্ট অর্থাৎ প্রথম দিনের সেই এলিয়েনটার সঙ্গে ছাড়া অন্য কারও সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি। এমনকি কারও সঙ্গে দেখাও হয়নি। মহাকাশেও আমাদের রুমের অবস্থা স্বাভাবিক। যদিও রুমের বাইরে বের হওয়ার উপায় নেই।
মহাকাশে আমাদের তৃতীয় দিন। গ্যাপিন্টের সঙ্গে কথা বলে জানলাম, লুটেক্স সূর্যের খুব কাছাকাছি যাবে। বুধের কক্ষপথ ছাড়বে আজই। সূর্য থেকে সংগ্রহ করবে গাঢ় প্লাজমা।
বারবার একটা জিনিস ভাবাচ্ছে-এমন কোন ধাতু দিয়ে তৈরি লুটেক্স, যা সূর্যের পৃষ্ঠ থেকে প্লাজমা সংগ্রহ করার মতো ক্ষমতা রাখে!
‘ওরা আমাদের অক্সিজেন জোগাচ্ছে কীভাবে, জিনান?’ হুগোর কথায় ভাবনাছেদ ঘটল।
‘যাদের কাছে ডিপ ড্রাইভ টেকনোলজি থাকতে পারে, তারা সামান্য দুটো মানুষের অক্সিজেন জোগান দিতে পারবে না?’
কী যেন ভেবে বলল, ‘তাদের উদ্দেশ্য ঠিক কী? আমাদের কী করবে?’
‘কিছুই তো বলছে না। হয়তো ব্রিউয়ার্সকে পৃথিবীর মতো করতে চায়। দেখা যাক কী হয়। ক্ষতি তো করেনি এখনও।’
সূর্য থেকে প্লাজমা সংগ্রহ শেষ। আজ দেখছি সামনের দেওয়ালটা অন্য একটা আবরণে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। জানালার মতো ছোট একটা অংশ ফাঁকা রয়েছে। রুমে স্থাপন করেছে নতুন দুটো অদ্ভুত আকৃতির বক্স।
সবকিছু দেখে মনে হচ্ছে যাত্রার জন্য প্রস্তুত লুটেক্স।
গ্যাপিন্ট এসে বলে গেল, আপাতত এখানকার কাজ শেষ। আমরা মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি ত্যাগ করার প্রস্তুতি নিচ্ছি। গ্যালাক্সির কেন্দ্রে যেতে হবে। ওখান থেকে আমরা বিওগেন গ্যালাক্সিতে যাব।
আজকের মধ্যেই অরায়ন বাহু থেকে গ্যালাক্সির কেন্দ্রের উদ্দেশে রওনা দেওয়া হবে। ওয়্যারলেস নির্দেশ আসার সঙ্গে সঙ্গেই বক্সে ঢুকে যাবেন। প্রবেশ করলেই বডি অটোমেটিক সেটআপে কিউব লক হয়ে যাবে। হয়তো তিন ঘণ্টায় পৌঁছে যাব।”
হুগোর চোখে-মুখে বিস্ময়ের ছাপ ফুটে উঠেছে। বিস্ময়ভরা কণ্ঠেই বলল, ‘গ্যালাক্সির কেন্দ্র! সেখান থেকে মিল্কিওয়ের বাইরে! কত দূরে এদের গ্রহ ব্রিউয়ার্স?’
মিল্কিওয়ের বাইরে শুনে ভাষা হারিয়ে ফেলছি। অস্থির স্বরে বললাম, ‘কত দূরে, তা বলা মুশকিল। তবে দেখো, সূর্য থেকে গ্যালাক্সির কেন্দ্র ২৭ হাজার আলোকবর্ষ দূরে। আমরা এ পথ পাড়ি দিতে লক্ষ বছর পেরিয়ে যাবে। কিন্তু গ্যাপিন্টের কথা শুনলে? তিন ঘণ্টায় পৌঁছে যাব!’
‘ঘণ্টায় ৯ হাজার আলোকবর্ষ পাড়ি দেবে!’
‘এটা তাদের সর্বনিম্ন গতি!’
ওয়্যারলেসে নির্দেশ শুনে কিউবে প্রবেশ করতেই বডি লক হয়ে গেল। রুমের ভেতর গাঢ় বেগুনি রঙে ছেয়ে গেছে। যাত্রা শুরু হবে কিছুক্ষণের মধ্যেই।
২৭ হাজার আলোকবর্ষ পাড়ি দেওয়ার জন্য তৈরি লুটেক্স। বিশ্বাসই হয় না। ডিপ ড্রাইভ টেকনোলজি দিয়ে এটা সম্ভব। কিন্তু মহাকাশে এত গ্রহ, নক্ষত্র, অ্যাস্টেরয়েড আরও কত কিছু ছাড়িয়ে আছে। এই গতিতে লুটেক্স চলবে কীভাবে? একটা ধাক্কা লাগলেই তো সব শেষ!
ছয়.
মিল্কিওয়ের কেন্দ্রে অবস্থান করছি। কিউবের লক খুলে গেছে। বাইরের পরিবেশটা বোঝানো অসম্ভব। নক্ষত্রের ছোটাছুটি আর অসীম সীমানার মহাকাশ মুগ্ধ করছে সার্বক্ষণিক।
নিঃসঙ্গতা অনুভব হচ্ছে কখনো। অসীম এই মহাকাশে হুগো ছাড়া কোনো মানুষ নেই।
তিন দিন অবস্থান করবে এখানে লুটেক্স। যদিও তাদের ব্রিউয়ার্সে ৭৭ ঘণ্টায় দিন।
দুই দিন কেটে গেছে। গ্যাপিন্ট মুহূর্তের জন্যও আসেনি। শিপের কাজে হয়তো খুব ব্যস্ত। কতজন যে আছে এখানে! গ্যাপিন্ট এলে জিজ্ঞেস করতে হবে।
তৃতীয় দিনে গ্যাপিন্ট এলো। আমরা ঘড়ি দেখে ঘণ্টা মিলিয়ে দিনের হিসাব রাখছি। পৃথিবী থেকে আসার সময় সবকিছু নিয়ে নিলেও হাতে থাকা ঘড়িটা নেয়নি।
আজ গ্যাপিন্টের মাথা, হাত-সব বের হয়ে আছে। এমন সম্পূর্ণ রূপে কখনো দেখা যায়নি তাকে।
গ্যাপিন্ট যা বলে গেল, তার সারমর্ম এমন-মিল্কিওয়ের কেন্দ্র থেকে ডিপ জাম্প করার জন্য লুটেক্স প্রস্তুত। তবে সমস্যা হচ্ছে, তাদের রাডার ঠিকমতো কাজ করছে না। পৃথিবীতে অবস্থান করার জন্য পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে রাডারে গোলমাল দেখা দিয়েছে। এজন্য পৃথিবী থেকে বের হওয়ার সময় এবং প্লাজমা সংগ্রহের পূর্ব পর্যন্ত লুটেক্স অনেক ধীরে চলেছে। তখন সেটি সারিয়ে তুললেও আবার সমস্যা দেখা দিয়েছে।
রাডার সমস্যার জন্য লুটেক্স সামনের অবজেক্ট এড়িয়ে চলতে পারবে না। তবে আশার বিষয়, গ্যালাক্সির এ অংশ সম্পূর্ণ ফাঁকা। ডিপ জাম্প দেওয়া যায়। কিন্তু বিওগেনে প্রবেশের সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
‘শেষে কিনা বিওগেনে মৃত্যু ঘটবে! পৃথিবীর বাইরে, সৌরজগতের বাইরে, এমনকি গ্যালাক্সিরও বাইরে! এই ছিল ভাগ্যে?’
‘চিন্তা করো না, হুগো। এদের টেকনোলজি অনেক স্মার্ট। কিছু না কিছু উপায় বের হবেই।’
দুজনেই চুপ হয়ে গেলাম। কোথায় সাইবেরিয়ায় এসেছিলাম রহস্য উদ্্ঘাটনে, আর কয়েক দিনের ব্যবধানে আজ মিল্কিওয়ের কেন্দ্রে! ভাবা যায়!
রাডারজনিত কারণে যাত্রা স্থগিত হয়েছে। তবে রেডিও ওয়েভে ব্রিউয়ার্সে তাদের হেডকোয়ার্টারে সিগন্যাল পাঠানো হয়েছে। সিগন্যাল পৌঁছাতে পারলে ওপাশ থেকে ব্যাকআপ টিম আসবে।
গতকাল লুটেক্স ডিপ জাম্প দিয়েছে। মিল্কিওয়ের কেন্দ্র থেকে বিওগেন গ্যালাক্সি কয়েক লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে। সুপার পাওয়ার মোডে চলবে লুটেক্স। ১৫ দিনের মধ্যে বিওগেনে পৌঁছাবে।
আবার সেই অদ্ভুত বক্সের মধ্যে। লুটেক্সের কভার বদলে গেছে কখন যেন। রুমের বাতি অফ। পুরো অন্ধকারে ছেয়ে আছে। যাত্রা শুরু হলে কিউবের ভেতর অটো স্লিপ মোডে চলে যাব। বিওগেনে পৌঁছে ঘুম ভাঙবে।
গ্যাপিন্টের কাছে শুনলাম-শিপের সবাই স্লিপ মোডে থাকবে। লুটেক্স চলবে অটোপাইলটে।
তবে আরও একটা দুঃসংবাদ। মিল্কিওয়ের কেন্দ্রে নির্ধারিত সময়ের বেশি অবস্থান করার জন্য লুটেক্সের এনার্জি শেষের পথে। বড়জোর বিওগেন এরিয়ায় ঢুকতে পারবে। কিন্তু সেখান থেকে দুই লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে ব্রিউয়ার্সে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
ব্যাকআপ টিমই একমাত্র ভরসা।
সাত.
‘জিনান! এই জিনান! ওঠো!’
হুগোর ডাকাডাকিতে চোখ খুললাম। বক্সের মধ্যে শুয়ে আছি, ঢাকনাটা খোলা। বিওগেনে চলে এসেছি।
‘কখন উঠেছ, হুগো?’
‘একটু আগেই।’
‘সাইরেন বাজছে কেন?’
‘সেটাই তো বুঝতে পারছি না। যাহোক, কিছু সমস্যা হয়েছে নিশ্চয়ই।’
‘কখনো তো সাইরেন বাজেনি শিপে। চলো বাইরে গিয়ে দেখি।’
অবাক হলাম রুমের দরজা খোলা দেখে। এ দরজা কখনো খোলা থাকত না।
বাইরে এলাম। জানতাম লুটেক্স বড়। সেদিন সাইবেরিয়ায় দেখার সুযোগ হয়েছিল। কিন্তু এত বড় ভাবতে পারিনি।
হুগোকে সঙ্গে নিয়ে হাঁটছি। লম্বা করিডোর। ভেতরের দেওয়ালগুলো ধূসর কোনো কঠিন পদার্থের তৈরি। প্রায় বিশ মিনিট হাঁটলেও কাউকে দেখলাম না। তবে সব অংশেই সাইরেনের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে।
সামনে একটা রুম খোলা পেলাম। বিরাট হলঘরের মতো। মাঝখানে প্লাজমা সংরক্ষণের বড় বড় কিউব। তবে আশ্চর্যের বিষয়, রুমের প্রায় পুরোটা অংশজুড়ে কালো মাটিভর্তি বড় বড় অনেকগুলো কিউব।
তাহলে অ্যামাজনের মাটি পৃথিবী ছাড়িয়ে, গ্যালাক্সি ছাড়িয়ে অন্য একটা প্ল্যানেটে ট্রান্সফার করা হচ্ছে! উদ্দেশ্যটা কী? এরাই সেই মাটি গায়েবকারী!
পাশেই একটা বিরাট ট্রান্সপারেন্ট মনিটর দেখে অন করতেই আজব অক্ষরে কী সব লেখা ভেসে উঠল। আমাদের মাথায় ট্রান্সলেট হেলমেট তখনও ছিল।
হেলমেটের ওপর থাকা চশমাটা পরে নিলাম। এবার স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। বিশদ বিবরণ দেওয়া একটা ফাইল। প্রজেক্টের বিবরণ আছে তাতে। মিশনের খুঁটিনাটি সব।
“প্রায় তিন হাজার বছর আগে ব্রিউয়ার্স গ্রহের প্রাণীরা পৃথিবীর সন্ধান পায়। তাদের গ্রহের দুর্লভ মাটি পৃথিবীতে নিয়ে আসে পরীক্ষামূলক গবেষণা চালাতে। উদ্দেশ্য-সফল হলে তারা পৃথিবীতে ট্রান্সফার হবে।
মিশন অনেকটা সফল হয়েছিল। পৃথিবীর বিশাল একটা অংশজুড়ে সে মাটি প্রতিস্থাপন করে তারা। তবে পরবর্তীতে কোনো কারণে মিশন অফ হয়ে যায়।
এখন তাদের গ্রহের অবস্থা বিপন্ন। বিশাল এক প্ল্যানেট ওয়ারের ফলে তাদের প্ল্যানেটের সব মাটি তলিয়ে গেছে। তাই তারা পৃথিবীতে রেখে যাওয়া মাটির সন্ধান শুরু করে। পেয়েও যায় একপর্যায়ে। দেখে, তাদের সেই মাটি অক্ষত।
কিন্তু ব্রিউয়ার্সের মাটি পুরোটা সমুদ্রে তলিয়ে গেছে। তারা বসবাস করে কৃত্রিম দ্বীপে। আবার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে এ মিশন। এবং মিশনে কয়েকজন মানুষ নিয়ে আসার কথাও বলা হয়েছে-ব্রিউয়ার্সে বসবাস করতে পারে কি না।”
দুর্ভাগ্যবশত বা ভাগ্যবশত সেই মানুষ আমরাই।
এতদিন ঘটে যাওয়া সব ঘটনা পরিষ্কার হলো এতক্ষণে।
হঠাৎ পেছনে বিপ বিপ শব্দে সাইবেরিয়ার পাহাড়ে দেখা ড্রোনসদৃশ অবজেক্টগুলো এসে তাদের পেছনে পেছনে যাওয়ার নির্দেশ দিলো।
ওপরতলার একটি রুমে এলাম। গ্যাপিন্টের মতো কয়েক শ এলিয়েন বসে আছে। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকার নির্দেশ দিয়ে চলে গেল ড্রোনগুলো।
একটু পর গ্যাপিন্ট এলো। আবারও একটা বিপদের মধ্যে পড়েছি।
ডিপ জাম্পের পরে একটা ব্ল্যাকহোলের সামনে এসে পড়েছে লুটেক্স। ইতোমধ্যেই নিজের দিকে টেনে নিতে শুরু করেছে। ব্ল্যাকহোলের ম্যাগনেটিক পাওয়ারে ধীরে ধীরে সেদিকে এগোচ্ছি।
লুটেক্সের এনার্জি শেষ হওয়ায় পেছনে যাওয়ার রাস্তা বন্ধ। তবে ব্রিউয়ার্স থেকে যদি উদ্ধার টিম আসে, তবে বাঁচার সম্ভাবনা আছে।
সে আশাও ক্ষীণ। রেডিও ওয়েভ কাজ করছে না। সিগন্যাল সামনে না গিয়ে সব ব্ল্যাকহোলে ফিরে যাচ্ছে। এনার্জি না থাকায় জোরালো সিগন্যাল পাঠানো যাচ্ছে না।
লুটেক্সের ইঞ্জিন বিকল হয়ে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে দুই দিন হয়তো সচল থাকবে।
হুগো আর আমার কপালে দুশ্চিন্তার ছাপ ফুটে উঠল। ব্ল্যাকহোল থেকে বেশি দূরে নেই। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লুটেক্সসহ আমরা বিলীন হয়ে যাব হয়তো।
লুটেক্সের সব ইঞ্জিন বন্ধ। গ্যাপিন্ট পাশেই আছে।
অক্সিজেনও প্রায় শেষের পথে। নতুন করে উৎপাদনও সম্ভব নয়। ক্রু মেম্বাররা সব আগেই স্লিপ মোডে চলে গেছে।
গ্যাপিন্ট আর আমরা দুজন শুধু লুটেক্সে জেগে আছি। গুনছি মৃত্যুপ্রহর।
চারপাশে অন্ধকার। গাঢ় অন্ধকার। অক্সিজেন নিতে কষ্ট হচ্ছে খুব। ব্ল্যাকহোলের ভেতরে চলে এসেছি হয়তো।
গ্যাপিন্টের সাড়া পাচ্ছি না। হুগো জ্ঞান হারিয়েছে।
চোখের সামনে ভেসে উঠল বরফে ঢাকা সাইবেরিয়া, রহস্যময় অ্যামাজন আর সেদিন লুটেক্স থেকে দেখা পৃথিবীকে।
সব শেষ হয়ে যাবে কিছুক্ষণের মধ্যে। তলিয়ে যাব ব্ল্যাকহোলের অতল গহ্বরে। হারিয়ে যাবে চিরতরে লুটেক্স। হারিয়ে যাবে আমাদের চিহ্ন।
চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। শেষ মুহূর্তে এসে পড়েছি।
হঠাৎ দেখলাম লুটেক্সে বাতি জ্বলে উঠেছে।
ব্যাকআপ টিম পৌঁছে গেছে?
হুগো উঠে বসেছে!
অক্সিজেনের অভাবে হ্যালুসিনেশন হচ্ছে নাকি সব সত্যি?
[কিশোরকণ্ঠ সায়েন্স ফিকশন প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত]
আরও পড়ুন...