ফুটবলের বিশ্বযুদ্ধ
প্রচ্ছদ রচনা আবু আবদুল্লাহ জুন ২০২৬
চলে এলো ফুটবলের ‘বিশ্বযুদ্ধ’। এক মাস সারা দুনিয়ার ফুটবল ভক্তরা মেতে থাকবে বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে। সবার নজর থাকবে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর দিকে। আসরের ব্যাপ্তি এক মাস হলেও এই শিরোপা লড়াই নিয়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে থাকে অনেক দিন ধরেই। দুই বছর আগ থেকেই দুনিয়ার নানা প্রান্তে চলে বিশ^কাপের বাছাইপর্ব। যে কারণে সারা বিশ্বই মেতে থাকে বিশ্বকাপের আমেজে।
দলগুলোকে বাছাইপর্বের কঠিন লড়াই পার হয়ে বিশ্বকাপে আসতে হয়। যে কারণে সারাক্ষণই থাকে টানটান উত্তেজনা। সামান্য ভুল করলেই মিস হতে পারে বিশ্বকাপের ট্রেন। এ বছর যেমন এই ট্রেনে উঠতে পারেনি চারবারের চ্যাম্পিয়ন দল ইতালি। শক্তিশালী দল হিসেবে পরিচিত এমন আরও অনেক দেশ আসতে পারেনি বিশ্বকাপে যেমন : ডেনমার্ক, পোল্যান্ড, নাইজেরিয়া, ক্যামেরুন, চিলি, সার্বিয়া। আবার এমন কয়েকটি দেশ সুযোগ পেয়েছে, যারা বিশ্ব ফুটবলে খুব বেশি পরিচিত নয়; যেমন : কুরাসাও, কেপ ভার্দে, হাইতি, পানামা।
প্রথমবারের মতো তিন দেশের আয়োজন ও ৪৮ দেশের অংশগ্রহণে হচ্ছে এবারের বিশ্বকাপ। ১২ গ্রুপে বিভক্ত হয়ে রাউন্ড রবিন লিগ পদ্ধতিতে প্রথম রাউন্ড খেলবে দলগুলো। প্রতিটি গ্রুপের সেরা দুটি দল এবং গ্রুপে তৃতীয় হওয়া দলগুলোর মধ্য থেকে পয়েন্ট বা গোল ব্যবধানে এগিয়ে থাকা ৮টি দল যাবে নকআউট পর্বে। ‘রাউন্ড অব থার্টি টু’ পর্বে ৩২টি দল থেকে নকআউট পদ্ধতিতে বিজয়ী ১৬ দল যাবে রাউন্ড অব সিক্সটিনে। সেখান থেকে কোয়ার্টার ফাইনাল ও সেমি ফাইনাইল শেষে পাওয়া যাবে দুই ফাইনালিস্ট।
১১ জুন রাতে মেক্সিকো সিটিতে মেক্সিকো বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচ দিয়ে শুরু হওয়া আসরের পর্দা নামবে ১৯ জুলাই নিউ জার্সির মেট লাইফ স্টেডিয়ামে। সেদিন শিরোপা উঠবে বিজয়ীদের হাতে।
কে ফেবারিট
ফুটবল বিশ্বে রয়েছে একগাদা প্রায় সমশক্তির দল। তারা প্রত্যেকেই বিশ্বকাপ জেতার মতো শক্তি রাখে। যে কারণে এককভাবে কোনো দলকে ফেবারিট হিসেবে দাবি করা কঠিন। তবে ফুটবল বিশ্লেষকেরা সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স, খেলোয়াড় তালিকা, ফিকশ্চার ইত্যাদির ওপর নির্ভর করে তিন-চারটি দলকে সম্ভাব্য শিরোপা জয়ী হিসেবে ঘোষণা করেন। কখনো কখনো এগুলোর মধ্যে কেউ বিশ্বকাপ জেতে, আবার কখনো সব হিসাব পালটে দিয়ে অন্য কেউ কাপ জিতে নেয়। চলো দেখে নেই এবারের আসরে কারা কারা শক্তিশালী দল হিসেবে ফুটবল বিশ্লেষকদের নজর কেড়েছে।
স্পেন
এবারের বিশ্বকাপে ফুটবল পণ্ডিতেরা ফেবারিটের তালিকায় এগিয়ে রাখছেন স্পেনকে। ২০২৪ ইউরো টুর্নামেন্ট থেকেই দারুণ ফুটবল খেলছে দলটি। প্রত্যাশা মতোই ইউরো শিরোপা ঘরে তুলেছে। দারুণ ফর্মে আছেন টিনেজ তারকা লামিন ইয়ামাল। এ ছাড়া বার্সেলোনা ক্লাবে তার সতীর্থ প্রেদ্রিও ভালো ফর্মে আছেন। আছেন রিয়াল মাদ্রিদের তারকা ডিফেন্ডার ডিন হুইসেন। এ ছাড়াও প্রতিটি পজিশনে দলটির খেলোয়াড়রা দারুণ ফুটবল খেলছে। যে কারণে অনেকেই মনে করছেন লা রোজাদের থামানোর মতো কেউ নেই।
নম্বর নাইন পজিশনে কোনো তারকা স্ট্রাইকার না থাকায় অনেকে মনে করছেন, স্পেন গোল করতে হিমশিম খাবে। তবে বাছাইপর্বে এই আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়েছেন আক্রমণভাগের দুই গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় মাইকেল মেরিনো ও মাইকেল ওয়েরজাবাল। দুজনেই বিশ^কাপ বাছাইপর্বে ছয়টি করে গোল করেছেন।
গ্রুপ পর্বে স্পেনের প্রতিপক্ষ নবাগত কেপ ভার্দে, সৌদি আরব ও উরুগুয়ে। যে কারণে সহজেই গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তেমনটি হলে দ্বিতীয় রাউন্ডেও তুলনামূলক সহজ প্রতিপক্ষ হিসেবে আসতে পারে আলজেরিয়া, জর্ডান বা অস্ট্রিয়া। তবে কোনো কারণে পা ফসকে গ্রুপে দ্বিতীয় হলে পরের রাউন্ডেই আর্জেন্টিনার সাথে দেখা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। রাউন্ড অব সিক্সটিনে স্পেনের সামনে আসতে পারে ইংল্যান্ড বা ক্রোয়েশিয়ার মতো শক্ত প্রতিপক্ষ।
আর্জেন্টিনা
লিওনেল স্কালোনির শীষ্যরা এবার মাঠে নামবেন শিরোপা ধরে রাখতে। দলটির সমর্থকদের জন্য আশার কথা হচ্ছে, দলটি এখন আর লিওনেল মেসিনির্ভর নয়। মেসির বয়স হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই আগের মতো গতি আর টেকনিক তার কাছ থেকে পাওয়া সম্ভব নয়। তবে এই দলটিতে আরও কিছু দারুণ প্রতিভাবান খেলোয়াড় তৈরি হয়েছেন, যারা দলকে শিরোপার লড়াইয়ে রাখতে সক্ষম। মেসিকে ছাড়াই এই দলটি বাছাইপর্বে ব্রাজিলকে হারিয়েছে। আক্রমণভাগের দুই ভরসা হয়ে উঠেছেন হুলিয়ান আলভারেজ ও লাউতারো মার্টিনেজ। একাদশে আরও থাকতে পারেন পাওলো দিবালা ও নিকোলাস গঞ্জালেস। মেসির অভিজ্ঞতা আর তাদের ক্ষিপ্রতা দলটিকে অপ্রতিরোধ্য করে তুলতে পারে। বয়স যতই হোক, মেসি এখনো একক চেষ্টায় ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন।
চার বছরের মধ্যে একটি বিশ্বকাপ ও দুটি কোপা আমেরিকা ট্রফি জেতা দলটা এবার আত্মবিশ্বাসে ভরপুর হয়েই যুক্তরাষ্ট্রের মাঠে নামছে।
মাঝমাঠ সামলাবেন লিয়েন্দ্রো পারেদেস, ডি পল, ম্যাক এলিস্টার, এনজো ফার্নান্দেজরা। রক্ষণভাগে দুর্বলতার কিছুটা বদনাম আছে আলবিসেলেস্তেদের। তবে এবার রক্ষণভাগেও আছেন রোমেরা, মলিনা, ওতামেন্দি, তাগলিয়াফিকোর মতো তারকা ডিফেন্ডার। গোলপোস্টে দলটির ভরসা হয়ে আছেন ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম নায়ক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ।
জে গ্রুপে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া ও জর্ডান। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে গেলে সামনে পড়বে উরুগুয়ে বা সৌদি আরব। এই জায়গায় এসে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের টেনশন কিছুটা বেড়ে যেতে পারে। কারণ উরুগুয়ে দুইবারের সাবেক বিশ^ চ্যাম্পিয়ন, আর ২০২২ সালের আসরে আর্জেন্টিনা প্রথম ম্যাচেই সৌদি আরবের কাছে হেরে বিশ^কাপ শুরু করেছিল। কোয়ার্টার ফাইনালে সামনে পড়তে পারে বেলজিয়াম।
ফ্রান্স
গত ইউরোতে সেমিফাইনালে হেরে গেলেও তারপর থেকেই ধারাবাহিকভাবে ভালো খেলছে ফ্রান্স। কিলিয়ান এমবাপ্পের নেতৃত্বে ফ্রান্সের আক্রমণভাগ যেকোনো দলের রক্ষণদুর্গ ভেঙে চুরমার করে দিতে পারে। তাকে সঙ্গ দেবেন ওসমান ডেম্বেলে, মারকাস থুরাম, ডেজিয়ের দুয়ে। মাঝমাঠের সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে উঠতে পারেন অসম্ভব পরিশ্রমী ফুটবলার এনগলো কন্তে। সব মিলে ফ্রান্সের দলটি বেশ শক্তিশালী। একাদশ যেভাবেই সাজানো হোক ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলোর ফুটবলারের প্রাধান্য থাকবে।
বিশ^কাপের আগে প্রীতি ম্যাচে তারা ব্রাজিল ও কলম্বিয়াকে হারিয়েছে দাপটের সাথে। সেই সাথে দলটির আছে গত দুটি বিশ^কাপের ফাইনাল খেলার অভিজ্ঞতা। টানা তৃতীয় ফাইনাল খেলার লক্ষ্য পূরণ করতে ‘লেস ব্লুজদের’ প্রতিটি খেলোয়াড় বদ্ধপরিকর থাকবে সে কথা বলাই যায়।
এর আগে পশ্চিম জার্মানি ও ব্রাজিলের টানা তিন ফাইনাল খেলার রেকর্ড রয়েছে। ফ্রান্স টিমের মূল শক্তি কাউন্টার অ্যাটাক। খুব দ্রুত আক্রমণে যাওয়ার বৈশিষ্ট্য ফ্রান্সকে অনন্য করে তুলেছে। দলটি নিজেদের সীমানা থেকে বল নিয়ে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে গোল করে আসতে পারে, এত দ্রুত যে-প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররা কিছু বুঝে ওঠার আগেই সর্বনাশ হয়ে যায়। বিশেষ করে এমবাপ্পে বরাবরই মাঠে বিপজ্জনক। পেছন থেকে দলটির কৌশল ঠিক করে দেবেন কোচ দিদিয়ের দেশ্যম। ২০১২ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে দলটিকে অসাধারণ করে তুলেছেন। কোচ ও অধিনায়ক দুই ভূমিকায় বিশ্বকাপ জেতার রেকর্ড আছে তার।
ওই গ্রুপে ফ্রান্সের সঙ্গী সেনেগাল, ইরাক ও নরওয়ে। দ্বিতীয় রাউন্ডে তাদের সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ গ্রুপে তৃতীয় হওয়া যেকোনো একটি কম শক্তির দল। শেষ ষোলোতে গিয়ে দেখা হতে পারে জার্মানির সাথে।
পর্তুগাল
সাম্প্রতিক সময়ের দারুণ পারফরম্যান্স দলটিকে ফেবারিটের তালিকায় তুলে এনেছে। ইউরো ২০২৪-এর কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের কাছে টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নিলেও দলটি এরপর থেকে ভালো ফর্মে রয়েছে। ২০২৫ উয়েফা নেশন্স লিগের ফাইনালে স্পেনকে হারিয়ে শিরোপা জিতেছে রবার্তো মার্টিনেজের শীষ্যরা। ৪১ বছর বয়সি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো এই বিশ^কাপটাকে স্মরণীয় করে ক্যারিয়ার শেষ করতে চাইবেন। বয়সের কারণে ক্ষিপ্রতা কমলেও রোনালদো নামটাই বিশ^কাপের মাঠে প্রতিপক্ষের জন্য আতঙ্ক হয়ে দেখা দেবে।
মাঝমাঠে দলটির রয়েছেন তিনজন দুর্দান্ত মিডফিল্ডার-পিএসজির ভিতিনহা ও জোয়াও নেভেস আর ম্যানইউ’র বুর্নো ফার্নান্দেস।
কে গ্রুপে কঙ্গে, উজবেকিস্তান ও কলম্বিয়ার মুখোমুখি হবে পর্তুগিজরা। দ্বিতীয় রাউন্ডে সামনে পর্বে গ্রুপ পর্বে তৃতীয় স্থান পাওয়া কোনো একটি দল। সেক্ষেত্রে সহজেই রাউন্ড অব সিক্সটিনে যাওয়ার সুযোগ থাকবে পর্তুগালের সামনে। সেখানে সুইজারল্যান্ড বা কানাডা হতে পারে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ। অর্থাৎ পর্তুগালের সামনে কোয়ার্টার ফাইনালে যাওয়ার পথটা তুলনামূলক সহজ, যদি তারা এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে তবে আত্মবিশ্বাসী হয়ে শেষ দিকের কঠিন ম্যাচগুলো খেলতে পারবে। তবে কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
নাকি অন্য কেউ
ইংল্যান্ড দলটিকে বিশ্বকাপের ফেবারিট হিসেবে ধরা হচ্ছে এবার। ইউরোর ফাইনাল খেলা দলটি বিশ্বকাপ বাছাইপর্বেও দাপটের সাথে খেলেছে। থমাস টুখেলের শীষ্যরা বাছাইপর্বের সবগুলো ম্যাচে জয় পেয়েছে। ব্রিটিশ মিডিয়াগুলো এবার ইংল্যান্ড দলকে নিয়ে খুবই আশাবাদী। বিবিসির এক রিপোর্টে স্পেনের পরেই দ্বিতীয় ফেবারিট হিসেবে ইংল্যান্ডের নাম উঠে এসেছে। জুড বিলিংহাম ও হ্যারি কেইন দলটির সবচেয়ে বড় দুই তারকা। বাকিরাও বড় বড় ক্লাবে খেলেন।
ব্রাজিলকে এবার ফেবারিটের তালিকায় রাখা হচ্ছে না। অনেক দিন ধরেই দলটি নিজেদের ছায়া হয়ে আছে। তবুও ৫ বারের বিশ্বকাপ জয়ীরা যেকোনো সময় বিশ^কাপের সমীকরণ পালটে দিতে পারে। দলে প্রতিভার অভাব নেই, কিন্তু ধারাবাহিক সফলতার অভাবে মানসিকভাবে পিছিয়ে আছে সেলেসাওরা। বিশ^কাপকে সামনে রেখে কার্লো আনচেলত্তিকে কোচ করা হয়েছে। আনচেলত্তি সারা দুনিয়ার সফল কোচদের একজন। তার জাদুতে ব্রাজিল ভালো কিছু করে ফেলবে বলে আশাবাদী অনেক সমর্থক।
জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসও বিশ্বকাপের বড় দল হিসেবে পরিচিত। যদিও সাম্প্রতিক ফর্ম ভালো যাচ্ছে না দল দুটির। তারপরও তারা যেকোনো সময় জ¦লে ওঠার ক্ষমতা রাখেন। এ ছাড়া সুইজারল্যান্ড, তুরস্ক, বেলজিয়াম, স্বাগতিক মেক্সিকো বিশ্বকাপে ভালো কিছু করে বসার ক্ষমতা রাখে। ২০২২ বিশ্বকাপে সেমিফাইনাল খেলা মরক্কো এবার আরও ভালো করার টার্গেট নিয়ে মাঠে নামবে। এশিয়ার দলগুলোর মধ্যে জাপানকে এগিয়ে রাখছেন ফুটবল বিশ্লেষকরা।
আরও পড়ুন...