ঘুড়ি থেকে গ্যালাক্সি
প্রচ্ছদ রচনা মুসা আল হাফিজ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মাঠ থেকে দেশ
তোমরা কি ঘুড়ি ওড়াও? ঘুড়িটা উড়তে উড়তে চলে যায় মাঠে। তখন হয়তো সবুজ ঘাসে বসে গায়ে রোদ মাখছে ঘাসফড়িং, বাতাসে দুলছে কাশফুল, দূরে তালগাছের মাথায় বসে শালিক ডাকছে। তোমরা হইচই করে মাতিয়ে তোলো মাঠ। মাঠ পেরিয়ে ঘুড়ি যায় আরও দূরে। তার সুঁতো ধরে তোমরা যাও হাওড়ে। কত্ত বড় হাওড়!
হাওড়ের পানিতে নামে নীল আকাশের ছায়া। তুলতুলে সাদা মেঘ ভেসে যায় দল বেঁধে। কচুরিপানার ফাঁকে ফাঁকে সাদা বক দাঁড়িয়ে থাকে। মাছরাঙা শিকার করে দারুণ কৌশলে। পানকৌড়ি ডুব দিয়ে তুলে আনে মাছ। পানির ওপর ফুটে শাপলা। হালকা বাতাসে ভেসে আসে ধানখেতের গন্ধ।
হাওড়ের বাইরে আছে আরও অনেক কিছু। গ্রাম, নদী, রাস্তা, বাড়ি, স্কুল, হাসপাতাল। আছে বড় বড় বাজার ও শহর। ছোট ছোট হাট।
বিভিন্ন বাজার ও গ্রাম মিলে তৈরি হয় ইউনিয়ন। কয়েকটি ইউনিয়ন মিলে তৈরি হয় থানা। কয়েকটি থানা মিলে গড়ে ওঠে জেলা। কিছু জেলা মিলে তৈরি হয় বিভাগ। অনেকগুলো বিভাগ মিলে সৃষ্টি হয় দেশ। আমাদের দেশের নাম বাংলাদেশ। বাংলাদেশের আয়তন প্রায় ১,৪৭,৫৭০ বর্গকিলোমিটার। এখানে আছে ৮টি বিভাগ, ৬৪টি জেলা, ৪৯৫টি থানা ও ৪,৫৭৯টি ইউনিয়ন। বাংলাদেশে গ্রামের সংখ্যা ৯০,০৪৯টি। বাংলাদেশ কত্ত বড়!
এর ভেতরে আছে কত কিছু! গ্রামের আঙিনায় আমগাছের ছায়া, বাঁশঝাড়ে বাতাসের শোঁ শোঁ আওয়াজ। বটগাছের ছায়ায় বসে রাখাল গান গায়। আকাশে উঁকি মারছে তালগাছ; একপায়ে দাঁড়িয়ে। খেজুর গাছে ঝুলছে রসের হাড়ি। আম-কাঁঠাল-লিচুর গাছে থোকা থোকা ফল। এর মাঝে উড়ে যায় দোয়েল, ফিঙে। চড়–ই। বাবুই। বসন্তে গান গায় কালো কোকিল।
জমিতে ধান, গম, ভুট্টা, পাট, সবজি। আরও আছে লাউ, কুমড়া, বেগুন, মরিচ। সবুজ শস্যে ভরে থাকে খেতখামার। হাওড়-পুকুরে সাঁতার কাটে কত মাছ। টেংরা, পুটি, রুই, কাতলা, বোয়াল, মাগুর।
নদীর ধারে নৌকার সারি। মেঠো পথে চলছে গরুর গাড়ি। মাঠে কৃষক লাঙল চালায়, মহিষ কাদায় গড়াগড়ি খায়। শহরে উঁচু ভবনের জানালায় ঝিকমিক করছে সূর্যের আলো। শহরের পার্কে শিশুরা খেলে। চিড়িয়াখানায় হরিণ দৌড়ায়, বানর লাফায়। মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে থাকে জেব্রা।
রাজপথ দিয়ে চলছে ছোট-বড় গাড়ি। পথের ধারে সারি সারি গাছ। কোথাও পাহাড়, টিলা, বন। বনে আছে নানা রকম পাখি; টিয়া, ময়না, শকুন, কাঠঠোকরা, প্যাঁচা। আছে হরেক রকম প্রাণী-বানর, হনুমান, চিত্রাহরিণ, মেছোবাঘ, উল্লুক। সুন্দরবনের গভীরে রয়েল বেঙ্গল টাইগার ঘুরে বেড়ায়। বনের বুকে বয়ে যায় ছোট-বড় ঝরনা, খাল, নদীর বাঁক। পাহাড়ি ঢাল আর চা-বাগানের সবুজ ঢেউ।
দেশটিতে বয়ে গেছে পদ্মা-মেঘনা-যমুনা তিস্তা-কর্ণফুলি ও সুরমা-কুশিয়ারার মতো কত নদী। নদীর শেষ ঠিকানা সাগর। বাংলাদেশে দক্ষিণে আছে সাগরের গর্জন, উপকূলের বালুবেলা। সারা দেশে ছড়িয়ে আছে মায়াভরা নীল নীল দিগন্ত। বাংলাদেশের তুলনায় তোমার খেলার মাঠ একটি মোটরের দানার মতো ছোট।
দেশ থেকে মহাদেশ
বাংলাদেশের পাশে আছে ভারত, মায়ানমার। একটু দূরে নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও চীন। মানচিত্র খুললে দেখা যায়-কোথাও পাহাড়, কোথাও মরুভূমি, কোথাও দ্বীপ, কোথাও সজীব ঘাসের ভূমি। সবুজ, সোনালি, বাদামি ও সাদা রঙের ছড়ানো বাহার।
৪৯টি স্বাধীন দেশ মিলে হয়েছে বিশাল এশিয়া মহাদেশ। আয়তন প্রায় ৪ কোটি ৪৫ লাখ বর্গ কি. মি.-প্রায় ৩০০টি বাংলাদেশের সমান জায়গা! দেশের তুলনায় মহাদেশ কত্ত বড়!
এশিয়া যেন এক বিস্ময়ের ভাণ্ডার। উত্তরে আছে তুষারঢাকা হিমালয়। বরফে ঝলমল করছে চূড়া। বাতাস পাতলা, আকাশ গভীর নীল। নেপালে দাঁড়িয়ে আছে পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু পাহাড়ের চূড়া এভারেস্ট। সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে বরফে ঢাকা পাহাড়ের রাজা তুষার চিতা। বনে লুকিয়ে আছে বুকে চাঁদের মতো সাদা দাগওলা কালো ভালুক। আরও আছে নীল গাই, লাল পাণ্ডা, ইয়াক।
ভুটানে পাহাড়ের গায়ে গায়ে সাদা মঠ, মেঘ এসে ছুঁয়ে যায় ঘরের জানালা।
ভারতে আছে বিশাল থর মরুভূমি, আবার আছে বনের ঘন ছায়া। চরে বেড়াচ্ছে সিংহ, হাতি বাঘ ও বেবুন। কোথাও রঙিন উৎসব, কোথাও হাজার বছরের পুরোনো স্মৃতি। কোথাও ফুল ও ফলের বাগান, সবুজের ঢেউ।
চীনে আছে পৃথিবীর দীর্ঘতম প্রাচীর-গ্রেট ওয়াল। যা পাহাড় পেরিয়ে সাপের মতো এগিয়ে গেছে দূরে। সেখানে আছে ঝলমলে শহর, ভয় জাগানো মরুভূমি আর পাহাড়ের সারি। সকালে সূর্যের আলো পাহাড়ের গায়ে নরম ছায়া ফেলে আর বিকেলের কুয়াশা ধীরে ধীরে ঢেকে দেয় চূড়াগুলো। এর মাঝে আছে শান্ত, সুন্দর গ্রাম। ছোট-বড় বন, যেখানে বাঁশবনে বসে আছে শান্ত পাণ্ডা।
জাপানে বসন্তে ফোটে গোলাপি চেরি ফুল। আবার সেখানে আছে আগুন-পাহাড়। সেখানে উন্নত প্রযুক্তি আর সুন্দর প্রকৃতি পাশাপাশি হেঁটে চলে।
মালদ্বীপের সমুদ্র এত নীল যে মনে হয় রং ঢেলেছে কেউ। ছোট ছোট দ্বীপ যেন পানির ওপর ভাসছে।
শ্রীলঙ্কায় আছে সবুজ চা-বাগান, প্রাচীন পাথরের দুর্গ, আর বুনো হাতির চলাফেরা।
পাকিস্তানে আছে মজার মজার খাবার, পাহাড়ে তৈরি মনুমেন্ট, দারুণ সব মসজিদ-মাজার। আছে কারাকোরাম পর্বতমালা; উঁচু, পাথুরে, কিন্তু অপূর্ব সুন্দর।
সৌদি আরবে আছে বিশাল মরুভূমি, বালুর ঢেউ যেন সাগরের মতো ওঠানামা করে। রাতে আকাশ ভরা তারা, যেন হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে।
তুরস্কে আছে দুই মহাদেশের সেতুবন্ধন; একদিকে ইউরোপ, অন্যদিকে এশিয়া। সেখানে আছে অদ্ভুত গুহা-নগরী, পাথরের স্তম্ভ যেন রূপকথার প্রাসাদ।
ইন্দোনেশিয়ায় আছে শত শত আগ্নেয়গিরি। কোথাও ধোঁয়া উড়ছে, কোথাও সবুজ ধানক্ষেত পাহাড় বেয়ে নেমে এসেছে।
এশিয়ায় আছে বিশে^র সবচেয়ে বড় মরুভূমিগুলোর একটি, আবার আছে সবচেয়ে ঘন বর্ষাবন। আছে সাইবেরিয়ার বরফশীতল তুন্দ্রা, আবার আছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উষ্ণ দ্বীপমালা। কোথাও উটের কাফেলা চলছে, কোথাও দ্রুতগতির বুলেট ট্রেন ছুটে যাচ্ছে। এশিয়ার এক প্রান্তে যখন সূর্য ওঠে, আরেক প্রান্তে তখনও রাত। কোথাও মানুষ তুষারের ঘরে থাকে, কোথাও বাঁশের ঘর, কোথাও আকাশছোঁয়া অট্টালিকা।
মহাদেশ থেকে পৃথিবীএশিয়া একা নয়। মহাদেশ আছে মোট সাতটি। সেগুলো হচ্ছে আফ্রিকা, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, অ্যান্টার্কটিকা। এশিয়া মহাদেশে আছে ৪৯টি দেশ। আফ্রিকায় আছে ৫৪টি দেশ। ইউরোপে ৪৪টি দেশ। উত্তর আমেরিকায় আছে ২৩টি দেশ। দক্ষিণ আমেরিকায় ১২টি দেশ। অস্ট্রেলিয়ায় আছে ১৪টি দেশ। অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশ পুরোটাই বরফে ঢাকা। এখানে কোনো দেশ নেই। সব মহাদেশ মিলিয়ে তৈরি হয়েছে আমাদের গ্রহ-পৃথিবী। এর আয়তন প্রায় ৫১০ কোটি ১ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার।
স্থলভাগ আর জলভাগ
এখানে স্থলভাগের আয়তন হলো ১৪ কোটি ৮৯ লক্ষ ৫০ হাজার ৩২০ বর্গ কিলোমিটার। আর জলভাগের আয়তন প্রায় ৩৬ কোটি ১০ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার। জলভাগই পৃথিবীতে বেশি। কারণ পৃথিবীর ৭১% অংশ পানি।
তুমি পুকুরে পানি দেখেছ। নদীতে দেখেছ পানির স্রােত। হাওরে দেখেছ পানি আর পানি। কিন্তু বিশ্বের সমস্ত নদী, হ্রদ, হাওর, পুকুর ইত্যাদিতে আছে মোট পানির ১০০ ভাগের মাত্র ১ ভাগ। এই পানি দিয়ে আমরা প্রয়োজন পূরণ করি। ২ ভাগ পানি জমে আছে পাহাড় ও মেরু অঞ্চলে, বরফ আকারে। বাকি ৯৭ ভাগ পানি আছে সাগরে। ৫টি মহাসাগর আছে পৃথিবীতে। সবচেয়ে বড় হলো প্রশান্ত মহাসাগর। তারপর আটলান্টিক মহাসাগর। তারপর একে একে ভারত মহাসাগর, উত্তর মহাসাগর ও দক্ষিণ মহাসাগর। এগুলো ছাড়াও বড় সাগর আছে প্রায় ৫০টি। উপসাগর আছে প্রায় ২০০টি। সব মিলিয়ে আমাদের এই পৃথিবী।
পৃথিবী কত্ত বড়, তাই না? কিন্তু সূর্য তার তুলনায় অনেক অনেক বড়। সূর্যের ভেতরে প্রায় ১৩ লক্ষ পৃথিবী ঢুকে যেতে পারে! সূর্যের আছে ৮টি গ্রহ। এদের সবাই মিলে তৈরি হয়েছে সৌরজগৎ। সূর্যের একটা গ্রহ হলো আমাদের এই পৃথিবী।
আলোর হিসাব
পৃথিবীতে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গা কত দূরে তা জানার জন্য নানা পদ্ধতি আছে। যেমন মিটার, কিলোমিটার, মাইল ইত্যাদি। কিন্তু পৃথিবীর বাইরের জগতে দূরত্ব মাপার জন্য এই পরিভাষাগুলো যথেষ্ট নয়। ফলে তৈরি হয় নতুন পরিভাষা-আলোকবর্ষ। আলোকবর্ষ মানে হলো-এক বছরে আলো যত দূর যায়।
আলো কত দ্রুত যায়?
আলো খুব খুব দ্রুত চলে। এক সেকেন্ডে আলো প্রায় ৩ লক্ষ কিলোমিটার যায়। মানে কী জানো? এক সেকেন্ডে আলো পৃথিবীকে প্রায় ৭ বার ঘুরে আসতে পারে! এত দ্রুত!
তাহলে এক বছরে?
এবার ভাবো-আলো এক সেকেন্ডে যায় ৩ লক্ষ কিলোমিটার। এক মিনিটে কত? এক ঘণ্টায় কত? এক দিনে কত? আর পুরো এক বছরে কত? সব মিলিয়ে এক বছরে আলো যায় প্রায় ৯ লক্ষ ৪৬ হাজার কোটি কিলোমিটার। (সংখ্যায়: ৯,৪৬,০০,০০,০০,০০,০০০ কিলোমিটার) এই বিশাল দূরত্বটাই হলো এক আলোকবর্ষ।
সহজ কল্পনা
ধরো তুমি একটা টর্চ জ্বালালে। টর্চের আলো খুব দ্রুত সামনে ছুটে গেল। যদি সেই আলো একটানা এক বছর ধরে ছুটতে থাকে-যতদূর যাবে, সেই দূরত্বই এক আলোকবর্ষ।
কেন আলোকবর্ষ দরকার?
মহাকাশ খুবই বিশাল। কিলোমিটারে হিসাব করলে সংখ্যা এত বড় হয়ে যায় যে লিখতেই কষ্ট হয়! যেমন-চাঁদ পৃথিবী থেকে আলোর হিসেবে প্রায় ১.৩ সেকেন্ড দূরে। সূর্য পৃথিবী থেকে প্রায় ৮ মিনিট দূরে। যদি কিলোমিটারে বলি, সংখ্যা এত বড় হবে যে মাথা ঘুরে যাবে! অতএব, এক বছরে আলো যত দূর যায়-সেই বিশাল পথের নাম আলোকবর্ষ। তা দিয়ে কি আমরা বুঝতে পারি মহাবিশ্ব কত বড়?
না, পুরোপুরি বুঝতে পারি না। কারণ পুরো মহাবিশে^র সঠিক আকার আমরা জানি না। কিন্তু মানুষ যতটুকু জানতে পেরেছে-তাকে বলা হয় দৃশ্যমান মহাবিশ্ব। দৃশ্যমান মহাবিশ্বের আকার প্রায় ৯৩ বিলিয়ন আলোকবর্ষ।
সংখ্যাটা কল্পনা করো
এক বিলিয়ন মানে ১০০ কোটি। তাহলে ৯৩ বিলিয়ন মানে ৯,৩০০ কোটি। এখন মনে আছে তো-এক আলোকবর্ষ মানে কী? এক বছরে আলো যত দূর যায়, সেটাই এক আলোকবর্ষ। এক বছরে আলো কতদূর যায়? এক বছরে আলো অতিক্রম করে প্রায় ৯ লক্ষ ৪৬ হাজার কোটি কিলোমিটার দূরত্ব।
এবার ধীরে ধীরে ভাবো। দৃশ্যমান মহাবিশে^র এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত প্রায় ৯,৩০০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে। মানে আমাদের ৯,৩০০ কোটি বার গুণ করতে হবে ৯ লক্ষ ৪৬ হাজার কোটি কিলোমিটারকে। ভাবতে পারছ?
যদি তুমি খাতায় বসে এই সংখ্যাটা লিখতে চাও, তাহলে কী হবে?
৯,৩০০ কোটি গুণ ৯ লক্ষ ৪৬ হাজার কোটি। এর ফলাফল এত বড় হবে যে, খাতার পাতা ভরে যাবে। সাধারণ সংখ্যায় লিখলে ফলাফল হলো : ৮৮০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০ কিলোমিটার। যদি তুমি এই দূরত্ব কিলোমিটারে লিখতে চাও, তাহলে ৮৮ লিখে তার পরে ২২টা শূন্য বসাতে হবে। শূন্য গুনতে গুনতেই ক্লান্ত হয়ে যাবে তুমি।
সূর্য থেকে গ্যালাক্সি
রাতের আকাশে অসংখ্য তারা জ্বলে। তাদের অনেকেই সূর্যের মতো। কেউ আবার তার চেয়েও বড়। এসব কোটি কোটি তারা মিলে তৈরি করেছে বিশাল তারার জগৎ। তার নাম মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি। মিল্কিওয়ের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তের দূরত্ব প্রায় ১ লক্ষ আলোকবর্ষ। যে আলো এক সেকেন্ডে পৃথিবীকে প্রায় ৭ বার ঘুরে আসতে পারে-সেই আলোও এই গ্যালাক্সি পার হতে ১ লক্ষ বছর সময় নেবে! ভাবতে পারছ কত বড়?
বিজ্ঞানীরা বলেন, এখানে আছে প্রায় ১০০ থেকে ৪০০ বিলিয়ন তারা। অর্থাৎ ১০,০০০ কোটি থেকে ৪০,০০০ কোটি তারা! আমাদের পুরো পৃথিবীতে মানুষ আছে ৮০০ কোটির মতো। তার চেয়েও হাজার হাজার গুণ বেশি তারা শুধু মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতেই! আমাদের সূর্য এই গ্যালাক্সির এক কোনায় অবস্থিত সাধারণ এক তারা। মানে সূর্য কোনো বিশেষ বড় তারকা নয়। সে এই বিশাল পরিবারের একটি সাধারণ সদস্য। এই মিল্কিওয়ে বা আকাশগঙ্গা একমাত্র গ্যালাক্সি নয়। মহাকাশে আছে আরও কোটি কোটি গ্যালাক্সি।
গ্যালাক্সির পরিবার
কয়েকটি গ্যালাক্সি মিলে তৈরি করে একটি ছোট পরিবার। একে বলে গ্যালাক্সি গ্রুপ। আমাদের মিল্কিওয়ে আছে লোকাল গ্রুপ নামে একটি গ্রুপে। এখানে প্রায় ৫০টির মতো গ্যালাক্সি আছে। এখানে তারা প্রতিবেশীর মতো আছে। মিল্কিওয়ের সবচেয়ে বড় প্রতিবেশী হলো অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি। অ্যান্ড্রোমিডা আমাদের থেকে প্রায় ২৫ লাখ আলোকবর্ষ দূরে।
অনেকগুলো গ্যালাক্সি গ্রুপ একসাথে মিললে তৈরি হয় একটি গ্যালাক্সি ক্লাস্টার। একটা গ্যালাক্সি ক্লাস্টারে থাকে কয়েক ডজন ছোট ক্লাস্টার। কয়েক শত মাঝারি ক্লাস্টার। হাজার বা তার চেয়ে বেশি বড় ক্লাস্টার। এর মানে হলো, একটা গ্যালাক্সি ক্লাস্টারে থাকে হাজারের চেয়ে বেশি গ্যালাক্সি।
মহাবিশে^র যতটুকু মানুষ জানে, তাতে কম হলেও ১০ লক্ষেরও বেশি গ্যালাক্সি ক্লাস্টার থাকতে পারে। অনেকের মতে, তার সংখ্যা হবে কোটির কাছাকাছি। আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি যে অঞ্চলে আছে, তা বৃহত্তর নেটওয়ার্কের অংশ। এর নাম লানিয়াকেয়া সুপারক্লাস্টার। এর আয়তন প্রায় ৫০ কোটি আলোকবর্ষ।
অনেকগুলো গ্যালাক্সি ক্লাস্টার একত্রিত হয়ে তৈরি হয় সুপারক্লাস্টার। সুপারক্লাস্টারে থাকে লক্ষাধিক গ্যালাক্সি ও ডার্ক ম্যাটার। সুপারক্লাস্টারের আকার সাধারণত দশ কোটি আলোকবর্ষ থেকে শুরু হয়ে তিন শত কোটি আলোকবর্ষ পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।
ভাবো
আলো এক সেকেন্ডে পৃথিবীকে ৭ বার ঘুরে আসতে পারে। কিন্তু সুপারক্লাস্টার পার হতে আলোর লাগবে ৩০০ কোটি বছর!
মহাজাগতিক জাল
সব সুপারক্লাস্টার মিলে তৈরি করেছে বিশাল এক জালের মতো কাঠামো। যাকে বিজ্ঞানীরা বলেন কসমিক ওয়েব।
এটা দেখতে অনেকটা বিশাল মাকড়সার জালের মতো। যেখানে জালের সুতোয় গ্যালাক্সিগুলো দলবেঁধে বসে আছে। মাঝখানে আছে বিশাল ফাঁকা জায়গা। যেখানে প্রায় কিছুই নেই। এই ফাঁকা জায়গাগুলোর আকারও হতে পারে কয়েক শ মিলিয়ন আলোকবর্ষ!
দৃশ্যমান মহাবিশ্বের আমরা যতদূর দেখতে পাই
এইসব মিলিয়েই গঠিত হয়েছে আমাদের দৃশ্যমান মহাবিশ^। যার ব্যাস প্রায় ৯৩ বিলিয়ন আলোকবর্ষ। অর্থাৎ, মহাবিশে^র যে অংশ আমরা আজ পর্যবেক্ষণ করতে পারি, তার সীমানায় পৌঁছাতে আলোরও প্রায় ৯৩ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরত্ব পাড়ি দিতে হবে। এই অসীম বিস্তৃত মহাবিশ্বে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন গ্যালাক্সি থাকতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন। আর প্রতিটি গ্যালাক্সির মধ্যেই রয়েছে কোটি কোটি, কখনো শত শত কোটি তারা, যারা মহাশূন্যের অন্ধকারে নিজস্ব আলো নিয়ে জ্বলছে।
এই সংখ্যাগুলো এতই বিশাল যে মানবমনের পক্ষে সহজে কল্পনা করা কঠিন। বোঝার সুবিধার জন্য মনে রাখা যেতে পারে, ১ ট্রিলিয়ন মানে ১-এর পরে ১২টি শূন্য (১,০০০,০০০,০০০,০০০), আর ২ ট্রিলিয়ন মানে ২,০০০,০০০,০০০,০০০। যদি কেউ প্রতি সেকেন্ডে মাত্র একটি করে গ্যালাক্সি গুনতে শুরু করে এবং এক মুহূর্তের জন্যও থেমে না থাকে, তবে ২ ট্রিলিয়ন গ্যালাক্সি গুনে শেষ করতে তার ৬৩ হাজার বছরেরও বেশি সময় লেগে যাবে। মহাবিশ্বের বিশালতা কল্পনা করো এবার।
মহাবিশ্ব এখনো বাড়ছে
মহাবিশ্ব থেমে নেই। সে আরও বড় হচ্ছে। কিশমিশ মেশানো পাউরুটি ফুলে উঠলে কিশমিশগুলো একে অপর থেকে দূরে সরে যায়। তেমনি গ্যালাক্সিগুলোও দূরে সরে যাচ্ছে। মহাবিশে^র আকার বেড়ে চলেছে।
এই মহাবিশ্বে পৃথিবী একটি ছোট বালুকণার চেয়েও ছোট। সূর্য একটি কমলার চেয়েও ছোট। এত বড় জগৎ কে বানালেন? একটি ঘর কেউ না বানালে তৈরি হয় না। যিনি ঘর বানান, তিনি হন বিজ্ঞ ও বড়। এত বড় জগৎ যিনি বানালেন, তিনি কে? তিনি আমাদের আল্লাহ।
আরও পড়ুন...