গোলের উল্লাসে
গল্প নাসীমুল বারী জুন ২০২৬
রাইট উইং থেকে হাইয়ান বলটা লব করে পাঠায় ডি-বক্সের একটু সামনে। দ্রুত এসে বলটা রিসিভ করে রশিদ সামনে এগোতে যাবে অমনি বাধা পায় প্রতিপক্ষ সোহেলের। রশিদ যেমন দুর্দান্ত স্টাইকার; ঠিক তেমনি সোহেল একজন নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার।
মুখোমুখি দুই সেরা খেলোয়াড়। হ্যাঁ, এমন পজিশনের সেরা খেলোয়াড়রা বরাবরই মুখোমুখি দাঁড়ায়।
-গো...ল...!
দুর্দান্ত গোল দিয়ে দিয়েছে; তবে রশিদ নয়। লেফট উইং থেকে এগিয়ে আসা মাসুদ দিয়েছে। সোহেল রশিদকে আটকাতে আসার সাথে সাথে রশিদও দ্রুত লেফট উইংয়ে বলটি পাস দিয়েই সামনে এগিয়ে যায়। ডিফেন্ডার সোহেলও রশিদের সাথে এগিয়ে যায়। এটা ছিল রশিদের ডামি অ্যাটাক।
রশিদের এ বিভ্রান্তিতে পরিকল্পনা সফল। আর সে পরিকল্পনার আনন্দে গ্যালারিতে নাহিদ লাফ দিয়ে বলে ওঠে, গো...ল...
নাহিদ ও ফাহিম স্কুলবন্ধু, পাড়ারও বন্ধু। দুজনই ফুটবল পাগল। ছোটবেলায় পাড়ার মাঠে দুজন স্ট্রাইকারে খেলত। কিন্তু এলাকায় ভালো কোচিং ছিল না। ছিল না স্কুলেও। একসময় খেলা ছেড়ে দিলেও খেলা দেখা কিন্তু বন্ধ করেনি। ওরা এখন অসম্পূর্ণ স্বপ্নের মানুষ। এখন শুধু দর্শক। ঢাকা স্টেডিয়াম তো আছেই, এমনকি টিভিতেও ওরা নিয়মিত খেলা দেখে।
আজ স্টেডিয়ামে এসেছে স্থানীয় লিগের মোহামেডান ও আবাহনীর খেলা দেখতে।
দুজনেই মোহামেডানের সমর্থক। প্রিয় দলের পক্ষে গোল হওয়ায় আনন্দ-উচ্ছ্বাসে লাফ দিতে গিয়ে সহপাঠী বন্ধু ফাহিমের গায়ে পা লাগে জোরে। ফাহিম শরীরটা ঘুরিয়ে ফিরে বলে, কিরে লাথি মারলি কেন? আমাগো দলই তো গোল দিয়েছে!
-লাথি না, লাথি না রে! পা দিয়া তোরে আদর করলাম।
-পা দিয়া আদর! ফাইজলামির জায়গা পাস না!
-আরে এত রাগিস ক্যান? আচ্ছা এটা যদি বিশ্বকাপ ম্যাচ হতো, তাহলে কী করতি?
একটু চমকে ফাহিম বলে, বিশ্বকাপের খেলা! বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলছে আর গোল দিয়েছে, এমনটি? তাহলে একটা না দশটা লাথি দিলেও তোকে কিছু বলতাম না। কিন্তু এরা তো আর বিশ্বকাপের মতো অমন চমৎকার, রোমাঞ্চকর চোখধাঁধানো খেলা খেলে না।
-কথাটা ঠিকই। আচ্ছা ২০০২-এর ফাইনালে ব্রাজিল-জার্মানির খেলাটা মনে আছে রে তোর?
-কী যে বলিস! তখন আমার ও তোর জন্ম হয়েছে?
-এই জেন-জির যুগে জন্ম হয়ে খেলা দেখতে হবে? অনলাইন, ইউটিউবেই তো খেলাটা পাওয়া যায়।
ফাহিম কিছুটা আবেগাপ্লুত হয়ে বলে, ঠিক বলেছিস। কবারই তো দেখেছি। সে কি খেলা রে! দুই দলেরই গতি আর ক্ষিপ্রতায় চোখ ধাঁধানো এক শৈল্পিক খেলা ছিল ওটা! এসব কি ভোলা যায়? থামে ফাহিম।
আবার ফাহিমই বলতে থাকে, ফাইনালে দারুণ উত্তেজনাকর সে খেলার এক মুহূর্তে রিভালদো জার্মানির এক ডিফেন্ডারকে ড্রিবলিং দিয়ে দ্রুত এগিয়ে গোলে শট নেয়। জার্মানির গোলরক্ষক অলিভার কান বলটি ধরতে পারেনি, গোল হতেও দেয়নি। কান সে সময় বিশ্বসেরা গোলরক্ষকদের একজন। কানের হাত থেকে বলটি তাৎক্ষণিক ফিরে এসে রোনালদোর পায়ে পড়ে। রোনালদো মনে হয় মাইক্রো সেকেন্ডের মধ্যে বলটি ধরেই শট নেয় এবং গোল! রিভালদো থেকে রোনালদোর গোল-দুজনের পায়ের কারুকাজে অতি ক্ষিপ্রতা ও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে হয়ে যায় এক ঐতিহাসিক গোল। বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা গোল।
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে নাহিদ বলে, আহ্! আমরা কবে এমন গতিময় খেলা আর পায়ের এমন কারুকাজ দেখতে পাব আমাদের দেশের খেলোয়াড়দের থেকে?
কিছুটা চুপ হয়ে যায় দুজন। নিজ দলের গোল দেওয়ার আনন্দটাও চুপসে যায়। একটা অদৃশ্য স্তব্ধতা যেন দুজনের কথার মাঝখানে এসে থামে।
নাহিদ শান্ত কণ্ঠে বলে, জর্ডান, উজবেকিস্তান, কুরাসাও এবং কেপ ভার্দেও প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পেয়েছে এবারের ছাব্বিশে! ছোট ছোট দেশগুলোও এখন বিশ্বকাপে জায়গা করে নিচ্ছে! আর আমরা?
কোনো কথা বলছে না। দুজনেই চুপচাপ মাঠের খেলা দেখছে। চুপচাপ কেটে যায় ক মিনিট। একসময় দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে ভাবনার জাল বুনতে বুনতে নাহিদই আবার বলে, এর মধ্যে সবচেয়ে ছোট দেশ হলো কুরাসাও। লাখ দেড়েক জনসংখ্যা। কেপ ভার্দেও-ও ছোট দেশ। মানুষ লাখ ছয়েক। এরা খেলছে বিশ্বকাপে। অথচ আঠারো কোটি মানুষের এ বাংলাদেশ থেকে খুঁজে পাওয়া যায়নি ওইসব দেশের এগারো জনের সমকক্ষ কাউকে! আঠারো কোটির মধ্যেও অমন ১১ জনের প্রতিভা কারো মধ্যে নেই!
নাহিদের দিকে তাকিয়ে ফাহিম বলে, বুজছিস, আমরা হলাম কুয়ার ব্যাঙ। এই ঢাকা স্টেডিয়ামের মোহামেডান আবাহনীর এদের খেলা দেখেই আমরা এত লাফালাফি করি। বিশ্বকাপের খেলা হলে কি যে করতাম!
মাঠের দিকে ভাবলেশহীনভাবে তাকিয়ে থাকে নাহিদ।
আবারও দুজন চুপচাপ।
কিছুক্ষণ পর কষ্টের হাসি হেসে নাহিদ বলে, শুন, বিশ্বকাপের খেলাগুলো শুধু বল আর দৌড়াদৌড়ি না, মাথাও খাটাতে হয়। শারীরিক ক্রিড়াশৈলীও দেখাতে হয়। ফুটবলশৈলীর অনন্যসাধারণ সেসব ম্যাচে থাকে সময় আর সুযোগ কাজে লাগানো, পরিকল্পিত ফিনিশিং, অপ্রত্যাশিত দ্রুত সিদ্ধান্ত, গতি, নিখুঁততা ইত্যাদি। বাংলাদেশ অর্ধশতাব্দী বয়সে এসব কিছুই অর্জন করতে পারেনি। তাইতো বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলে না; খেলা দেখে মাত্র।
ফাহিম কোনো কথা না বলে শুধু মাঠের খেলা দেখছে। একসময় ফাহিম নিজে নিজেই বলে ওঠে, সময় গতি আর মাথা মিলে পদযুগলের এক অনন্য শিল্পই ফুটবল খেলা। আমরা এত কোটি কোটি মানুষের দেশ ছাপ্পান্ন বছরেও তা অর্জন করতে পারিনি। আর কবে পারব রে!
ততক্ষণে স্টেডিয়াম থেকে ধীরে ধীরে লোক বেরিয়ে যাচ্ছে। শেষ বাঁশি বাজেনি। খেলা তখনও ১৫ মিনিটের বেশি বাকি। বিশ্বকাপের মতো উত্তেজনা, আকর্ষণ আর চোখ ধাঁধানো কিছু নেই বলেই দর্শকরা খেলা শেষ হওয়ার এত আগেই গ্যালারি ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আমাদের দেশের স্টেডিয়ামের এটা চিরায়ত দৃশ্য হলেও বিশ্বকাপে কিন্তু এমন দেখা যায় না কখনো।
নাহিদ আর ফাহিমও উঠে দাঁড়ায়। তারপর নাহিদ বলে, এত বড় জনশক্তির দেশে অর্ধশতাব্দীতেও আমরা বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারলাম না! আশ্চর্য!
ওরাও ধীরে ধীরে নামছে গ্যালারি থেকে। অনেকের মতোই ওরাও চলে যাচ্ছে খেলা বাকি রেখে। নামতে নামতে হঠাৎ থামে নাহিদ। চারিদিক তাকিয়ে দেখে গ্যালারি অনেকটাই ফাঁকা, কিন্তু মাঠে খেলা চলছে। নাহিদ হেঁয়ালিভাবে বলে, দেখ, মাঠে খেলা আছে, অথচ দর্শক নেই। আমাদের ফুটবলের কী অবস্থারে এটা! আচ্ছা আমরা বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জন করতে পারি; এমন একটি ফুটবল অবকাঠামো গড়ে তোলার জন্য কিছু কি করা যায়?
ফাহিম নাহিদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলে, পারি। অবশ্যই পারি, যদি আমাদের সদিচ্ছা থাকে।
-পারবি! মানে, কীভাবে পারবি?
-আন্দোলন গড়ে তুলব। চল, আন্দোলন গড়ে তুলি। জেন-জি ফুটবল আন্দোলন। আমাদের মতো জেন-জি ফুটবল দর্শকরাই আন্দোলনে বিপ্লবী সৈনিক হবে।
-সত্যিই তো! আসলেই আমরা একটা আন্দোলন গড়ে তুলতে পারি।
কথাটা বলতে বলতে দুজন গ্যালারি ছাড়তে থাকে শেষ বাঁশির আগেই।
আরও পড়ুন...