ফেরার জানালা
তোমাদের গল্প আসাদুজ্জামান খান মুকুল নভেম্বর ২০২৫
শৈশব থেকেই ছাদের ঘরের জানালাটা রুদ্রর অনেক প্রিয় ছিল। গ্রামের নিরিবিলি পরিবেশে তাদের বাড়ি। চারপাশে আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, নিম আরও অনেক বৃক্ষরাজিতে ঘেরা। যেন এক সবুজ উদ্যান। অদূরেই চলে গেছে রেললাইন। রাতে নির্জনে দূর থেকে যখন ট্রেনের হুইসেল ভেসে আসত-মা তাকে বলতেন, “রাতের ট্রেন ডাক দেয় রে-যারা দূরে চলে যায়, তারা যেন ফিরে আসে এই ডাকে!”
বড়ো হয়ে চাকরির সুবাদে রুদ্র শহরে চলে যায়। যে কারণে গ্রামের বাড়িতে খুব একটা ফেরা হয় না তার।
তিন বছর আগে মা মারা গেছেন শহরের এক হাসপাতালে, সে তখন শেষবারের মতো বাড়ি ফিরেছিল মায়ের কাফনে মোড়ানো লাশ নিয়ে। বাবাও চলে গেছেন বহু আগে না ফেরার দেশে।
আজ দীর্ঘ তিন বছর পর সে আবার ফিরে এসেছে পুরোনো বাড়িতে। উঠোনে শুকনো পাতার স্তূপ, দরজার কপাটে ধুলো আর জংধরা নিস্তব্ধতা। বাড়ির সব জায়গায় ঝুলের ছাপ। বাতাসেও যেন এক ক্লান্তির ছায়া।
প্রতিবেশীরা বলল, এখানে তো আর কেউ থাকে না ভাই, বাড়িটা না হয় বিক্রি করে দাও।
রুদ্র কিছুই বলল না। শুধু চুপ করে শুনে গেল। যেন নিজের ভেতরের কণ্ঠও নিরুত্তর।
রাতে ছাদের ঘরে গিয়ে খুলে দিলো সেই পুরোনো জানালা। অনেক দিন পর বাতাসে ভেসে এলো এক পরিচিত গন্ধ-দূরের ট্রেনের সুরেলা হুইসেল, গাছের ফাঁকে ঝরে পড়া চাঁদের আলো, আর যেন কোথাও অদৃশ্য মায়ের নীরব ছায়া!
হঠাৎ চোখে পড়ল জানালার পাশে কাঠের ফ্রেমে গুঁজে রাখা একটি খাম। তার ভেতরে মায়ের হাতের লেখা একটি চিরকুট।
“রুদ্র, জানি একদিন ফিরবি। এই জানালা দিয়ে তুই তাকিয়ে দেখতি আকাশ, আর ভাবতিস স্বপ্নের কথা। তাই আমি প্রতিদিন তাকিয়ে থেকেছি এখানে-আর ভেবেছি, তোর পায়ের শব্দ একদিন ফেরার সুর বয়ে আনবে। জানালার পাশে তোর জন্য আমার ভালোবাসাটুকু রেখে গেলাম। যদি কোনো একদিন বুঝিস-”
লেখাটা পড়ে রুদ্রর চোখ পানিতে ভরে উঠল। কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে ধীরে ধীরে বসে পড়ল জানালার পাশে। মাথার ওপর তারা ভরা আকাশ। মনে হলো চাঁদের আলোয় কেউ যেন নিঃশব্দে হাত রাখছে তার কাঁধে।
সেই রাতেই সিদ্ধান্ত নিল-বাড়িটা আর বিক্রি করবে না। এই ঘর, এই জানালা, এই শূন্যতা-সব তার জন্মভূমির স্মৃতি হয়ে থাকবে। কারণ কিছু জানালা থাকে, যেগুলো কেবল আলো বা বাতাসের জন্য নয়-সেগুলো প্রিয়জনের ফেরার পথ উন্মুক্ত করে রাখে। চুপিচুপি চিরকাল।
আরও পড়ুন...