আইসক্রিম এলো কেমন করে
ফিচার কিশোর কল্লোল মার্চ ২০২৬
আইসক্রিম পছন্দ করে না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। আবার ছোটবেলা আইসক্রিম খেয়ে বাবা-মায়ের বকা খায়নি এমন মানুষও খুঁজে পাওয়া মুশকিল। এটি এমন একটি খাবার, যা ছোট থেকে বড় সবার প্রিয়। কিন্তু আইসক্রিম কীভাবে এলো? সে এক লম্বা গল্প। আজ আমরা সেই গল্প শুনব।
সবচেয়ে প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, আইসক্রিম প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন প্রাচীন চীনারা। পরে মার্কো পোলো ইতালিতে নিয়ে যান। সেখান থেকে ক্যাথরিন দে মেডিচির মাধ্যমে ফ্রান্সে যায় আইসক্রিম। তারপর থমাস জেফারসন তা আমেরিকায় পৌঁছে দেন। এভাবে আইসক্রিমের দেশ ভ্রমণ চলতে থাকে। আর একসময় পৌঁছে যায় বিশ্বের আনাচেকানাচে।
তবে আইসক্রিমের প্রকৃত ইতিহাস জানতে পারা এত সহজ নয়। খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০০ সাল থেকেই বরফ-ঠাণ্ডা পানীয় ও মিষ্টান্নের প্রচলন ছিল। তখন ইউফ্রেটিস নদীর তীরে বসবাসকারী সম্ভ্রান্তরা প্রচণ্ড গরম থেকে রেহাই পেতে বরফ রাখার ঘর (আইস হাউস) নির্মাণ করতেন।
খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতকে এথেন্সের রাস্তায় বরফ বিক্রি হতো। রোমান সম্রাট নিরো (খ্রিষ্টাব্দ ৩৭–৬৭) মধু মেশানো বরফ-ঠাণ্ডা পানীয় পান করতেন।
অন্যদিকে, চীনের ট্যাং রাজবংশের (৬১৮-৯০৭ খ্রিষ্টাব্দ) দলিলে একধরনের মিষ্টি পানীয়র কথা উল্লেখ আছে, যা তৈরি হতো বরফ মেশানো মহিষের দুধ দিয়ে। এর সঙ্গে যোগ করা হতো কর্পূরের ঘ্রাণ।
তুর্কি শরবত
ঠাণ্ডা পানীয় ইসলামী বিশ্বেও অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। ‘শরবত’ এসেছে তুর্কি শব্দ থেকে। শরবত বলতে বিভিন্ন উপকরণ মেশানো একধরনের মিষ্টি পানীয়কে বোঝায়। তখনকার সময়ে শরবত বরফ ঘরে সংরক্ষিত বরফ দিয়ে ঠাণ্ডা করা হতো।
প্রাচীনকালে আরেকটি জনপ্রিয় মিষ্টান্ন ছিল ইরানে তৈরি ফালুদা। এটি তৈরি হতো ঠাণ্ডা সিরাপে ভেজানো সেমাই দিয়ে।
ভারতে মোগল সম্রাটদের প্রিয় একটি খাবার ছিল কুলফি। এই মিষ্টান্নটি ঘন দুধ থেকে তৈরি আধা-আইসক্রিম ছাঁচে জমিয়ে রাখা হতো।
ইতালীয় আইস
হিস্ট্রি ডট কমের তথ্য অনুযায়ী, ১৬শ সালের শুরুর দিকে ইউরোপে প্রথম আইসক্রিম ও ওয়াটার আইস বা শরবতজাত বরফ-মিষ্টান্ন তৈরি হয়েছিল সম্ভবত ইতালিতে। ১৬২০ সালের দিককার লেখায় এ ধরনের বরফ-ঠাণ্ডা মিষ্টান্নের বর্ণনা পাওয়া যায়। আর শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এগুলো জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ইউরোপের রাজকীয় ভোজসভাগুলোয়। বিশেষ করে প্যারিস, ফ্লোরেন্স, নেপলস ও স্পেনে।
১৬৭২ সালে ইংরেজ ইতিহাসবিদ ইলায়াস অ্যাশমোল লিখেছিলেন, রাজা চার্লস দ্বিতীয়-এর ভোজসভায় ‘এক প্লেট আইসক্রিম’ পরিবেশন করা হয়েছিল।
এরপর ১৬৯৪ সালে নেপলসের রাজসভায় কর্মরত স্টুয়ার্ড অ্যান্টোনিও লাতিনি একটি রান্নার বই প্রকাশ করেন। যেখানে তিনি দুধের শরবতের একটি রেসিপি উল্লেখ করেন।
আধুনিক আইসক্রিম কবে তৈরি হলো
১৯২০ সালের দিকে রাস্তার ফেরিওয়ালার কাছ থেকে আইসক্রিম কেনা খুব সাধারণ দৃশ্য হয়ে ওঠে। তবে আধুনিক আইসক্রিমের সূচনা হয়েছিল আবিষ্কারের যুগে, যখন ইউরোপীয়রা আমেরিকায় উপনিবেশ স্থাপন শুরু করে।
ইতিহাসবিদ ওয়াসবার্গ জনসন বলেন, ‘স্প্যানিশ সাম্রাজ্যই প্রথম ইউরোপীয় শক্তি যারা ‘নিউ ওয়ার্ল্ড’-এ উপনিবেশ গড়ে। ১৬শ শতকে তারা মেক্সিকো ও ইউকাতান উপদ্বীপ থেকে চিনি, চকলেট ও ভ্যানিলা ইউরোপে আনে। তখন ইতালির নেপলসও স্প্যানিশ সা¤্রাজ্যের অংশ ছিল, আর এখানেই জন্ম নেয় শরবত।’
এরপর ফরাসি অভিজাতরা এই ঠাণ্ডা খাবার খাওয়া শুরু করে। পরে ইংল্যান্ডের মানুষ দুধ ও ক্রিম একসঙ্গে জমিয়ে আইসক্রিম তৈরি শুরু করে।
১৮শ শতকের দিকে ইউরোপে আইসক্রিম ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
তখন ইউরোপীয় ও ধনী আমেরিকান উপনিবেশকরা স্থানীয়ভাবে পাওয়া দুধ-ক্রিম, কাটা বরফ এবং আটলান্টিক দাস বাণিজ্যের মাধ্যমে পাওয়া চিনি ও মোলাসেস ব্যবহার করে আইসক্রিম তৈরি করত। জর্জ ওয়াশিংটন ও টমাস জেফারসনের মতো মানুষ ইউরোপ থেকে বিশেষ আইসক্রিম তৈরির পাত্র আনাতেন। টমাস জেফারসন আইসক্রিমকে জনপ্রিয় করতে বড় ভূমিকা রাখেন। তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে হোয়াইট হাউসে বহুবার আইসক্রিম পরিবেশন করেছিলেন বলে হিস্ট্রি ডটকমেরি আর্টিকলে বলা হয়।
আইসক্রিমের ‘জনক’
রিডার্স ডাইজেস্টের তথ্য অনুযায়ী, ফিলাডেলফিয়ার কৃষ্ণাঙ্গ রাঁধুনি অগাস্টাস জ্যাকসনকে বলা হয় আইসক্রিমের জনক। তিনি আইসক্রিম আবিষ্কার করেননি, তবে আধুনিক আইসক্রিম তৈরির পদ্ধতি উদ্ভাবনের কৃতিত্ব তার।
ইতিহাসে তার উল্লেখ খুব কম পাওয়া যায়। কিন্তু ধারণা করা হয়, ১৮১৭ থেকে ১৮৩৭ সালের মধ্যে তিনি হোয়াইট হাউসে রাঁধুনি হিসেবে কাজ করতেন। এরপর ফিলাডেলফিয়ায় ফিরে নিজের মিষ্টির দোকান ও ক্যাটারিং ব্যবসা শুরু করেন, যেখানে আইসক্রিম তৈরি ও বিক্রি হতো।
মজার বিষয় হলো, আমেরিকার সবচেয়ে পুরোনো আইসক্রিম ব্র্যান্ড বাসেটস আইসক্রিমের শুরু হয়েছিল ফিলাডেলফিয়াতে। এটি ১৮৬১ সালে শুরু হয়, ১৮৮৫ সালে প্রথম দোকান খোলে, আর ১৮৯২ সালে রিডিং টার্মিনাল মার্কেটে জায়গা করে নেয়। আজও সেখানেই দোকানটি চলছে।
আইসক্রিমে কি ডিম থাকে
সব আইসক্রিমে নয়, তবে কিছু আইসক্রিমে ডিমের কুসুম থাকে। ১৭৫০ সালের দিকে ফরাসি শেফরা আইসক্রিমে নতুন আকার দেন। তারা দুধ, ক্রিম, চিনি, ভ্যানিলার সঙ্গে ডিমের কুসুম যোগ করেন। এতে তৈরি হয় আজকের ফ্রোজেন কাস্টার্ড।
শুরুতে আইসক্রিম কেবল অভিজাতদের খাবার ছিল। কিন্তু রেফ্রিজারেশন বা ফ্রিজ আবিষ্কারের পর এটি সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আসে। বাড়িতে ফ্রিজ থাকায় এখন সবাই সহজেই আইসক্রিম রাখতে পারে।
আরও পড়ুন...