ইফতার

তোমাদের গল্প সুপ্ত রায়হান সজিব ফেব্রুয়ারি ২০২৬

‘আম্মা, আজ মাকলুবা রান্না করো না! খুব খেতে ইচ্ছে করছে। প্লিজ!’

মাকে জড়িয়ে ধরে আবদার করে আয়েশা।

মায়ের বুকটা হু হু করে ওঠে। এই অনুরোধ সে প্রতিদিনই শুনছে, অথচ পূরণ করতে পারছে না। যুদ্ধবিধ্বস্ত এই দেশে যেখানে মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, সেখানে উপাদেয় খাবার বিলাসিতা ছাড়া কিছু নয়।

অশ্রু সামলে মুচকি হেসে মেয়েকে সান্ত¡না দিলেন, ‘আজ হবে না মা। দেখছিস না, ইফতারের সময় হয়ে এলো। বাজারে যেতেই আজান পড়ে যাবে। এই অল্প সময়ে কীভাবে রান্না করব? মুলুখেয়া দিয়েই আজ ইফতার করি, কেমন?’

আয়েশা চুপচাপ মাথা নেড়ে সায় দিলো। তবু বুকের ভেতর কোথাও হালকা মোচড় দিয়ে উঠল। রসনার ঢেউ মাঝে মাঝে ধৈর্যের তরীকে টলিয়ে দেয়, কিন্তু ছোট্ট হলেও বিবেকের নোঙর তাকে আবার তীরে ফেরায়।

মা সিদ্ধ ঘাসের পাতাভর্তি থালা হাতে তাঁবুতে ঢুকতেই হঠাৎ কেঁদে উঠলেন। আয়েশা হতভম্ব হয়ে মাকে জড়িয়ে ধরল।

মুলুখেয়া নয়-খবিজা নামের বন্য লতা, জরদ ঘাস আর লেবুর রস একসঙ্গে সেদ্ধ করে মেয়েকে খাওয়াচ্ছেন তিনি। একই খাবার নিজেও খান। রমজানের প্রথম দিন মরুভূমির ক্যাকটাসের পানসে অংশ দিয়েই ইফতার করেছিলেন। আজ সেহরিতে কিছুই জোটেনি-এক মশক পানিতেই মা-মেয়ে রোজা রেখেছে।

এই অভাব শুধু তাদের নয়-পুরো গাজার। যুদ্ধবিরতির ভেতরেই শুরু হয়েছে রমজান। ক্ষুধা, আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার মাঝেও মানুষ আল্লাহর নির্দেশ পালন করছে। না খেয়ে থাকা যাদের নিত্যদিনের সঙ্গী, তাদের কাছে সংযম নতুন কিছু নয়।

আজানের ধ্বনিতে দুজন পানি খেয়ে রোজা ভাঙল। এশার আগেই আয়েশা ঘুমিয়ে পড়ল। তায়াম্মুম করে নামাজে দাঁড়ালেন মা। সিজদায় নত হয়ে অশ্রু ঝরাতে ঝরাতে মুক্তির জন্য ফরিয়াদ জানালেন। নামাজ শেষে তাঁবুর বাইরে এসে বসলেন। রমজানের চাঁদ-জ্যোৎস্নায় চারপাশ আলোকিত। স্মৃতিরা ভিড় করে আসে, একসময়ের সুখ, শিক্ষার আলো, স্বপ্নের বিদ্যালয়-সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেছে ইজরাইলের ছোঁড়া মিসাইলের আঘাতে।

হঠাৎ খবর আসে-জাবালিয়া ক্যাম্পে ত্রাণ বিতরণ হচ্ছে। প্রতিবেশীদের সঙ্গে ছুটে যান মা। ভিড় ঠেলে তিন দিনের খাবার জোটে। আর একটি থালা মাকলুবা। বহু প্রতীক্ষিত।

ইফতারের আগে মহল্লায় ফিরতেই দূরে আয়েশাকে ক্রাচে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন। খাবারের প্যাকেট উঁচিয়ে ধরতেই আয়েশার মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। খুশিতে সে দৌড়াতে শুরু করে। ক্রাচে ভর করেই।

হঠাৎ দ্রুম! দ্রুম! দ্রুম! মিসাইল আঘাত হানে পাশের দুটো ভবন পরে। ক্রাচ ছিটকে পড়ে যায় আয়েশা। ইজরায়েলি সেনাদের গুলিতে পা হারিয়েছিল ও। মা দ্রুত ছুটে যান মেয়ের কাছে। খাবার রেখে তুলে ধরেন মেয়েকে। দ্রুত তাঁবুর দিকে হাঁটা দেন মেয়েকে নিয়ে। আয়েশার মুখে দৃঢ়তা। একটি হাসি বেরোয় মুখ দিয়ে। যন্ত্রণার হাসি। খাবার পেয়েও ইফতারের স্বপ্নটা ম্লান হয়ে গেছে। আশেপাশে ছোটাছুটি শুরু হয়েছে। মানুষের আতঙ্কিত চিৎকার শোনা যাচ্ছে। ওরা ফিরছে তাঁবুতে। কিন্তু সে তাঁবু কতক্ষণ অক্ষত থাকবে কেউ জানে না।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ