পিকুর অপেক্ষায়

গল্প ডা. নাঈম তাজওয়ার জুলাই ২০২৫

আজ আয়ানের কিছুতেই সময় কাটছে না। ছয় বছরের ছোট্ট ছেলেটা বারবার ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকায়, কখন যে বাবা ফিরবে! আজ ২৪ জুলাই। ওর জন্মদিন। বাবা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন-আজ তিনি আয়ানের বহুদিনের স্বপ্ন আনবেন, একটি রঙিন পাখি। লাল টুকটুকে ঠোঁট, গায়ে নীল-লাল আর হলুদের ঝলক-যেন রংধনু ভেঙে আনা হয়েছে ঠিক আয়ানের জন্যই।

এই পাখিটা আয়ান প্রথম দেখে হিমেলদের বাড়িতে। হিমেল আর তার বড়ো ভাই রিমেল মিলে পাখিটার যত্ন নেয়; খাওয়ায়, গোসল করায়, খেলে। আর সেদিনই আয়ানের মনে বাসা বাঁধে এক রঙিন স্বপ্ন। ঠিক এমনই পাখি চাই! বাবাকে সে বহুবার বলেছে, ‘বাবা, একটি পাখি এনে দাও না!’

কিন্তু বাবা হাসতে হাসতে বলেন, ‘তুমি তো নিজেই খেতে চাও না, পাখিকে খাওয়াবে কীভাবে? আগে বড়ো হও।’

সেদিন থেকে আয়ান বদলে গেছে। সে এখন নিজে নিজে খায়, খেলনা গুছিয়ে রাখে; এমনকি একা একাই ঘুমিয়ে পড়ে। কারণ তার বিশ্বাস, সে বড়ো হয়েছে। এবার নিশ্চয় বাবা তার ইচ্ছেটা পূরণ করবেন।

এত কিছুর পরেও বাবা যেন বুঝেও না বোঝার ভান করেন। আয়ান কখনো রাগ করে খাওয়া বন্ধ করে দেয়, কখনো কাঁদে। আর বাবা একেক সময়ে একেক বুদ্ধিতে তাকে বুঝিয়ে খাইয়ে দেন।

এবার জন্মদিনে আয়ান বাবাকে সোজাসাপ্টা বলে দিয়েছে, ‘গিফট হিসেবে আমার পাখিটা চাই! লাল ঠোঁট, নীল-হলুদ পালক-একটা পিকু!’

হ্যাঁ, সে আগেই ঠিক করে রেখেছে, পাখিটার নাম হবে পিকু। সে পিকুর সঙ্গে খেলবে, গল্প বলবে, খাওয়াবে, ভালোবাসবে। কত স্বপ্ন আয়ানের! আজ তাই সে কিছুতেই মন বসাতে পারছে না। তার প্রিয় ডোরেমন ভালো লাগছে না। ছবির খাতা পড়ে আছে কোনায়। গাড়িগুলোতে একটুও হাত দিচ্ছে না। শুধু একদৃষ্টিতে চেয়ে আছে দরজার দিকে।

হঠাৎ বাইরে বাজ পড়ার মতো শব্দ হলো! চমকে উঠল আয়ান। এটা কীসের শব্দ? শব্দটা পরিচিত মনে হচ্ছে। একটু ভাবতেই মনে পড়ে-এই শব্দ তো রিমেল ভাইয়ের মোবাইলে শুনেছে, যখন সে পাবজি খেলে।

তাহলে কি বাসার বাইরের রাস্তায় কেউ পাবজি খেলছে? শব্দ এত জোরে কেন?

আয়ান আর দেরি করে না। দৌড়ে ছুটে যায় বারান্দায়, বাবা এলো কি না দেখা দরকার। হয়তো পিকু এসেই গেছে!


দুই.

আজ হাসপাতালে রোগীর চাপ তুলনামূলক কম। ডাক্তার রফিক কফির কাপ হাতে বসেছেন তাঁর সহকর্মী জামালের সঙ্গে। কথা বলছেন একমাত্র ছেলে আয়ানকে নিয়ে। ও জন্মের সময়েই মাকে হারায়। সেই ছোট্ট আয়ান আজ রফিকের জীবনের একমাত্র অবলম্বন। মা-মরা ছেলের ছোটো ছোটো আবদারগুলো পূরণ করতেই যেন বেঁচে আছেন তিনি। ওর সবচেয়ে বড়ো আবদার ছিল একটি পাখি। আজ আয়ানের জন্মদিন। বহু দিন ধরে সে বলছে, জন্মদিনে একটি রঙিন পাখি চায়। জামাল জানালেন, কাঁটাবনে একটি পোষা পাখির দোকান আছে।

দুপুরে রোগীর চাপ নেই। রেজিস্ট্রার স্যারের অনুমতি নিয়ে ঘণ্টাখানেকের ছুটি নিলেন ডা. রফিক। রিকশা নিয়ে চলে এলেন পাখির দোকানে।

দোকানে হরেক রকম পাখি। টিয়া, বাজরিগার, লাভ বার্ড, ককাটেল। তবে রফিক খুঁজছেন সেই লাল টুকটুকে ঠোঁটের নীল রঙের বাজরিগার পাখিটা। খুঁজতে খুঁজতে অবশেষে পেয়ে গেলেন। খাঁচায় বন্দি ছোট্ট পাখিটা যেন আয়ানের রঙিন স্বপ্ন!

পাখিটা কিনে কিছুদূর হেঁটে আসতেই হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দে চমকে উঠলেন ডা. রফিক। এ তো গুলির শব্দ! আশেপাশে তাকিয়ে দ্রুত পাশের বিল্ডিংয়ে ঢুকে পড়লেন। উঠে গেলেন দুই তলায়। একটু পর নিচে তাকিয়ে দেখলেন, চারদিকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী। মানুষের আতঙ্কিত চিৎকার ভেসে আসছে! কাছাকাছি কোথাও সাউন্ড গ্রেনেড বিস্ফোরণ হয়েছে। এক রক্তাক্ত যুবককে নিয়ে দৌড়াচ্ছে দুটি ছেলে।

আরও এক দফা গুলির শব্দ হলো! লুটিয়ে পড়ল ছেলেগুলো। এখানে আর একটুও সময় নষ্ট করলেন না ডা. রফিক। দ্রুত ফিরে এলেন হাসপাতালে।

হাসপাতালের সামনে রিকশা, অ্যাম্বুলেন্সের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। অসংখ্য মানুষ আহত হয়ে কাতরাচ্ছে, আর্তনাদ করছে। মুহূর্তে হাসপাতালটি যুদ্ধক্ষেত্রের মেডিকেল ক্যাম্পে রূপ নিয়েছে যেন। ওয়েটিং রুমের মেঝে রক্তে ভেজা। করিডোরে লাশের সারি। গাদাগাদি করে রাখা লাশ। ডা. রফিক গুনে দেখার চেষ্টা করেন, এক, দুই... বিশ, ত্রিশ...

না, গোনা সম্ভব নয়। সব বাচ্চা ছেলেপিলে! বয়স কতই-বা হবে? পনেরো থেকে একুশ।

আহতদের কেউ মাথায় গুলিবিদ্ধ, কেউ বুকে, কেউবা চোখে। একের পর এক আহতদের নিয়ে আসা হচ্ছে।

পাখির খাঁচাটা ড্রেসিং রুমে রেখে দ্রুত ওটি ড্রেস পরে অপারেশন থিয়েটারে ঢুকে পড়লেন ডা. রফিক। সবে নিউরো-সার্জারিতে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেছেন। আজ কোনো দিকে না তাকিয়ে, কোনো চিন্তা না করে শুধু অপারেশন করে চলেছেন একটার পর একটা। করছেন জীবন বাঁচানোর লড়াই!

একটি ছিদ্র, একটি পৃথিবী। রাত গভীর হচ্ছে। ডা. রফিক একের পর এক অপারেশনে ব্যস্ত। আল্লাহর রহমতে আজ অনেকগুলো প্রাণ ফিরেছে, আবার কিছু চিরতরে থেমেও গেছে। এবার অপারেশন টেবিলে আনা হলো এক তরুণকে। মাত্র কুড়ি বছর বয়স। মাথায় গুলির ক্ষত, রক্তে ভেসে গেছে শরীর। ডা. রফিক থেমে থাকেন না। প্রাণপণে চেষ্টা করতে থাকেন রক্তক্ষরণ বন্ধ করার জন্য। যেন তার অস্ত্রোপচার নয়, সময়ের সঙ্গে এক অসম যুদ্ধ!

এই ছেলেটি মরতে পারে না! পৃথিবীর আসল রূপ তো সে এখনো দেখেনি। জীবনের মানে বুঝে ওঠার আগেই বুক পেতে দিয়েছে দেশের জন্য। না, তাকে যেতে দেওয়া যাবে না।

মাথায় চিন্তার ঝড়। এমন সময় ওটি-বয় ছুটে আসে। হতাশ কণ্ঠে জানায়, আরেকটি শিশু এসেছে, মাথায় গুলিবিদ্ধ। রক্তক্ষরণে মৃতপ্রায়। কিন্তু কোনো অপারেশন থিয়েটার খালি নেই। ওটি-বয় বারবার অনুরোধ করে, তাগাদা দেয়। ডা. রফিক অটল। চোখ তুলে বলেন, ‘এই ছেলেটির কাজ শেষ না করে আমি অন্য কারও কাছে যেতে পারব না।’

অবশেষে দীর্ঘ এক যুদ্ধ শেষে রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়। তরুণটি বেঁচে যায়। ঘড়িতে তখন প্রায় রাত একটা। শরীরজুড়ে ক্লান্তি, মাথায় ধ্বনিত হচ্ছে নিস্তব্ধতা। ওয়াশরুমে গিয়ে চোখে পানি দিয়ে ফিরে আসেন তিনি। পকেট থেকে মোবাইল বের করে তাকান স্ক্রিনে। অসংখ্য মিসড কল! কল ব্যাক করার চেষ্টা করেন। কিন্তু সিগন্যাল নেই। নেটওয়ার্ক যেন পুরো শহরের মতোই স্তব্ধ। উদ্বিগ্ন মনে ছুটে যান ড্রেসিং রুমের দিকে। সেখানে পৌঁছেই স্থির হয়ে যান ডা. রফিক।

ড্রেসিং রুমেও লাশের স্তূপ। হাসপাতালের প্রতিটি প্রান্ত যেন পরিণত হয়েছে এক মৃত্যুপুরীতে। তার চোখ যায় এক কোণে রাখা খাঁচার দিকে। সেই রঙিন পাখির খাঁচা, যেটি আয়ানের জন্য কিনেছিলেন। খাঁচাটা চাপা পড়ে আছে একটি লাশের নিচে। চ্যাপ্টা হয়ে গেছে। পাখিটির পালকও বেরিয়ে আছে খাঁচার ফাঁক গলে। পাখিটির কী দশা কে জানে!

লাশটি সরানো দরকার। তিনি ধীরে ধীরে এগিয়ে যান। আর তখনই থেমে যায় সময়। চোখ হয়ে যায় স্থির। না-না-না! এটা... এটা তো...আয়ান! তার নিজের ছেলে। তার জীবনের সবটুকু অর্থ, অস্তিত্ব, আশ্রয়!

সেই মায়াবী মুখ। কী শান্ত! কী কোমল! তবে আয়ানের কপালের ঠিক মাঝখানে একটি নিঃশব্দ ছিদ্র। একটি গুলির চিহ্ন!

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ