জীবন্ত বজ্র
বিজ্ঞান নিয়াজ মোরশেদ এপ্রিল ২০২৬
বজ্রপাত বলতে সাধারণত আকাশে হঠাৎ তীব্র আলোকরেখা বোঝায়। হঠাৎ যদি এমন হয় আকাশে একটি ফুটবলের মতো উজ্জ্বল আলোর গোলক ভেসে বেড়াচ্ছে! কোনো শব্দ নেই, নেই কোনো ঝিলিক। অবাক হলেও প্রকৃতিতে এমন রহস্যময় ঘটনা ঘটে। বজ্রপাতসহ ঝড়ের আগে এ বিষয়টি প্রায়ই দেখা যায়। যদিও একে অনেকেই ভিনগ্রহের প্রাণীদের বাহন হিসেবে মনে করতেন। তবে বিজ্ঞানীরা একে বল লাইটেনিং বা গোলক বজ্র বলেন।
বল লাইটনিং বা গোল বজ্রপাত একটি অত্যন্ত বিরল, রহস্যময় প্রাকৃতিক ঘটনা। এটি সাধারণ বজ্রপাতের মতো নয়। আকাশে হঠাৎ উজ্জ্বল আগুনের মতো গোল আলো দেখা যায় যা শূন্যে ভেসে চলে।
সম্প্রতি একজন চীনা গবেষক এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। যাকে বল লাইটনিং থিওরি বলা হয়। এক প্রতিবেদনে বিষয়টি জানিয়েছে মিরর। চীনা গবেষক এইচ.সি.উ.যে বিষয়টি উপস্থাপন করে বলেছেন, আকাশে হঠাৎ যে রহস্যময় আলো দেখা যায়, তা মূলত এক ধরনের রেডিয়েশনের ফলে সৃষ্ট আলো। একে বল লাইটনিং বলা হয়।
‘গোলক বজ্র’ বা বল লাইটনিং প্রকৃতির সবচেয়ে বড় রহস্যগুলোর একটি। এটি একটি উজ্জ্বল, গোলক আকৃতির বৈদ্যুতিক আভা যা সাধারণত বজ্রঝড়ের সময় আকাশে বা ঘরের ভেতর দেখা যায়।
এটি সাধারণত একটি টেনিস বল থেকে শুরু করে ফুটবল আকৃতির হয়। সাধারণত ৫ থেকে ৪০ সেন্টিমিটার ব্যাসের হয় একটি জ্বলন্ত গোলক। এর রং সাদা, হলুদ, নীল বা কমলা হতে পারে। বল লাইটনিং মাঝে মাঝে শোঁ শোঁ শব্দ করে। কখনো গন্ধ ছড়ায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বল লাইটেনিং চলে যাওয়ার পর বাতাসে ওজোন গ্যাস বা পোড়া সালফারের মতো একধরনের গন্ধ পাওয়া যায়।
সাধারণ বিদ্যুৎ চমক মাত্র কয়েক সেকেন্ড থাকে, কিন্তু বল লাইটেনিং ১০ সেকেন্ড বা তার বেশি সময় ধরে বাতাসে ভেসে থাকতে পারে।
এটি ঘরের জানালা, দেওয়াল বা বন্ধ দরজার ভেতর দিয়ে অনায়াসেই যাতায়াত করতে পারে। এমনকি বাতাসের ফাঁক দিয়েও ঢুকে যেতে পারে এবং কোনো ক্ষতি না করেই আবার বেরিয়ে যায়। অনেক সময় এটি কোনো শব্দ ছাড়াই মিলিয়ে যায়, আবার কখনো বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়।
চীনের বিজ্ঞানীগণ ল্যাবরেটরিতে বল লাইটেনিং তৈরি করার চেষ্টা করেছেন। যদিও সফল হননি তবে এর কাছাকাছি কিছু তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। এর সৃষ্টির কারণ হিসেবে বর্তমানে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য তত্ত্ব দেওয়া হয়েছে। ২০০৬ সালে জন আব্রাহামসন এটি প্রস্তাব করেন।
সাধারণ বজ্রপাত যখন মাটিতে আঘাত করে, তখন মাটির ভেতরের সিলিকা প্রচণ্ড তাপে বাষ্পীভূত হয়ে যায়। এই সিলিকা বাষ্প বাতাসের অক্সিজেনের সাথে মিশে গিয়ে একটি উজ্জ্বল গোলক তৈরি করে যা ধীরে ধীরে জ্বলতে থাকে। ২০১৪ সালে চীনা বিজ্ঞানীরা স্পেকট্রোস্কোপি ব্যবহার করে বল লাইটেনিংয়ের ভেতরে সিলিকা, লোহা এবং ক্যালসিয়ামের উপস্থিতি পেয়ে এই তত্ত্বের সত্যতা প্রমাণ করেছেন।
প্লাজমা থিওরি নামে আর একটি তত্ত্ব দেওয়া হয়েছে। বজ্রপাতের ফলে বায়ুমণ্ডলের গ্যাসগুলো অত্যন্ত উত্তপ্ত হয়ে ‘প্লাজমা’ অবস্থায় চলে যায়। এই প্লাজমা যখন একটি নির্দিষ্ট চৌম্বক ক্ষেত্রের মধ্যে আটকা পড়ে, তখন তা একটি উজ্জ্বল বলের মতো দেখায়। এই প্লাজমা গোলকটি বাতাসের ওপর ভেসে বেড়াতে পারে এবং এর শক্তি শেষ না হওয়া পর্যন্ত এটি দৃশ্যমান থাকে।
মাইক্রোওয়েভ ক্যাভিটি তত্ত্ব মতে, বজ্রপাতের সময় বিশাল পরিমাণের রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি বা মাইক্রোওয়েভ বিকিরণ তৈরি হয়। এই বিকিরণ যখন কোনো বদ্ধ জায়গায় আটকা পড়ে, তখন সেখানে বাতাসের অণুগুলো উত্তেজিত হয়ে একটি উজ্জ্বল আলোর পিণ্ড তৈরি করে।
নিকোলা টেসলা বল লাইটেনিং নিয়ে গবেষণা করেছিলেন এবং দাবি করেছিলেন, তিনি পরীক্ষাগারে এটি তৈরি করতে পেরেছেন।
এ ছাড়া রাশিয়ার বিখ্যাত বিজ্ঞানী গেয়র্গ রিখম্যান ১৭৫৩ সালে বজ্রপাত নিয়ে পরীক্ষা করতে গিয়ে বল লাইটেনিংয়ের আঘাতে মারা যান বলে ধারণা করা হয়।
শত শত বছর ধরে গবেষণা করলেও এখনো এর নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। বিজ্ঞানীরা ল্যাবে বারবার চেষ্টা করেও ঠিক একই রকম বল লাইটনিং তৈরি করতে পারেননি। বল লাইটনিং বা জীবন্ত বজ্র পৃথিবীর অন্যতম রহস্যময়, সুন্দর এবং বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক ঘটনা।
আরও পড়ুন...