গাজায় ইসরাইলের নৃশংসতার বড়ো শিকার শিশুরা

প্রতিবেদন মোহাম্মদ নকিব মে ২০২৫

ফিলিস্তিনের গাজায় এ বছর ঈদ আসেনি, এসেছে ইসরাইলের ভয়ানক নৃশংসতা। তারা ঈদের দিনেও ঘুমন্ত গাজাবাসীকে হত্যা করেছে। হত্যা করেছে শিশু ও নারীদের। ৭০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ফিলিস্তিনিরা নিজ গৃহে পরবাসী। তাদের বাড়িঘর দখল করে আছে হানাদার ইসরাইলিরা। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস ইসরাইলিদের ওপর আক্রমণ চালায়। তাদের লক্ষ্য ছিল বিশে^র দৃষ্টি আকর্ষণ করা। তাদের সাহায্য করা। তাদের কথা তুলে ধরা। কারণ প্রতি দিনই তারা মার খাচ্ছে। মারা যাচ্ছে। এরপর থেকে ইসরাইল হয়ে যায় আরো বেপরোয়া। গত দেড় বছরে তারা ৫১ হাজার ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে। মাস দেড়েকের যুদ্ধবিরতির পর আবার হামলা শুরু করে ইহুদিবাদী ইসরাইল।

দিনে দিনে তাদের অত্যাচার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে গাজা নগরীর উপকণ্ঠে শুজাইয়া এলাকা খালি করার নির্দেশ দিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। প্রাণ বাঁচাতে অসহায় শিশুদের নিয়ে পালাচ্ছেন  ফিলিস্তিনি নারীরা। এ দৃশ্য দেখে বিশ^ হতবাক। কিন্তু কেউ কিছু করছে না। 

এক বিবৃতিতে হামাস বলেছে, ‘যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজায় প্রায় ১৯ হাজার শিশু শহীদ হয়েছে। মা-বাবা হারিয়ে এতিম হয়েছে ৩৯ হাজার শিশু। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিষ্ক্রিয়তা ও দায়মুক্তির কারণে ইসরায়েলি দখলদারেরা ফিলিস্তিনি শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধ করতে আরও উৎসাহী হচ্ছে।’ ইসরায়েলের অপরাধ তুলে ধরার জন্য মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কাছে আহ্বান জানায় হামাস।

২.

গাজার মোট ২৩ লাখ বাসিন্দার ৫১ শতাংশ শিশু। উপত্যকাটিতে ইসরায়েলের হামলায় নিহত শিশুদের তথ্য আরও সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরেছে ফিলিস্তিনের কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান ব্যুরো। তাদের তথ্যমতে, গাজায় নিহত শিশুদের মধ্যে ২৭৪টি নবজাতক আর এক বছরের কম বয়সি ৮৭৪ শিশু রয়েছে। হামলার পাশাপাশি উপত্যকাটিতে ঠাণ্ডায় জমে ১৭ এবং ক্ষুধা ও অপুষ্টিতে ৫২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজায় নির্বিচারে হামলা শুরু করে ইসরায়েল। গাজার স্থানীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, তখন থেকে উপত্যকাটিতে অন্তত ৫০ হাজার ৬৬৯ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত ১ লাখ ১৫ হাজার ২২৫ জন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে গত ১৮ মার্চ থেকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের পর নিহত ১ হাজার ২৪৯ জন রয়েছেন। এই সময় আহত হয়েছেন ৩ হাজার ২২ জন।

১৮ মার্চ থেকে গাজায় হামলার পাশাপাশি দখলও শুরু করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। রাফা ও খান ইউনুসে চলছে স্থল অভিযান।

সম্প্রতি গাজা নগরীর শুজাইয়া এলাকায় আকাশ ও স্থলপথে ব্যাপক হামলা হয়। তীব্র গোলাগুলির মধ্যে আটকা পড়েন এলাকাটির বাসিন্দারা। এক বাসিন্দা আল-জাজিরাকে বলেন, ‘ইসরায়েলের নির্বিচার তীব্র হামলার কারণে আমরা বাসাবাড়ি ও তাঁবু ছেড়ে যেতে ভয় পাচ্ছি। কামানের গোলার আঘাতে আমাদের বেশির ভাগ তাঁবু ছিঁড়ে গেছে। ড্রোন থেকেও আমাদের ওপর হামলা হচ্ছে।’

এদিকে গাজায় ইসরায়েলের বোমা হামলার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন উপত্যকাটির একজন সাংবাদিক। স্থানীয় সাংবাদিকেরা দাবি করেছেন, ওই ভিডিওতে বোমার আঘাতে মানুষের শরীর কয়েক তলা ভবনের সমান ওপরে ছিটকে পড়তে দেখা গেছে। ভিডিওটি শেয়ার করা সাংবাদিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ‘শিশুদের আত্মা ও শরীর স্বর্গে পাঠানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি রকেট ব্যবহার করছে দখলদার ইসরায়েলিরা।’

গাজায় ইসরায়েলের হামলার শুরু থেকেই দেশটিকে সর্বাত্মক সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় বসার পর সেই সমর্থন আরও বাড়িয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এমনকি তিনি ফিলিস্তিনিদের বিতাড়িত করে উপত্যকাটি যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানায় আনার কথা বলেছেন। গাজার ৮০ শতাংশ বাড়িঘর ধ্বংস করে দিয়েছে ইসরাইল। 

৩.

কয়েক দিন আগের চিত্র। সেদিন জন্মদিন ছিল ফুটফুটে শিশু বানান আল-আলোউতের। আরেক শিশু হুর আল-সালোউতের বয়স এক বছর হয়েছে। কবে সে গুটি গুটি পায়ে হাঁটা শুরু করবে, সে অপেক্ষায় ছিলেন মা-বাবা। আর ঈদ কবে আসবে, কী কেনাকাটা করবে তা নিয়ে ছোট্ট সালমাহ এসলিয়েহ যেন আরও চঞ্চল হয়ে উঠেছিল।

সালমাহের ঈদ আর আসবে না, আসেওনি। হুর আলসালোউতের প্রথম হাঁটা, আধো আধো বুলিতে কথা শোনার অপেক্ষা শেষ হবে না কোনোদিন। ইসরায়েলের নির্মম হামলা মা-বাবার কোল থেকে কেড়ে নিয়েছে ফিলিস্তিনের গাজার এই শিশুদের। শুধু এই তিনজন নয়, ১৭ মাস ধরে চলা ইসরায়েলের নির্বিচার হামলায় ফিলিস্তিনের উপত্যকাটিতে প্রাণ হারিয়েছে প্রায় ১৮ হাজার শিশু। গাজায় গত ১৯ জানুয়ারি শুরু হয়েছিল যুদ্ধবিরতি। এরপর সেখানকার শিশুদের দুর্দশা কিছুটা কমেছিল। তবে গত ২০ মার্চ ভোররাতে (সাহরির আগে) গাজায় আবার নৃশংস হামলা শুরু করে ইসরায়েল। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, এই হামলায় এক দিনে ৫৯১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শিশু ২০০। যদিও বার্তা সংস্থা এএফপি প্রথম দুই দিনে ৯৭০ জনের নিহত হওয়ার খবর জানিয়েছিল।

এরপর থেকে মৃত্যুর মিছিল চলছেই। বিশে^র দেশে দেশে এই হামলা ও নৃশংস হত্যার প্রতিবাদ হয়েছে। প্রতিবাদ হয়েছে বাংলাদেশেও। এখনো চলছে প্রতিবাদ। কিন্তু এই মৃত্যুর মিছিল কবে থামবে?

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ