জলচর পাখি কালেম

চিত্র-বিচিত্র নিয়াজ মোরশেদ জানুয়ারি ২০২৬

কালেম বা কালিম জলাভূমির পাখি। এরা পানি এবং ডাঙা উভয় স্থানেই বিচরণ করে। সুন্দর এই পাখিটি দেখতে অনেকটা মুরগির মতো।

বাংলাদেশে কালেম পাখি অনেক নামে পরিচিত। যেমন : কায়িম পাখি, কামিয়া পাখি, কালিম পাখি, কালেম পাখি, কায়েম পাখি, করমা পাখি, সুন্দরী পাখি, বুরি পাখি ইত্যাদি। ইংরেজিতে গ্রে-হেডেড সোয়াম্পহেন নামে পরিচিত। এর আগে পাখিটি পার্পল সোয়াম্পহেন, পার্পল মুরহেন বা ইন্ডিয়ান পার্পল সোয়াম্পহেন নামে পরিচিত ছিল। বর্তমানে পার্পল সোয়াম্পহেনের ছয়টি উপপ্রজাতিকে ছয়টি আলাদা প্রজাতিতে ভাগ করা হয়েছে। রেলিডি গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Porphyrio policephalus।

বাংলাদেশে এটি দুর্লভ আবাসিক পাখি। তবে শীতকালে এই পাখিটিকে টাঙ্গুয়ার হাওড়ে বিপুল সংখ্যায় দেখা যায়। বাংলাদেশ ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্য, ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে চীনের উত্তরাঞ্চল হয়ে থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চল পর্যন্ত ওরা বিস্তৃত। উত্তর আমেরিকাতেও এদের উপস্থিতি আছে। 

কালেম পাখির দেহের দৈর্ঘ্য ৩৮-৫০ সেন্টিমিটার। প্রসারিত ডানা ৯০-১০০ সেন্টিমিটার এবং ওজন ৭০০-৮৫০ গ্রাম। দেহের পালক চকচকে নীলচে-বেগুনি। নীলের ওপর বেগুনি রঙের আভা। মাথার রং হালকা। ডানা সবুজ দীপ্তিময়। লেজ ও ডানার  শেষপ্রান্ত কালচে। লেজের নিচের দিকে সাদা। ঠোঁটের মাথার পেছন পর্যন্ত লাল রঙের আবরণ আছে। ঘাড় ও বুক চকচকে। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একই রকম হলেও কপালের ওপরের লাল বর্মটি স্ত্রীর ক্ষেত্রে ছোট। চোখ লাল। এদের পা ও পায়ের আঙুল বেশ লম্বা হয়। আঙুল লাল রঙের। পা হাঁসের মতো না হলেও এরা ভালো সাঁতার কাটতে পারে। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখি অনুজ্জ্বল, গলা ফ্যাকাশে এবং মুখ, ঘাড় ও বুকে ধূসর আভা রয়েছে। এরা সব সময় লেজ নাচাতে থাকে এবং লম্বা আঙুলওয়ালা দীর্ঘ পা দিয়ে শ্যাওলার ওপর হেঁটে বেড়ায়। 

জলজ পাখি কালেম প্রধানত বিভিন্ন জলাশয়, হাওড় বা বিলে বিচরণ করে। বাংলাদেশে কয়েকটি জায়গায় কালেম দেখা যায়। সবচেয়ে বেশি দেখা যায় মৌলভীবাজারের বাইক্কার বিলে। এরা ৯ মাস এই বিলে থাকে। বাকি তিন মাসের জন্য এরা পাহাড়ে চলে যায়। এরা ধীরে হলেও বেশ ভালো উড়তে পারে।

কালেম পাখি খুবই দুঃসাহসী, লড়াকু ও মারকুটে স্বভাবের। কালেম পাখি ভোরবেলা ও গোধূলি ছাড়াও বাদলা দিনে বেশ সক্রিয় থাকে। বেগুনি কালেম ছোট থেকে মাঝারি ও বড় দলে থাকে এবং বেশ উচ্চৈঃস্বরে ডাকাডাকি করে। এলাকার মালিকানা শক্তভাবে রক্ষা করে থাকে।

জলজ উদ্ভিদ ও পোকামাকড় এদের প্রধান খাদ্য। অল্প পানিতে ভাসমান আগাছায় হেঁটে হেঁটে জলজ উদ্ভিদ, বীজ, শস্যদানা, শিকড়, খোলসযুক্ত প্রাণী, ছোট ছোট মাছ, কেঁচো, পানির পোকা, জোঁক, মাকড়সা, ফড়িং ইত্যাদি খায়। কচুরিপানা এদের খুব পছন্দ। কচুরিপানার জঞ্জালে ঘুরে ঘুরে খাদ্য খোঁজে। এরা দলবেঁধে চলাফেরা করে। খাবার খোঁজার সময় লেজ নাড়ায়। তখন লেজের নিচের সাদা পালকগুলো দেখা যায়।

শত্রুর হাত থেকে বাঁচার জন্য অনেক পাখি একসঙ্গে থাকে। শুধু নিজেদের সঙ্গে নয়, দল বাঁধে অন্য জলচর পাখিদের সঙ্গেও। ঝাঁকবেঁধে থাকলে একেকজন একেক দিকে নজর রাখতে পারে। তখন শত্রুর জন্য সুযোগ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

কালেম পাখির আরও একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে। পোষ মানলে এরা উড়ে যায় না। সেজন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে পোষা পাখির খামারিরা এদের বিক্রির জন্য লালনপালন করেন। অথচ বাংলাদেশের প্রচলিত বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে বন্যপ্রাণী ও পাখি পোষা এবং বিক্রি করা আইনত অপরাধ।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ