জুলাই বিপ্লবে কিশোর মনের ভাবনা

জুলাই-নিবন্ধ সীমান্ত আকরাম জুলাই ২০২৬

জুলাই বিপ্লবে বাংলাদেশের কিশোরদের ভাবনা ছিল একটি বৈষম্যহীন, স্বাধীন এবং নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার। প্রথাগতভাবে কিশোর বয়সকে রাজনৈতিক বা সামাজিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাইরে রাখা হলেও, এই আন্দোলনে স্কুলের গণ্ডি না পেরোনো কোমলমতি কিশোররা তাদের গভীর দেশপ্রেম, ন্যায়ের প্রতি অটুট এবং স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে অকুতোভয় মানসিকতার পরিচয় দিয়েছে। এ আন্দোলনটি যদিও শুরু হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে, কিন্তু কিশোরদের মনে প্রশ্ন জাগে, যোগ্যতা এবং মেধার ভিত্তিতে সবাই সমান সুযোগ পায় না কেন? কেন অন্যায্য সুযোগ বা বৈষম্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বপ্নকে ধ্বংস করছে? এসব অন্যায় দেখে তারা উপলব্ধি করেছিল যে, আজ প্রতিবাদ না করলে নিজেদের ভবিষ্যৎও একদিন অন্ধকারে তলিয়ে যাবে। 

২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে কিশোরদের ভাবনা ছিল মূলত বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত ও গণতান্ত্রিক একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলা। প্রথাগত রাজনীতির বাইরে গিয়ে তারা দেশ ও সমাজের মৌলিক সংস্কার এবং সমঅধিকারের দাবিতে রাজপথে নেমেছিল। কিশোর মনের এসব ভাবনাই জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের কিশোর সমাজকে রাতারাতি পরিপক্ব করে তুলেছে। এটি প্রমাণ করেছে যে, তারা কেবলই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বুঁদ হয়ে থাকা কোনো প্রজন্ম নয়; বরং প্রয়োজনে দেশের হাল ধরার মতো গভীর দেশপ্রেম ও সংকল্প তাদের ভাবনার মূলে রয়েছে।

জুলাই বিপ্লবে স্কুল-কলেজের কিশোরদের (এবহ-ত) অবদান ছিল এককথায় অভূতপূর্ব এবং ঐতিহাসিক। তারা কেবল বড়দের আন্দোলনের সমর্থক ছিল না; বরং অনেক ক্ষেত্রে রাজপথের সম্মুখভাগে থেকে আন্দোলনের গতিপথ নির্ধারণ করেছে। আন্দোলনে শামিল হয়ে এসব কোমলমতি শিশু-কিশোররা নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছে। আবার কেউ কেউ পঙ্গুত্ব বরণ করেছে, কেউ কেউ আহত হয়ে এখনো হাসপাতালের বেডে কাতরাচ্ছে। এখনো অনেক কিশোর মানসিক অভিঘাতের মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছে।

আমরা দেখেছি, জুলাই বিপ্লবে রাজপথে কিশোরদের অবদান অতুলনীয় ছিল। রাজধানী ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে স্কুল ও কলেজের ইউনিফর্ম পরা কিশোর-কিশোরীরা আন্দোলনের প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে ব্যারিকেড তৈরি করে। প্রযুক্তি-সচেতন এই প্রজন্ম ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের সময়ও প্রক্সি নেটওয়ার্ক বা অফলাইন মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহার করে আন্দোলনের সমন্বয় বজায় রাখে। তারা ব্যঙ্গাত্মক মিম (গবসবং), কার্টুন, স্লোগান এবং প্ল্যাকার্ডের মাধ্যমে স্বৈরাচারের ভয়কে জয় করতে রসবোধকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। 

জুলাই বিপ্লবের দিনগুলোতে কিশোররা রংতুলি হাতে পুরো দেশের দেওয়ালগুলোকে প্রতিবাদের ক্যানভাসে রূপান্তর করে। তারা আবু সাঈদ, মীর মুগ্ধের ছবি এবং বিভিন্ন সাহসী স্লোগান এঁকে দেয়ালগুলোকে চিরস্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভে পরিণত করে। কিশোরদের মুখে মুখে ছড়ানো-“বুকের ভেতর দারুণ ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর”, “পানি লাগবে, পানি?” “ইউ ওয়ান্ট জাস্টিস” ইত্যাদি স্লোগানগুলো বারুদের মতো কাজ করেছে। 

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের এক উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল ১১ থেকে ২০ বছর বয়সি কিশোর-কিশোরী। তাদের এই নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে মোট ১৩২ শিশু-কিশোর শহীদ হয়েছেন। এরা সবাই একটি সুন্দর আগামীর স্বপ্নে বিভোর ছিল। সে স্বপ্নের কথা জুলাই আন্দোলনে শহীদ হওয়া আনাস তার চিঠিতে বলে গেছে। তখন তার বয়স ছিল ১৬ বছর ৯ মাস। রাজধানীর গেন্ডারিয়ার আদর্শ একাডেমিতে বিজ্ঞান বিভাগে দশম শ্রেণিতে পড়ত আনাস। সে ভবিষ্যতে ইঞ্জিনিয়ার হতে চেয়েছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির দিন রাজপথে নামা ছয় আন্দোলনকারীকে গুলি করে রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় হত্যা করা হয়। এই ছয় শহীদের একজন শাহারিয়ার খান আনাস। আন্দোলনে যাবার পূর্বে মাকে একটি চিঠি লিখেছিল সে। চিঠিতে লিখেছিল, “মা, আমি মিছিলে যাচ্ছি। আমি নিজেকে আর আটকিয়ে রাখতে পারলাম না। স্যরি আব্বুজান। তোমার কথা অমান্য কোরে বের হলাম। স্বার্থপরের মতো ঘরে বসে থাকতে পারলাম না। আমাদের ভাইরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কাফনের কাপড় মাথায় বেঁধে রাজপথে নেমে সংগ্রাম করে যাচ্ছে। অকাতরে নিজেদের জীবন বিসর্জন দিচ্ছে। একটি প্রতিবন্ধী কিশোর, ৭ বছরের বাচ্চা, ল্যাংরা মানুষ যদি সংগ্রামে নামতে পারে, তাহলে আমি কেন বসে থাকব ঘরে। একদিন তো মরতে হবেই। তাই মৃত্যুর ভয় করে স্বার্থপরের মতো ঘরে বসে না থেকে সংগ্রামে নেমে গুলি খেয়ে বীরের মতো মৃত্যুও অধিক শ্রেষ্ঠ। যে অন্যের জন্য নিজের জীবনকে বিলিয়ে দেয়, সেই প্রকৃত মানুষ। আমি যদি বেঁচে না ফিরি তবে কষ্ট না পেয়ে গর্বিত হয়ো। জীবনের প্রতিটি ভুলের জন্য ক্ষমা চাই। আনাস।”

হাসনাতুল ইসলাম ফাইয়াজ কারাবরণ করা একজন কিশোর জুলাই যোদ্ধা। ২৪ জুলাই রাতে পুলিশ তাকে মাতুয়াইল থেকে তুলে নিয়ে যায় এবং তিন দিন পর ডিবি অফিসে পাঠানো হয়। সেখানে মিথ্যা সাক্ষ্য না দেওয়ায় তাকে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়। মাত্র ১৭ বছর বয়সী সাহসী এই কিশোরকে আদালতে তোলা হয় হাতে দড়ি বাঁধা অবস্থায়। আদালত তার রিমান্ড মঞ্জুর করলে ফুঁসে ওঠে দেশবাসী। প্রতিবাদে তার রিমান্ড বাতিল করে গাজীপুর কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানো হয়। রাজনীতি-সচেতন ফাইয়াজ সত্য ও ন্যায়ের জন্য যেকোনো সংগ্রামে রাজপথে নামতে প্রস্তুত। এক সাক্ষাৎকারে সে বলে, “রাজপথে দাঁড়িয়ে বুঝেছিলাম, এই আন্দোলনে যারা ছিলেন, তারা ক্লান্তিহীন। তারা সব বাধাকে সাহসিকতার সাথে মোকাবিলা করার দৃঢ়প্রত্যয় গ্রহণ করেছিল।” 

“একদিন পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে। এমন জীবন গড়ো, যাতে মৃত্যুর পর মানুষ তোমাকে মনে রাখে।” নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টের ইন্ট্রোতে রেসিডেন্সিয়াল মডেলে কলেজের এইচএসসি ২৫তম ব্যাচের ছাত্র ফারহান ফাইয়াজ ইংরেজিতে এ কথা লিখেছিলেন। ১৮ জুলাই ধানমন্ডিতে জুলাই আন্দোলনে নিহত হয়েছে সে। তার ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল নিজেকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। আনাস, ফাইয়াজ ও ফারহানদের মতো হাজারো স্বপ্নবাজ তরুণদের ভাবনার ফলেই জুলাই আন্দোলনে মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদের কবর রচিত হয়েছে।

জুলাই এবং আগস্ট মাসে বাংলাদেশে সংঘটিত মর্মান্তিক ঘটনা সম্পর্কে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনের ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ প্রকাশিত প্রতিবেদনটি একই সঙ্গে হৃদয়বিদারক এবং উদ্বেগজনক। প্রতিবেদন অনুযায়ী ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে যে ১ হাজার ৪০০ ব্যক্তি শহীদ (নিহত) হয়েছেন, তাদের মধ্যে শতাধিক ছিল শিশু। শিশুরাও এই সহিংসতা থেকে রেহাই পায়নি; তাদের অনেককে হত্যা করা হয়, পঙ্গু করে দেওয়া হয়, নির্বিচারে গ্রেপ্তার করা হয়, অমানবিক অবস্থায় আটক করে রাখা হয় এবং নির্যাতন করা হয়। এই ঘটনাগুলো অবশ্যই আমাদের সবাইকে আতঙ্কিত করে তুলছে। 

এই বিপ্লব প্রমাণ করেছে যে, আজকের কিশোররা রাজনীতিবিমুখ নয়। রাজনীতির মাঠে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শিখেছে। তারা দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীরভাবে ভাবে এবং প্রয়োজনে নিজের জীবনবাজি রেখে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। এ আন্দোলনে বুলেটের ভয় বা দমন-পীড়নের হুমকি কিশোরদের দমাতে পারেনি। তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর অদম্য সাহস দেখিয়েছে। তাদের ভাবনা ছিল-যে দেশে সত্য কথা বলা যায় না বা নিজের অধিকার দাবি করা অপরাধ, সেই ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। এই চেতনা থেকেই তারা বড়দের পাশাপাশি স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজপথে নেমে আসে। 

দেশ সংস্কারের প্রশ্নে এসব কিশোরদের চিন্তা রাজ্যে অমূল পরিবর্তন দেখা গিয়েছে। বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে কিশোরদের একটি ভাবনা ছিল দেশের শৃঙ্খলা বজায় রাখা। তারা ট্র্যাফিক নিয়ন্ত্রণ, দেয়ালচিত্র (গ্রাফিতি) আঁকা এবং রাস্তা পরিষ্কারের মাধ্যমে প্রমাণ করেছে যে, দেশটা তাদেরও এবং এর দেখভালের দায়িত্ব তাদের নিজেদের কাঁধেই। তারা অনুভব করেছিল যে বাংলাদেশের ভাগ্য কোনো রাজনৈতিক এলিট শ্রেণির হাতে নয়, বরং সাধারণ মানুষের হাতে থাকা উচিত। জুলাই বিপ্লবে শতাধিক শিশু-কিশোর প্রাণ হারিয়ে এমনটাই প্রমাণ করেছে। বেঁচে থাকা কিশোরদের ভাবনায় এখন সবচেয়ে বড় জায়গা জুড়ে আছে তাদের শহীদ ও আহত বন্ধুদের স্মৃতি। তাদের আত্মত্যাগ যাতে বৃথা না যায় এবং একটি সুন্দর বাংলাদেশ গঠিত হয়, সেটাই এখন তাদের মূল লক্ষ্য।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ