জুলাই স্মৃতি

জুলাই-গল্প এম. রইচ জুলাই ২০২৬

শহরটা তখন আগ্নেয়গিরির মতো টগবগ করে ফুটছিল। ২০২৪ সালের সেই জুলাই মাস, যার প্রতিটি দিন ছিল ইতিহাসের এক একটি পাতা। আমি তখন দশম শ্রেণির ছাত্র। সাধারণ এক কিশোরের চোখে দেশ দেখার চশমাটা সেদিন বদলে গিয়েছিল। আমাদের শান্ত এলাকাটাও যেন এক উত্তাল জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছিল।

সেদিন ছিল ৫ আগস্ট। চারদিকে থমথমে ভাব। বড় ভাইদের মুখে শুনছিলাম চারদিকে কী হচ্ছে। মা বারবার নিষেধ করছিলেন বাইরে যেতে, কিন্তু মনের ভেতর যে অস্থিরতা কাজ করছিল, তা চার দেওয়ালের মাঝে আটকে রাখা অসম্ভব ছিল। বিকেলের দিকে যখন স্লোগানের শব্দ তীব্র হলো, তখন আর ঘরে থাকতে পারলাম না। মাকে না জানিয়েই পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।

রাস্তায় নামতেই এক অন্যরকম দৃশ্য চোখে পড়ল। আমার চেয়ে খুব বেশি বড় নয় এমন সব তরুণেরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে। কারো হাতে পানির বোতল, কারো হাতে বিস্কুটের প্যাকেট। অপরিচিত একজনের তৃষ্ণা মেটাতে আরেকজন নিজের শেষ সম্বলটুকু বাড়িয়ে দিচ্ছে-এমন ভ্রাতৃত্ব আগে কখনো দেখিনি। হঠাৎ দূর থেকে টিয়ারশেলের শব্দ কানে এলো। বাতাস ভারি হয়ে উঠল ঝাঁঝালো ধোঁয়ায়। চোখের সামনে দেখলাম মিছিলে থাকা একটা ছেলে লুটিয়ে পড়ল। আমার বুকটা কেঁপে উঠল, কিন্তু দমে গেলাম না। ভয় নয়; বরং এক অদ্ভুত জেদ কাজ করতে শুরু করল।

আমি দৌড়ে গিয়ে পাশের দোকান থেকে এক বালতি পানি নিয়ে এলাম। রাস্তার পাশে যারা ধোঁয়ায় শ্বাস নিতে পারছিল না, তাদের চোখে-মুখে পানি ছিটিয়ে দিতে লাগলাম।

রাত যখন নামল, তখন আমি ঘরে ফিরলাম। মা খুব বকাঝকা করলেন, কিন্তু যখন দেখলেন আমার শার্টে ধুলো আর কপালে ঘাম, তখন পরম মমতায় জড়িয়ে ধরলেন। সেই রাতে ঘুমাতে পারিনি। কানে শুধু বাজছিল সেই স্লোগানগুলো-যা অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল। সেই জুলাই আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়াতে হয়। কীভাবে একটা সাধারণ কিশোরও দেশের প্রয়োজনে অসাধারণ হয়ে উঠতে পারে।

আজ যখন পেছনের দিকে তাকাই, তখন গর্ব হয়। জুলাইয়ের সেই উত্তাল দিনগুলো কেবল আন্দোলনের গল্প নয়, তা ছিল এক নতুন স্বপ্ন দেখার গল্প।

ঝিলতুলি, ফরিদপুর সদর, ফরিদপুর

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ