আসছে চাকরি নিতে কতটা প্রস্তুত তুমি?
আইটি কর্নার টি এইচ মাহির নভেম্বর ২০১০
বর্তমানে একটি আতঙ্ক সবখানে ছড়িয়ে পড়েছে-কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হাতে চাকরি হারাতে যাচ্ছে মানুষ। ভবিষ্যতে হয়তো মানুষের বদলে কাজ করবে এআই কিংবা রোবট। মানুষের প্রতিদ্ধন্দ্বী হয়ে উঠছে এআই। প্রতিনিয়ত শক্তিশালী হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জগৎ। এআই দিয়ে তৈরি হচ্ছে ছবি, ভিডিও, গান আরও কত কী! পড়াশোনার কাজেও ব্যবহৃত হচ্ছে। তোমরা হয়তো অনেকেই পড়াশোনার কাজে এআই ব্যবহার করে থাকো। বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর খোঁজা কিংবা জটিল কোনো গাণিতিক সমস্যা সমাধানে এখন এআই ব্যবহার করছে শিক্ষার্থীরা। এআইয়ের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুটো দিকই আছে। নেতিবাচক দিকের একটি হলো, ভবিষ্যতে এআইয়ের হাতে মানুষের চাকরি হারানোর ভয়। অনেক বিশেষজ্ঞ ও প্রযুক্তিবিদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের চাকরি দখল করবে। আবার অনেকের মতে, এআই হবে মানুষের কাজের সহযোগী। তোমরা যারা পড়াশোনা করে বিভিন্ন চাকরির দিকে যাওয়ার চিন্তা করছ; তাদের মনেও হয়তো প্রশ্ন জাগতে পারে, তোমার পছন্দের পেশায় কি ভাগ বসাবে এআই? কিংবা কোন কোন পেশা বিলুপ্ত হতে পারে ভবিষ্যতে। আবার কোন দক্ষতাগুলো এআই যুগেও টিকে থাকবে।
একটা পরিসংখ্যান দিয়ে শুরু করা যাক। ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরামের ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে, ৪১ শতাংশ চাকরির নিয়োগকর্তা এআইয়ের কারণে তাদের কর্মী সংখ্যা কমানোর পরিকল্পনা করছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই সংখ্যাটা আরও বেশি। ৪৮ শতাংশ মার্কিন নিয়োগ কর্তা জানিয়েছেন, তারা কর্মীদের বদলে এআই ব্যবহার করতে চান। তবে এই পরিসংখ্যান ও গবেষণার লেখক টিল লিওপোল্ডের মতে, এই পরিসংখ্যান উদ্বেগজনক নয়। তার মতে, এটি দক্ষতা বৃদ্ধির সমস্যা। কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানোর সাথে আরও ভালোভাবে এআই ব্যবহার করতে চায় ৭৭ শতাংশ নিয়োগকর্তা। তাই নতুন নতুন দক্ষতা-ই হতে পারে নতুন নতুন পেশা বা চাকরির ক্ষেত্র।
হারাতে পারে যেসব পেশা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দখলে নিতে পারে এমন পেশার মধ্যে সবার প্রথমেই আসে ডাটা এন্ট্রি পেশা। বর্তমানে বেশিরভাগ ডাটা এন্ট্রির কাজ সফটওয়্যারের দখলে চলে গেছে। কোম্পানিগুলো ফর্ম এবং ছবি থেকে সরাসরি তথ্য তাদের ডাটাবেসে আনার জন্য মেশিন লার্নিং ও এআই ব্যবহার করে। যার ফলে ত্রুটি অনেক কম থাকে। তাই মানুষের ইনপুট দ্রুত কমে যাচ্ছে এবং এই ধরনের কাজে মানুষের দখল কমে আসছে। এমন আরও অফিসভিত্তিক রুটিনমাফিক কাজ ও নিয়মভিত্তিক কাজ এআই দখল করতে যাচ্ছে। এর মধ্যে গ্রাহক পরিষেবার পেশাও ঝুঁকিতে আছে। তোমরা হয়তো খেয়াল করবে, বর্তমানে অনলাইনে বিভিন্ন ওয়েবসাইট কিংবা অ্যাপভিত্তিক পরিষেবায় গ্রাহকদের সহায়তার জন্য এআই চ্যাটবট ব্যবহার করা হয়। এসব চ্যাটবট গ্রাহকদের সচরাচর জিজ্ঞাসিত বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেয়। যেমন তুমি কোনো অনলাইন শপে পণ্য অর্ডার দিলে, এখন তাদের এআই এজেন্টের সাথে কথা বলে পণ্যটি সম্পর্কে আরও জেনে নিতে পারো কিংবা তোমার অর্ডার সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য জানতে পারো। এ ধরনের গ্রাহক পরিষেবার কাজগুলো এআই করতে পারবে। বহুল প্রচলিত চ্যাটজিপিটির মাতৃপ্রতিষ্ঠান ওপেনএআইয়ের স্যাম অল্টম্যানও মনে করেন, এআই গ্রাহক পরিষেবার পেশাগুলো হারানোর জন্য দায়ী হবে। স্যাম অল্টম্যান আরও উদ্বেগ প্রকাশ করেন ডেভেলপার ও প্রোগ্রামারদের জন্য। তার মতে ডেভেলপার ও প্রোগ্রামারদের অনেক কাজ এআইয়ের হাতে চলে যেতে পারে। বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, এআই নিজেই কোড লিখে দিচ্ছে কিংবা সফটওয়্যার বানিয়ে দিচ্ছে।কল সেন্টার ও ভার্চুয়াল রিসেপশনিস্টের মতো পেশাগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দখলে চলে যেতে পারে। ফ্রন্ট ডেস্ক কণ্ঠস্বরগুলো কৃত্রিম হয়ে যেতে পারে। ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট দিয়ে এখন অনেক কল সেন্টারগুলোতে গ্রাহকদের সেবা দেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে সবাই হয়তো এই যন্ত্রের সাথেই কথা বলবে। যাইহোক, বুঝতেই পারছ এআই কোন ধরনের পেশাগুলো দখল করবে বা করছে। যুক্তরাজ্যের ইনডিডের একটি গবেষণার তথ্যও বলছে একই কথা। তাদের গবেষণা মতে, এআই শিল্পক্ষেত্রে উৎপাদন কাজ যেমন মেশিন পরিচালনা, পণ্য পরিচালনা, পরীক্ষা, প্যাকেজিং, পরীক্ষা ইত্যাদি এবং গ্রাহক পরিষেবা, ইনভেন্টরি ব্যবস্থাপনা, জালিয়াতি বিশ্লেষণের মতো কাজগুলো করতে পারবে। আবার পরিবহণ ও সরবরাহের কাজগুলো করতে পারবে। তোমরা হয়তো জানো, এখন বিভিন্ন দেশে ইকমার্স কোম্পানিগুলো ড্রোন ও স্বায়ত্বশাসিত গাড়ির মাধ্যমে পণ্য সরবরাহ করছে বা হোম ডেলিভারি দিচ্ছে। এতে মানব সংশ্লিষ্ঠতা যেমন কমে আসছে তেমনই সরবরাহ কাজগুলো আরও দ্রুত হচ্ছে। ইনডিডের গবেষণায় আরও যে পেশাগুলোর কথা উঠে এসেছে তার মধ্যে আছে আর্থিক বিশ্লেষণ, হিসাব রক্ষক, ট্রাভেল এজেন্ট, রিয়েল এস্টেট, কর পরিষেবা, অনুবাদকের কাজ। এসব পেশাও ভবিষ্যতে এআই দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে পারে। আবার বিখ্যাত ম্যাগাজিন ফোর্বস ইনডিডের এই তালিকার সাথে যুক্ত করেছে আরও কিছু পেশা। যেমন প্রুফরিডার, প্যারালিগ্যাল বা আইন চুক্তিপত্রবিষয়ক পেশা, গ্রাফিক ডিজাইনার।
টিকে থাকবে যেসব পেশা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হাতেই যে সব পেশা হারিয়ে যাবে এমন নয়। বরং নতুন নতুন পেশা যুক্ত হতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থানেও টিকে থাকবে এমন কিছু পেশার ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন বিখ্যাত ধনকুবের বিল গেটস। তার মতে তিনটি পেশা এআই দ্বারা প্রতিস্থাপন হবে না। এর মধ্যে অন্যতম হলো কোডার বা প্রোগ্রামার, যারা এআই তৈরি করে বা পরিচালনা করে। বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, এআই বিভিন্নভাবে কোড লিখে দিচ্ছে। তাই অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে এআই ভবিষ্যতে প্রোগ্রামার বা কোডারদের চাকরি দখল করবে কিনা। কিন্তু এআই তৈরি করতেও দরকার হয় প্রোগ্রামের। মানুষের বুদ্ধি ছাড়া এআই চলতে পারে না। তাই সব প্রোগ্রামিং পেশা বিলুপ্ত হবে না। বিল গেটসের মতে, এআই পরিচালনার জন্য মানুষের দরকার আছে। তার মতে, আরও দুটি পেশা এআই দখল করবে না। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও জীববিজ্ঞানী। শক্তি বা জ্বালানি খাত এত বিশাল ও জটিল যে, এআই একে পরিচালনা করতে পারবে না।বিল গেটসের মতে, যদিও এআই বিশ্লেষণ ও দক্ষতায় সহায়তা করতে পারে কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সংকট মোকাবিলায় মানুষের প্রয়োজন আছে। আবার জীববিজ্ঞানী ও যারা জীবনের গবেষণা করেন বিশেষ করে চিকিৎসা গবেষণা এবং বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারে এআই প্রতিস্থাপন হতে পারে না। বিল গেটস ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে, জীববিজ্ঞানীরা চিকিৎসার অগ্রগতি এবং জীবনের জটিলতাগুলো বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাবেন, যেখানে এআই প্রতিস্থাপনের পরিবর্তে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে।
বিখ্যাত ম্যাগাজিন ফোর্বস এআই যুগে যেসব পেশা টিকে থাকবে তাদের তালিকা তৈরি করেছে। এর মধ্যে আছে এআইভিত্তিক পেশাগুলো। যেমন : মেশিন লার্নিং ইঞ্জিনিয়াররা, সফটওয়্যার ডেভেলপাররা, তথ্য বিজ্ঞানী, সাইবার নিরাপত্তা প্রকৌশলী ও এআই এজেন্ট ম্যানেজাররা। এআইকে সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য এসব পেশা ভবিষ্যতে আরও বেশি হবে। এআইভিত্তিক চাকরি ছাড়াও শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও ব্যবসাক্ষেত্রে টিকে থাকবে এমন পেশার তালিকাও করেছে ফোর্বস। যেমন : নার্স, সার্জন, সাংবাদিক, শিক্ষক, সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, কোরিওগ্রাফার, প্যারামেডিকস, মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। এসব ক্ষেত্রেও যে এআইয়ের প্রভাব একেবারেই পড়বে না এমন নয়। এসব পেশায় থাকা যে-কোনো ব্যক্তিকে তাদের কাজকে খাপ খাইয়ে নিতে হবে, কাজের আরও জটিল দিকগুলোতে সহায়তা করার জন্য এআইচালিত সরঞ্জাম এবং বুদ্ধিমত্তা অন্তর্ভুক্ত করার উপায় খুঁজে বের করতে হবে।
এআই যুগে দরকার যেসব দক্ষতা
এআই আসছে চাকরি নিতে এমন আতঙ্কে আছে বর্তমানে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীরা। কিন্তু বাস্তবে এআইকে ক্যারিয়ারের শত্রু মনে করার তেমন কারণ নেই। এআই যুগে নতুন নতুন দক্ষতা শিখা জরুরি। প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান আইবিএমের ভাইস প্রেসিডেন্ট জাস্টিনা নিক্সন-সেন্টিল এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘শিক্ষা কখনো থেমে থাকে না। প্রতিনিয়তই একটি নতুন প্রযুক্তি আসছে; এটি আগের চেয়ে অনেক দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। আপনি জানেন, আজ এটি এআই, আগামীকাল এটি কোয়ান্টাম হতে পারে। এআই প্রায় প্রতিটি চাকরির ভূমিকা এবং প্রতিটি শিল্পকে প্রভাবিত করবে।’ তিনি বলেন, ‘যে পেশাই লক্ষ্য হোক না কেন, সবারই নতুন নতুন দক্ষতা শিখা জরুরি।’চলো কিছু দক্ষতা নিয়ে জেনে আসি
অভিযোজনযোগ্যতা : এআই যুগে নতুন নতুন দক্ষতার মধ্যে আছে অভিযোজনযোগ্যতা বা কীভাবে শিখবে তা শেখা। গুগল ডিপমাইন্ডের সিইও ডেমিস হাসাবিস বলেন, ‘যেহেতু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সপ্তাহে সপ্তাহে পরিবর্তিত হচ্ছে, তাই পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা হবে ক্রমাগত শেখার ক্ষমতা। এআই যেহেতু দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, তাই মানুষকে ক্রমাগত এর সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হবে।’সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবন : এআই বিভিন্ন আইডিয়া তৈরি করতে পারে কিন্তু মানুষের উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতার প্রতিলিপি তৈরি করতে পারে না। তাই সৃজনশীল ও উদ্ভাবনী মনোভাব বাড়াতে হবে।
কমিউনিকেশন : যোগাযোগ দক্ষতা বা কমিউনিকেশন স্কিল সব সময় অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এআই যুগে মানুষে মানুষে মিথস্ক্রিয়া আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রোগ্রামিং ও ডেভেলপমেন্ট : নতুন নতুন সফটওয়্যার ও এআই বানাতে প্রোগ্রামিং দক্ষতার আরও বেশি প্রয়োজন। বর্তমানে বিভিন্ন এআই কোম্পানি গড়ে উঠছে। এসব এআই তৈরি ও পরিচালনায় প্রোগ্রামিংয়ে আরও বেশি দক্ষতার দরকার।
প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং ও এআই টুলের ব্যবহার : তোমরা হয়তো দেখেছ, সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকে এআই টুল ব্যবহার করে চমৎকার সব কনটেন্ট তৈরি করছে। এসব টুল ব্যবহারে যে যত বেশি দক্ষ সে তো ততো এগিয়ে থাকবে। বিভিন্ন ধরনের বিভিন্ন কাজের এআই টুল পাওয়া যায়। এসব টুল ব্যবহারের দক্ষতা ও প্রম্পট লেখার দক্ষতা ভবিষ্যতে অনেক বেশি প্রভাব ফেলবে। প্রযুক্তিবিদরা এই দক্ষতাকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
সাইবার নিরাপত্তা : এআই আসার পর সাইবার অপরাধীরা এর অপব্যবহারও শুরু করেছে। তাই সাইবার সিকিউরিটি কর্মীদের আরও নতুন নতুন সুরক্ষা পদ্ধতি দরকার। তাই সাইবার জগতে দক্ষতাও দরকার।
সর্বোপরি, নতুন নতুন যত প্রযুক্তিই আসুক না কেন, আমাদের সেসব প্রযুক্তির সাথে খাপ খেয়ে চলতে হবে। নতুন প্রযুক্তি যেমন পুরোনো অনেক পেশাকে বিলুপ্ত করবে তেমনই নতুন নতুন পেশার দ্বার খুলে দেবে। আর এসব পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে আমাদের দরকার যথেষ্ট দক্ষতা।
আরও পড়ুন...