হলুদ বরণ রোদ
গল্প আহসান হাবিব বুলবুল অক্টোবর ২০২৫
তারা ভরা রাত ও হলুদ বরণ রোদ-ওরা জমজ। সবাই ওদের ছোট্ট করে রাত ও রোদ বলেই ডাকে।
শিহাব উদ্দিন ও হাসনাহেনা দম্পতির প্রথম সন্তান ওরা। আমাদের সমাজে প্রথম সন্তান মেয়ে হলেকেউ কেউ একটু মন ভার করে, বেজার হয়। তাও আবার প্রথমবার জমজ কন্যাসন্তান। সেদিক থেকে শিহাব-হেনা দম্পতি ব্যতিক্রম। তারা খুব খুশি, যারপরনাই আনন্দে আছে। শিহাব স্ত্রীকে বলেন, ‘জানো আমাদের দুটি বেহেশত।’
মিসেস হেনা স্বামীর দিকে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকান।
স্বামী বলেন, ‘এটা কিন্তু হাদিসের কথা। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “যার তিনটি কন্যা সন্তান আছে, সে যদি তাদের লালন-পালন করে, শিক্ষাদীক্ষা দেয় এবং তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করে তবে সে বেহেশত পাবে।”’ তখন লোকজনের মধ্য থেকে একজন বলে উঠল, কারো যদি দুটি কন্যাসন্তান থাকে! রাসূল (সা) বললেন, ‘দুইটি কন্যা সন্তান হলেও।’
মিসেস হেনার দু-চোখে হাসির ঝিলিক খেলে যায়। নাম দুটি এত কাব্যিক হলো কীভাবে। এ প্রশ্ন সবার। হ্যাঁ, তারও একটা কারণ আছে বইকি। দুই বোন জোছনা রাতে জন্মগ্রহণ করে। সে দিনের পূর্ণিমা রাতটা ছিল হলুদ বরণ মিষ্টি রোদের মতো। বাবা ভাবলেন, তাদের মেয়েদের নাম এমন রাখবেন, যাতে সময়কে ধরে রাখা যায়। বাবা একজনের নাম রাখলেন, ‘তারা ভরা রাত’। মা অপরজনের নাম রাখলেন, ‘হলুদ বরণ রোদ’। সেই থেকে ওরা সংক্ষেপে ‘রাত’ ও ‘রোদ’ হয়ে গেল।
বাবা-মাকে খুশি দেখে পরিবারের অন্য সদস্যদের মুখও আনন্দে ভরে উঠল। দাদি তো আকাশের দুখণ্ড চাঁদ হাতে পেলেন। তিনি নাতনিদের নাম রাখলেন, ‘চাঁদ’ ও ‘তারা’। দাদির রাখা নামই পরিবার থেকে পরিবারে চাউর হলো।
দেখতে দেখতে জমজ দুবোন বড়ো হয়ে উঠল। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, ওরা ঢাকার বাসায় এলে রাত ও রোদ হয়ে যায়। আর দেশের বাড়িতে গেলে চাঁদ ও তারা হয়ে যায়।
দাদির কাছে ওরা খুব প্রিয়। আবার ওদের কাছে দাদিও খুব প্রিয়। গ্রামের বাড়িতে গেলে দাদিকে ছেড়ে ওদের আর আসতে ইচ্ছে করে না। কোনো কোনোবার দাদি ওদের সাথেই চলে আসেন। ঢাকার বাসায় বন্দিদশায় দাদির বেশি দিন মন টেকে না। তাই কিছুদিন পরই গ্রামে পাড়ি জমান। যাবার সময় দুই নাতনিকে বুকে জড়িয়ে ধরে নিজে চোখের পানিতে ভাসেন।
রাত ও রোদের ভেতর পার্থক্য করা খুব কঠিন। একমাত্র মা-ই পারেন পার্থক্যটা বুঝতে। বাবাও মাঝেমধ্যে ভুল করে বসেন। আর আগন্তুকরা তো ধরতেই পারেন না, কে রাত আর কে রোদ! কোলে থাকতে দাদি ঠাহর করার জন্য একজনের পায়ের পাতায় কাজলের টিপ দিয়ে রাখতেন।
রাত ও রোদ এখন বড়ো হয়েছে। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। স্কুলে ওদের নিয়ে সবার মধ্যে খুব উৎসুক্য ও আগ্রহ কাজ করে। ওরা বিদ্যালয়জুড়ে সকলের প্রিয়।
মিসেস হেনা অর্থাৎ রাত ও রোদের মা একদিন ভাবলেন, দুই মেয়ের মধ্যে একটু পার্থক্য সূচিত করতে পারলে ভালো হয়। নইলে অনেকেই ভুল করেন। নিজেদেরও অনেক সময় ভুল হয়ে যায়। তাই তিনি ঠিক করেন, রাতের ঠোঁটের নিচে থুতনিতে একটা ‘তিল’ এঁকে রাখবেন। রাতও রাজি হলো। সেই থেকে রাত নিজের থুতনিতে কাজলের কালি দিয়ে একটা ‘তিল’ এঁকে রাখত। তিলের জন্য রাতকে খুব সুন্দর লাগত। রাতের প্রতি সবার মনোযোগ। রাত সবার কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠল। রোদ একটু কষ্ট পেল। কেউ তাকে নিয়ে ভাবছে না। রোদ আবদার জানাল, তিল’টা সে আঁকবে। মা বললেন, ‘তা কেমন করে হয়। রাত তো ইতোমধ্যেই পরিচিত হয়ে উঠেছে তিল নিয়ে। তুমি তিল নিলে তো আবার সব এলোমেলো ও গোলমেলে হয়ে যাবে!’
রোদ ভেতরে ভেতরে খুব অভিমান করল। কিন্তু কাউকে কিছু বুঝতে দিলো না।
রাত ও রোদ কেউ কাউকে ছাড়া বোঝে না; একা থাকতে পারে না। খেলাধুলা, লেখাপড়া, খাওয়াদাওয়া সব একসাথে করা চাই। দুজনের পার্থক্য ধরা যায় কেবলমাত্র একটি তিলের জন্য। হ্যাঁ, একজনের একটি তিল আছে। দাদি খুব খুশি হলেন এই পার্থক্য বিচারে কিন্তু রোদের অভিমানটা কেউ বুঝল না। কারো কাছে গিয়ে পৌঁছাল না। মা কিছুটা হলেও বুঝতেন। বলতেন, তোমরা দুবোনই সুন্দর। যে পরিচয়টা প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, সেটা পালটিয়ে ফেলা ঠিক হবে না। রোদ মায়ের কথায় নীরব সায় দিত। আর রাত তো তিলের জন্য গর্বিত।
মার্চ মাসের মাঝামাঝিতে ঢাকায় শীত অনেকটাই কমে যায়। রাতের বেলার খাওয়াদাওয়া, পড়াশোনা শেষ। এখন শোবার পালা। দুই বোন শুয়ে পড়েছে। মা এসে একটা নকশিকাঁথা ওদের গায়ের ওপর টেনে দেন। ‘রাত’ শুলেই ঘুমিয়ে পড়ে। এটা ওর একটা ভালো অভ্যাস। রোদের কিন্তু ঘুম আসছে না। রাজ্যের যত ভাবনা রোদের মাথায় এসে ভিড় করে। ওর দাদির কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে দাদাভাইয়ের কথা। গ্রামের কথা। চাচাতো ভাই-বোনের কথা। ঈদে বাড়ি গেলে কত-না আনন্দ হয়। ফুফুরা আসেন। ফুপাতো ভাই-বোনদের সাথে কত-না আনন্দ করি। হঠাৎ বৃষ্টি নামলে তো আর কথাই নেই! কত মাখামাখি লুটোপুটি। বৃষ্টিতে ভেজার মজাই আলাদা। আবার কবে বাড়ি যাওয়া হবে। রোদ ভাবে, শিশুবেলায় দাদি যদি আমার পায়ে টিপ দিতেন তবে মা আমাকে তিল পরাতেন।
এ রকম হাজারো চিন্তার বুননে রোদের দু-চোখজুড়ে ঘুম নেমে আসে। ভোরে আজানের সুরে সুরে দুবোন জেগে ওঠে। আজ রাতে রোদ একটা ভালো স্বপ্ন দেখেছে। স্বপ্নের কথা ভেবে ও খুব আনন্দে আছে। সকালে দখিনা বাতায়ন পাশে বসে ও সে কথাই ভাবছে। বসন্তের মৃদু-মন্দ বাতাস দুবোনের চুল ছুঁয়ে যাচ্ছে।
রাত বলল, ‘কী ব্যাপার, আজ তোকে বেশ ফুরফুরে লাগছে। ভালো ঘুম হয়েছে বুঝি?’
রোদ বলল, ‘ভালো একটা স্বপ্ন দেখেছি। সে কথাই ভাবছি। স্বপ্ন যে এত সুন্দর হতে পারে!’
‘তা স্বপ্নটা কী, বল শুনি।’
রোদ স্বপ্নের কথা বলতে চায় না। বলে, ‘স্বপ্নের কথা শুনে কেউ খারাপ মন্তব্য করলে স্বপ্নের তাবির ভালো হয় না।’
রাত কিছুটা আড়মোড়া ভেঙে বলে, ‘ঠিক আছে বাবা, না বললে; তুমি তোমার স্বপ্ন নিয়েই থাকো। আমি যাই আম্মু ডাকছে।’
রোদ যতই বড়ো হচ্ছে, দিন যতই যাচ্ছে, একটা চিহ্ন ততই দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। রোদ হাসলে ওর বাম গালে একটা টোল পড়ে। তখন ওকে অসম্ভব সুন্দর দেখায়। রোদ ভাবে, তাহলে তার স্বপ্ন সত্যি বাস্তব হতে যাচ্ছে। রোদ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়। বিস্মিত হয়। রোদ আল্লাহকে ধন্যবাদ দেয়। শুকরিয়া জানায়। রোদ তার এই সৌন্দর্যের রহস্য কাউকে বলে না। মনে মনে ঠিক করে, বাড়িতে গেলে দাদিকে সে তার স্বপ্ন-সৌন্দর্যের রহস্যের কথা বলবে।
রাত এখন আর কৃত্রিম ‘তিল’ আঁকে না। রোদকে যখন আলাদাভাবে চেনা যায় তখন তিল এঁকে আর কী হবে। তারপরও দুবোনের মধ্যে মিল-মহব্বতের কোনো অভাব নেই।
রাত ও রোদের বাবা ঢাকায় একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করেন। মা গৃহিণী। ওরা দুবোন রাজধানীর একটি ভালো স্কুলে পড়ে। দুবোন সারাদিন অপেক্ষায় থাকে-বিকালে কখন বাবা বাসায় ফিরবেন। সন্ধ্যায় ওদের চায়ের আড্ডা জমবে। ছুটির দিন হলে তো মহাখুশি। বাইরে বেড়াতে যাবার জন্য হইচই পড়ে যায়। বাবা মেয়েদের আবদার ফেলতে পারেন না। বেরিয়ে পড়েন ঘুরতে। কোনো পার্কে। কখনো কোনো রিসোর্টে।
কদিন হলো, রোদের দাদির অসুস্থতার খবর এসেছে। তাই কারো মন ভালো নেই। শিহাব বাড়ি যাওয়ার কথা ভাবছেন। ছুটি পেতে একটু সমস্যা হচ্ছে।
প্রথম খবরটা পেলেন মিসেস হেনা। হাতটা কেঁপে উঠল। ফোনটা রাখলেও সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি। পিপ পিপ শব্দ হচ্ছিল। কিছুক্ষণ পর সংবিৎ ফিরে পেলে রিসিভারটা ঠিক করলেন। এবার ফোন ওঠালেন, ডায়াল করলেন।
‘আসসালামু আলাইকুম।’ শিহাব সম্বোধন করলেন।
‘ওয়া আলাইকুমুস সালাম।’ একটু কাঁপা কণ্ঠে উত্তর দিলেন মিসেস হেনা।
‘কী ব্যাপার, কিছু বলবে!’
‘না তেমন কিছু না; একটু বাসায় এসো।’
‘কেন কী হয়েছে, বলো। রাত-রোদ ওরা...’
‘হ্যাঁ, ওরা ভালো আছে। তুমি একটু শিগগির এসো। আর শোনো, অফিসে বলে এসো, তোমার ছুটি নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।’
শিহাব এবার একটু ভড়কে গেলেন। বললেন, আচ্ছা আসছি। তুমি বাচ্চাদের দিকে খেয়াল রেখো।’
মিসেস হেনা ভাবছেন, একজন সন্তানকে কীভাবে তার মায়ের মৃত্যুর সংবাদ জানাবেন। না! এটা কিছুতেই তার পক্ষে সম্ভব না। রাত ও রোদের বাবা বাসায় এসে পৌঁছেছেন। মেয়েদের কাঁদতে দেখে শিহাবের আর বুঝতে বাকি থাকল না, ভয়াবহ কিছু একটা ঘটেছে।
মিসেস হেনা বললেন, ‘শান্ত হও। ধৈর্য ধরো। আমাদের বাড়ি যেতে হবে। আম্মা অসুস্থ।’
মেয়েরা বাবাকে ধরে বসালেন। তিনি অস্ফুট স্বরে শুধু বললেন, ‘বড্ড দেরি হয়ে গেল!’
ততক্ষণে লাগেজ গুছিয়ে ফেলা হয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের গাড়ি বাড়ির উদ্দেশে ছেড়ে গেল।
তিন দিনের মাথায় শোকের ভার কিছুটা কমল। বাড়িটা আজ একটু হালকা মনে হচ্ছে। রোদ শুধু কেঁদে ফিরছে আর বলছে, ‘দাদিমনিকে আমার স্বপ্নের কথা আর বলা হলো না!’
দাদির খাটের শিথানে একটা চিঠি পাওয়া গেছে। দাদির লেখা। রাত ও রোদকে সম্বোধন করে লেখা।
চাঁদ-তারা,
আমার মিষ্টি দুটো আপু।
তোমরা মন খারাপ করবে না। আব্বু-আম্মুকে ভালোবাসবে। তাদের কথা শুনবে। মন দিয়ে লেখাপড়া করবে। কাউকে কষ্ট দেবে না। তোমরা ছিলে আমার দু-চোখের মণি। তোমরা দুই বোন আমার কবরের পাশে একটি গাছ রোপণ করে দিয়ো। আমি সেই গাছের ছায়ায় থাকব। তোমাদের জন্য আমার অফুরন্ত দোয়া রইল। ভালো থেকো। আল্লাহর রহমত ঘিরে রাখুক তোমাদের। আমার জন্য দোয়া করো।
আজ সারাদিন দাদির এই চিঠির কথা নিয়েই সুখ-দুঃখের একটা আবহ বিরাজ করছিল সারা বাড়িতে।
আরও পড়ুন...