কে হারে কে জেতে
অনুবাদ গল্প জাফর তালুকদার মে ২০২৬
ঝলমলে আকাশ। মেঘ, বৃষ্টি, রোদ যে যার মতো বিশ্রামে মশগুল। শুধু বাতাসের ঘুম নেই। সে কুর কুর করে সবাইকে খুঁচিয়ে মারছে, ‘আমি বিরক্ত। চলো, একটা ঝড় তৈরি করা যাক।’
বজ্র আর বিদ্যুৎ সে-কথায় আমল না দিয়ে বলল, ‘আমরা আগে একবার ওটা করেছি। এখন বাপু দয়া করে যাও তো। আমরা ক্লান্ত।’
‘আপনি তো সব সময়ই ক্লান্ত। আমার মতো শক্তিশালী হলে কথা ছিল। তা আপনার কী খবর বজ্র? কিছু একটা করবেন নাকি?’
‘না’ বজ্রের সোজাসাপ্টা জবাব।
বাতাস এবার একটু চঞ্চল হয়ে গা ঝাড়া দিতেই আকাশের রং পালটে গেল।
বৃষ্টি রীতিমতো বিরক্ত, ‘কী শুরু করলে! একটু থামো তো বাপু। আমরা এখন ঘুমাব।’
বাতাস হাসছে দেখে বৃষ্টি কাতর গলায় বলল, ‘যথেষ্ট হয়েছে। আর কত! তুমি কী একটু বসে থাকতে পারো না?’
‘পারি না, কারণ আমি হলাম তোমার চেয়ে শক্তিশালী।’
বৃষ্টি চোখ বন্ধ করে বিড় বিড় করল, ‘খুব ভালো কথা। আমরা জানি তুমি শক্তিশালী। এবার দয়া করে পথ মাপো।’ বাতাসের কাণ্ডকারখানায় বৃষ্টির ধৈর্য হারানোর অবস্থা।
মুচকি হেসে জবাব দিলো বাতাস, ‘ঠিক আছে। একটা পরীক্ষা হয়ে যাক। দেখি কে বেশি শক্তিশালী?’
এবার বৃষ্টির গলায় বিরক্তি ঝরে পড়ল, ‘আর ঘুমিয়ে কী হবে! বেশ, এসো তাহলে। হয়ে যাক পরীক্ষা। তবে একটা প্রতিজ্ঞা তোমাকে করতে হবে। হেরে গেলে আমাকে দেখলেই কিন্তু পালাতে হবে তোমাকে।’
বাতাস নেচে উঠল আনন্দে, ‘আর তুমি যদি হেরে যাও তাহলে প্রতিজ্ঞা করতে হবে অমন হাপুস কেঁদে মাটিতে চোখের পানি ফেলতে পারবে না।’
বৃষ্টি একটু দ্বিধাগ্রস্ত। এটা একটা কঠিন প্রতিজ্ঞা। যদি হেরে যায় তাহলে গাছপালা, পশুপাখি, ফসল, মানুষ কী করে টিকে থাকবে যদি না সে চোখের পানিতে বৃষ্টি ঝরায় পৃথিবীতে!
বাতাসের ঠোঁট বিদ্রুপে ঝুলে পড়ল, ‘তুমি হারবে বলে ভয় পেয়েছ মনে হচ্ছে।’
‘না, কীসের ভয়! তোমাকে এমন ঠ্যাঙানি দেবো তখন বুঝবে মজা।’
বাতাস উত্তেজনায় হই হই করে উঠল, ‘চলো, চলো, এক্ষুনি পৃথিবীতে যাই।’
বৃষ্টি বাতাসের পেছন পেছন নেমে এলো পৃথিবীতে। তারা দেখল বাঁশগাছের মাথার ওপর একটা বানর বসে আছে। বৃষ্টি বানরকে ইঙ্গিত করে বাতাসকে বলল, ‘ওকে যদি গাছ থেকে ফেলতে পারো তবে জিতে যাবে তুমি।’
বাতাস একটা দমকা তৈরি করে অবজ্ঞার গলায় বলল, ‘এ আর এমন কী! আমি চাইলে হারিকেন, টর্নেডো, টাইফুন সব করে ওটাকে ছিটকে ফেলে দিতে পারি।’
বৃষ্টি নিশ্চিন্ত ছিল এই ভেবে যে বাঁশ বাতাসে বাঁকাতে পারে সত্য, কিন্তু সহজে ভাঙবে না।
বানরটিও মাটিতে না পড়ে ঝুলে থাকবে বাঁশে।
বাস্তবে সেটাই সত্য হলো। বাতাস শোঁ শোঁ করে বয়ে গেলেও বানরটাকে সামনে-পেছনে দোলানো ছাড়া আর কিছু করতে পারল না।
ঘণ্টাখানেক লেগে থেকে বাতাস হাল ছেড়ে বলল, ‘না, পারা গেল না। তুমিও কিছু করতে পারবে বলে মনে হয় না। আসলে এই প্রতিযোগিতায় আমরা কেউই জিততে পারব না!’
দেখতে দেখতে আকাশ কালো হয়ে বৃষ্টি ঝরতে শুরু করল। অবিরল বৃষ্টিধারা বয়ে চলল বাঁশঝাড়ের ওপর।
বৃষ্টি গম্ভীর গলায় বলল, ‘একটু অপেক্ষা করো। ওই যে পুবালি বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল।’
বৃষ্টির তোড়ে চোখ ছানাবড়া হয়ে মাটিতে আছড়ে পড়ল বানর। একটা বড় পাতা দিয়ে সে বৃথা চেষ্টা করছিল মাথা ঢাকতে।
বৃষ্টি উত্তেজনায় চিৎকার দিয়ে উঠল, ‘আমি জিতেছি। এবার তোমার শাস্তির পালা।’
বাতাস ভয়ে লজ্জায় বিচলিত হয়ে মুখ ঘুরিয়ে উড়ে গেল। সে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, যদি আজকে হেরে যায় তবে বৃষ্টি দেখলেই পালিয়ে যাবে সামনে থেকে।
এরপর থেকে বাতাস যখনই উথাল পাথাল বইতে শুরু করে মানুষ দোয়া করে বৃষ্টির জন্য। বৃষ্টি নামলেই ভয়ে পালিয়ে যায় বাতাস।
আরও পড়ুন...