জার্সি
জুলাই-নিবন্ধ আহমেদ বায়েজীদ আগস্ট ২০২৫
সেন্টার সার্কেলের মধ্যে বাপ্পীর পায়ে বল আসতেই দৌড় শুরু করল লেফট উইঙ্গার রোহান। একদম সোজা দৌড়ে চলল প্রতিপক্ষের সীমানার দিকে। যেন আগে থেকেই জানে বাপ্পী বলটা ওকেই দেবে। লম্বা পাসে বাপ্পী বলটা সেদিকেই বাড়িয়ে দিলো। রোহানের থেকে আরও সামনে। দৌড়ে বলটা ঠিক ধরে ফেলল রোহান। প্রতিপক্ষের রাইট ব্যাক ওর পেছন পেছন ছুটলেও তার আর কিছুই করার ছিল না।
ক্ষিপ্রগতিতে বলটা থামিয়েই ডান দিকে ঘুরল রোহান। ডি-বক্সের দিকে কয়েক পা এগিয়ে যেতেই প্রতিপক্ষের সেন্টার ব্যাক এগিয়ে এলো ওকে আটকাতে; কিন্তু দৌড়ের ওপর থাকা রোহান তাকে সহজেই ডজ দিলো। বাম দিকে ঝুঁকে ডি-বক্সে ঢোকার ভান করেও আবার উলটো দিক দিয়ে বেরিয়ে গেল বল নিয়ে। সেন্টার ব্যাক ধোঁকা খেয়ে আবার যতক্ষণে ঘুরে দাঁড়াল ততক্ষণে বল নিয়ে ডি-বক্সের ঠিক মাথায় পৌঁছে গেল রোহান। ওর সামনে এখন শুধুই গোলরক্ষক। দর্শকদের মাঝ থেকে হই হই রব উঠল। ম্যাচ শেষ হতে বাকি আর মিনিট পাঁচেক। এই সময়ে গোল করতে পারলে সেই গোল শোধ করা প্রতিপক্ষের জন্য কঠিন হবে।
গায়ের সবটুকু জোর খাটিয়ে ডান পায়ে কিক নিল রোহান; কিন্তু বিধি বাম! শেষ মুহূর্তে বলটা কিছুটা লাফিয়ে ওঠায় কিকটা লাগল বলের তলায়। ক্রসবারের অন্তত পাঁচ ফুট ওপর দিয়ে উড়ে চলে গেল মাঠের বাইরে। দর্শকরা হতাশায় কেউ ‘ইস... রে...’, কেউ ‘এইডা কী করলি রোহান!’ বলে চিৎকার করে উঠল। বলের দিকে চেয়ে রইল রোহান। মাথায় হাত দেওয়া ছাড়া করার কিছুই ছিল না। শটটা এতটাই উঁচুতে উঠেছে যে গোলপোস্টের পেছনে থাকা টিনশেড বাড়িটার ওপর দিয়ে ওই পাশের তিনতলা বিল্ডিংয়ের বারান্দার গ্রিলে গিয়ে লেগেছে। দর্শকদের মধ্য থেকে কে যেন বলে উঠল, চান্দে পাঠাইতে চাস!
রেফারির হুইসেলে টনক নড়ল রোহানের। রেফারি ফয়েজ ভাই ওকে আঙুল তুলে বলের লোকেশন দেখিয়ে দিচ্ছেন বারবার। রোহানের মনে পড়ল, বলটা ওকেই আনতে যেতে হবে। মহল্লার মাঠে এমনই নিয়ম। টিনশেড বাড়ির পেছনে কেউ বল মারলে তাকেই আনতে যেতে হয়। তা ছাড়া প্রতিপক্ষের গোলরক্ষক মহল্লার সিনিয়র তামিম ভাই। তাকে আনতে বলতেও পারছে না। সময় নষ্ট না করে তাই দৌড় দিলো রোহান। যাওয়ার আগে হাতের ইশারায় রেফারিকে ‘দাঁড়ান আনতাছি’ ভঙ্গি করল।
গোলের এমন এমন সুযোগ ম্যাচে এক-দুবারই আসে। এমন জমজমাট ম্যাচে সেটা মিস করলে কোনো অজুহাত দেওয়ার সুযোগ থাকে না। আজকের এই ম্যাচে রোহানের পায়ের দিকেই তাকিয়েছিল ‘জেন-জি স্টারস’। প্রতিপক্ষ মহল্লার সিনিয়র ভাইদের দল ‘ইয়াং বয়েজ’। বরাবরই তাদের সাথে সমান তালে ফাইট দিয়েছে রোহানের টিম। ওরা সবাই স্কুল স্টুডেন্ট। সিনিয়ররা কেউ কলেজ, কেউ ভার্সিটির ছাত্র। আগের দুই ম্যাচে দুই দল একটা করে জেতায় এই ম্যাচ পরিণত হয়েছে ফাইনালে। মহল্লায় গত এক মাস ধরে এই ফুটবল সিরিজ নিয়ে টানটান উত্তেজনা। আজকের ফাইনালে তাই দর্শকসংখ্যাও ছিল বেশ। সবাই অপেক্ষায় আছে বল কখন আসবে। কেউ কেউ দ্বিতীয় বল না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করল।
মিনিট দশেক পর মাঠের উত্তর-পূর্ব কোনা দিয়ে ঢুকল রোহান। হাতে বল নেই। গায়ের জার্সিটা একপাশে গলার কাছে ছেঁড়া, অনেকখানি ঝুলে আছে ছেঁড়া অংশ। চেহারা বিধ্বস্ত। খালি হাতে আসতে দেখে বাপ্পী এগিয়ে গেল, কী রে বল কই! তোর জার্সি ছেঁড়া ক্যান?
একটা পোলা মারছে আমারে। আস্তে করে বলল রোহান। ততক্ষণে আশপাশে আরও কয়েকজন এসেছে। তারাও শুনল রোহানের কথাটা।
বাপ্পী বলল, কস কী! তোরে মারছে কেডা? আর মারবে ক্যান, বল বিল্ডিংয়ে লাগছে তাই?
জানি না। একটা পোলা আমারে দেইখাই ঝাপাইয়া পড়ছে।
চল তো দেহি পোলাডা কেডা? এত বড়ো সাহস! বলেই হাঁটতে শুরু করে বাপ্পী। ওর পিছু নেয় রোহান। একজন গিয়ে প্রতিপক্ষ টিমের সিনিয়রদের খবরটা দিলো। ‘চল... সবাই চল’ বলে কে যেন হাঁক দেয়। খেলোয়াড়-দর্শক মিলে প্রায় পঞ্চাশজনের একটা দল বাপ্পী আর রোহানের পিছু পিছু ওই বিল্ডিংয়ের দিকে চলতে শুরু করে। কিছু ছেলে উত্তেজিত হয়ে হই হই করে ওঠে। সিনিয়র টিমের কয়েকজন বড়ো ভাই সবাইকে শান্ত থাকার নির্দেশ করে নিজেরা বিষয়টা দেখবে বলে জানায়; কিন্তু তাতে খুব একটা কাজ হয় না। বিল্ডিংটার সামনে হাজির হয়ে হাঁক ডাক শুরু করে অনেকে। কেউ কলাপসিবল গেট ধরে ঝাঁকাতে থাকে। মহল্লার আরও অনেক মানুষ জমে যায় বাড়িটার সামনে।
কতক্ষণ পর সেই বিল্ডিংয়ের নিচতলার একটা বাসা থেকে একজন লোক বেরিয়ে আসেন। বয়স পঞ্চাশের কোটায়। লুঙ্গি পরা, গায়ে হাফ শার্ট। মোটা গোঁফ, ভারী মুখমণ্ডল কিন্তু চেহারা মলিন। তাকে দেখেই রোহান বলে ওঠে, এই লোকটাই ওই পোলাডারে ছাড়াইয়া নিসে।
পাশ থেকে কে যেন বলে ওঠে, কই পোলাডা, ওরে ডাকেন। কত্ত বড়ো সাহস মহল্লার পোলাপানের গায়ে হাত দিসে!
লোকটা এসে কলাপসিবল গেট খুলে হাত তুলে সবাইকে থামতে বলেন। তারপর ধীর গলায় বলেন, বাবারা, তোমরা কেন এসেছ আমি জানি। আমার ছেলেটা তোমাদের একজনের সাথে অন্যায় করছে; কিন্তু বিশ্বাস করো, ও সুস্থ না। সুস্থ থাকলে এই কাজ করত না।
রেফারি ফয়েজ ভাই বললেন, তাই বলে মহল্লার ছেলেদের গায়ে হাত তুলবে!
রোহানকে দেখিয়ে লোকটি বললেন, আমার ছেলে তো ওকে চেনে না। ওর সাথে কোনো শত্রুতা নাই। তাহলে মারবে কেন বলো? আসলে ওর গায়ে ফুটবলের জার্সি দেখেই আমার ছেলেটা উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল। ও সুস্থ নয়, ওর চিকিৎসা চলছে। তোমরা ওকে ক্ষমা করে দাও। বলতে বলতে কাঁদতে শুরু করেন তিনি।
ছেলেরা সবাই চুপ হয়ে গেল লোকটির কথা শুনে। কয়েক সেকেন্ড কেউ কোনো কথা বলল না। সিনিয়র টিমের অধিনায়ক জামিল ভাই বললেন, আঙ্কেল, আমরা বুঝতে পারিনি। আপনি কাঁদবেন না। কী হয়েছে আপনার ছেলের? আর ও জার্সি দেখেই বা উত্তেজিত হলো কেন?
সেটা অনেক বড়ো ইতিহাস, বাবা। আমার ছেলেটাও তোমাদের মতো ফুটবল খেলত। ওর নাম মাহি। শুধু খেলতই না, বড়ো ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখত। আমরা যে শহরে থাকতাম সেখানে একটা অ্যাকাডেমিতে প্র্যাকটিস করত। অনূর্ধ্ব-১৫ জেলা দলে সুযোগও পেয়েছিল; কিন্তু এখন আমরা ঢাকায় চলে এসেছি ওর চিকিৎসার জন্য। ওর জীবনে অনেক বড়ো একটা ট্র্যাজেডি ঘটে গেছে, যার ধাক্কাটা সইতে পারেনি। বললেন তিনি।
কী এমন ঘটেছে ওর জীবনে আঙ্কেল, কেন বন্ধ হলো মাহির ফুটবল খেলা? এতক্ষণ পর কথা বলল রোহান।
রোহানের দিকে তাকালেন মাহির বাবা। ওর মাথায় আদরমাখা হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, গত বছরের ঠিক এই সময়ের গণআন্দোলনের কথা তো তোমরা জানো। সারা দেশের মতো আমাদের শহরেও ছাত্ররা রাস্তায় নেমেছিল বৈষম্য দূর করে ইনসাফের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে।
রেফারি ফয়েজ ভাই বললেন, হ্যাঁ, আমরাও সেই আন্দোলনে অংশ নিয়েছি। আমাদের বন্ধু শাকিলের গায়ে গুলিও লেগেছে।
মাহির বাবা আবার বলেন, মাহি শুরুতে কয়েক দিন মিছিলে যাওয়ার জন্য বায়না ধরেছিল; কিন্তু আমরা যেতে দিইনি। বিশেষ করে ওর মা একমাত্র ছেলেকে সারাক্ষণ আগলে রাখেন। তিনিই বাধা দিতেন; কিন্তু যখন বিভিন্ন শহর থেকে ছাত্রদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণের খবর আসতে থাকে, একের পর এক শহীদ হওয়ার খবর আসতে থাকে তখন মাহি বাসার মধ্যে ছটফট করতে শুরু করে। প্রতিদিন মিছিলে যাওয়ার আবদার করে। সারাক্ষণ টিভিতে, মোবাইল ফোনে আন্দোলনের আপডেট দেখে। এর ওর কাছে ফোন করে খবর নেয়। এর মধ্যে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন রূপ নেয় স্বৈরাচার পতনের আন্দোলনে। ছাত্রদের ডাকে সাড়া দিয়ে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। তেমন উত্তাল সময়ে একদিন বন্ধু জিমিকে নিয়ে বাসায় আসে মাহি। আমাদের বলে, আব্বু, জিমির বাসা থেকে অনুমতি দিয়েছে মিছিলে যাওয়ার। আমাদের ভাইদের গুলি করে মারা হচ্ছে, আমিও মিছিলে যাব। তুমি আমাকে যেতে দাও।
মাহির বাবা আবার বলেন, জিমি ছিল ওর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু। দুজনে একসাথে ফুটবল খেলত। একই স্কুলে ক্লাস নাইনে পড়ত। জিমি যাবে শুনে মাহিকেও আর আটকাতে পারলাম না। দুপুরে খাওয়ার পর দুই বন্ধু একসাথে বেরিয়ে গেল। সেদিন ছিল আগস্টের ৩ তারিখ। সারা দেশের মতো আমাদের শহরও তখন উত্তাল। চারদিক থেকে শাহাদাতের খবর আসছে। হাসপাতালে লাশের সারি দীর্ঘ হচ্ছে। আসরের পর অপরিচিত একটা নম্বর থেকে কল দিয়ে মাহি জানায়, জিমির গায়ে গুলি লেগেছে। ওকে সদর হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে। আমি দৌড়ে হাসপাতালে গেলাম। গিয়ে দেখি বন্ধুর লাশের পাশে দাঁড়িয়ে আছে মাহি। শান্ত, চুপচাপ। আমাকে দেখে শুধু বলল, বাবা, জিমি মরে গেছে। দুজনের গায়ে একই ডিজাইনের জার্সি ছিল সেদিন। জিমির জার্সি রক্তে ভেজা। মাহির গায়েও রক্ত লেগে আছে। সপ্তাহখানেক আগে একসাথে ওই জার্সি কিনেছিল ওরা। সেটা পরেই মিছিলে যায় দুই বন্ধু। হাসপাতালের মেঝেতে তখন গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদছেন জিমির বাবা-মা। এর মধ্যে কারফিউ জারির খবর আসে। জিমির দুয়েকজন আত্মীয় আসার পর আমরা লাশ নিয়ে দ্রুত চলে আসি। পুলিশ ও স্থানীয় গুন্ডাদের চাপে দ্রুত দাফন করা হয়।
এটুকু বলে থামলেন মাহির বাবা। দুই চোখ দিয়ে পানি পড়ছে তার। সামনে থাকা ছেলেদেরও অনেকের চোখে পানি এসে গেছে। জামিল ভাই বললেন, তারপর কী হলো, আঙ্কেল? মাহি কবে থেকে অসুস্থ হলো?
সেদিন থেকেই মাহি একদম চুপচাপ। কোনো কথা বলেনি, কাঁদেওনি। আমরা ভাবলাম বন্ধুর শোকে এমন হচ্ছে; কিন্তু যখন স্বৈরচার পতন হলো, আমরা সবাই উল্লাস করলাম তখনও ওর মধ্যে কোনো ভাবান্তর নেই। আমাদের সন্দেহ হলো। দেশের পরিস্থিতি শান্ত হলে ডাক্তারের কাছে নিলাম। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ডাক্তার বললেন, প্রচণ্ড মানসিক আঘাত পেয়েছে। এরপর মাহি ক্রমশই অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করে। বাসায় থাকা ওর জার্সিগুলো দেখলেই উত্তেজিত হয়ে পড়ত। জার্সিগুলো টেনে ছিঁড়ে ফেলত। ডাক্তারের পরামর্শে আমরা জার্সিসহ সব খেলার সরঞ্জাম ওর চোখের আড়ালে রাখলাম। কয়েক মাস হলো আমরা ঢাকায় এসেছি ওর উন্নত চিকিৎসার জন্য। এমনিতে সারাদিন চুপচাপ থাকে; কিন্তু কারো গায়ে ফুটবলের জার্সি দেখলেই উত্তেজিত হয়ে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। জার্সি ছিঁড়ে ফেলতে চায়।
একটানা এটুকু বলে থামলেন মাহির বাবা। ছেলেরা সবাই চুপচাপ। সবার চোখে পানি। জামিল ভাই দুই হাত দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বললেন, কাঁদবেন না, আঙ্কেল। প্রিয় বন্ধুকে হারিয়ে মাহি যে শোক পেয়েছে, সেটা ও সইতে পারেনি। আশা করি, ও আবার সুস্থ হয়ে উঠবে। আবার ফুটবল খেলবে। আমরা দুঃখিত, না জেনে ওর ওপর রাগ করেছিলাম।
আর কিছু না বলে মাহির বাবা বাসার ভেতরে চলে গেলেন। জামিল ভাই নিজের গায়ের জার্সিটা খুলে হাতে নিয়ে মাথা নিচু করে মাঠের দিকে হাঁটতে শুরু করলেন। চোখ থেকে পানি ঝরছে। তার দেখাদেখি অন্যরাও যার যার জার্সি খুলে ফেলল। পশ্চিম আকাশে সূর্যটা তখন ডুবতে শুরু করেছে।
আরও পড়ুন...