লাল আজাদির গল্প

কুরআনের আলো বিলাল হোসাইন নূরী আগস্ট ২০২৬

না, নাফিসের চোখে আজ কোনোমতেই ঘুম আসছে না।

রাত বাড়ছে। বাইরে থেকে মাঝেমধ্যে দূরের শব্দ ভেসে আসছে। বিকট। গুলির শব্দ কিনা বুঝতে পারছে না। তবে গুলিই হবে। কারণ এখন তো এসবই চলছে। এ যেন মানুষ হত্যার মৌসুম।

বিছানা থেকে উঠে জানালার পাশে এসে দাঁড়াল নাফিস। বুকটা ধুকপুক করছে। ঢাকার আকাশে আলো-আঁধারির খেলা। রাস্তাগুলো ফাঁকা। কিন্তু ফাঁকা হলেও তারা যেন কারও জন্য অপেক্ষা করছে। অপেক্ষা করছে-কখন নামবে মুক্তিকামী মানুষের ঢল। যেন তারা বলছে-‘সূর্য ওঠার কত দেরি, কত দেরি!’ নাফিস জানে না-আগামীকাল কী হবে। তবে কিছু একটা যে হবে-এ কথা বলাই যায়!

এক মাস ধরে চলা অবিরাম জুলুম ও খুনের চিত্র নাফিসের কল্পনাকেও হার মানায়। সরকার তার নিজ দেশের নাগরিকদের পাখির মতো মারছে। শিশুদের মারছে। নারীদের মারছে। নাফিসের দু-চোখে অশ্রু আর কণ্ঠে অস্ফুট বেদনার সুর-

‘কোন‌ আঁধারে লাশ হয়েছে আমার বাংলাদেশ-

কোন‌ আঁধারে নাশ হয়েছে আমার বাংলাদেশ?’

না, এখন আর কাঁদলে হবে না। একটু ঘুমাতে হবে। রাত পোহালেই নামতে হবে রাজপথে। কিন্তু ঘুমের মধ্যেও সেই একই দৃশ্য। বন্ধু জুবায়ের এসে হাজির। তারা একসাথে পড়েছে, একসাথে স্বপ্ন দেখেছে। রাজপথেও নেমেছে একসাথে। কিন্তু গুলিটা খেয়েছে সে একাই। তারপর? তারপর সে নাই হয়ে গেল। নাই নাই নাই! নাফিস বলল-ভাই! তোমার খুনের বদলা নিতেই আগামীকাল নামছি মিছিলে। বাঁচা-মরার শেষ সংগ্রামে!

৫ আগস্ট! ভোররাত। ফজরের আজান হয়নি এখনও। মা বললেন-নাফিস! ওঠ! যেভাবে ঈদের দিন মা ঘুম থেকে ডেকে দেন। তবে মায়ের গলা আজ অন্যরকম। সাহসে দৃপ্ত। এ কি কোনো নতুন ঈদের পূর্বাভাস? তাকে জাগিয়ে মা দাঁড়ালেন জায়নামাজে। তাহাজ্জুদের দীর্ঘ সিজদায় কান্নার তরঙ্গ উঠেছে যেন। বাবা ঘরে পায়চারি করছেন। একটু পরপর তিনি চিৎকার করে বলছেন-ইয়া আল্লাহ!

সকালের আলো ফোটার আগেই সবাই বেরিয়ে পড়ল। নাফিস। মা। বাবা। লাখ লাখ মানুষ তখন দখল করে নিয়েছে ঢাকা। ঢাকার প্রতিটি অলিগলি। সবার যাত্রা গণভবনের দিকে। খুনির পতন ছাড়া আজ আর কেউ ঘরে ফিরবে না। সবার কণ্ঠে বজ্রের দৃঢ়তা। চোখে-মুখে শহীদি তামান্নার স্ফুলিঙ্গ।

দুপুর গড়াতে না গড়াতেই খবর এলো-হাসিনা পালিয়েছে!

এই একটি খবরের জন্য মানুষ অপেক্ষা করেছে বছরের পর বছর। আলহামদুলিল্লাহ! নাফিসের মনে পড়ল আল্লাহর বাণী-“বলো, সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে। নিশ্চয়ই মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল” [সূরা বনি ইসরাইল : ৮১]

পথে পথে আজও লাশ পড়ে আছে। তবু চারদিকে পতাকা উড়ছে। লাল-সবুজ। সেই চিরচেনা রং কিন্তু আজকে যেন আরও সুন্দর। 

যুগে যুগে এভাবেই বাতাসে উড়তে থাকে লাল টুকটুক আজাদির গল্প!

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ