লাল জুলাই

জুলাই-গল্প হেলাল আনওয়ার জুলাই ২০২৬

অন্য দিনের মতো যথারীতি সেদিনও বইয়ের ব্যাগ কাঁধে বেরিয়ে পড়ে মাহিম। নবম শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগে পড়ে সে। লেখাপড়ায় খুব ভালো। অল্প দিনের মধ্যেই সব স্যারদের কাছে সে পরিচিতি লাভ করেছে। সবাই তাকে বেশ আদর আর স্নেহ করে।

বিজ্ঞানের ছাত্র মানে তার আর অন্য কোনো দিকে তাকানোর সুযোগ থাকে না। স্কুল শেষে বাড়ি। তারপর গোসল খাওয়া সেরেই আবার প্রাইভেটের প্রস্তুতি। সেই সাথে হোমওয়ার্ক। সব মিলিয়ে ভীষণ ব্যস্ত থাকতে হয়।

গতদিনে স্কুল থেকে ফেরার পথে লিজা কি একটা বলবে বলে জানিয়েছিল। অবশ্য শোনার মতো সময় তখন একদমই ছিল না। ওর তাতে মন খারাপ হয়ে গেল। তাই কাল শুনব বলে ওকে অভয় দিয়েছিলাম।

লিজার কথাটা শোনা হয়নি বলে মাহিমেরও মন খুব খারাপ। আসলে লিজার কথাটা শুনতে হতো। ওর চোখে মুখে কেমন বিষণœতা ছিল। দুশ্চিন্তায় ওর মুখ বড় ফ্যাকাশে দেখাচ্ছিল। চোখে ছিল হতাশা আর অসহায়ত্ব।

মাহিম ভাবল, আজ ওর কথাটা আগেই শুনতে হবে। ও কী বলতে চায়। আর কেনইবা ও চিন্তিত। সত্যি বলতে লিজার দিকে চেয়ে আমারও খুব খারাপ লাগছিল।

বাসা থেকে বেরিয়ে কিছুদূর যেতে না যেতেই দেখতে পেল সমস্ত রাস্তাজুড়ে মানুষ আর মানুষ। বিশেষ করে স্কুল, কলেজ, মাদরাসা আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা সব রাস্তায় নেমে এসেছে। সেই সাথে সাধারণ মানুষও। সবার চোখে মুখে সাহসের ফুলকি। ওরা সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। ওদের দাবি সন্ত্রাসমুক্ত শিক্ষাঙ্গন, দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ। যেখানে কোনো বৈষম্য থাকবে না। সবাই যেন এই দাবির পক্ষে একাট্টা হয়ে গেছে।

এত মানুষ। মাহিম আগে কখনো এত ভিড়-ভাট্টা দেখেনি। সবাই স্লোগান দিচ্ছে ক্লান্তিহীন। দিল্লি না ঢাকা-ঢাকা, ঢাকা। কোটা না মেধা-মেধা মেধা। মরব তবু হারব না-রাজপথ ছাড়ব না। আরও কত রকমের স্লোগানে মুখরিত রাজপথ। সবার মাঝে ভাঙনের সুর। নতুন করে গড়ার স্বপ্ন। এবং কলুষমুক্ত সমাজ গড়ার অঙ্গীকার।

মাহিমের রিকশা আর এগোতে পারে না। এত ভিড় ঠেলে কীভাবে সামনে যাবে? রিকশাওয়ালা ইতস্তত করতে থাকে। মাহিম তাকে একটু সাইড করে দাঁড়াতে বলে। সে অবাক হয়ে যায়। চারদিকে কেবল মানুষ আর মানুষ। রাস্তার ওপর যেন তিল ধারনের জায়গা নেই। গুলির শব্দে মাঝে মধ্যে কাঁপিয়ে তুলছে চারপাশ। তবু তাতে কারোর বুকে ভয় ডর নেই।

মাহিম রিকশা থেকে নেমে ভিড় ঠেলে সামনে যাবার চেষ্টা করে। কী কোলাহল, চিৎকার। মাঝে মাঝে এলোপাতাড়ি গুলির শব্দ। আসল ঘটনা কী মাহিম তখনও বুঝতে পারেনি। পাশ থেকে আধাবয়সি একজন মানুষ পাগলের মতো কেবল জোরে জোরে বিরতিহীনভাবে কথা বলে যাচ্ছেন। মাহিম তাঁর পাশে দাঁড়াল। একটু বামে এগিয়ে লোকটাকে জিজ্ঞেস করল, মামা ঘটনা কী? 

-ঘটনা-? আর শুনো না, বাবা।

-কেন?

-মানে এই যে মিছিল হচ্ছে না?

-হ্যাঁ, কিন্তু কীসের জন্য এই মিছিল?

-মন দিয়ে শোনো। ওরা কী স্লোগান দিচ্ছে। তাহলে ঠিকঠাক বুঝতে পারবে।

-তাতো শুনলাম, মামা। কিন্তু বুঝতে পারলাম না তো।

-ও তোমরা বুঝবে না। আর একটু বড় হলে বুঝবে।

মাহিম ফিক করে হেসে ওঠে। আমরা বুঝব না। অথচ, সামনে যাদের দেখছি তারা তো আমাদের বয়সেরই। মুরুব্বির সাথে অহেতুক কথা না বাড়িয়ে ভিড় ঠেলে মাহিম সামনে হাঁটতে থাকে। তার মাথায় আর কোনো চিন্তা নেই। নেই বাড়ি ফেরার কোনো তাড়া। কিছুদূর যেতে না যেতেই হঠাৎ মাহিম থমকে দাঁড়াল। আজব তো। তারই স্কুলের ছেলেমেয়েরা, মানে তার সহপাঠীরা হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। তারা চায় নতুন বাংলাদেশ। যেখানে থাকবে মানুষের বাকস্বাধীনতা। মতামত প্রকাশের সুযোগ। গুম, খুন, আয়নাঘর কিছুই থাকবে না।

মাহিম আস্তে করে ওদের সাথে দাঁড়িয়ে গেল। লুবাবা, হিরা, রিনা ওরা সকলেই মাহিমকে দেখে এগিয়ে এলো। লুবার হাতের প্ল্যাকার্ডটি মাহিমকে ধরিয়ে দিয়ে বলল, তুমি এখানে দাঁড়াও। মাহিম প্ল্যাকার্ড হাতে এদিক-ওদিক তাকাতে থাকে। মনে মনে লিজাকে তালাশ করে। হঠাৎ দেখতে পেল একটু দূরেই লিজা দাঁড়িয়ে আছে। ওর হাতেও একটি ব্যানার। তাতে লেখা-উই ওয়ান্ট জাস্টিস। পাশেই হীরা। ওর হাতের প্ল্যাকার্ডে লেখা-আবু সাঈদ মুগ্ধ, শেষ হয়নি যুদ্ধ। এভাবে সবার হাতেই ব্যানার শোভা পাচ্ছিল। মাহিম বুঝতে পারল আসার সময় মা কেন তাকে অতিরিক্ত সতর্ক করেছিলেন।

মা’র কথা মনে হতেই মাহিমের মনটা চঞ্চল হয়ে ওঠে। নিশ্চয় মা আমার জন্য অনেক চিন্তা করছেন। তা করুক। তবু আমার কর্তব্য আমি পালন করব। তাতে যা হবার হবে।

খুব অল্প সময়ের মধ্যে শাহবাগ যেন জনসমুদ্রে পরিণত হয়ে ওঠে। গগনবিদারী চিৎকারে সবার কণ্ঠে ধ্বনিত হয় “উই ওয়ান্ট জাস্টিট” মরব তবু হারব না, রাজপথ ছাড়ব না। ফ্যাসিবাদের দোসর যারা, বাংলা ছেড়ে পালা তারা। দিয়েছি তো রক্ত, আরও দিবো রক্ত। রক্তের বন্যায়, ভেসে যাবে অন্যায়।

মাহিম যতই এগিয়ে যায় ততই তার মনের অবস্থা পরিবর্তন হতে থাকে। ভাবে, এরা কেন রাজপথে। এরা কেন জীবন দিচ্ছে, রক্ত দিচ্ছে, এমনকি হাসি মুখে পঙ্গুত্ব বরণ করছে, এদের দাবি কি মেনে নেওয়ার মতো নয়? তাহলে মানছে না কেন সরকার? নাকি অন্য কোনো বিষয় আছে? যারা দেশকে ভালোবাসে, দেশের ভালো চায় তারা তো এমন জালিমের মতো হতে পারে না।

উত্তপ্ত রাজপথ। যেকোনো সময়ে যেকোনো দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। তবু তা মাথায় না নিয়ে দেশের এবং জাতির মুক্তির জন্য মাহিমেরা এখন রাজপথে সিসাঢালা প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে গেছে। দেশের তরুণ সমাজ, নারী-পরুষ, শিশু-বৃদ্ধ যখন পথে নেমে যায় তখন বিজয় অনিবার্য। তার ঠেকিয়ে দেবার কোনো নজির নেই। অন্তত ইতিহাস তাই বলে। সাতচল্লিশ, বায়ান্ন, উনসত্তর, একাত্তর, নব্বইয়ের গণআন্দোলন তাই প্রমাণ করে। আর চব্বিশের আন্দোলন তো আরও ভয়াবহ। দেশের দামাল ছেলেরা যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করছে তাতে, বিজয় না এসে পারে না।

ওরা রক্ত দিচ্ছে, পঙ্গুত্ব বরণ করছে তবু নির্ভয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে।

সব বাধাবিঘœ পার করে সাহসের সাথে ওরা স্লোগানে স্লোগানে মুখর করে রাখে রাজপথ। পুলিশের বাধা তার সাথে দলীয় গুন্ডাদের বেপরোয়া আগ্রাসী মনোভাব। তবুও তাতে পরোয়া নেই। হাজারো মাহিম, হাজারো যুবক জীবন দেবার জন্য তৈরি হয়ে আছে।

লিজা ধীরে ধীরে মাহিমের দিকে এগিয়ে এলো। আলতো হেসে ফিসফিস করে বলল, মহিম তোমার কী মনে হয়ে আমরা হেরে যাব?

মহিম শক্ত ও দৃঢ়ভাবে বলল, না, আমরা হারতে আসিনি। আমরা হারতে জানি না। কোনো অন্যায়ের কাছে আমরা মাথা নত করব না।

আমারও বিশ্বাস আমরা হারব না। জিতব ইনশাআল্লাহ। মাহিম লিজার দিকে একপলক তাকিয়ে বলল, স্বৈরাচার যত বড় শক্তিশালী হোক না কেন, পরাজিত হবেই হবে। কেননা, সত্যের বিজয় অবধারিত। আর মিথ্যার ক্ষয়ও নিশ্চিত। এই দেখো ফ্যাসিস্টরা আঘাত করেছে বলে মাহিমেরা আজ বজ্র কঠিন। ভয়ভীতি আর রক্তপাত দেখে ছেলেমেয়েরা পিছিয়ে যেয়ে আরও শক্তভাবে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। তারা যেন সিসাঢালা প্রাচীরের মতো। আর স্বৈরাচার কখনো ভাবতেও পারেনি এভাবে তরুণ সমাজ দাঁড়িয়ে যাবে। স্বৈরাচার বুঝতে পারেনি এভাবে সবকিছু উলটো হয়ে যাবে।

বেশ কয়েক দিন যাবৎ আন্দোলন চলছে।

জুলায়ের শেষের দিক। স্বৈরাচার ভয়ে আঁতকে ওঠে। হৃদকম্পন শুরু হয় বুকের মাঝে। লাখো মানুষ পঙ্গপালের মতো গণভবনের দিকে ছুটতে থাকে। বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো মানুষের ঢল। অবস্থা বেগতিক দেখে পালিয়ে যায় ফ্যাসিস্টরা।

লুবাবা, হিরা, লিজারা চিৎকার করে ওঠে। এক বুক আনন্দ আর খুশিতে উত্তাল সারা দেশ। বিগ স্ক্রিনে লাইভ চলছে। কীভাবে আন্দোলনরত কচি কাঁচা সোনামণিরা বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে বিজয় ছিনিয়ে আনল।

লিজা, হিরা সবাই মাহিমকে খুঁজতে থাকে। ওকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। ওরা মানুষের কোলাহলে ছুটছে মাহিমকে খোঁজার জন্য।

সন্ধ্যা এসে গেছে। এখনই মাহিমকে বাসায় ফিরতে হবে। গত দুদিন হলো বাসায় যাওয়া হয়নি ওর। মা-বাবা সবাই খুব চিন্তিত। এমনকি তারা হয়তো ভাবতে শুরু করেছে, তাদের মাহিম...।

মাহিম হন হন করে দ্রুত ছুটতে থাকে বাসার দিকে। চারদিকে কেবল বিজয় মিছিল। কেউ কেউ আনন্দে কেঁদে ফেলে। সন্তানহারা বাবাও নেমে এসেছে রাজপথে। বিজয় মিছিলে। মাহিম ছুটছে বাসার দিকে মাথায় লাল সবুজের বেড়। হাতে প্ল্যাকার্ড। আজ ছত্রিশে জুলাই। লাল শিমুলের রাঙা হাসিতে স্মরণীয় এবং বরণীয় হয়ে থাকবে এই দিনটি। এভাবেই যুগে যুগে বিজয়ী বেশে মাহিমেরা ফিরে আসে বারবার।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ