লাল ক্যাঙ্গারু
চিত্র-বিচিত্র সাঈদ হাসান জুলাই ২০২৬
অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে পরিচিত প্রাণী ক্যাঙ্গারু। ক্যাঙ্গারু দেখতে অন্য প্রাণীর চেয়ে ভিন্ন। এদের দেহে রয়েছে অধিক শক্তি। অস্ট্রেলিয়ায় রেড ক্যাঙ্গারু বা লাল ক্যাঙ্গারু সবচেয়ে বিখ্যাত।
ক্যাঙ্গারু স্তন্যপায়ী প্রাণী। এরা মারসুপিয়াল গোত্রের প্রাণী। মারসুপিয়াল অর্থ যে প্রাণী তার সন্তানকে পেটের থলের ভেতরে রেখে লালনপালন করে।
ক্যাঙ্গারু শুকনো পরিবেশ খুব পছন্দ করে। অস্ট্রেলিয়ায় লাল মাটির সমভূমি আর তপ্ত রোদের মাঝে দাপিয়ে বেড়ায় লাল ক্যাঙ্গারু। পৃথিবীর বেশির ভাগ ক্যাঙ্গারুর বাস অস্ট্রেলিয়ায়। এদের শারীরিক গঠন, টিকে থাকার লড়াই এবং মাতৃত্বের অনন্য গল্প এদেরকে প্রকৃতির এক পরম বিস্ময় করে তুলেছে।
পুরুষ ক্যাঙ্গারুর গায়ের রং ফ্যাকাশে বা মরিচা লাল। কোনো কোনো পুরুষের গায়ের রং লালচে ধূসর হয়ে থাকে। তবে মেয়ে ক্যাঙ্গারু সাধারণত একই রকম গায়ের রং হয়।
একটি পূর্ণবয়স্ক পুরুষ লাল ক্যাঙ্গারু সোজা হয়ে দাঁড়ালে প্রায় ২.১ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয় এবং এদের ওজন ৯১ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। এদের পায়ে অনেক শক্তি রয়েছে। পেছনের শক্তিশালী পায়ের সাহায্যে এরা এক লাফেই প্রায় ৯ মিটার দূরত্ব পার হয়। এদের দৌড়ের গতি ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত হয়। বহুদূর লাফিয়ে যেতে পারে ক্যাঙ্গারু। এদের পেশিবহুল লেজটি লাফানোর সময় ভারসাম্য রাখে এবং বসার সময় তৃতীয় পায়ের মতো ভর দেয়।
এরা মূলত ঘাস খেয়ে জীবনধারণ করে। এরা দীর্ঘ সময় পানি পান না করে থাকতে পারে। নবজাতক ক্যাঙ্গারু শিশুকে তার মা নিজের থলিতে একটানা ২৩৫ দিন বহন করে। এ সময়ের মধ্যে শিশু ক্যাঙ্গারুর ওজন ৪ থেকে ৫ কেজি হয়ে থাকে।
অস্ট্রেলিয়ার রুক্ষ ও শুষ্ক অঞ্চলের তীব্র গরমের সাথে মানিয়ে নিতে লাল ক্যাঙ্গারুর রয়েছে কিছু চমৎকার প্রাকৃতিক কৌশল। এদের শরীরের ঘন পশম তীব্র রোদের তাপ থেকে ত্বককে রক্ষা করে। অতিরিক্ত গরমে এরা নিজেদের হাত লালা দিয়ে চাটে, যা বাষ্পীভূত হয়ে শরীরকে দ্রুত ঠাণ্ডা করে। এরা পানির পিপাসা মেটাতে গাছের পাতার আর্দ্রতার ওপর নির্ভর করে। এদের বিশেষ কিডনি প্রস্রাব থেকে পানি পুনরায় শোষণ করে শরীরে পানির অপচয় রোধ করে।
লাল ক্যাঙ্গারু একা থাকতে ভালোবাসে না। এরা দলবদ্ধভাবে বসবাস করে। ক্যাঙ্গারুদের এই দলকে বলা হয় ‘মব’। একটি দলে সাধারণত ১০ থেকে শুরু করে ৫০টিরও বেশি ক্যাঙ্গারু একসাথে ঘুরে বেড়ায়। দলের নেতৃত্ব থাকে একটি শক্তিশালী পুরুষ ক্যাঙ্গারুর কাছে। নিজেদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার বা সঙ্গী খোঁজার লড়াইয়ে পুরুষ ক্যাঙ্গারু বক্সিংয়ের মতো করে একে অপরকে পেছনের পায়ে ভর দিয়ে লাথি মারে।
শুধু বর্তমানে নয় অতীতেও অস্ট্রেলিয়ায় ছিল ক্যাঙ্গারুর বিস্তার। প্রায় ৫০ হাজার বছর আগে অস্ট্রেলিয়ার বুকে দাপিয়ে বেড়াত আকারে বড় দানবীয় প্রোটেমনোডন গোলিয়াথ প্রজাতির ক্যাঙ্গারু। বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্টিফিক রিপোর্টসে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, প্লাইস্টোসিন যুগের এই সব প্রাণী আধুনিক ক্যাঙ্গারুর পূর্বপুরুষ। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ম্যানচেস্টারের একদল গবেষক দাবি করেছেন, প্রাচীন এই প্রোটেমনোডন গোলিয়াথ তাদের বিশাল শরীর নিয়েও ছোট ছোট লাফ দিতে পারত।
বড় ক্যাঙ্গারুর ওজন ৫৫০ পাউন্ড বা প্রায় ২৫০ কেজি পর্যন্ত হতো, যা বর্তমান সময়ের বড় লাল ক্যাঙ্গারুর ওজনের দ্বিগুণ।
গবেষণায় দেখা গেছে যে আদি প্রজাতির ক্যাঙ্গারু দৈনন্দিন চলাচলের জন্য সব সময় লাফের ওপর নির্ভর করত না। তাদের বিশাল শরীরের জন্য সব সময় লাফানো ছিল শক্তির অপচয়। তারা কোনো বিপদের সম্মুখীন হলে বা শিকারি প্রাণীর হাত থেকে বাঁচতে লাফানোর কৌশল ব্যবহার করত। সে সময় অস্ট্রেলিয়ায় থাইলাকোলেয়ো বা মারসুপিয়াল সিংহের মতো ভয়ংকর শিকারি প্রাণীদের অস্তিত্ব ছিল। শিকারি থেকে জীবন বাঁচাতে অথবা বনের পথে বাধা এড়িয়ে চলতে এই দানবীয় ক্যাঙ্গারু ছোট কিন্তু দ্রুতগতিতে লাফ দিত।
বর্তমানে এদের আকার পরিবর্তন হলেও বৈশিষ্ট্য রয়েছে আগের মতো। লাল ক্যাঙ্গারু অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় প্রতীক হিসেবে স্থান পেয়েছে। বলা হয়ে থাকে, ক্যাঙ্গারু কখনো পেছনের দিকে লাফাতে পারে না, তারা সব সময় সামনে এগিয়ে যায়-যা অস্ট্রেলিয়ার প্রগতির প্রতীক।
আরও পড়ুন...