ব্লকচেইন টেকনোলজি
আইটি কর্নার নাদিম নওশাদ জুন ২০২৫
তোমরা কি কখনো ব্লকচেইন টেকনোলজি সম্পর্কে শুনেছ? অনেকের কাছেই হয়তো নামটা নতুন। আবার অনেকে হয়তো এ সম্পর্কে শুনে থাকবে। আজকে আমরা আলোচনা করব ব্লকচেইন টেকনোলজি সম্পর্কে।
ব্লকচেইন টেকনোলজি কী
ব্লকচেইন টেকনোলজি সম্পর্কে ভালোমতো ধারণা পেতে চলো একটা উদাহরণ দেখা যাক।
ধরো, তুমি কবিতা লিখতে খুব পছন্দ করো। তুমি দোকান থেকে একটা খাতা কিনে আনলে তোমার দৈনন্দিন লেখা কবিতাগুলো সংরক্ষণ করার জন্য। খাতাটিতে তুমি প্রতিদিনকার কবিতা সংরক্ষণ করে রাখছ। কিন্তু হঠাৎ তোমার মনে হলো, কেউ যদি খাতাটা চুরি করে নিয়ে যায়, তবে তোমার লেখাগুলো অন্য কেউ তার নিজের বলে চালিয়ে দিতে পারে। তাই তুমি তোমার খাতার কপি তোমার বন্ধুদের কাছে এক কপি করে দিয়ে রাখলে। তাহলে যদি কেউ তোমার কবিতা নিজের বলে চালিয়ে দিতে চায়, তবে তোমার বন্ধুদের কাছে থাকা কপির দরুন তা সম্ভব হবে না। আবার কেউ যদি তোমার খাতার কোনো লেখা বদলে দিতে চায়, তাও সম্ভব হবে না।
ঠিক এই কাজটাই করে ব্লকচেইন।
ব্লকচেইন হলো এমন একটা ডিজিটাল খাতা বা রেকর্ড বই, যেখানে লেনদেন বা তথ্য ব্লক আকারে রাখা হয়। প্রতিটি ব্লকের মধ্যে থাকে তথ্য এবং আগের ব্লকের একটি ডিজিটাল স্বাক্ষর। এভাবে আগের ব্লকের সাথে পরের ব্লক যুক্ত হয়ে তৈরি করে চেইন; যেটাকে মূলত ব্লকচেইন বলে। আর ব্লকচেইন ব্যবহার করে তৈরি টেকনোলজিকে ব্লকচেইন টেকনোলজি বলে।
ব্লকচেইনের বৈশিষ্ট্য
বিকেন্দ্রীকরণ : ব্লকচেইন এমন একটি প্রযুক্তি, যেখানে কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হাতেই সকল নিয়ন্ত্রণ থাকে না। বরং অনেক মানুষ বা অনেকগুলো কম্পিউটার একসঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি বলয়ের মতো তৈরি করে, যেখানে তথ্যের সংরক্ষণ ও যাচাই করা হয়। ফলে কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান চাইলেই কোনো তথ্য বদলাতে পারে না।
স্বচ্ছতা : ব্লকচেইনের প্রতিটি তথ্য সবার সামনে উন্মুক্ত থাকে। ফলে যে কেউ যে-কোনো সময়ে তথ্য দেখতে পারে। এমনকি কে কখন কোন তথ্য সংযোজন করছে, তাও দেখা সম্ভব। ফলে ব্যবহারকারী কোনো তথ্য ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ভরসা পায় এবং বিশ^াস তৈরি হয়।
নিরাপত্তা : ব্লকচেইন টেকনোলজিতে ব্যবহৃত ডাটাসমূহ ব্লকে যুক্ত করার আগে ক্রিপ্টোগ্রাফি ব্যবহার করে ডাটাগুলোকে এনক্রিপ্ট করা হয়। ফলে সহজে ডাটাগুলো খোলা দুঃসাধ্য, যা ব্লকচেইন টেকনোলজিকে নিরাপদ করে তুলেছে।
অপরিবর্তনশীলতা : ব্লকচেইন টেকনোলজি ব্যবহার করে কোনো তথ্য ব্লকচেইনে রাখলে তা আর মুছে ফেলা বা পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। কারণ, প্রতিটি ব্লকেই তার আগের ব্লকের ডিজিটাল স্বাক্ষর যুক্ত থাকে। ফলে তথ্য জালিয়াতির ঘটনা ঘটার সম্ভবনা খুবই কম।
ব্লকচেইন টেকনোলজির চ্যালেঞ্জ
যদিও ব্লকচেইন টেকনোলজি অনেক সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে, তারপরও এই প্রযুক্তি বাস্তবায়নে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
প্রযুক্তি সম্পর্কিত সঠিক জ্ঞানের অভাব : বর্তমানে অনেক মানুষ আছেন, যারা ব্লকচেইন টেকনোলজি সম্পর্কে অবগত নন। এ তালিকায় উচ্চপদস্থ থেকে নিম্নপদস্থ সকলেই আছেন, যাদের ব্লকচেইন টেকনোলজি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নেই। ফলে এ প্রযুক্তির সংযোজন অনেক সময়সাপেক্ষ হতে পারে।
দক্ষ জনবলের ঘাটতি : ব্লকচেইন প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজন প্রোগ্রামিং, ক্রিপ্টোগ্রাফি, ডেটাবেস, নেটওয়ার্কিংসহ আরও অনেক বিষয়ের দক্ষতার। বর্তমানে বিভিন্ন দেশে এখনো ব্লকচেইন সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও অভিজ্ঞ ডেভেলপারের সংখ্যা খুবই সীমিত।
পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাব : ব্লকচেইন টেকনোলজির যথাযথ সুফল ভোগ করার জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী সার্ভার, ক্লাউড স্টোরেজ, নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট ব্যবস্থা। এ ধরনের অবকাঠামো তৈরি এখনো অনেক দেশের জন্য ব্যয়বহুল ও কষ্টসাধ্য।
সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি : যদিও ব্লকচেইন অত্যন্ত নিরাপদ একটা প্রযুক্তি, তবুও আমরা যেসব অ্যাপস বা ডিজিটাল ওয়ালেট (অনলাইন ব্যাংকিং অ্যাপস) ব্যবহার করি, সেগুলোর কোনো নিরাপত্তাজনিত দুর্বলতা থাকলে হ্যাকাররা সে সুযোগ নিতে পারে!
ব্লকচেইনের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
আগে ব্লকচেইন শুধু আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে ব্যবহার হলেও বর্তমানে ব্লকচেইন বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহার হচ্ছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা এমনকি ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেও মৌলিক পরিবর্তনের সম্ভাবনার সুযোগ তৈরি করেছে এ প্রযুক্তি। এ প্রযুক্তি ব্যবহারে আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা থাকায় রেমিট্যান্সের পরিমাণ বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। এ ছাড়া জমির মালিকানা ও নথিপত্র-বিষয়ক জটিলতা দূর করতে ব্লকচেইন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। রোগীর মেডিকেল তথ্য, মেডিকেল রিপোর্ট, প্রেসক্রিপশন ইত্যাদি ব্লকচেইন দিয়ে সুরক্ষিত করলে আরও ভালো ফল পাওয়া সম্ভব।
বর্তমান বিশে^র আলোড়ন সৃষ্টিকারী প্রযুক্তি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট অব থিংস, বিগ ডাটা এবং ব্লকচেইন সমাজ ও অর্থনীতিতে পরিবর্তন সাধন করছে। দেশের প্রযুক্তির ছোঁয়াকে ব্লকচেইন অভাবনীয় উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম বলে অনেকেই ধারণা করছেন।
আরও পড়ুন...