ঈদ আনন্দ এবং কুরবানি
বিশেষ রচনা জয়নুল আবেদীন আজাদ জুন ২০২৫
আনন্দ কে না চায়। আনন্দ মিশে আছে মানুষের স্বভাবের সাথে। তবে আনন্দের চাহিদাটা শিশু-কিশোরদের একটু বেশি। মানুষের স্রষ্টা বিষয়টি বেশ ভালো করেই জানেন। তাই নির্মল আনন্দ-বিনোদন ইসলামে নিষিদ্ধ নয়। মুসলমানদের আনন্দ-উৎসবের দুটি বড়ো দিন হলো ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, ঈদের দুটি দিন আবার ইবাদত ও জনকল্যাণের সাথে সংযুক্ত। এটা এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। ঈদুল ফিতরের দিন প্রথমে ফিতরা আদায়, এরপর সালাত আদায়। এই দায়িত্বগুলো পালিত হওয়ার পর সামাজিক নির্মল আনন্দ-উৎসব ও খেলাধুলা আমাদের ধর্মে অনুমোদিত। তবে মুসলিম মনন গুনাহের ব্যাপারে সবসময় থাকে সতর্ক।
আজকে আমরা ঈদুল আজহা নিয়ে বিশেষভাবে কথা বলব। ঈদুল আজহার দিনে প্রথমে আমরা ঈদের সালাত আদায় করে থাকি। এরপর হয় পশু কুরবানি ও গোশত বিতরণ। এই ঈদেও নির্মল সামাজিক আনন্দ-বিনোদন, খেলাধুলা ইসলামে বৈধ। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, চাঁদ দেখে আমরা ঈদ করে থাকি। এভাবে আকাশের চাঁদের সাথে জমিনের মানুষের একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে, একই সাথে চাঁদের স্রষ্টার সাথেও।
ঈদুল আজহার দিনে গোসল করা, সাধ্যমতো ভালো পোশাক পরা, ঈদগাহে এক পথে যাওয়া অন্য পথে ফিরে আসার বিধান রয়েছে। এই ঈদে কিছু না খেয়ে ঈদের সালাত আদায় করা সুন্নত। কুরবানির গোশত দিয়ে এদিন পানাহার শুরু করা উত্তম। রাসূল (সা) সাধারণত সূর্যোদয়ের ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই ঈদুল আজহার সালাত আদায় করতেন। তবে ঈদুল ফিতরের সালাত তিনি একটু দেরি করে পড়তেন। মুসলিম উম্মাহ এখনও সেই সুন্নাহ পালন করে থাকে। তবে প্রয়োজনে কিছুটা বিলম্ব করা নিষিদ্ধ নয়। ঈদুল আজহার সালাত একটু আগে আদায়ের কারণ হলো, যাতে কুরবানির গোশত বণ্টন ও রান্নাবান্নায় সুবিধা হয়। এখানে বলে রাখা ভালো, পশু কুরবানি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, গোশত খাওয়া এর উদ্দেশ্য নয়। গোশত তো আমরা সারা বছরই খেয়ে থাকি। হাদিস থেকে কুরবানির গুরুত্ব উপলব্ধি করা যায়। রাসূল (সা) বলেছেন, ‘যার সাধ্য ছিল কুরবানি দেওয়ার, কিন্তু কুরবানি দিলো না, সে যেন আমাদের ঈদগাহে উপস্থিত না হয়।’
কুরবানির সময় রাসূল (সা) দুটি সুন্দর ও বড়ো সাইজের পুরুষ মেষ বা ভেড়া ক্রয় করতেন। এর একটি কুরবানি করতেন উম্মতের পক্ষ থেকে, অপরটি নিজের ও পরিবারের পক্ষ থেকে। এ ছাড়া রাসূল (সা) উট ও গরু কুরবানি দিয়েছেন। উট ও গরুর ক্ষেত্রে একটি পশুতে সাতজন শরিক হওয়ার অনুমতি আছে। স্বাস্থ্যবান সুন্দর পশু কুরবানি দিতে রাসূল (সা) উৎসাহিত করেছেন। অসুস্থ, রুগ্ন, কানা, খোঁড়া অর্থাৎ ত্রুটিযুক্ত পশু কুরবানি করতে তিনি নিষেধ করেছেন। আর যারা কুরবানি দেবেন, নখ ও চুল কাটার ব্যাপারে তাদের জন্য বিশেষ বিধান রয়েছে। রাসূল (সা) বলেছেন, ‘যদি তোমাদের কেউ কুরবানির নিয়ত করে, তবে জিলহজ মাসের নতুন চাঁদ দেখার পর সে যেন কুরবানি দেওয়া পর্যন্ত চুল ও নখ স্পর্শ না করে।’ (মুসলিম)
এতক্ষণ আমরা কুরবানির বিধিবিধান নিয়ে কিছু কথা বললাম। কুরবানির গল্পও আছে, সত্য সে গল্পে রয়েছে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সবচাইতে প্রিয় জিনিস ত্যাগের অপূর্ব বার্তা। হযরত ইবরাহিম (আ)-এর বয়স যখন ৮৬ বছর, তখন স্ত্রী হাজেরার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন তাঁর প্রিয় পুত্র ইসমাইল (আ)। বৃদ্ধ বয়সের এই প্রিয় সন্তানকে কুরবানি করার নির্দেশ দেন আল্লাহ তায়ালা। ইবরাহিম (আ) ইসমাইল (আ)-কে বলেন, ‘হে প্রিয় বৎস, আমি স্বপ্নে তোমাকে জবেহ করতে দেখেছি। এখন তোমার কী অভিমত?’ পুত্র বলল, ‘হে আমার পিতা, আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তা করুন। ইনশাআল্লাহ, আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন।’
অতঃপর যখন তাঁরা উভয়েই আল্লাহর ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করলেন এবং জবেহ করার উদ্দেশ্যে ইবরাহিম (আ) পুত্রকে কাত করে শুয়েই দিলেন; তখন আল্লাহ বললেন, ‘হে ইবরাহিম, তুমি তো স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করেছ, স্বপ্নাদেশ পালন করেছ-এভাবেই আমি তাকে মুক্ত করলাম এক মহান জবেহের বিনিময়ে।’ (সূরা সাফফাত, আয়াত ১০৪-১০৭)
ইবরাহিম (আ) নবী ছিলেন, এজন্য তাঁর স্বপ্ন ছিল ওহী। এখানে লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো, পিতা যখন পুত্রকে কাত করে শুইয়ে দিলেন জবেহের নিয়তে, তখন আল্লাহ ইবরাহিম (আ)-কে বললেন, স্বপ্নাদেশ পালন হয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ মন থেকে কুরবানি হয়ে গিয়েছে। হযরত ইবরাহিম (আ) এবং ইসমাইল (আ) মন থেকে আল্লাহর আদেশ মেনে নিয়েছেন। তাঁদের মনের এ কুরবানি ছিল নিখাদ ও অকৃত্রিম। এ কারণেই পুত্রকে শায়িত করার সাথে সাথেই আল্লাহ ইবরাহিম (আ)-কে জানিয়ে দিলেন, তোমার কুরবানি কবুল হয়ে গিয়েছে। আল্লাহ জান্নাতি এক দুম্বা দিয়ে কুরবানির ব্যবস্থা করলেন। অভূতপূর্ব এই ঘটনার মূল বার্তা হলো, উদ্দেশ্য বা নিয়তের বিশুদ্ধতা। নিজের সম্পদ বা প্রিয় বস্তু একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিলিয়ে দেওয়াই হলো প্রকৃত কুরবানি। হযরত ইবরাহিম (আ)-এর শ্রেষ্ঠ উদাহরণ যে কুরবানি দিচ্ছে, তা হযরত ইবরাহিম (আ)-এর কুরবানির অনুসরণ।
কুরবানি মুসলিম জীবনের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। নানাভাবে, নানা মাত্রায় এই কুরবানি দিয়ে যেতে হয়। একজন মানুষ মুসলিম হবে এবং জীবনে কুরবানির চ্যালেঞ্জ আসবে না, তা হয় না। কুরবানির পথ ও মাত্রায় পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু কুরবানির পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতেই হবে প্রত্যেক মুসলিমকে। এর কোনো বিকল্প নেই। প্রিয় স্বদেশে জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে আমরা তেমন এক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছি। ছোটো-বড়ো, নারী-পুরুষ, শ্রমিক-কৃষক, ছাত্র-জনতা অত্যাচারী ফ্যাসিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে এসেছে কুরবানির চেতনায়। গুলির সামনে তাঁরা বুক পেতে দিয়েছেন। আবু সাঈদের উদাহরণে উজ্জীবিত হয়ে শহীদ হয়েছে বহু শিশু-কিশোর-নারী এবং ছাত্র-জনতা। তাঁদের কুরবানির বিনিময়ে আমরা পেয়েছি দ্বিতীয় স্বাধীনতা। স্বাধীন পরিবেশে মাথা উঁচু করে আজ আমরা ঈদ করতে পারছি বাংলাদেশে, ফ্যাসিস্ট আমলে যা সম্ভব ছিল না। তাই জুলাইয়ের শহীদদের আজ আমরা স্মরণ করছি পরম শ্রদ্ধার সাথে।
আরও পড়ুন...