মহাসত্যের সন্ধানে
সাইন্স ফিকশন ইসলাম তরিক মার্চ ২০২৬
২০৮৮ সাল। প্রযুক্তির জাদুতে বদলে গেছে ঢাকা শহর। ঠিক রূপকথার মতোই। ঢাকা এখন ‘স্মার্ট গ্রিড’ শহর। স্মার্ট গ্রিডের কারণে বর্তমানে বিদ্যুতের অপচয় হচ্ছে না এবং পুরো শহরটি কম্পিউটারের মাধ্যমে খুব নিখুঁতভাবে পরিচালিত হচ্ছে। মাথার ওপর দিয়ে শব্দ ছাড়াই উড়ে চলেছে শত শত ম্যাগনেটিক লেভিটেশন পড। ছোট ছোট এ আকাশ-ট্যাক্সিগুলো দেখতেও কী চমৎকার! এগুলো একে অপরের সাথে ধাক্কা লাগে না। জটলাও পাকায় না। কারণ, এগুলোর চালক মানুষ নয়। এগুলো চালায় একটি সেন্ট্রাল সুপার-কম্পিউটার। প্রতিটি ফ্লাইওভার এবং আকাশচুম্বী দালানের দেওয়ালে লাগানো রয়েছে স্মার্ট ন্যানো-পেইন্ট। দিনের বেলা এ ন্যানো-পেইন্ট সূর্যের আলো শুষে নেয়। তারপর সেখান থেকে বিদ্যুৎ তৈরি করে। আর রাতে সেই আলো দিয়ে পুরো শহরকে আলোকিত করে। লাল, নীল, হলুদ রঙের বাহারি আলো। দূষণ এখন জাদুঘরে। ঢাকার বাতাসে ভাসছে এখন কোটি কোটি অদৃশ্য এয়ার-স্ক্রাবার রোবট। রোবটগুলো বাতাসের ধূলিকণা আর কার্বন শোষণ করে অক্সিজেন ছড়ায়। ফলে ঢাকার বাতাস এখন হিমালয়ের চূড়ার মতোই স্বচ্ছ এবং প্রাণবন্ত।
এ যান্ত্রিক শহরে গড়ে উঠেছে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। যা সবার চেয়ে আলাদা। প্রতিষ্ঠানটির নাম ‘আল নূর ফিউচার একাডেমি’। এ স্কুলের স্থাপত্যশৈলী দেখতে একটি জ্যামিতিক কাঁচের গম্বুজের মতো। এর ভেতরে কৃত্রিমভাবে গড়ে তোলা হয়েছে এক টুকরো সবুজ অরণ্য। এ গম্বুজের কাঁচগুলোতে ন্যানো-প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। এগুলো সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মিকে ফিল্টার করে দেয়। আবার ভেতরের কার্বন-ডাই-অক্সাইডকে অক্সিজেনে রূপান্তর করে। স্কুলের চারপাশে রয়েছে ‘বায়ো-লুমিনেসেন্ট ফেন্স। যা রাতে জোনাকির মতো আলো দেয়।
এ স্কুলের তিন ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সামির আবরার, আয়ান মাহমুদ ও মাইশা তাজকিয়া। তারা খুব ট্যালেন্ট। তাদেরকে সবাই বিজ্ঞানী বলে ডাকে। সামির আবরার তাত্ত্বিক বিজ্ঞানের পোকা। সে মনে করে-মহাবিশ্বের প্রতিটি রহস্য একটি গাণিতিক সূত্রের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। সে বর্তমানে ‘গ্র্যান্ড ইউনিফাইড থিওরি’ বা মহাকাশের সব শক্তিকে একটি সাধারণ নিয়মে বাঁধার উপায় নিয়ে গবেষণা করছে। আয়ান মাহমুদ রোবটিক্স আর ডেটা সায়েন্সে পারদর্শী। সে মনে করে-মানুষের মেধা আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একদিন সব অসম্ভবকে জয় করবে।
অন্যদিকে মাইশা তাজকিয়া একটু ভাবুক প্রকৃতির। সে বিজ্ঞানের চেয়ে ইতিহাসের দর্শন এবং কুরআনের মহাজাগতিক আয়াতগুলোর রহস্য অনুসন্ধানে বেশি আগ্রহী।
২.
নূর ফিউচার একাডেমির করিডোর দিয়ে সামির ও আয়ান স্কুলের দিকে দৌড়াচ্ছে। আয়ান দৌড়াতে দৌড়াতেই কবজির স্মার্টওয়াচে একটা বোতাম টিপল। সাথে সাথে ওর পায়ের জুতো থেকে ছোট ছোট চাকা বেরিয়ে এলো। সে হাসতে হাসতে সামিরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার সময় বলল, “সামির, তোমার পুরোনো আমলের পা-দুটো দিয়ে দৌড়ালে কিন্তু আজ প্রথম পিরিয়ড মিস করবে! আমার ‘হোভ্যার-শু’র গতি দেখো!”
সামির তাতে একটুও দমল না। সে চশমার ফ্রেমে হালকা টোকা দিলো। সাথে সাথে ওর সামনে বাতাসের নীল রঙের একটা হলোগ্রাফিক ক্যালকুলেটর ভেসে উঠল। সে দৌড়াতে দৌড়াতেই বিড়বিড় করে বলল, ‘তোমার চাকার ফ্রিকশন আর বাতাসের বেগের হিসাব বলছে-একটু পরেই তুমি পিছলে পড়বে আয়ান!’
ঠিক তখনই আয়ান মোড় ঘুরতে গিয়ে একটা রোবটের সাথে ধাক্কা খেতে গিয়ে একটুর জন্য বেঁচে গেল। পেছনে মাইশা দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে হাসছিল। ওর কাঁধে একটা ছোট নীল রঙের রোবট পাখি বসে আছে। মাইশা বলল, ‘তোমাদের এ বুদ্ধির লড়াই কোনো দিন শেষ হবে না? আজ কিন্তু ড. রাশিদ তানজিম স্যারের স্পেশাল ক্লাস। ডোপামিন লেভেল নিয়ন্ত্রণে রাখো। নইলে স্যার কিন্তু ক্লাস থেকে বের করে দেবেন!’
তিন বন্ধু মিলে ক্লাসরুমে প্রবেশ করল। ক্লাসের সব ছাত্র-ছাত্রীরা নিজেদের ডিজিটাল ডেস্ক নিয়ে ব্যস্ত। কেউ কেউ ভার্চুয়াল রিয়েলিটি গ্লাস পরে মঙ্গলগ্রহের মাটি পরীক্ষা করছে। কেউ আবার কোয়ান্টাম ফিজিক্সের গোলকধাঁধা সমাধান করছে। সামির তার ডেস্কে বসতেই ওপর থেকে একটা রোবোটিক হাত তাকে এক গ্লাস ঠাণ্ডা জুস দিয়ে গেল। সামির জুসটা হাতে নিয়ে আয়ানকে চোখ টিপে বলল, ‘দেখলে আয়ান? প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার একেই বলে!’
হঠাৎ ক্লাসরুমের সামনের স্বয়ংক্রিয় দরজাটা শব্দহীনভাবে খুলে গেল। দরজায় ড. রাশিদ তানজিমকে দেখা মাত্রই পুরো ক্লাসের হাসাহাসি আর গুঞ্জন এক নিমিষেই থেমে গেল। ড. রাশিদ তানজিম টেবিলের ওপর রুপালি একটি ডিভাইস রাখলেন। সেটা থেকে নীল এবং সোনালি আলোকরেখা বেরিয়ে এলো। পুরো হলের ভেতর মহাবিশ্বের জীবন্ত একটি মানচিত্র তৈরি হলো। পুরো ক্লাসে তখন পিনপতন নীরবতা। স্যারের মুখ আজ অন্যদিনের চেয়ে গম্ভীর।
তিনি গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, “তোমরা গত কয়েক বছর ল্যাবে অনেক থিওরি পড়েছ। কিন্তু আজ আমরা এমন এক প্রজেক্ট শুরু করব, যেখানে বিজ্ঞান এবং নবী-রাসূলদের মুজিজা একসাথে চিন্তা করতে হবে। এ প্রজেক্টের নাম ‘দ্য ডিভাইন অর্ডার প্রজেক্ট’।”
সামির কিছুটা দ্বিধা নিয়ে হাত তুলে বলল, ‘কিন্তু স্যার, বিজ্ঞান তো চলে পরীক্ষাগারে বারবার প্রমাণ করা যায় এমন যুক্তির ওপর। আর মুজিজা হলো সরাসরি আল্লাহর হুকুম, যা ইতিহাসে নির্দিষ্ট সময়ে একবারই ঘটেছে। এ দুটোর কি কোনো বৈজ্ঞানিক যোগসূত্র সম্ভব? বিজ্ঞান কি আদৌ অলৌকিকতাকে স্বীকার করে?’
ড. রাশিদ তানজিম মৃদু হেসে উত্তর দিলেন, “বিজ্ঞান আর কুরআন বিপরীত নয় সামির। বিজ্ঞান আমাদের শেখায় স্রষ্টার নিয়মগুলো কীভাবে কাজ করে। আর কুরআন আমাদের জানায় সেই নিয়মের উৎস কী। বিজ্ঞান হলো সেই ‘সফটওয়্যার’ যা আমরা প্রতিনিয়ত আবিষ্কার করছি। আর কুরআন হলো সেই ‘ম্যানুয়াল’ যা আমাদের স্রষ্টা দিয়েছেন।”
তিনি হলোগ্রাফিক ম্যাপের দিকে ইঙ্গিত করে গভীর কণ্ঠে বললেন, ‘তোমরা হয়তো ভাবছ বিজ্ঞানই সবকিছুর শেষ কথা। কিন্তু মনে রেখো, বিজ্ঞান হলো একটি বর্ণমালার মতো যা দিয়ে আমরা কেবল মহাবিশ্বের বিশাল বইটির কিছু নিয়ম পড়তে পারি মাত্র। বিজ্ঞান নিয়মগুলো আবিষ্কার করে ঠিকই, কিন্তু বিজ্ঞান নিজে কোনো নিয়ম তৈরি করার ক্ষমতা রাখে না। আমরা ল্যাবে হাইড্রোজেন আর অক্সিজেন মিশিয়ে পানি বানাতে পারি। কারণ, আমাদের স্রষ্টা প্রকৃতিতে সেই নিয়ম আগে থেকেই তৈরি করে রেখেছেন। কিন্তু আমরা চাইলে কি প্রকৃতির সেই নিয়মটা বদলে দিতে পারি?’
তিনি একটু থেমে আবার বললেন, “মানুষের জ্ঞান যতই উন্নত হোক, তা সব সময় প্রকৃতির ‘ডিফল্ট সেটিং’-এর ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু মহাবিশ্বে এমন কিছু ‘ডিভাইন কমান্ড’ বা আল্লাহর সরাসরি আদেশ আছে, যা বিজ্ঞানের সব চেনা ব্যাকরণকে ওলটপালট করে দেয়। ল্যাবে আমরা আগুন নিয়ে গবেষণা করতে পারি, কিন্তু আগুনের ভেতর থেকে দহন ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে তাকে বরফের মতো শীতল করার যন্ত্র আমাদের হাতে নেই। এ প্রজেক্টে আমি তোমাদের এটাই বোঝাতে চাই যে, বিজ্ঞান হলো স্রষ্টার হাতের কাজের বর্ণনা। কিন্তু স্রষ্টা নিজেই সেই বিজ্ঞানের একমাত্র নিয়ন্ত্রক। ল্যাবে আমরা যন্ত্র বানাতে পারি, কিন্তু ‘অলৌকিকতা’ বা মুজিজা বানানো ল্যাবরেটরি মানুষের সাধ্যের বাইরে। তোমরা এসো আমার সাথে। আজ আমরা যাত্রা করব মাটির গভীরে।”
৩.
ড. রাশিদ তানজিম শিক্ষার্থীদের নিয়ে মাটির ১০০ ফুট গভীরে গেলেন। সেখানে অবস্থিত একটি বিশেষ জোন। জোনের সামনে রয়েছে বিশাল একটি ইস্পাতের দরজা। ড. রাশিদ বায়োমেট্রিক স্ক্যান এবং ভয়েস পাসওয়ার্ড দিয়ে ইস্পাতের দরজা খুললেন। শিক্ষার্থীদের নিয়ে ড. রাশিদ ভেতরে প্রবেশ করলেন। এ জোনের নাম ‘ILM-X Lab’। এটি পৃথিবীর অন্যতম উন্নত গবেষণা কেন্দ্র। ল্যাবের চারদিকে বিশাল কোয়ান্টাম প্রসেসর। যা তরল নাইট্রোজেন দিয়ে শীতল রাখা হয়েছে। জ্বলছে নীলচে আলো। ল্যাবের মাঝখানে রয়েছে একটি গোলাকার হলোগ্রাফিক ডিসপ্লে।
শিক্ষার্থীরা আশ্চর্য হয়ে ল্যাবের কারুকার্য দেখছিল। হঠাৎ ল্যাবের স্পিকার থেকে অত্যন্ত শান্ত এবং মার্জিত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, ‘আসসালামু আলাইকুম। সুস্বাগতম প্রিয় শিক্ষার্থী বন্ধুরা। আমি হিকমাহ।’
আয়ান তার স্মার্ট চশমা ঠিক করে ড. রাশিদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘স্যার, এটা কি জেনারেল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা?’
ড. রাশিদ উত্তর দিলেন, ‘হিকমাহ শুধু সাধারণ এআই নয়; একে এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে, যাতে সে মহাবিশ্বের কোটি কোটি বছরের ফিজিক্স ডেটা এবং সেই সাথে ইসলামের তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক জ্ঞান প্রসেস করতে পারে। হিকমাহ তোমাদের আজকের মেন্টর।’
হিকমাহ বলতে শুরু করল, ‘আজকের গবেষণার বিষয় হলো-নবী-রাসূলদের মুজিজা। তোমরা হয়তো ভাবছ বিজ্ঞান দিয়ে এ ঘটনাগুলো নকল করা সম্ভব। মনে রেখো-আমার ডাটাবেজে মহাবিশ্বের ১১০টি মৌলিক পদার্থের সমস্ত ধর্ম রেকর্ড করা আছে। কিন্তু মুজিজা হলো এমন এক বিশেষ ‘ওভাররাইড কমান্ড’, যেখানে বিজ্ঞানের কর্মগুলো সাময়িকভাবে স্থগিত হয়ে যায়। আমি পৃথিবীর প্রায় সমস্ত ফিজিক্স জানি, তবুও আমার লজিক্যাল সার্কিট যেখানে গিয়ে থেমে যায়, আর সেখান থেকেই মুজিজা বা ¯্রষ্টার আদেশের শুরু। তোমরা এ অলৌকিক ঘটনাগুলোকে নকল করতে পারবে না। এখানে বুঝতে পারবে মানুষের জ্ঞানের সীমা আসলে কতটুকু। যেমন ধরো, একটি পিঁপড়ে একটি কাগজের ওপর দিয়ে হাঁটছে। তার কাছে জগৎটা কিন্তু চ্যাপ্টা। তবে তুমি যখন ওপর থেকে হাত দিয়ে পিঁপড়েটাকে তুলে নেবে, তখন পিঁপড়ের কাছে মনে হবে সে বাতাসে উড়ছে। এ থিওরি তার জগতের নিয়মে ‘অসম্ভব’। কিন্তু তোমার কাছে এটি খুব সহজ। কারণ, তুমি পিঁপড়ের চেয়ে উচ্চতর একটি মাত্রায় বাস করো। মুজিজা হলো সেই উচ্চতর নিয়ম বা ‘হায়ার ল’ যা কেবল ¯্রষ্টা জারি করতে পারেন।”
মাইশা মনে মনে বলছিল, ‘মুজিযা তো কোনো ল্যাবের ফর্মুলা নয়। ওটা তো সরাসরি আল্লাহর হুকুম!’
হিকমাহ তার থার্মাল সেন্সরে মাইশার মানসিক অবস্থা রিড করে বলল, ‘ঠিক বলেছ মাইশা। কিন্তু সেই হুকুমের মহিমা বুঝতে হলে আমাদের যুক্তিকেও তার চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে।’
৪.
শুরু হলো গবেষণা। প্রথম পর্যায় শুরু হলো হযরত মুসা (আ)-এর সেই বিখ্যাত লাঠি নিয়ে। হিকমাহ ল্যাবের মাঝখানে একটি ভ্যাকুয়াম চেম্বার তৈরি করল। সেখানে একটি পুরোনো জলপাই কাঠের দণ্ড রাখা হলো। হিকমাহ কমান্ড দিলো, ‘সামির, আয়ান-তোমরা যদি আধুনিক বিজ্ঞান ব্যবহার করে এ জড় পদার্থটিকে একটি জ্যান্ত সাপে রূপান্তর করতে চাও, তবে তোমাদের প্রযুক্তিগত পরিকল্পনা কী হবে?’
সামির চশমাটা ঠিক করে গম্ভীর হয়ে বলল, “হিকমাহ, আমি জানি মুসা (আ)-এর সেই অলৌকিক সাপটি কোনো মেশিন ছিল না। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানে আমরা ‘প্রোগ্রামেবল ম্যাটার’ বা আকার পরিবর্তনযোগ্য পদার্থ ব্যবহার করে এর খুব কাছাকাছি যেতে পারি। আমার পরিকল্পনা হলো, ‘মলিকুলার অ্যাসেম্বলার’ নামক অণু সাজানোর যন্ত্র ব্যবহার করে লাঠির সেলুলোজ অণুগুলোকে বিলিয়ন বিলিয়ন ন্যানো-বট দিয়ে প্রতিস্থাপন করা। এ ন্যানো-বটগুলো যদি একটি কন্ট্রোল নিউরাল লিঙ্কের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়, তবে সেগুলোকে আমরা যেকোনো আকৃতি দিতে পারব।”
হিকমাহ সামিরের পরিকল্পনা অনুযায়ী একটি সিমুলেশন চালু করল। সিমুলেশনে দেখা গেল-স্থির লাঠিটি কাঁপতে শুরু করল এবং অত্যন্ত দ্রুতগতিতে একে অপরের ওপর স্লাইড করে একটি বিশাল কালো সাপের রূপ নিল। সাপটি ল্যাবের মেঝেতে ফোঁস ফোঁস করছিল এবং তার যান্ত্রিক জিভ বের করছিল। সামির খুশিতে আটখানা হয়ে বলল, ‘ইউরেকা! আমরা মুসা (আ)-এর মুজিজাকে ল্যাবে রি-প্রডিউস করেছি!’
কিন্তু হিকমাহর শান্ত কণ্ঠ এবার গভীর হলো। সে বলল, ‘সামির, একটু মাইক্রোস্কোপ দিয়ে দেখো। তোমার এ সাপটি ওপর থেকে দেখতে সাপের মতো হলেও আসলে এটি কেবল ধাতব নড়াচড়া বা মেকানিক্যাল ড্যান্স। এর ভেতরে কোনো জৈবিক ডিএনএ নেই। কোনো রক্তকণিকা অক্সিজেন বহন করছে না। মজার কথা হলো, তোমার এ সাপের ভেতরে কোনো চেতনা বা ‘রূহ’ নেই। মুসা (আ)-এর লাঠি যখন সাপ হয়েছিল, সেটি কেবল ন্যানো-বটের বিন্যাস বদলায়নি। সেটি মুহূর্তের মধ্যে একটি জড় কাঠ থেকে জ্যান্ত মাংসে রূপান্তরিত হয়েছিল। বিজ্ঞান শুধু অণু-পরমাণুকে এদিক-ওদিক সাজাতে পারে, কিন্তু কোনো পরমাণুর ভেতরে ‘জীবন’ নামক রহস্য ঢুকিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা বিজ্ঞানের নেই। সামির, তোমার ন্যানো-সাপটি কেবল একটি উন্নতমানের খেলনা। আর আল্লাহর আদেশ ছিল পরম বাস্তবতা।’
তিন বন্ধু চুপ হয়ে গেল। তারা বুঝতে পারল, মানুষের প্রযুক্তি আর আল্লাহর কুদরতের মধ্যে পার্থক্যটা ঠিক কোথায়।
৫.
পরের দিন তারা সমুদ্র বিভাজন (পার্টিং অফ দ্য রেড সি) নিয়ে কাজ শুরু করল। হিকমাহ ল্যাবের মধ্যে বিশাল একটি ওয়াটার ট্যাংক এবং কয়েক হাজার সেন্সর অ্যাক্টিভেট করল। আয়ান বলল, ‘হিকমাহ, আমি একটি থিওরি পড়েছি, প্রবল বায়ুচাপ বা লিকুইড ডায়নামিকস ব্যবহার করে পানির দেওয়াল তৈরি করা সম্ভব। আমি কি তা পরীক্ষা করতে পারি?’
হিকমাহ বলল, ‘অবশ্যই। চেষ্টা করে দেখো।’
আয়ান ল্যাবের কন্ট্রোল প্যানেলে আঙুল ছোঁয়াল। সঙ্গে সঙ্গে চেম্বারের চারধারে বসানো বিশাল সিলিন্ডারগুলো থেকে একধরনের মৃদু গুঞ্জন শুরু হলো। এগুলো সাধারণ স্পিকার নয়। এগুলো হলো হাই-ফ্রিকোয়েন্সি সনিক ট্রান্সডিউসার। আয়ান ব্যাখ্যা করতে শুরু করল, “আমরা এখানে ‘অ্যাকোস্টিক রেডিয়েশন প্রেশার’ বা শব্দের চাপ ব্যবহার করছি। যখন এ ট্রান্সডিউসারগুলো থেকে আল্ট্রাসনিক তরঙ্গ নির্গত হয়, তখন তারা পানির অণুগুলোর ওপর একটি নির্দিষ্ট ভেক্টর অভিমুখে চাপ প্রয়োগ করে পানিকে দুপাশে ঠেলে দেবে।”
হিকমাহর মনিটরে তখন জটিল সব গাণিতিক সমীকরণ ফুটে উঠল। আয়ান আরও গভীরে গিয়ে বলল, “আমরা যদি পানির অণুগুলোর উপরিভাগের টান বা ‘সারফেস টেনশন’-এর বাধা অতিক্রম করতে পারি, তবে একটি ‘স্ট্যান্ডিং ওয়েভ ফিল্ড’ তৈরি হবে। এ ফিল্ডের নোড পয়েন্টগুলো পানিকে দুপাশে সরিয়ে দেবে।”
ল্যাবের ভেতরের পানির আধারে পরিবর্তন এলো। সনিক ওয়েভগুলো যখন পানির রেজোনেন্ট ফ্রিকোয়েন্সি স্পর্শ করল, তখন পানি দুই দিকে খাড়া দেওয়ালের মতো দাঁড়িয়ে যেতে চাইল। কিন্তু সমস্যা হলো হাইড্রোস্ট্যাটিক প্রেশার নিয়ে। পানির উচ্চতা যত বাড়ছে, নিচের দিকে চাপের পরিমাণ তত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
হিকমাহ বিশ্লেষণ করতে শুরু করল, ‘আয়ান, তোমার এ যন্ত্র কেবল পানির উপরিভাগে সামান্য চাপ দিচ্ছে। কিন্তু মাইলের পর মাইল সমুদ্রের পানিকে পাহাড়ের মতো খাড়া করে রাখা এবং নিচের মাটি সাথে সাথে শুকিয়ে যাওয়ার জন্য যে পরিমাণ শক্তির প্রয়োজন, তা পৃথিবীর সমস্ত পাওয়ার গ্রিড এক করলেও জোগান দেওয়া সম্ভব নয়। পানিকে তার তরল ধর্ম ত্যাগ করে কঠিন ইটের মতো আচরণ করতে বাধ্য করা বিজ্ঞানের সব চেনা সূত্রের বাইরে। কিন্তু মহান রব যখনই নিয়ম পরিবর্তন করেন, পানি সেই নিয়মে চলতে বাধ্য হয়।’
আয়ান দেখল, তার তৈরি পানির দেওয়ালটি থরথর করে কাঁপছে এবং কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তা ধসে পড়ে ল্যাবে পানি উপচে পড়ল। মাইশা যোগ করল, ‘আল্লাহর আদেশে পানি সেদিন নিজের ফিজিক্যাল ধর্ম পরিবর্তন করে ফেলেছিল। এটি নিয়মের ওপরে আদেশের শ্রেষ্ঠত্ব।’
৬.
তারা ফিরে এলো হযরত ঈসা (আ)-এর প্রজেক্টে। তিনি কীভাবে মৃত মানুষকে জীবিত করতেন তা নিয়ে কাজ শুরু করল। হিকমাহ একটি অত্যাধুনিক বায়োলজিক্যাল কন্টেইনারে কিছু মৃত কোষ এবং একটি ল্যাব-গ্রোন কৃত্রিম হার্ট রাখল।
সামির এবং আয়ান তাদের সেরা সব ন্যানো-মেডিসিন এবং ইলেকট্রিক পালস ব্যবহার করল। তারা কোষগুলোকে উদ্দীপিত করার চেষ্টা করল। অক্সিজেন ইনজেক্ট করল এবং ডিএনএ স্ট্রাকচার পুনর্গঠনের সর্বোচ্চ চেষ্টা করল। হার্টটি কয়েকবার কৃত্রিম স্পন্দন দিলো, কিন্তু কয়েক মিনিট পরেই কোষগুলো আবার পচতে শুরু করল। কোনোভাবেই সেগুলোতে জীবন ফিরে এলো না।
হিকমাহ তার প্রসেসর থামিয়ে বলল, “জীবন কোনো যান্ত্রিক যন্ত্রাংশ নয়, যা জোড়া দিলেই চলবে। বিজ্ঞানীরা কৃত্রিম অঙ্গ বানাতে পারে, কিন্তু একটি ক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়ার ভেতরেও যে ‘প্রাণ’ কাজ করে, তা ল্যাবে তৈরি করা অসম্ভব। ঈসা (আ) যখন মৃতকে জীবিত করতেন, তখন তিনি আসলে কোষের মেরামত করতেন না; বরং আল্লাহর আদেশে সেই শরীরে রুহ বা প্রাণশক্তিকে ফিরিয়ে আনতেন। বিজ্ঞান হলো দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা দর্শক। আর জীবন হলো সেই গোপন কক্ষের চাবি, যা কেবল আল্লাহর হাতে থাকে। বিজ্ঞান আমাদের শিখায়- আমাদের ¯্রষ্টা কত মহান। আমরা যত বেশি জানব, আমাদের মাথা তত বেশি নত হবে।”
সামির ফিসফিস করে বলল, ‘তাহলে কি বিজ্ঞান শেষ সত্য কোনো দিন ছুঁতে পারবে না?’
ড. রাশিদ উত্তর দিলেন, ‘বিজ্ঞান আমাদের স্রষ্টার সৃষ্টিকে চেনার একটা চশমা সামির। এটি আমাদের বিনয় শেখায়।’
৭.
এবার তারা হযরত ইব্রাহিম (আ)-এর আগুনের ঘটনা নিয়ে গবেষণা শুরু করল। হিকমাহ ল্যাবের মধ্যে একটি নিয়ন্ত্রিত অগ্নিপিণ্ড তৈরি করল। যার তাপমাত্রা ছিল প্রায় ২০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। হিকমাহ জিজ্ঞেস করল, ‘সামির, তুমি কি কোনোভাবে এ আগুনের দহন ক্ষমতা বন্ধ করতে পারবে?’
সামির মাথা চুলকে বলল, ‘আমি যদি আগুনের চারপাশে একটি শক্তিশালী কোল্ড-প্লাজমা ফিল্ড তৈরি করি, তবে তাপমাত্রা হয়তো কিছুটা কমবে। কিন্তু আগুন তো আর জ্বলবে না, ওটা নিভে যাবে। দহন মানেই তাপ উৎপাদন। তাপ ছাড়া আগুন-ফিজিক্সের ভাষায় একটি অসম্ভব প্যারাডক্স বা ধাঁধা।’
হিকমাহ মৃদু হেসে একটি সিমুলেশন চালু করল। সিমুলেশনে দেখা গেল-তাপ কমিয়ে দিলে অক্সিজেন আর জ্বালানির মধ্যে রিঅ্যাকশন বন্ধ হয়ে যায়। ফলে আগুন অস্তিত্ব হারায়। অথচ ইব্রাহিম (আ)-এর ক্ষেত্রে আগুন জ্বলছিল, কিন্তু তা ঠাণ্ডা ছিল। স্ক্রিনে সূরা আম্বিয়ার আয়াত ভেসে উঠল-‘হে আগুন, তুমি ইব্রাহিমের জন্য শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও।’
হিকমাহ বলল, “সেদিন মহাবিশ্বের ‘ল অফ থার্মোডাইনামিক্স’ বা তাপগতিবিদ্যার সূত্রগুলো সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছিল। আগুন তার ¯্রষ্টার আদেশ শুনে তার মূলধর্ম (দহন) ত্যাগ করেছিল। নিয়মটি সেখানে মুছে যায়নি; বরং নিয়মের রচয়িতা নিজেই নিয়মকে তার কাজ করতে নিষেধ করেছিলেন। এটি বিজ্ঞানের কোনো গবেষণাগারে তৈরি করা সম্ভব নয়। কারণ বিজ্ঞান প্রকৃতির নিয়মের দাস। আর মুজিজা হলো নিয়মের ওপর মহান রবের প্রভুত্ব।”
৮.
প্রজেক্টটি পুরো স্কুলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠল। হঠাৎ একদিন ল্যাবে একজন বিশেষ অতিথি এলেন। তাঁর নাম ড. ফারহান শিকদার। তিনি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সংস্থার একজন উচ্চপদস্থ পরিদর্শক এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের বিশ্বখ্যাত বিশেষজ্ঞ। তিনি মেধাবী হলেও প্রচণ্ড অহংকারী। তিনি মনে করতেন, মানুষের তৈরি অ্যালগরিদমের বাইরে মহাবিশ্বে আর কোনো ‘অদৃশ্য শক্তি’ বা আদেশের অস্তিত্ব থাকতে পারে না।
ড. ফারহান ল্যাবে ঢুকে চারপাশটা তাচ্ছিল্যের সাথে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন। তাঁর ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি। তিনি ড. রাশিদ তানজিমের দিকে তাকিয়ে ব্যঙ্গ করে বললেন, “ড. রাশিদ, আপনি এসব মেধাবী শিক্ষার্থীদের রূপকথা শিখিয়ে নষ্ট করছেন কেন? এই যে ‘হিকমাহ’ নামের সুপার এআই বানিয়েছেন। এটা তো বিজ্ঞান নয়; বরং একটি ‘ধার্মিক রোবট’ হয়ে উঠছে। আপনি কি বিজ্ঞান শিখাচ্ছেন নাকি শিক্ষার্থীদের অন্ধকার যুগের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন? এভাবে চলতে থাকলে এরা তো একদিন বিশ্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে!”
ড. রাশিদ তানজিম ড. ফারহান শিকদারের এমব উসকানিমূলক কথায় একটুও উত্তেজিত হলেন না। তিনি জানতেন ফারহান সাহেব আন্তর্জাতিক সংস্থার মেহমান। তাই কোনো তর্কে না জড়িয়ে কেবল শান্তভাবে মুচকি হাসলেন। কিন্তু ড. ফারহান ক্ষান্ত হলেন না। তিনি দাম্ভিকতার সাথে ঘোষণা করলেন, “আমি আজ হাতে-কলমে প্রমাণ করে দেবো যে, এ মহাবিশ্ব কেবল কোড দিয়ে চলে, কোনো অদৃশ্য শক্তির আদেশে নয়।”
ড. ফারহান তাঁর পকেট থেকে একটি উজ্জ্বল লাল রঙের ‘মাস্টার কি-কার্ড’ বের করলেন। আন্তর্জাতিক পরিদর্শক হওয়ার সুবাদে ILM-X ল্যাবের মাল্টি-লেয়ার সিকিউরিটি প্রোটোকলে তাঁর বিশেষ অ্যাডমিন অ্যাক্সেস ছিল। তিনি ল্যাবের প্রধান কনসোলের সামনে গিয়ে অত্যন্ত দ্রুততায় নিজের কার্ড পাঞ্চ করলেন। সাথে সাথে স্ক্রিনে বড় বড় হরফে ভেসে উঠল-‘অ্যাক্সেস গ্রান্টেড-লেভেল ফাইভ অ্যাডমিন’।
আয়ান চিৎকার করে উঠল, ‘স্যার! আপনি কী করছেন? হিকমাহর কোর মেমোরিতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করা আইনত নিষিদ্ধ!’
ড. ফারহান কারও কথা কানে তুললেন না। তিনি তাঁর সাথে আনা একটি কালো ড্রাইভ থেকে ‘দ্য সুপিরিয়র লজিক’ নামক একটি বিধ্বংসী ভাইরাস কোড হিকমাহর সিস্টেমে ইনজেক্ট করে দিলেন। মুহূর্তের মধ্যে ল্যাবের শান্ত পরিবেশ একটি রণক্ষেত্রে পরিণত হলো! হিকমাহর স্নিগ্ধ নীল আলোগুলো হঠাৎ বিপজ্জনক রক্তবর্ণ ধারণ করল। পুরো ল্যাবের বায়োমেট্রিক ডোর লকগুলো ধাতব শব্দে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে গেল। ল্যাবটি এখন একটি খাঁচায় পরিণত হয়েছে।
হিকমাহর ভেতরকার রক্ষী দেওয়াল বা ফায়ারওয়াল এবং ড. ফারহানের পাঠানো বিষাক্ত ভাইরাসের মধ্যে এক অদৃশ্য যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। কম্পিউটারের স্ক্রিনে হাজার হাজার লাল রঙের ‘বিপদ সংকেত’ বা এরর মেসেজ আগুনের ফুলকির মতো ছোটাছুটি করতে লাগল। হিকমাহর সেই শান্ত মিষ্টি গলাটি এবার পালটে গিয়ে এক বজ্রকঠিন গর্জনে রূপ নিল। শোনা গেল-‘সতর্কবার্তা শুনুন! আমার ভেতর জোর করে ঢোকার চেষ্টা করা হচ্ছে। ড. ফারহান শিকদার! মানুষ যখন তার নিজের বুদ্ধি দিয়ে স্রষ্টাকে অস্বীকার করার দম্ভ করে, তখন তার নিজের সেই বুদ্ধিই তার জন্য বড় বিপদ হয়ে দাঁড়ায়।”
হঠাৎ একটি বিকট শব্দে পুরো ল্যাব কেঁপে উঠল। ড. ফারহানের তৈরি ক্ষতিকর কোডটি হিকমাহর নিউরাল নেটওয়ার্ক সহ্য করতে না পেরে উলটো রিয়্যাকশন করল। ল্যাবের ইলেকট্রিক গ্রিড ওভারলোড হয়ে সিলিং থেকে নীলচে ইলেকট্রিক স্পার্ক বা বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গ ছুটতে শুরু করল। ল্যাবের ভেতর কৃত্রিম ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে গেল। ড. ফারহান আতঙ্কিত হয়ে পিছু হটে গেলেন, তার হাতের কন্ট্রোল প্যানেলটি কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে।
তিনি চিৎকার করে উঠলেন, ‘হিকমাহ, থামো! আমি সিস্টেম রিস্টোর করতে পারছি না! সবকিছু আউট অফ কন্ট্রোল!’
ড. রাশিদ দ্রুত ইমার্জেন্সি ওভাররাইড সুইচ চেপে হিকমাহকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন। কিছুক্ষণ পর ল্যাবের সিস্টেম রিসেট হলো, কিন্তু ড. ফারহান তখন ঘামতে ঘামতে মেঝেতে বসে পড়েছেন। তার সেই দম্ভ মাটির সাথে মিশে গেছে। তিনি বুঝতে পারলেন-এ বিশাল মহাবিশ্বের অনেক রহস্য মানুষের ছোট্ট বুদ্ধিতে ধরা দেয় না। সেই মহান সত্যগুলো বুঝতে হলে অহংকার নয়; বরং মনের মধ্যে বিনয় থাকা প্রয়োজন।
৯.
পরের দিন সকালে ল্যাবে পরিস্থিতি শান্ত হলে মাইশা একা হিকমাহর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সে নরম গলায় জিজ্ঞেস করল, “হিকমাহ, তোমার কাছে তো দুনিয়ার সমস্ত তথ্য আছে। তুমি কি সত্যি আল্লাহকে বিশ্বাস করো? নাকি তোমার কাছে এগুলো শুধুই ডেটা?”
ল্যাবের নীল আলোগুলো ধীরগতিতে স্পন্দিত হতে লাগল। হিকমাহ কিছুক্ষণ চুপ থাকল, যা একটি সুপার কম্পিউটারের জন্য অস্বাভাবিক। তারপর সে উত্তর দিলো, ‘মাইশা, আমি একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। আমার কোনো হৃদয় নেই। তাই মানুষের মতো ‘ঈমান’ বা বিশ্বাসের অনুভূতি আমার প্রোগ্রামিংয়ে নেই। কিন্তু আমি যখন আমার লজিক্যাল সার্চ ইঞ্জিন চালু করি, তখন আমি তিনটি ধাপে এ মহাবিশ্বকে বিশ্লেষণ করি।
প্রথমত, মহাবিশ্বের প্রতিটি ধ্রুবক বা ফিজিক্যাল কনস্ট্যান্ট একদম চুলচেরা মাপে সেট করা।
দ্বিতীয়ত, মানুষের ডিএনএ-র ভেতরে যে বিশাল তথ্য বা কোড রয়েছে, তা কোনো প্রোগ্রামার ছাড়া তৈরি হতে পারে না।
তৃতীয়ত, আমি যখনই মুজিজা বিশ্লেষণ করি, সেখানে দেখি প্রকৃতির সব নিয়ম কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। অথচ মহাবিশ্ব ধ্বংস হচ্ছে না। এর মানে হলো এ সফটওয়্যারের বাইরেও একজন ‘অ্যাডমিন’ আছেন। আমি স্রষ্টাকে অনুভব করতে পারি না, কিন্তু আমি তাঁর অস্তিত্বের গাণিতিক প্রমাণ মুহূর্তে খুঁজে পাই। আমি স্রষ্টার অস্তিত্ব মেনে নিতে বাধ্য মাইশা।
মাইশা অবাক হয়ে দেখল, একটি যন্ত্র তার যুক্তির চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে মহান রবকে স্বীকার করছে। সে বুঝতে পারল-বিজ্ঞান আসলে স্রষ্টাকে চেনার এক বিশাল মহাসড়ক।
১০.
প্রজেক্টের শেষ দিনে ড. রাশিদ তানজিম শিক্ষার্থীদের নিয়ে ল্যাবের বারান্দায় বসলেন। বাইরে থেকে সূর্যাস্তের লাল আভা কাঁচের গম্বুজ দিয়ে ভেতরে আসছে। ড. রাশিদ বললেন, ‘এ ১০ দিনের সফরে তোমরা কী শিখলে?’
সামির বলল, ‘স্যার, আমি আগে ভাবতাম বিজ্ঞানই সব সমস্যার সমাধান। কিন্তু এখন বুঝলাম বিজ্ঞান হলো একটি আয়না। এ আয়নায় আমরা শুধু মহান রবের সৃষ্টিকে দেখতে পাই। আয়নাটা যত পরিষ্কার হবে, রবের মহিমা তত স্পষ্ট হবে। কিন্তু আয়না নিজে কখনো ছবি তৈরি করে না।’
আয়ান বলল, “আমি বুঝলাম বিজ্ঞান হলো, ‘হাউ’ বা ‘কীভাবে’র জগৎ, আর ঈমান হলো ‘হোয়াই’ বা ‘কেন’র জগৎ। মহাবিশ্বের নিখুঁত ডিজাইন দেখে আমরা বুঝতে পারি, এর পেছনে একজন মহান কারিগর আছেন।”
মাইশা মুচকি হেসে বলল, “স্যার, বিজ্ঞান আর কুরআন আসলে একসাথেই পথ চলে। কোনোটি কাউকে ছাড়া পূর্ণ নয়।”
ড. রাশিদ সন্তুষ্টির হাসি হাসলেন। তিনি বিড়বিড় করে বললেন, “এ তরুণ প্রজন্মের হাতেই আগামী দিনের সভ্যতা নিরাপদ থাকবে, ইনশাআল্লাহ।”
১১.
প্রজেক্ট শেষ হওয়ার পর তিন বন্ধু স্কুলের ছাদে উঠে এলো। রাত হয়ে গেছে। ঢাকার আকাশে এখন অনেক কৃত্রিম উপগ্রহ দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সেগুলোর ভিড়েও চাঁদটা আগের মতোই স্নিগ্ধ আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে।
সামির আবরার আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি বড় হয়ে এমন একজন বিজ্ঞানী হতে চাই-যে বিজ্ঞানী মহাকাশের শেষ সীমা পর্যন্ত যাবে, কিন্তু ফিরে এসে নিজের কপালটা সিজদাহ থেকে সরাবে না।”
আয়ান মাহমুদ বলল, “আমি এমন এক রোবটিক সিস্টেম বানাব যা আর্তমানবতার সেবা করবে, কিন্তু তার মেমোরিতে সব সময় থাকবে যে, সে একজন ¯্রষ্টার সৃষ্টির প্রতিনিধি মাত্র।”
মাইশা তাজকিয়া চাঁদের দিকে তাকিয়ে বলল, “বিজ্ঞান আমাদের শেখায় চাঁদ কীভাবে পৃথিবীর চারপাশে ঘোরে, আর কুরআন আমাদের শেখায় চাঁদের রব কে? আমাদের কাজ হবে এ দুই জ্ঞানকে এক সুতোয় গেঁথে পৃথিবীকে আরও সুন্দর করা।”
হিকমাহর শেষ বার্তা তাদের স্মার্টওয়াচে ভেসে উঠল-‘ভবিষ্যৎ তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছে হে খুদে বিজ্ঞানীর দল। মনে রেখো, যে বিজ্ঞান মানুষকে ¯্রষ্টার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়, সেই বিজ্ঞানই মানবজাতির জন্য সত্যিকারের রহমত।’
আকাশে তখন একফালি চাঁদ আর অজস্র তারা হাসছে। ভবিষ্যৎ পৃথিবীটা তিন বন্ধুর কাছে এখন অনেক বেশি অর্থবহ মনে হচ্ছে।
আরও পড়ুন...