মমতাময়ী সে আগুনের মেয়ে

জুলাই-নিবন্ধ আতা সরকার সেপ্টেম্বর ২০২৬

কাঁধে আলতো ছোঁয়া। মমতাময়ী কোমল কণ্ঠে ডাক : বাবা, স্কুলে যাই।

আনমনা আবুল হোসেন। সামনে কয়েকটা চায়ের কাপ। কাস্টমারদের জন্য কেটলি থেকে চা ঢালছিল। এরপর দুধ আর চিনি মেশানোর কাজ। সবগুলো কাজই হবে, খানিকটা রোবটের মতো। কিন্তু কেন জানি এখন আর কাজে মন বসতে চায় না।

আবার কোমল গলা : যাই বাবা।

আবুল হোসেন আনমনে শুধুই বলে ওঠে : হুম।

বলেই চমকে উঠল। কার ছোঁয়া? কে যাই বলল? অবিকল নাফিসার গলা। বুকটা ধড়াস করে উঠল আবুল হোসেনের। চমকে ফিরে তাকাল পেছনে। ছোট মেয়ে সাফা? স্কুলে যাওয়ার আগে বাবাকে জানিয়ে যাচ্ছে-ঠিক নাফিসার মতো?

নিজের চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। কথায় কথায় ক্ষণে ক্ষণে ভিজে যায়। বুকটাও ধড়াস ধড়াস লাফিয়ে ওঠে। চায়ের চুলোর আঁচে ঘেমে ঘেমেও মুখটা ভিজে উঠেছে। কাঁধের গামছা দিয়ে মুখ মোছে, ভেজা চোখও।

চারপাশে তাকায়। কোথাও কেউ নেই। চা পান করতে আসা কাস্টমাররা নিজেদের মধ্যে আড্ডায় মাতোয়ারা।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবুল হোসেন। নাফিসা তার বুকটা শুধুই শূন্য করে যায়নি, হৃদয়টা চিরে দিয়ে গিয়েছে। ওর এইচএসসি রেজাল্টটা যেদিন এলো, জানা গেল : সে জিপিএ ৪.২৫ পেয়ে পাশ করেছে-তখন মেয়ে হারানোর হাহাকার প্রবল হয়ে বেজেছে।

নাফিসার ঝোঁক ছিল লেখাপড়ার। শুধুই মা-বাবা-পরিবারের আয়-রোজগারের কষ্ট নয়, চেয়েছিল মানুষের খেদমত করতে। স্বপ্ন ছিল : গ্রাফিক ডিজাইনার ও ফটোগ্রাফার হবে। স্বপ্নের পথে হাঁটতে হাঁটতে সমুখ রণক্ষেত্রে সে হয়ে উঠল বিদ্রোহ ও বিপ্লবের কন্যা। আগুনের মেয়ে।

মেয়ে হারানোর ব্যথার সাথে সাথে তার বিপ্লবী মেয়েটার জন্যে বুকটা কি গর্বে ভরেও ওঠে?

রাতে চায়ের দোকানটা বন্ধ করে আবুল হোসেন যখন পথে নামল, কেন জানি দুটো পা-ই স্থির হয়ে গেল। মনটা বেঁকে বসছে। এখনই ঘরে ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে না।

কোন ঘরে যাবে সে? যে ঘরে এখন আর নাফিসা নেই?

আবুল হোসেনের স্ত্রী কুলসুম বেগম। দুই মেয়ে নাফিসা হাসান মারওয়া ও সাফা হোসেন। মেয়েরা স্কুল-কলেজে পড়ে। আবুল হোসেন দম্পতি দুই মেয়েকেই লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষের মতো মানুষ বানাতে চায়। সংসারের অভাব যেন ওদেরকে স্পর্শ না করে, অভাবের কারণে ওদের লেখাপড়া বাধাগ্রস্ত না হয়, সেজন্য স্বামী-স্ত্রী দুজনারই কড়া নজর। সুযোগ পেয়ে কুলসুম বেগম প্রবাসে চাকরি নিয়ে কুয়েতে গিয়েছে। তাদের ছোট মেয়ে সাভারে তার নানুর সাথে থাকে। ওখানেই লেখাপড়া করছে। বড় মেয়ে নাফিসাও সাভারেই থাকত। সাভার ল্যাবরেটরি উচ্চ বিদ্যালয়ে ইন্টারমিডিয়েট ফার্স্ট ইয়ার পর্যন্ত পড়েছে। এরপর মাইগ্রেশন নিয়ে টঙ্গী সাহাজউদ্দিন সরকারি আদর্শ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সেকেন্ড ইয়ারে ভর্তি হয়।

বাবা আর মেয়ে এক রুমের বাসা ভাড়া নিয়ে থাকে। বাবা সারা দিন চায়ের দোকানেই। আর মেয়ের ওপর কড়া হুকুম : লেখাপড়া ছাড়া আর কোনো দিকে যেন না তাকায়। ঘর-সংসার রান্নাবান্না নিয়ে ব্যস্ত যেন না থাকে। বাসার পাশেই খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যাতে মেয়েকে রান্নাবান্নার চাপ না নিতে হয়। 

বারবার আবুল হোসেনের মনে ছুটে বেড়াচ্ছে নাফিসা। তার হুল্লোড় কানে বাজছে। কল্পনায় চোখে ভাসছে উত্তাল মিছিলে মেয়ের স্লোগান দেওয়ার দৃশ্য।

নাফিসার সারা দেহ থেকে কি তখন আগুনের ফুলকি ঝলক দিয়ে উঠেছে? জ্বলজ্বলে তেজস্বিনী মেয়ে তার!

বাবার মনকে, বাবাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে তারই দিকে। হাঁটতে শুরু করল আবুল হোসেন। ঘরের পথে নয়, কোন পথে যাচ্ছে সেদিকে তার খেয়াল নেই। শুনতে পাচ্ছে তারই আত্মজার উচ্চকিত স্লোগান। কানে ভেসে আসছে বিপ্লবের গান।

হাঁটতে হাঁটতে কখন যে কবরখানায় এসে ঢুকে পড়েছে, খেয়াল করেনি সে। এসে থামল মেয়ের কবরের পাশে।

কবরের পাশে দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই ভেসে এলো মেয়ের কণ্ঠস্বর : আব্বু, আমি তো বাঁচব না, লাশটা নিয়ে যাইয়ো।

নাফিসার এই কণ্ঠস্বরটাই তো ভেসে এসেছিল তার মোবাইলে। আবুল হোসেনের মনটা সেদিন অস্থির ছিল। খবর এসেছে : সাভারে গোলমাল চলছে। শুরু হয়েছে হাঙ্গামা।

মেয়ের সাথে দুপুরে কথা হয়েছে। মেয়েই ফোন করেছে। তার কণ্ঠে ছিল উল্লাস : বাবা, সুখবর। শেখ হাসিনা পালিয়েছে। 

বাবার মনের শঙ্কা কাটে না। খানিকটা রাগ দেখিয়েই বলল : শেখ হাসিনা পালিয়েছে তো কী হয়েছে? তোর বাবা যে চাওয়ালা ছিল সেই চাওয়ালাই থাকবে। আল্লাহ না করুক, তোর যদি কিছু একটা কিছু হয়ে যায়, তোকে কে দেখবে?

নাফিসা বাবাকে আশ^স্ত করে বলেছিল : তুমি আমাকে নিয়ে চিন্তা করো না। এখানে আমি ভার্সিটির বড় ভাই-বোনদের সাথে আছি।

আবুল হোসেন নাফিসাকে রাস্তায় ঘোরাঘুরি করে ঐসব হৈ-হাঙ্গামায় না থেকে বাসায় ফিরে যেতে বলেছিল। নাফিসার জবাবটা ছিল দৃঢ় কণ্ঠেই : আর পেছনে ফিরে যাওয়ার উপায় নেই আব্বা। আল্লাহ কপালে যা রাখছেন তাই হবে। পরে নাফিসাকে ফোন করে কোনো সাড়া না পেয়ে টেনশন আরও বেড়ে গিয়েছিল। এ সময়ই মোবাইলটা বেজে উঠল। হ্যালো বলতেই এক অজানা ছেলের কণ্ঠস্বর : আপনি কে বলছেন?

: বাবা।

তখনই আত্মাটা ছ্যাঁৎ করে উঠেছিল। নাফিসার কি কিছু হয়েছে? কোনো দুঃসংবাদ? ও নিজে ফোন করেনি কেন? এখন কে ফোন করল?

দুঃসংবাদ ছেলেটাই জানাল : নাফিসা গুলিবিদ্ধ। হাসপাতালে রয়েছে। ল্যাবজোন হাসপাতালে।

খবরটা পেয়েই দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। সাথে সাথে দোকান বন্ধ করে বেরিয়ে পড়েছিল। নাফিসার নানি-মামাদেরকে ফোন করে তাদের নাগাল পেল না। ওদের ওখানেই সাভারে ছিল নাফিসা।

এখানে টঙ্গীতে থাকলে বারবার ছুটে যায় আন্দোলনে। তাই তাকে মামাদের তত্ত্বাবধানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সংগ্রামী মেয়ে তার। যোদ্ধা। রণক্ষেত্র ঠিকই বের করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।

মামাদের কাউকে না পেয়ে দূর প্রবাসে কুয়েতে কর্মরত স্ত্রী কুলসুম বেগমকে ফোন করে মেয়ের খবর জানায়। নিজেও ছোটে সাভারে।

অমলিন সেই দিনক্ষণ কখনোই ভুলবার নয়। নিশ্চিত বিজয়। বিজয়ের মাঝেও পরাজিত ফ্যাসিস্ট শক্তি কতখানি ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে, সাভারের রক্তভেজা মাটি তার সাক্ষী।

আগস্টের পাঁচ তারিখ। নাফিসা তখন ছোট মামার বাসায়। বাসা থেকে বেরুনোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল সে। মামার কড়া নিষেধ অমান্য করে লুকিয়ে বেরিয়ে গেল সে। যোগ দিলো ফ্যাসিস্ট সরকারবিরোধী আন্দোলনে। সাভারে জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটির ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে লংমার্চে। 

এরমধ্যে মামার ফোন। লুকিয়ে আন্দোলনে যোগদানের খবর পেয়ে গিয়েছে। হুকুম দিলো বাসায় ফিরে যাওয়ার। তখন রক্ত টগবগ। কার হুকুম কে মানে!

এই ফাঁকেই দুপুর দুইটায় বাবাকে ফোন করে শেখ হাসিনার পলায়নের খবর জানিয়েছিল নাফিসা। 

ওরা মিছিল করে সাভার মডেল মসজিদ এলাকার দিকে যাচ্ছিল, তখনই ফ্যাসিস্ট শক্তি তাদের রক্তখেকো দানবীয় রূপটা দেখায়। পোষা পুলিশদের সাথে নিয়ে তারা সশস্ত্র হামলা চালায় নিরস্ত্র ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর। পালিয়ে যাওয়ার কালেও প্রতিহিংসা মিটিয়ে যায়। গোলাগুলিতে লুটিয়ে পড়ে অনেকেই। আহত হয় নাফিসাও। তাদেরকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসা হয় ল্যাবজোন হাসপাতালে। যতদূর সম্ভব সাধ্যমতো চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়।

এরমধ্যেই খবর পেয়ে ছুটে আসে নাফিসার মামারা। আরও উন্নত চিকিৎসার জন্য আহতদেরকে এনাম হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে ল্যাবজোন হাসপাতালেই মৃত্যু হয় নাফিসার। শহীদদের লাশ নিয়ে ফেরার পথে তারা আবার হামলার শিকার হয়। ছররা গুলিতে নাফিসার মামা এবার আহত হয়।

তখন পর্যন্ত হতভাগা বাবা আবুল হোসেন সাভারে পৌঁছাতে পারেনি।

কন্যাহারা বাবার বুক ফাটা আর্তনাদে কবরখানার বাতাস সিক্ত হয়ে ওঠে।

এভাবেই বুঝি মানুষের স্বপ্ন গুঁড়িয়ে যায়, নাকি একজনের আত্মাহুতি জাগিয়ে তোলে হাজারো মানুষের স্বপ্ন! একজন হবু গ্রাফিক ডিজাইনার ফটোগ্রাফার তার তরতাজা রক্তের কম্পিউটারে এঁকেছে ফ্যাসিস্ট শক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহী বাংলার চিরন্তন রূপ, ক্যামেরার ফ্লাশে ধারণ করেছে মানুষের জাগরণ ও মুক্তির স্বপ্ন।

তার এই এতটুকু মেয়ে যে এই দেশ ও মানুষের জন্য এত বড় এত মহান কাজ করে গিয়েছে আবুল হোসেনের তা কল্পনাতেও আসেনি। এখন বুক ফেটে যেমন তার কান্না আসছে, তেমনি গর্বেও মাথা উঁচু হচ্ছে।

ছাত্র-ছাত্রীদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন স্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। নাফিসাদের কলেজেও। বিদ্রোহ ও সংগ্রামের আগুন তো এতদিন চাপা পড়েছিল ওদের মনেও। তাই এই আন্দোলনে যুক্ত হতে তারা বিলম্ব করেনি। নাফিসারা কয়েকজন সহপাঠিনী বান্ধবীরা মিলে একটা ব্লগ গ্রুপ তৈরি করে। সেখানেই তারা পরামর্শ ও পরিকল্পনা করে। বেরিয়ে পড়ে আন্দোলনের রাজপথে। নেত্রী নাফিসা।

কর্মব্যস্ত আবুল হোসেন এত সব টের পায়নি। মেয়ের খবর প্রথম জানতে পারে প্রতিবেশীদের কাছ থেকে। বুকটা কেঁপে ওঠে বাবার। মেয়েকে খুব বকাঝকা করে। কে শোনে কার কথা! যে বিপ্লবের মন্ত্রের পাঠ নিয়েছে নাফিসারা তা থেকে তাদেরকে বিচ্যুত করতে পারে কে? অভিভাবকের বারণ নয়, পেশিশক্তির গোলাগুলিও নয়।

আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখনই নাফিসা সাভারে যাওয়ার জন্য বলে : পরীক্ষা তো নাই। এই ফাঁকে সাভারে মামাদের বাসা থেকে ঘুরে আসি।

বাবা হয়তো মনে মনে খানিকটা স্বস্তিই পেয়েছিল। মামাদের বাড়িতে গিয়েই বেড়িয়ে আসুক, এখানে থাকলেই তো এইসব আন্দোলন সংগ্রামের মধ্যে জড়িয়ে থাকবে?

বাবা তো আর জানত না, মেয়ের লক্ষ্য ছিল ভিন্ন-সাভারে বৃহত্তর আন্দোলনে শামিল হওয়া! 

সাভারে যাওয়ার কদিন পরেই নাফিসা আন্দোলনের মাঝখান থেকে সেলফি তুলে বাবাকে পাঠায়। ছবি দেখেই বাবা অস্থির হয়ে পড়ে, ছটফট করতে থাকে। মেয়েকে ফোন করে বকাবকি করে, তৎক্ষণাৎ ঘরে ফিরে আসতে বলে। মেয়ে জানিয়ে দেয়, এখন এটাই সময়ের দাবি, তাদের যত দুর্ভোগ ও দুর্ভাগ্যের স্রষ্টা স্বৈরশক্তির নিপাত।

বুকফাটা কান্না সামলাতে পারছে না আবুল হোসেন। মেয়ের কবরের সামনে বসে পড়ল। 

ঐভাবে কতক্ষণ বসেছিল, জানা নেই তার। নিজের মধ্যেই ছিল না সে। 

কেউ যেন তার মাথায় হাত রাখল। নাফিসা কি?

আবুল হোসেন মাথা তুলল। এরমধ্যেই ভোর হয়ে গিয়েছে, সে টেরও পায়নি। তার মাথায় হাত রেখেছে একজন মেয়ে। একজন নয়, একজনের পর একজন। কয়েকজন মেয়ে। 

কবরের পাশে এতক্ষণ বসে পড়েছিল আবুল হোসেন। এখন উঠে দাঁড়াল। তার পাশে বেশ কয়েকজন মেয়ে। মেয়েরা সারিবদ্ধভাবে এদিকেই আসছে। এদের কাউকে কাউকে সে চিনতে পারল। এরাই নাফিসার বান্ধবী। সঙ্গী-সাথী। একসাথে মিলেমিশে আন্দোলনে নেমেছিল। সবার পরনে স্কুলড্রেস। হাতে বাঁশের ঝুড়িতে গুচ্ছ গুচ্ছ নানান জাতের ফুল। নাফিসার কবরটাকে ফুলে ফুলে সাজিয়ে দিলো। দোয়া দরুদ পড়ল। দেশের গানও গাইল।

আবুল হোসেনের সিক্ত চোখজোড়া এখন ঝিলিক দিয়ে উঠছে। তার মেয়ে তো মরেনি। তার চারপাশে এখন একজন নয়, অনেক অনেক নাফিসা।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ